• Breaking News

    নিজের ক্লাবের সমালোচনার অভ্যাস কলকাতার ‘ছিল’, এখন ‘নেই’!

    রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

    mb logo f

    কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিতে দল নামাল না মোহনবাগান।

    প্রথমেই সত্যিটা স্বীকার করে নেওয়া যাক। ১৯৮৬-তে তো বটেই, ১৯৯৬-এও এই ঘটনা ঘটলে তা বাংলা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা পেত এবং পাড়ার মোড়ে মোড়ে, অফিসে অফিসে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থেকে যেত বেশ কিছুদিন।

    ২০১৬তে এই সিদ্ধান্তে কারও কিছু যায় আসে না।

    এখানেই সর্ষের মধ্যে ভূত। কারও কিছু যায় আসে না, কারণ কলকাতা তথা বাংলার ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের হঠকারি সিদ্ধান্তই আজ ‘কলকাতা ডার্বি’ বা ‘বাংলার বড় ম্যাচ’-কে অপ্রাসঙ্গিক, এমনকি হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে।

    ডার্বি করা যেত কিনা, গেলে কোথায় যেত – কল্যাণী না শিলিগুড়ি, করা গেল না, তা কার গোঁয়ার্তুমির জন্য – মোহনবাগান না ইস্টবেঙ্গল নাকি দুপক্ষই – এই অবান্তর আলোচনায় সময় নষ্ট করা অনর্থক। ঐতিহাসিক ভুলের কারিগররাও জানেন, ডার্বি করা যেত। মাঠে কত দর্শক এলেন, ১৬ না ৬০ হাজার, পূর্ত দফতর অস্থায়ী গ্যালারিকে ফিট সার্টিফিকেট দিল কিনা - এগুলো কোনও ক্লাব কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নয়। ইস্টবেঙ্গল একদিন পর খেলতে পারত কিনা, প্রশ্ন সেটাও নয়।

    কলকাতা ফুটবল সম্পর্কে যাঁর ন্যূনতম ধারণা রয়েছে তিনিও জানেন, মোহনবাগান কর্তাদের (পড়ুন ৪ জন) অবিমৃষ্যকারিতার জন্যই ২০১৬-১৭ মরসুমের প্রথম ডার্বি (এবং সম্ভবত শেষ কয়েকটি বড় ম্যাচের একটা) আয়োজন করা সম্ভব হল না। নির্দ্বিধায় এ-কথা লিখতে আজ আর কোনও সমস্যাই থাকার কথা নয়, কারণ যে চারজনের কথা বলা হয়েছে তাঁদের এই ‘ময়দানি’ চরিত্রও কারও অজানা নয়।

    প্রশ্ন ওঠে কর্তাদের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের পেছনে সাধারণ সমর্থকদের প্রবল সমর্থন দেখে।

    বিপক্ষের ফুটবলার, কোচ বা কর্তাদের পাশাপাশি নিজের ক্লাবের সমালোচনা করার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস কলকাতার দর্শকদের বরাবরই ছিল।

    আর নেই!

    ইদানীং (বেশ কিছুদিন আগে থেকেই) সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইটগুলোয় একটা অদ্ভুত ধারা চোখে পড়ছে। নিজের ক্লাবের কর্তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তকেও সাধুবাদ জানানো। সমালোচনা যে হয় না তা নয়। কিন্তু সেই সমালোচনা মাঠে ফুটবলারদের খারাপ পারফরম্যান্স চোখে পড়লে তবেই প্রকাশ্যে আসে। তা ছাড়া নয়।

    রেফারিংয়ের মান যেমনই হোক না কেন (এদেশে কোনও দিনই খুব উচ্চস্তরের ছিল না), দর্শক হাঙ্গামায় ম্যাচ ভণ্ডুল হলে পৃথিবীর সর্বত্র ক্লাবকে তার মাশুল গুনতে হয়। এ কথা বিলক্ষণ জানেন বলেই ইউরোপের ক্লাবকর্তারা মাঠে ঝামেলা বাধলে তা থামাতে উদ্যত হন।

    কলকাতায় সবই উল্টো। এখানে রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের ‘প্রতিবাদ’ জানাতে দর্শক পিলপিলিয়ে মাঠে ঢুকে পড়েন, কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে তাতে সায় দেন এবং টুর্নামেন্ট কমিটি বা গভর্নিং বডি ‘ঠুটো জগন্নাথ’ হয়ে বসে থাকে। এমনকি, তারপরও ডার্বিতে বড় দলকে মাঠে নামানোর জন্য কর্তাদের তোষামোদ করতেও পিছপা হয় না।

    গত দিন তিনেক ধরেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইটগুলোয় মোহনবাগানের নামাঙ্কিত ফোরামগুলিতে কর্তাদের সমর্থনে নানাবিধ মন্তব্য, মতবাদ দেখা যাচ্ছে। কোনও এক মোহনবাগান সমর্থক রীতিমতো এক, দুই, তিন, চার করে তাঁদের উদ্দেশে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, যাঁরা ডার্বিতে দল নামানো নিয়ে কর্তাদের সিদ্ধান্তের উল্টোমত পোষণ করেন।

    প্রশ্নকর্তা উত্তরগুলো পেয়েছেন কিনা জানা নেই, কিন্তু এই বেলা আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভাসিয়ে রাখা দরকার। এই যে ম্যাচটা হল না, তাতে কার লাভ হল এবং কতটা?

    কলকাতা লিগ নামক একটি প্রহসন কোনও ক্লাব একুশ শতকে টানা সাতবার জিতল না আটবার, তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা কারও নেই। কিন্তু এই যে টিভি চ্যানেল-এ প্রাক্তন ফুটবলার থেকে বর্ষীয়ান সদস্য-সমর্থক পর্যন্ত মোহনবাগানের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না, এই যে আবার বিরোধীপক্ষ ‘পলায়নী মনোবৃত্তি’ নিয়ে নতুন করে টিটকিরি দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছে এবং এই ডিজিটাল যুগে এই খেউর-নাটিকা দেখে গোটা দেশ মুখ টিপে হাসছে এবং তির্যক মন্তব্য করছে, এতে একটা ১২৭ বছরের পুরনো ক্লাবের গৌরববৃদ্ধি হল কি?

    1 comment:

    1. এটাই ময়দানের বর্তমান রূপ, উপর থেকে কী সবুজ না দেখতে, মাঠে নামলেই ঘাসের তলায় কাদা। লেখাটার জন্য অশেষ ধন্যবাদ, এরকমই একটা লেখার দরকার ছিল এই সময়, খুব ভাল লাগল পড়ে।

      ReplyDelete