• Breaking News

    বারবোসা-মারাকানাজোর শাপমোচন! অলিম্পিকে ফুটবল-সোনা অবশেষে ব্রাজিলের!

     

     

    ব্রাজিল ১          জার্মানি ১


    নেইমার ২৭          মেয়ের ৫৯


    (টাইব্রেকারে ব্রাজিল জয়ী ৫-৪)


     

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    neymar kanna

    মোয়াসির বারবোসা নাসিমেন্তো-কে চেনেন?

    ব্রাজিল চেনে। শুধু চেনে বললে ভুল হবে, সবাই জানেন নামটা। ব্রাজিলের প্রথম গোলরক্ষক যাঁর গায়ের রঙ ছিল কালো। কিন্তু তাঁকে চেনার কারণ গায়ের রঙ নয়। ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের কাছে শেষ ম্যাচ (ফাইনাল বলবেন না কেউ, দোহাই! ওই বিশ্বকাপে ‘ফাইনাল’ বলে কোনও ম্যাচ হয়নি। দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচ ছিল ব্রাজল-উরুগুয়ে।) হেরে বিশ্বকাপ জিততে না-পারার কারণ হিসাবে ব্রাজিল চিহ্নিত করেছিল তাঁকে। ২০০০ সালে মারা যাওয়ার আগেও বারবোসার খেদোক্তি ছিল, ‘ব্রাজিলে যে কোনও অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছর, আর অপরাধ না-করেও পঞ্চাশ বছর পরও আমার কিন্তু মুক্তি নেই!’

    মারাকানাজো-র মড়াকা্ন্নার বিস্তৃতি এত দূর ছিল যে, ২০১৪ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হয়েও ব্রাজিল একটাও ম্যাচ খেলেনি রিও-র মারাকানায়। ঠিক ছিল, যদি ফাইনালে উঠতে পারে, খেলবে আবার। তা, সেই ফাইনালে ওঠার পথে শেষ বাধায় এমন বিপত্তি যে, আবারও নতুন নাম ঢুকে গিয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবল-ইতিহাসে, মিনেইরাওজো! কিন্তু, ব্রাজিলীয়রাই স্বীকার করেছিলেন, মারাকানাজো ‘ট্র্যাজেডি’ হলে মিনেইরাওজো ছিল ‘কমেডি’, আরও পরিষ্কার করে বললে ‘কমেডি অফ এররস’! মারাকানার শাপমোচন হয়নি যদিও।

    বারবোসার মুক্তি এল আরও দু-বছর পর। আনলেন আর এক গোলরক্ষক ওয়েভেরতন পেরিরা দা সিলভা। রিও ব্রাঙ্কো-তেই যাঁর জন্ম, বারবোসার মতোই। অলিম্পিকে তাঁর খেলার কোনও প্রশ্নই ছিল না। ফেরনান্দো প্রাস আঘাত পেযে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন অলিম্পিক থেকে। ব্রাজিলের অলিম্পিক-কোচ রোজেরিও মিকালে ডেকে নিয়েছিলেন তাঁকে। ফাইনালের আগে পাঁচ ম্যাচে ব্রাজিল একটিও গোল খায়নি। ফাইনালে গোল খেল। শে্যে টাইব্রেকারে জার্মানির পঞ্চম শট নিতে এসেছিলেন নিলস পিটারসেন। তাঁর শট বাঁচিয়ে দিলেন ওয়েভেরতন, বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে। নেইমারের কাছে এনে দিলেন সুযোগ, সাধের অলিম্পিক সোনা জিতে নেওয়ার। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি ব্রাজিলের ফুটবল-ভবিষ্যৎ!

    এক শটে মারাকানাজো, বারবোসা, মিনেইরাওজো – তিন পাখি মারলেন নেইমার!

    চার পাখিও বলতে পারেন। ১৯৮৪, ১৯৮৮ ও ২০১২, তিন-তিনবার ফাইনালে উঠেও অলিম্পিকের সোনা অধরা ছিল। বিশ্বকাপে যে-অবস্থা নেদারল্যান্ডসের, অলিম্পিকে ছিল ব্রাজিলের। দেশের মাঠে বিশ্বকাপ জেতা হয়নি বলে শতবার্ষিকী কোপাতে নেইমারকে ছাড়াই খেলতে গিয়ে হারও মেনে নিয়েছিল ব্রাজিল, শুধু এই দিনটা দেখতে চেয়ে। মারাকানায় জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে উড়বে ব্রাজিলের পতাকা। হাসতে হাসতে গাইবে ব্রাজিল। মারাকানা মায়াবী হয়ে উঠবে রাতের আলোয়। সঙ্কেত দেবে নতুন ভোরের।

    দিলও! মিনেইরাওজো-ও এমন প্রভাব ফেলে গিয়েছে ব্রাজিলীয় মানসে যে, ‘সাত’ সংখ্যাটাকে এখন তীব্র অপছন্দ। অথচ, জার্মানির হয়ে গোল শোধ করেছিলেন যিনি, জার্মান অধিনায়ক মেয়ের-এর জার্সি নম্বর সেই সাত! শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওয়েভেরতনের হাত আর নেইমারের পা সব কুসংস্কারকেই ছুড়ে ফেলল কোপাকাবানা বিচের সমুদ্রসৈকতে।

    ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দুটি গোল। চমৎকার! প্রথমে, প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ফ্রি কিকে। নেইমার নিয়েছিলেন শট। বল জার্মান গোলরক্ষক হর্নকে পরাস্ত করে লাগল বারের নিচের দিকে। যেন বারে চুমু খেয়ে জালে। মারাকানায় বিস্ফোরণ! আবার, ৫৯ মিনিটে জার্মানদের হয়ে সমতা ফিরিয়েছিলেন অধিনায়ক মেয়ের। ডানদিক থেকে আক্রমণ এসেছিল। টোলিয়ান ক্রস রেখেছিলেন, অপেক্ষমান অধিনায়কের জন্য। মেয়ের একটুও সময় নষ্ট না করে ডানপায়ের শট রাখেন চকিতে, যা ব্রাজিলের গোলরক্ষক ওয়েভেরতেন-কে পরাস্ত করে সহজেই। অলিম্পিকে ব্রাজিলের জালে প্রথমবার বল!

    পরের ৩১ মিনিটে আর কোনও গোল না হওয়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিট। তখনও গোল নেই। সুযোগ ছিল প্রচুর। ব্রাজিল অনেকবারই গোলের রাস্তা খুলে ফেলেও বল জালে পাঠাতে পারেনি যেমন, শুধু প্রথমার্ধেই তিন-তিনবার জার্মানদের শট ফিরে এসেছিল বারে লেগে। ফলে, ২০০০ সালের পর আবার অলিম্পিক ফুটবল ফাইনালে টাইব্রেকার। সেবার স্পেন জিতেছিল ক্যামেরুনকে হারিয়ে। এবার স্পেনের বার্সেলোনায় খেলেন এমন এক ফুটবলার নিয়ে এলেন ব্রাজিলের বহু সাধের, কাঙ্ক্ষিত সোনা।

    ব্রাজিল যখন প্রথম বিশ্বকাপ জেতে, বলা হত ‘সোনার পরী’। সেই সোনার পরী এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন পেলে, যাঁর উত্থান সানতোস ক্লাবে খেলে। অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথম সোনা এনে দেওয়ার পেছনেও সেই সানতোস। নেইমার বার্সেলোনায় গিয়েছিলেন তো সানতোস থেকেই!

    আর হ্যাঁ, বার্সেলোনায় ফিরে গিয়ে লিওনেল মেসিকেও যে বলতে পারবেন নেইমার এখন, ‘তোমাকে ছুঁয়ে ফেললাম আট বছরেই!’

    No comments