• Breaking News

    ‘সফলতম’ হয়েই থাকুন ফেল্পস, ‘সর্বোত্তম’ হতেই হবে কেন?

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    Winner United States' Michael Phelps celebrates with his gold medal after the men's 200-meter butterfly during the swimming competitions at the 2016 Summer Olympics, Tuesday, Aug. 9, 2016, in Rio de Janeiro, Brazil. (AP Photo/Lee Jin-man)

    খাতায় কলমে লড়াই হয়। আসলে তো আর হয় না!

    সাদা কাগজে কালো কালির এই লড়াই সত্যিই অর্থহীন। অথচ যে কোনও বড় আসরের আগে বা আসর চলাকালীন এমন লেখার লড়াই লেগেই থাকে। বিশ্বকাপ ফুটবলে শ্রেষ্ঠ দল বেছে নেওয়া, বিশেষ বিশেষ ফুটবলারদের ধরে তাঁদের মধ্যে কে সেরা বিচারের চেষ্টা, এগুলো বেশ মুচমুচে ‘কপি’। আমরা যেহেতু সাহেবদের সবসময়ই টোকার চেষ্টা করি, বিলেতের ইংরেজি কাগজপত্রগুলোয় এমন লেখা থাকে আকছার। তেমনই অলিম্পিকের আগে কিছু পারফরম্যান্স তুলে ধরে বোঝানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা চলে, কেন ও কী কারণে কে কে এগিয়ে অন্য অনেকের তুলনায়। ভাবগম্ভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে। গোটা লেখা জুড়ে একটা ‘কেমন দিলাম’ গোছের ভাবনা। দৃষ্টিকোণ, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, বৈজ্ঞানিক যুক্তির মায়াজাল ইত্যাদি কঠিন কঠিন শব্দ দিয়ে ঘেরা জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ! নির্বিচারে টুকে দেওয়ার জন্য এমন অনেক পাওয়া যায় এখন, ইন্টারনেট ঘাঁটলেই। তুলনায় সহজ হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা।

    কিন্তু, শ্রেষ্ঠত্ব যে মেপে ফেলবেন, মাপকাঠিটা কী? কীসের ভিত্তিতে মেপে নেওয়া হবে তিনিই সেরা? যেমন ধরুন মাইকেল ফেল্পস আর উসেইন বোল্ট। কী করে তুলনা করবেন? সাঁতারে বহু পদক পাওয়ার সম্ভাবনা। ১৭টা ইভেন্ট থাকে সাঁতারে। মাইকেল ফেল্পস পাঁচটা অলিম্পিকে ২৬টা পদক পেয়েছেন মানে, ২৬টা ইভেন্টে নামতে পেরেছিলেন বলেই তো? বোল্টের পক্ষে তো ২৬টি ইভেন্টে নামাই সম্ভব নয়! তিনটে অলিম্পিক মিলিয়েও নয়। দুটি অলিম্পিকে তিনি তিনটি করে ইভেন্টে নেমেছেন, ছ’টা সোনা। সোজা বাংলায়, যে ক’টি ইভেন্টে নেমেছেন, সোনা পেয়েছেন। তা হলে কী করে ধরে নেওয়া সম্ভব যে, ২২টি সোনা পেয়েছেন বলেই ফেল্পস এগিয়ে বোল্টের চেয়ে?

    কিছু কিছু খেলায় তা-ও তো একাধিক ইভেন্টে নামার সুযোগ আছে। যে সব খেলায় নেই, তাদের তারকারা বাদ তা হলে? পোলভল্টের শ্রেষ্ঠ তারকা ইসিনবায়েভার পক্ষে একাধিক ইভেন্টে নাম দেওয়াই সম্ভব নয়! তিনি তাঁর ইভেন্টে সেরা। যতই বিশ্বরেকর্ড বা অলিম্পিক রেকর্ড গড়ুন, সোনা তো একটাই! খুব বেশি হলে, তিনি আট বছরে তিনটি অলিম্পিকে নামার সুযোগ পেতে পারতেন, এবার সেই সুযোগও তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যদি পেতেন সুযোগ, ধরে নেওয়া গেলও না হয় যে, তিনবারই তিনি সেরা হতেন, সোনা পেতেন। তাতেও তো সাকুল্যে তিনটিই সোনা! ফেল্পসের সঙ্গে তুলনায়ই আসবেন না তা হলে? তেওফিলো স্তিভেনসন লরেন্স কিউবার বক্সার। হেভিওয়েট ক্যাটেগরিতে বক্সিং লড়তেন। ১৯৭২ মিউনিখ, ১৯৭৬ মন্ট্রিল ও ১৯৮০ মস্কো – তিন-তিনটি অলিম্পিকে হেভিওয়েট ক্যাটেগরিতে সোনা তাঁর। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা পারফরম্যান্স। বারবার প্রলোভন এসেছিল। অ্যামেচার থেকে প্রফেশনাল হওয়ার। সানন্দে সেই দাবি উড়িয়ে থেকে গিয়েছিলেন ‘অ্যামেচার’, তুলে নিয়েছিলেন তিনটি সোনা, তিনটি অলিম্পিক থেকে। বক্সিংয়েই আরও দুজন ছিলেন, হাঙ্গেরির লাজলো পাপ ও কিউবার ফেলিক্স সাভন। তাঁরাও তিনটি করে সোনা পেয়েছিলেন নিজের নিজের ক্যাটেগরিতে। তিনটি অলিম্পিকে তিনটি সোনা মানে তাঁদের ক্যাটেগরিতে তাঁরাই সেরা। কিন্তু, সোনার সংখ্যা তো, শেষ বিচারে, মাত্র তিনটিই! কী করে তাঁরা লড়তে পারবেন ফেল্পসের সঙ্গে? আর, যেহেতু লড়তে পারছেন না, তার মানেই কি তাঁরা আসতে পারছেন না সর্বকালীন শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইতে? এ আবার কেমনধারা বিচার?

    ফুটবল, ক্রিকেট সংক্রান্ত এমন দল বেছে নেওয়া বা শ্রেষ্ঠত্বের হিসাব কষতে গিয়ে প্রায়ই লেখা হয় যে, এ তো আর অলিম্পিক নয় যে প্রাপ্ত পদকের সংখ্যার বিচারে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারিত হবে। এমন ভাব, যেন পদকের নিরিখে বিচার করা গেলে তাতে শ্রেষ্ঠত্বের অমর্যাদা হয়!

    যেমন ধরুন ‘গিয়ার্স’ অর্থাৎ সরঞ্জাম। পাভো নুরমি, আবেবে বিকিলা, এমিল জাটোপেকরা একটা ভাল জুতোও পাননি, বোল্ট পেয়েছেন। কার্ল লুইস যে জুতো পরে দৌড়েছিলেন, বোল্টের জুতো উৎকর্ষের বিচারে তার চেয়ে এগিয়েই থাকবে, প্রযুক্তির বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে। সে কারণে কি পয়েন্ট কাটা যাবে বোল্টের? রড লেভার আর রজার ফেডেরারের খেলার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যেমন বলা হয় যে, লেভার কাঠের র‍্যাকেটে খেলতেন, ফেডেরার আজকের তারকা হয়ে সুযোগ পাচ্ছেন উন্নততর র‍্যাকেট দিয়ে খেলার যা আরও জোরে আরও দূরে বল পাঠাতে পারে সহজেই। ভুলে যাওয়া হচ্ছে তখন, ব্যাপারটা এমন কখনও নয় যে, ফেডেরার যাঁর বিরুদ্ধে খেলছেন তাঁর হাতে কাঠের র‍্যাকেট! একইরকম আধুনিক উন্নততর র‍্যাকেট থাকে তাঁর বিপক্ষের হাতে। এবং, লেভারও যাঁর বিরুদ্ধে খেলেছিলেন তাঁর হাতে ছিল সেই কাঠের র‍্যাকেটই, উন্নততর আধুনিক র‍্যাকেট নয়। নিজেদের সময়ের শ্রেষ্ঠ যাঁরা, যে-পরিস্থিতিতে খেলেন, যে-সরঞ্জামের সাহায্যে খেলেন, বুঝিয়ে দেন শ্রেষ্ঠত্ব। কাঠের র‍্যাকেট দিয়ে খেললেই ফেডেরারের শ্রেষ্ঠত্ব থাকত না আর উন্নততর র‍্যাকেট দিয়ে খেললেই লেভার আরও গোটা দশেক গ্র্যান্ড স্লাম জিতে ফেলতেন, দুটোই অত্যন্ত জোলো, অবাস্তব মতবাদ, ভিত্তিহীন।

    মূলে মানুষের সেই সচেতন প্রচেষ্টা, যা একজনকে নীচে টেনে নামিয়ে অন্যকে বিরাট করে দেখাতে চায়। কিংবা, উল্টোটাও। নিজের কল্পনায় বল্গাহীন হয়ে নিজের পছন্দকে তুলে ধরতে চায় শ্রেষ্ঠ হিসাবে, অন্যের পছন্দ নস্যাৎ করে। এ বিবাদ অন্তহীন অনর্থ। খামোখা সমস্যা বাড়িয়ে তোলা, যা পেয়েছি তাতে সন্তুষ্ট না-হওয়ার চিন্তিত ‘জ্ঞানী’ উপায়বিশেষ। এর দ্বারা সত্যিই কোনও মহৎ কাজ কখনও হয়নি, হবেও না ভবিষ্যতে।

    তাই ‘সফলতম’ হয়েই থাকুন ফেল্পস। ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলিম্পিয়ান’ তকমা না-জুড়লেও তাঁর ২২ সোনার কীর্তি অবিস্মরণীয়ই থাকবে। চিরকাল মানুষ বিস্ময়ে-শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে ভেবে যে, এমন একজন মানুষ ছিলেন, পুল থেকে সোনা তোলাটা যাঁর কাছে ছিল নৈমিত্তিক। কিন্তু, জোর করে ফেল্পসকে সর্বোত্তম বানাতে গিয়ে নুরমি-বিকিলা-জাটোপেক-ওয়েন্স-বোল্ট বা স্তিভেনসন-লাতিনিনাদের খামোখা ছোট করার অপচেষ্টা বন্ধ হোক। তাতে সবারই সম্মানহানি।

    আর, অলিম্পিকের ১২০ বছরের ইতিহাসে সফলতম হওয়া কোন অংশে কম অগৌরব?

    No comments