• Breaking News

    বরিস-জুতোয় পা গলাতে চাইলে …

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

     

    ????????????????????????????????????

    বাঁ পা-টা এগোন। ছুঁয়ে আছে বেসলাইন। ডান পায়ের সঙ্গে প্রায় তিরিশ ডিগ্রি কোণে। ইংরেজির উল্টোন ‘ভি’ অক্ষরের মতো। বাঁ-হাতে বলটা ছোড়েন আকাশে, সোজা, টানটান সে-হাত। ডান হাতটা পেছনে আবারও ‘ভি’ আকৃতি। পা দুটো ভেঙে সার্ভিস করার ঠিক আগের মুহূর্তটায় মনে হবে শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে। বল আর র‍্যাকেটসহ হাতদুটো একই সঙ্গে উঠছে, নামছে। জিভটা মুখের দরজা ঠেলে বাঁদিকে উঁকি মেরেছে একটু। দৃষ্টিতে যেন শূন্যতা। আসলে, তিনি সেই মুহূর্তে আর পার্থিব জগতে নেই। একটা সার্ভিস নামিয়ে আনতে হবে, অপার্থিব, দৈব। ছ’ফুট তিন ইঞ্চির শরীরটায় খেলে যাবে ঢেউ। মনঃসংযোগের চূড়ান্ত ওই দু-তিনটে বাড়তি সেকেন্ড সময়ে। আর, কী অসম্ভব যত্ন!

    সার্ভিসে অসম্ভব জোরের কারণে বিজয় অমৃতরাজ তাঁর নামে জুড়েছিলেন ‘বুমবুম’। কিন্তু বরিস বেকার মানে শুধুই সেই জোরটুকুই নয়। তা হলে গোরান ইভানিসেভিচ, স্লোবোডান জিভোজিনোভিচদেরও তো পেয়েছিল টেনিস দুনিয়া। শুধু সার্ভিসের জোরেই তো ২০০১ সালে উইম্বলডন জিতেছিলেন গোরান। বলা হত, যতক্ষণ সার্ভিস না ফিরছে, গোরান রাজা। সার্ভ ফিরলেই ফকির! বেকার তো আর তেমন নন। ফরাসি ওপেন না পেয়ে থাকতে পারেন, ক্লে কোর্ট যা টেনিস প্লেয়ারের সার্বিক দক্ষতার পরীক্ষা নেয়, সেই সাফল্য না পেলেও, বরিস মানেই বুমবুম সার্ভিস ভাবেন যিনি, ভুল ভাবেন।

    বরিস মানে জন ম্যাকেনরোর বিরুদ্ধে টেনিস ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ম্যাচও। ৪-৬, ১৫-১৩, ৮-১০, ৬-২, ৬-২ জিতেছিলেন বেকার। তখন ডেভিস কাপে টাইব্রেকার হত না। মোট ৭২ গেমের খেলা। গড়িয়েছিল ৬ ঘন্টা ২২ মিনিট। বরিস নাকি তাড়াতাড়ি পয়েন্ট শেষ করতে ভালবাসেন? কলকাতায় টিএসকে ২৫কে ম্যারাথনের উদ্বোধনে এসে জানিয়েও গেলেন ওই ৬ ঘন্টা ২২ মিনিটের ম্যারাথন টেনিস ম্যাচের অন্যতম খেলোয়াড়, ‘দ্রুতগতির কোর্ট পছন্দ করতাম। র‍্যাকেট টেকনোলজি নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ছয়ের দশকে যখন চারের মধ্যে তিনটি গ্র্যান্ড স্লামই হত ঘাসের কোর্টে, যদি খেলার সুযোগ পেতাম, আরও বেশি সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত!’ পরোক্ষে বলে গেলেন - উপকরণ নয়, খেলার ধরনই সাফল্যের চাবিকাঠি।

    বড় যাঁরা, সত্যিকারের বড় যাঁরা, পছন্দগুলোও বড়-বড়ই হয়। টেনিস-প্লেয়ার? ‘ছোট থেকেই মনে হত বিয়র্ন বর্গের মতো হতে হবে। তিনিই আদর্শ, আমার টেনিসে আসার কারণ। তাঁর নামে কোনও জুতো বেরয়নি কখনও। আমি যে জুতো বা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থার সঙ্গে সারা জীবন কাটিয়েছি, তাদের সঙ্গে বর্গের কোনও সম্পর্ক ছিল না কখনও। যাদের সঙ্গে ছিল তারাও অবশ্য বর্গের নামে কোনও জুতো প্রস্তুত করেননি। তাই বর্গের জুতোয় পা গলানো আক্ষরিক অর্থেই সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন যদি কারও মনে হয়, বরিস বেকারের জুতোতে পা গলিয়ে দৌড়তেও পারবে, টেনিস খেলতেও পারবে,’ বলে ডান পা-টা তুলে ধরলেন বসে বসেই, সাদা নতুন ‘বরিস বেকার’ নামের জুতোটা দেখাতে। তিনি যে এমনই। আন্দাজ অসম্ভব।

    তাঁর জীবনও যে তা-ই। সতেরয় অবাছাই উইম্বলডন জয়। হ্যাঁ, কুইন্স ক্লাবে জিতেছিলেন তার ঠিক আগেই। র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী ২০ নম্বরে ছিলেন আর উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ ১৬জনের বেশি তারকাকে বাছাইয়ের স্বীকৃতি দিত না তখন বলে, বেকার ছিলেন অবাছাই। না হলে, কুইন্স ক্লাব জেতা মানেই তো উইম্বলডনে ভাল ফলের নিশ্চয়তা!

    ৬ গ্র্যান্ড স্লাম, দুবার ডেভিস কাপ জয়, সর্বপ্রথম জার্মান হিসাবে উইম্বলডন জয় তো আছেই, সেরা ট্রফি জয়ের কথায় আবারও ফিরে যাওয়া ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিকে, যেখানে মাইকেল স্টিখকে সঙ্গে নিয়ে জিতেছিলেন ডবলসে সোনা। ‘পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, এক নম্বরে পৌঁছেছিলাম, যে স্বপ্নটা মনের গভীরে লালনপালন করে সব খেলোয়াড়ই। এবং এক সপ্তাহ বা একটা প্রতিযোগিতায় ভাল খেললেই যেখানে পৌঁছন যায় না, দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা দেখিয়ে যেতে হয়। ট্রফিগুলো, এই এক নম্বরে পৌঁছনো অন্য রকম, অবশ্যই। একই সঙ্গে, এত দিন পর যখন পেছনে তাকাই, ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিকের সোনার পদকটা ঝলমল করে। তখন ওই সোনার গুরু্ত্ব ততটা বুঝিনি। শেষ হতে না হতেই তো পরের টুর্নামেন্টে খেলার প্রস্তুতি। এখন মনে হয় সেই সোনার ঔজ্জ্বল্য অনেক কিছুর চেয়েই বেশি ছিল!’

    কলকাতার সাংবাদিক তাঁকে ভারতীয় টেনিস নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে যখন সানিয়া মির্জা আর মহেশ ভূপতির নাম করেই থেমে যান, মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না, ‘কলকাতা তো লিয়েন্ডার পেজের শহর, তাই না? লিয়েন্ডার, মহেশ দুজনেই আমার বন্ধু। সানিয়ার সঙ্গে এখন তো প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত থাকে, চ্যাম্পিয়ন হয় বেশি্রভাগ সময়েই, প্রতিযোগিতার শেষ দিনে লাঞ্চ করি একসঙ্গে, তাই বেশি কথার সুযোগও পাই।’

    ক্রিকেটে তাঁর একমাত্র পছন্দ সবুজ মাঠ আর সাদা পোশাক। তারপর? ‘কেন যে দৌড়য়, কতটা দৌড়য়, কতদিন ধরে দৌড়য়, কী তার নিয়মকানুন, জানি না, বুঝতে পারিনি। আমার খেলা বাপু একদিনেই শেষ হয়ে যায়, চার দিন বা পাঁচ দিন ধরে চলে না একটাই খেলা। জানি এমন বলার জন্য এই দেশের সংবাদমাধ্যমে আমাকে নিয়ে কিছু বলা-টলা হবে হয়ত। কিন্তু আমি এমনই। যা বুঝি না, বলব না কেন?’

    হাসি ফুটে ওঠে ফুটবল প্রসঙ্গে। ফুটবলার? ‘কাইজার বলি তাঁকে আমরা। তিনি ছাড়া আর কে!’

    সঙ্গে জানালেন, জার্মানদের ঘুমপ্রিয় মানসিকতার কথা। ‘ম্যারাথন, দৌড়নো সবসময়ই ভাল। যে কোনও খেলায় দৌড়নো সবচেয়ে জরুরি। টেনিসেই দেখুন না, আপনি তত ভাল প্লেয়ার যত ভাল বলের কাছে পৌঁছবেন। বলের কাছে না পৌঁছলে মারবেন কী করে? আর মারতে না পারলেই তো হারবেন। তো, বলের কাছে পৌঁছনোর একমাত্র রাস্তাই তো দৌড়নো! কিন্তু, সকাল ছ’টায় কেন? এখন তো শহরে শীতকাল, একটু পরে আটটা নাগাদ করা যেত না? বাঙালিরা কেমন আমি ঠিক জানি না, কিন্তু জার্মানরা একটু ঘুমকাতুরে। রাতে অন্তত ঘন্টা পাঁচেক না ঘুমোলে হয় না আমাদের।’

    যখন জানানো হলে তাঁকে যে, বাঙালি এই অল্প শীতের আবেশেই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না, একগাল হেসে ফেললেন। উনপঞ্চাশেও তিনি চনমনে, আশাবাদী। ছাত্র নোভাক জকোভিচের সঙ্গে কোচের বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। ছ’টি গ্র্যান্ড স্লাম নোভাক জিতেছিলেন তাঁর কোচিংয়ে। ‘কোচ আর প্লেয়ারের সম্পর্ক এমনই। দুজন দুজনকেই আঁকড়ে সারা জীবন থাকে না। নোভাকের সঙ্গে দুর্দান্ত সম্পর্ক ছিল, আছে। ভবিষ্যতে আমরা আবার একসঙ্গে কাজ করব না, জোরগলায় কি বলা সম্ভব?’

    আপ্তবাক্য তো বলেই এসেছেন বহুদিন ধরে। ‘অন্যকে পরাস্ত করতে চাও? আগে আয়নায় চেহারা দ্যাখো, সেই মানুষটাকে হারাও আগে, নিজেকে, তারপর তো অন্যকে হারানোর কথা ভাববে!’

    পরিশ্রমের গল্পটা আর সাফল্যের রহস্যের সেরা সূত্রটা এভাবেই ধরিয়ে দিয়ে ম্যারাথনের ভোরে জেগে ওঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র ছাড়লেন বরিস বেকার, শনিবারের বিকেলে। খেলায় বিপক্ষের শট ফেরানোর সময় তো বটেই, প্রশ্নের উত্তরও তিনি যত্নসহকারেই দেন, বুঝিয়ে!

    No comments