• Breaking News

    সুপেরগার দুঃসহ দুর্ঘটনা, ফিরে-দেখা

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    কলম্বিয়ায় ব্রাজিলের ক্লাব চাপেকোয়েনসে বিমান-দুর্ঘটনায় প্রায় নিশ্চিহ্ন যখন, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম দুঃখজনক ঘটনা সুপেরগা বিমান-দুর্ঘটনা মনে পড়ে যেতে বাধ্য। ভালেন্তিনো মাজোলাসহ ৩১ জনের কেউ বাঁচেননি ১৯৪৯ সালের সেই দুর্ঘটনায়। সেই এফসি তোরিনো দলে ছিলেন তখনকার ইতালি জাতীয় দলের দশজন ফুটবলারও। এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংবাদ প্রতিদিন’ সংবাদপত্রের রবিবার ‘ছুটি’-তে, ২৮ অগাস্ট ২০১৬, শিরোনাম ছিল - কান্নাপাহাড়, দুঃখনদী



    [caption id="attachment_2658" align="alignleft" width="300"]সুপেরগা দুর্ঘটনার পর বিমানের ধ্বংসাবশেষ। ছবি - টুইটার সুপেরগা দুর্ঘটনার পর বিমানের ধ্বংসাবশেষ। ছবি - টুইটার[/caption]

    ইতালির অন্যতম বিখ্যাত নদী ‘পো’। এই পো নদীর দক্ষিণ তীরে সুপেরগা পাহাড়। খুব বেশি উঁচু নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৭২ মিটার মাত্র। এই পাহাড়ের মাথাতেই অবস্থিত ‘বাসিলিকা অফ সুপেরগা’ যা আসলে একটি গির্জা।

    কথিত, দ্বিতীয় ভিত্তোরিও আমেদেও তৈরি করেছিলেন এই গির্জা, ১৭০৬ সালে। কেন ওই পাহাড়ের চূড়াই বেছে নিয়েছিলেন, সে-সম্পর্কে যে-গল্প প্রচলিত – ইতালির তুরিন শহর সেই সময় ফরাসি-স্পেনীয় সৈন্যদের দখলে। দ্বিতীয় ভিত্তোরিও আমেদেও তখন উঠেছিলেন সুপেরগা-র চূড়ায়। দেখে নিতে চেয়েছিলেন ফরাসি-স্পেনীয় সৈন্যদের অবস্থান। ওই উচ্চতা থেকে বিদেশি সৈন্যদের দেখে অসহায় দ্বিতীয় ভিত্তোরিও আমেদেও ওখানে দাঁড়িয়েই প্রার্থনা জানিয়েছিলেন মা মাদোনা-র কাছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তুরিন যদি স্বাধীন হয়, ওখানেই গড়ে দেবেন গির্জা। পরে, তুরিন স্বাধীন হয়। দ্বিতীয় ভিত্তোরিও আমেদেও রাজা হন সিসিলি-র। সিসিলি-র বিখ্যাত স্থপতি ফিলিপো জুভারার সঙ্গে কথা বলেন। তৈরি হয় বাসিলিকার নকশা।

    কাজ শুরু হয়েছিল ১৭১৭ সালে। চোদ্দ বছর লেগেছিল গির্জা তৈরি হতে। পাহাড়চূড়ায় গির্জা তৈরির জন্য চূড়ান্ত উচ্চতা প্রায় ৪০ মিটার কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর ওই গির্জার মাথায় উঠে তুরিন শহরকে দেখে রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষের চোখ যা যা দেখতে পেয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য’।

    অথচ, এই সুপেরগা বাসিলিকার পেছনের দেওয়াল নতুন করে তৈরি করা হয়নি আর। অর্থাভাব বা ইচ্ছের অভাবে নয়। দুঃসহ স্মৃতি ধরে রাখতে। এক ফুটবল দলের। যা ছিল তুরিনের সেরা। এফসি তোরিনো।

    দুর্ঘটনার দিন ১৯৪৯ সালের ৪ মে। এফসি তোরিনো খেলতে গিয়েছিল লিসবনে। সেখান থেকে ফেরার দিন। সকাল ৯-৪০, লিসবন থেকে তিন-ইঞ্জিনের ফিয়াট জি২১২ ছেড়ে দুপুর একটায় পৌঁছেছিল বার্সেলোনা বিমানবন্দরে। সেখানে সাময়িক বিরতি। বিমানের ৩১ যাত্রী দুপুরের খাবার খাবেন। বিমানের ইঞ্জিন পরীক্ষানিরীক্ষা ও ‘রিফুয়েল’ করে নেওয়া হবে। বার্সেলোনা বিমানবন্দরে তখন হাজির আবার মিলানের ফুটবলাররা। তাঁরা যাচ্ছিলেন মাদ্রিদে খেলতে। মিলান ও তোরিনোর ফুটবলাররা একসঙ্গেই দুপুরের খাবার খেয়ে উঠে পড়েছিলেন যে যার বিমানে। দেশে ফিরছিলেন তোরিনোর ফুটবলাররা।

    দুপুর ২-৫০, বিমান ছাড়ে তুরিনের এরিতালিয়ার উদ্দেশে। বিকেল ৪-৫৫, তুরিনের বিমানবন্দর থেকে বিমানের পাইলটকে জানানো হয়েছিল, তুরিনের আবহাওয়া খুবই খারাপ। ঝড়জল, দৃষ্টি অস্বচ্ছ, ৪০ মিটারের বেশি দেখা যাচ্ছে না। যখন মাত্র ৯ মাইল দূরে সেই বিমান, পাইলট প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ল্যান্ডিং-য়ের। ৫-০৩, বিমান ঘোরে বাঁদিকে। ঘন্টায ১৮০ কিমি বেগে ঘুরে পাইলট চোখের সামনে আবিষ্কার করেছিলেন বাসিলিকার দেওয়াল, যখন তাঁর আর কিছু করার ছিল না। বিমান সোজা গিয়ে ধাক্কা মারে দেওয়ালে। ৩১ জন যাত্রীর কেউ বাঁচেননি।

    দুর্ঘটনা ঘটলে যা হয়, কারণ খোঁজার চেষ্টা। বলা হয়েছে, অলটিমিটার-টা ২০০০ মিটার উচ্চতায় খারাপ হয়ে গিয়েছিল, যে-কারণে পাইলট বুঝতে পারেননি তিনি কতটা নিচে নেমে এসেছেন। আরও একটি কারণ, প্রচণ্ড বেগে ঝড় চলছিল, যা বিমানটিকেও বাধ্য করেছিল বাঁদিকে ঘুরে যেতে। পাইলট জানতেন বাসিলিকা রয়েছে তাঁর ডান দিকে। হঠাৎ যখন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন বাসিলিকা তাঁর সোজাসুজি, তাঁর আর কিছু করারও ছিল না। বিমান মুখোমুখি ধাক্কা মেরেছিল। যদি পাইলট চেষ্টাও করতে পারতেন ঘুরে যাওয়ার, আড়াআড়ি ধাক্কা লাগত, বিমানের একটা দিক হয়ত চুরমার হত। কিন্তু, এখানে ধাক্কা মুখোমুখি। তাই বিমানের যে ভগ্নাংশ চেনা গিয়েছিল তা পেছনের দিকের।

    খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটবল বিশ্ব শোকে পাথর। তখন শেষ পাঁচ বছরের ইতালীয় লিগে চ্যাম্পিয়ন দলের সব ফুটবলার একসঙ্গে মৃত। সেই দলে ছিলেন তখনকার ইতালির দশজন ফুটবলারও। তাঁদের মৃত শরীর শনাক্তকরণে ডেকে আনা হয়েছিল ইতালির দুবারের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিত্তোরিও পোজো-কে। কীভাবে সেই শরীরগুলো শনাক্ত করেছিলেন পোজো, অবর্ণনীয় সেই অভিজ্ঞতা। ১৮ জন ফুটবলার, পাঁচজন কোচ ও সাপোর্ট-স্টাফ, আয়োজকদের তরফে একজন, বিমানের ক্রু চারজন ও তিনজন সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার। সব মিলিয়ে ৩১ জন নিশ্চিহ্ন।

    ভালেন্তিনো মাজোলা তো ছিলেনই। দুর্ঘটনার দিন ৪ মে। আর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন ২০ এপ্রিল, ১৯৪৯। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় তাঁর মৃত্যু। প্রথম বিয়ে এমিলা রিনাল্দির সঙ্গে। দুই ছেলে – সান্দ্রো ও ফেরুচ্চিও। স্বল্পবাক ভালেন্তিনো পারিবারিক জীবনেও কড়া শৃঙ্খলাপরায়ণ। এমিলা সেই শৃঙ্খল মানতে পারেননি। ফলে, সম্পর্কে ভাঙন এবং ১৯৪৬ সালে বিবাহবিচ্ছেদ। তিন বছর পর দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত ভালেন্তিনোর। কিন্তু সেই বিবাহিত জীবন শুরুর আগেই শেষ।

    ২০০৮ সালে তুরিনের গ্রুগলিয়াসকো-তে একটি জাদুঘর নির্মিত হয়েছে, ‘গ্রান্দে তোরিনো’ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ৫০ বর্ষপূর্তিতে। সেখানে এখনও সাজানো রয়েছে সেই বিমানের ভগ্নাবশেষ। ভালেন্তিনোসহ আরও কয়েকজন ফুটবলারের ব্যাগ, জিনিসপত্র, যা পাওয়া গিয়েছিল ওই ভগ্নস্তুপে। ‘মুসেও দেল গ্রান্দে তোরিনো এ দেলা লেজেন্দা গ্রানাতা’, এই স্মৃতিঘর বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের অবশ্য-দ্রষ্টব্য এখন।

    বাসিলিকার সেই দেওয়ালে একটি বড় ক্রস, সেই ফুটবলারদের স্মৃতিতে। ভালেন্তিনোদের মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়েছিল তুরনের সবচেয়ে বিখ্যাত কবরখানায়। সেই দিন তুরিনের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী সব দেশের সংবাদমাধ্যম হাজির ছিল সেই অনুষ্ঠানে, যথাযথ মর্যাদায় ‘কভার’ করা হয়েছিল শেষকৃত্য। এখনও ৪ মে, ইতালির প্রতিটি সংবাদমাধ্যম নিয়ম করেই মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃখজনক ঘটনা।

    ভালেন্তিনো মাজোলার দুই ছেলের মধ্যে সান্দ্রো মাজোলার নাম ফুটবলপ্রেমী মাত্রেই জানেন। ইন্তার মিলান ছাড়া আর কোনও ক্লাবে খেলেননি সান্দ্রো। খেলেছিলেন বাবার মতোই জাতীয় দলে, বিশ্বকাপেও। কিন্তু, সুপেরগা-র দুর্ঘটনা তাঁর বাবাকে কেড়ে নিয়েছিল অকালে, মাত্র তিরিশ বছর বয়সে, যখন তিনি সেরা ছন্দে খেলছিলেন।

    ফুটবল-মাঠে দশ নম্বর জার্সিকে অমরত্ব দিয়েছিলেন ভালেন্তিনো মাজোলা। তাঁর ফুটবল মুখে হাসি ফুটিয়েছিল ইতালির, ইউরোপের অন্যান্য দেশের ফুটবলপ্রেমীদের। তাঁর সেরা সময়ে বিশ্বকাপ হয়নি। ১৯৩৮-এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপের আসর আবার বসেছিল ১৯৫০ সালে। তাই মাত্র দশটি ম্যাচ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পেরেছিলেন ভালেন্তিনো। সুপেরগা-র দুর্ঘটনা না-হলে ব্রাজিলে পরের বছর বিশ্বকাপে তিনিই নেতৃত্ব দিতেন ইতালির, সন্দেহ নেই।

    ৪ মে দুর্ঘটনার পর ৬ মে ইতালির ফুটবল সংস্থা জানিয়ে দিয়েছিল, সেই বছর লিগ চ্যাম্পিয়ন তোরিনোই। বাকি চারটি ম্যাচে তোরিনোর তো মাঠে নামানোর মতো দলই ছিল না। সাউরো তোমা, দলের ফুলব্যাক, অসুস্থ থাকায় যেতে পারেননি বলে বেঁচেছিলেন। আর সেই সফরে যাননি দ্বিতীয় গোলরক্ষক রেনাতো গান্দোলফি। বাকি দল তো ভস্মীভূত। তোরিনোকে কিছু বলতেও হয়নি। বাকি চারটি ম্যাচের বিপক্ষ দলগুলোই বলে দিয়েছিল, বাচ্চাদের খেলাবে। তোরিনোও সেই চার ম্যাচে খেলিয়েছিল যুব দল। খেলা থামেনি। সেই মুহূর্তে শুধু থেমে গিয়েছিল ফুটবল, শোকে মুহ্যমান। থেমে গিয়েছিলেন ভালেন্তিনো মাজোলা।

    ইতালির সাপ্তাহিক নিউজরিল সেত্তিমানা ইনকম, যা দেখানো হত সেই সময় সিনেমা হলগুলোয়, বলেছিল, ‘The twilight lasted all day, a melancholy to die for. The sky came apart in the mist and the fog blotted Superga.’

    আরও দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা -

    ১) ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮ --- ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড-এর ফুটবলারদের নিয়ে বিমান মিউনিখ থকে ওঠার মুখেই ভেঙে পড়েছিল। ‘বুসবি বেবস’ মানে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড-এর কোচ ম্যাট বুসবির ছাত্ররা ছিলেন বিমানে। ফিরছিলেন ইউরোপিয়ান কাপে রেডস্টার বেলগ্রেড-এর বিরুদ্ধে খেলে। সেই বিমানে ৪৪ জনের মধ্যে ২৩ জন মারা গিয়েছিলেন। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ৮ জন ফুটবলার মারা গিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ডানকান এডওয়ার্ডস। ববি চার্লটন ও বুসবি অবশ্য বেঁচেছিলেন।

    ২) ২৭ এপ্রিল, ১৯৯৩ --- জাম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের ১৮ সদস্য মারা গিয়েছিলেন। সেনেগালের বিরুদ্ধে ডাকারে খেলতে যাচ্ছিলেন তাঁরা, বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচে। অতলান্তিক মহাসাগরে তলিয়ে যায় দল। কোচসহ ২৫ জনের কেউ বাঁচেননি। পরে জানা যায়, পাইলট ভুল ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেই সেই দুর্ঘটনা।

    No comments