• Breaking News

    ইতিহাস লিখেও ‘অদৃশ্য’ দীপা, টিভি-তে!

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    karmakar-reuters-m

    ‘ওরা তোমাকে দেখাবে বলে কথা দিয়েছিল। দেখাল না। তুমি তবুও আমাদের গর্ব’, লিখলেন অমিতাভ বচ্চন, টুইটারে।

    ব্যালান্স বিমে তিনি যখন পরীক্ষা দিচ্ছেন, ১০ সেন্টিমিটার চওড়া বিমে ভারসাম্য রাখছেন, ফ্লোর এক্সারসাইজ দেখানো হচ্ছিল ইউরোপীয়দের। টিআরপি-ই যে ঈশ্বর!

    তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে অলিম্পিকে পাঁচ সোনা তিন রুপো এক ব্রোঞ্জের মালিক ইয়ান থর্পের চোখদুটো জ্বলজ্বলে। ত্রিপুরার আগরতলার এক অখ্যাত বাঙালিকে চেনেন তিনি, জানেন তাঁর সম্পর্কে, প্রোদুনোভা সম্পর্কেও!

    স্টার স্পোর্টস নেটওয়ার্ক তাঁকে চিনল না তবু। ১২৫ কোটি ভারতীয়কে যিনি পদকের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, অবহেলায় তাঁকে রাখল এলইডি-এইচডি স্ক্রিনের বাইরে। দিনের শেষে তবু তিনিই পদক-ভরসা, ভারতের।

    দীপা কর্মকার ইতিহাস লিখেছিলেন প্রথম মহিলা ভারতীয় জিমন্যাস্ট হিসাবে অলিম্পিকে যোগ্যতার্জন করে। আবার ইতিহাস লিখলেন নতুন করে, ভল্টে সেরা আটে জায়গা পেয়ে। জিমন্যাস্টিক্সের কোনও ইভেন্টে বিশ্বের প্রথম আটে এক ভারতীয়, কৃতিত্ব হিসাবে এর মূল্য বোঝাই অসম্ভব আমাদের ভারতের মতো অলিম্পিক-ক্রীড়ার ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন দেশে।

    ২৩তম জন্মদিন আগামিকাল, ৯ অগাস্ট। তার আগে নিজেকেই উপহার দিলেন দীপা, সেরা আটে জায়গা পেয়ে। আর তাঁর পারফরম্যান্স যে এখনই প্রতিদ্বন্দ্বীদের চোখ টেনে নিয়েছে, প্রমাণ ভল্টে ১৬.০৫০ পয়েন্ট পেয়ে বাছাইপর্বে শীর্ষে-থাকা মার্কিন সিমোনে বাইলস-এর মন্তব্যে।

    বাইলস বলেছেন, ‘প্রোদুনোভা করতে গিয়ে মরে যাওয়ার কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না।’ যেন দীপার ছিল! যেন দীপা অমরত্ব চেয়েছিলেন প্রোদুনোভা করতে গিয়েই! খেলা মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যত বেশি প্রতিবন্ধকতা, পেরতে তত আনন্দ। দীপা জানেন জীবনের ঝুঁকি আছে প্রোদুনোভায়। কিন্তু সে তো বহু খেলাতেই আছে। বক্সিংয়ে আছে, ফুটবল মাঠে ফুটবলারদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, মহাকাশচারীদের মতো নিরাপত্তার পোশাক পরেও ক্রিকেট মাঠে মৃত্যু কত কাব্যের জন্ম দিয়ে গিয়েছে আমাদের বাংলা সংবাদপত্রে! শুধু শুধু প্রোদুনোভা নিয়ে এভাবে ভারতের এক উঠতি জিমন্যাস্টকে বিদ্রুপ না-করলেই ভাল করতেন মার্কিন জিমন্যাস্ট, সন্দেহ নেই।

    দীপা সচেতন তাঁর ইভেন্ট সম্পর্কে, তাঁকে ঘিরে হঠাৎ জেগে-ওঠা ভারতীয় আবেগ সম্পর্কেও। পদক-সম্ভাবনা নিয়ে আদৌ মাথাই ঘামাচ্ছেন না। তাঁর লক্ষ্য অন্য, অনন্য। তাঁকে দেখে ভারতীয় মেয়েরা উৎসাহী হয়ে উঠুক জিমন্যাস্টিক্সে। যেন পরে ভারতীয় মেয়েদের দল অংশ নিতে পারে অলিম্পিকে। অন্য দেশগুলোয় যেমন হয়, ‘দল’ থাকে। একাকীত্ব ছুঁতে পারে না, ভাল-খারাপ ভাগ করে নেওয়া যায় চূড়ান্ত আসরেও। পারফর্ম করতে হয় একা, একাই। কিন্তু পারফরম্যান্সের পর কয়েকটা হাত তো বাড়ানো থাকুক!

    কিন্তু, তিনি চাইলেই বা কী! যে-সংস্থা দায়িত্বে ছিল তাঁকে দেখানোর তারা তো ক্যামেরা ঘুরিয়েই রাখল!

    যেমন হয়েছে ভারতে, মিলখা সিং পরিচিতি পান ফারহান আখতার তাঁর ভূমিকায় রুপোলি পর্দায় নেমেছেন বলে, মেরি কম রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেরাতেই পারেন, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া পারেন না। হয়ত একদিন আসবে যখন দীপার ভূমিকাতে অভিনয় করার জন্য দৌড়বেন কোনও বলিউডি অভিনেত্রী। নিশ্চিতভাবেই প্রোদুনোভার সময় দীপার ভিডিওটাই ব্যবহৃত হবে তখনও, অভিনেত্রীই বা কেন নেবেন জীবনের ঝুঁকি। কিন্তু যা নিশ্চিত, স্টার স্পোর্টস তখন প্রোমো-তে রোজ বারবার দেখাবে সেই ছবির ঝলক।

    কোনও কোনও হতভাগ্য ভারতীয়র হয়ত মনে পড়বে সেই দিনও, আসল দিনে তাঁকে কীভাবে অস্পৃশ্য ও অদৃশ্য রেখেছিল স্টার স্পোর্টস!

    No comments