• Breaking News

    ‘সিদ্ধান্ত’ ঘোষণার ‘অথরিটি’ গোয়েঙ্কাবাবুকে দিলটা কে?

    সঞ্জীব গোয়েঙ্কা পরিষ্কার জানিয়েছেন, আগামী বছর আই লিগ ও আইএসএল মিশে গেলে কলকাতা থেকে একটাই দল থাকবে, এটিকে! কিন্তু, তিনি কি সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার সভাপতি? সচিব?


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    3-clubs

    ‘আগামী বছর আইএসএল-এ কলকাতার একটি দলই খেলবে এবং সেটি এটিকে।’


    বক্তা, সঞ্জীব গোয়েঙ্কা মহাশয়। আতলেতিকো দে কলকাতার অন্যতম মালিক। কথাগুলি বলেছিলেন শুক্রবার আতলেতিকো দে কলকাতার সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে, লিখেছে কলকাতার অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র ‘বর্তমান’। আগামী বছর আইএসএল ও আই লিগ মিশে যাওয়া নিয়ে যে-চর্চা চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে।


    প্রশ্ন একটাই, এই ‘সিদ্ধান্ত’ ঘোষণা করার তিনি কে?


    সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বড় ব্যবসায়ী হতে পারেন, ভাল কথা। কিন্তু, তিনি কি সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার সভাপতি? সচিব? কোন সর্বোচ্চ পদে আছেন এআইএফএফ-এ যে তিনি এভাবে ‘নিশ্চিত’ করে বলে দিতে পারেন, ‘একটিই দল খেলবে এবং সেটি এটিকে’? এই ‘সিদ্ধান্ত’ জানানোর ‘অথরিটি’ তাঁকে দিলটা কে? কোন দল খেলবে, ঠিক করার কে হে তিনি সঞ্জীব গোয়েঙ্কা?


    এআইএফএফ এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি, দুটি লিগ মিশে গেলে কোন শহর থেকে ক’টি বা কোন কোন দল খেলবে। সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থায় রিলায়েন্স-এর সর্বগ্রাসী প্রভাবে কী হতে চলেছে আন্দাজ করা যেতেই পারে। কিন্তু যতক্ষণ না সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হচ্ছে, সবই ‘স্পেকুলেশন’। হতে পারে, না-ও পারে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান খেলবে কিনা, না খেললেও কেন, তার ব্যাখ্যা দেবে এআইএফএফ, ভারতে ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। কোনও ভুঁইফোঁড় ফ্র্যাঞ্চাইজি বা তার অন্যতম মালিক নয়।


    ১২৭ বছর (মোহনবাগানের জন্মসাল ১৮৮৯), আর ৯৬ বছরের (ইস্টবেঙ্গলের জন্মসাল ১৯২০) ইতিহাসের বিচার দু’বছরের বাচ্চার কোনও  ‘অভিভাবক’ করতে পারেন? পারলে, তা অন্যায্য অনৈতিক অযৌক্তিক। সদ্যোজাত বাচ্চার পা টলমল করে দু-বছরে। আইএসএল-এর অবস্থা তেমনই। পার্থক্য শুধু একটাই জায়গায়। দু-বছরের বাচ্চার থাকে আধো-আধো-বোল। এখানে পেট থেকে পড়েই বোলবালা চলছে, হম্বিতম্বিও। একমাত্র কারণ, তাঁদের প্রচুর টাকা! তাই আমাদের মতো দেশে তাঁদের আছে যা-খুশি বলার স্বাধীনতাও।


    আইএসএল এমন লিগ, চলে আড়াই মাস। খেলে ভূভারতের মাত্র আট দল। দলও নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজি। ‘ক্লাব’ বললে তো ডাহা মিথ্যে। ক্লাব সারা বছর শুধু নয়, বছরের পর বছর থাকে, আছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর তেমন কিছু আছে, অভিযোগ নেই! যা আছে গোয়েঙ্কাবাবুদের, প্রচার। সঙ্গে হাবভাব তো এমন যে, ভারতীয় ফুটবলের তাঁরাই হর্তা-কর্তা-বিধাতা। তবু, কী দুরবস্থা হায়, ভারতের প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়, ফুটবলার চেয়ে। সেই ক্লাবগুলির ফুটবলারদের না-নিলে খেলতে পারবে না। না আছে ক্লাব, না আছে মাঠ, না ফুটবলার, না ফুটবলের পরিকাঠামো। আছে টাকা, আর প্রচারের আলো শুষে নেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক পিঠ-চাপড়ানির পাশাপাশি পেটোয়া বাজারি সংবাদমাধ্যম। ‘উফ্, যা বিরাট একটা কাণ্ড হচ্ছে না!’


    গোটা মরসুমের জন্য ফুটবলার ‘পুষব’ কেন, আড়াই মাসের টাকা দিয়ে দিলাম, ‘ঝামেলা’ শেষ! এই ‘কর্পোরেট’ মানসিকতায়ই নাকি ভারতীয় ফুটবলে তরতরিয়ে বিপ্লব আসবে। ভাবনাটাকে ‘হাস্যকর’ বললে হাস্যকর শব্দটাই হেসে উঠবে উচ্চস্বরে!


    ক্লাব নেই, ফুটবলার নেই-ই শুধু নয়, দর্শকও তো নেই! সমর্থন আছে গোয়েঙ্কাবাবুর ফ্র্যাঞ্চাইজির পেছনে? যদি জনপ্রিয়ই, এত ভয় কেন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানকে? ফুটবলারদের মতো, সমর্থকও ধার-নেওয়া। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান নেই বলে, জুটে যাচ্ছে ‘ফ্রি’! গোয়েঙ্কাবাবুর সাধের এটিকে-র জন্য চেঁচাতে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে একজনকেও পাওয়া যাবে এই কলকাতায়? মাঠে গিয়ে ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলায়, তাঁর জন্য, তাঁর ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে, গলা ফাটাতে? তিনি তো মহমেডান স্পোর্টিং নামটার সঙ্গেও জুড়ে নেই। আই লিগে কলকাতার তিনটি ক্লাবই খেলেছিল যখন, কোনও কথা উঠেছিল? সমর্থকরা নিজেদের পয়সায়ই লরি ভাড়া করে লড়তে লড়তে যুবভারতীতে গিয়েছিলেন, খেলাশেষেও লড়তে লড়তেই ফিরেছিলেন নিজের নিজের দলের কোলে ঝোল টানতে টানতে। ‘তিনটি দল খেললে আমাদের কী হবে’ আশঙ্কায় একবছর আগে থেকেই হুমকি বা নাকি কান্না, কোনও পথেই যেতে হয়নি!


    টাকার জোর আছে তাঁর। সেই জোরে তিনি ব্যবসা করে যা কোনও দিনও করতে পারতেন না, করে ফেলেছেন ফুটবলের সঙ্গে থাকার সুবাদে। পেলের পাশে বসে সাংবাদিক সম্মেলন! ফুটবল ছাড়া আর কিছু তাঁকে এ-সুযোগ দিত না। ছবিটা হয়ত তাঁর সুসজ্জিত মহামূল্যবান বসার ঘরের শোভাবর্ধন করছে এখন। কিন্তু, তার মানে এমন কখনও নয় যে, তিনি বললেই সুড়সুড় করে কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে এটিকে-সমর্থক বনে যাবেন রাতারাতি। ভয় যে আসলে সেখানেই। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ওই নতুন লিগে খেললে না পাবেন ফুটবলার, না সমর্থক!


    স্পেনের ‘আতলেতিকো দে মাদ্রিদ’-এর নামানুসারে ফ্র্যাঞ্চাইজি। অথচ, গোয়েঙ্কাবাবু এবং তাঁর অনুচররা এই সহজ সত্যটুকুও জানার প্রয়োজন মনে করেননি যে, সেই ক্লাব উচ্চারণে মোটেও ‘অ্যাটলেটিকো ডে ম্যাড্রিড’ নয়! টাকা থাকলেই ফুটবল হলে ইংল্যান্ড সব বিশ্বকাপ আর ইউরো কাপ জিতত, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রমরমা থাকত শুধুই ইংরেজ ক্লাবগুলোর। তেমনি, চিবিয়ে চিবিয়ে শক্ত-শক্ত করে ইংরেজি ধাঁচে উচ্চারণ করলেও ফুটবল হয় না, কারণ ফুটবলের ভাষাটা ইংরেজি একেবারেই নয়, স্প্যানিশই।


    তাই গোয়েঙ্কাবাবুর এমন বক্তব্যের পর, তাঁর সাধের ‘এটিকে’-কে ময়দানি ছন্দে ভেঙে নিখাদ বাংলায় উচ্চারণ করতে ইচ্ছে জাগে - ‘এটি কে?’

    No comments