• Breaking News

    পায়ে-পায়ে আনন্দের সকাল, ইয়র্কদের সঙ্গে

    ‘পাড়ার ছোট্ট পার্ক / ঘাস নেই আছে ধূলো


    ঘাসের অভাব পরোয়া করে না / সবুজ বাচ্চাগুলো’


    ---  কবীর সুমন


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


     

    20161210_110611

    ‘হেড’ বললে ‘ক্যাচ’ করবে, ‘ক্যাচ’ বললে ‘হেড’!

    বক্তা ডোয়াইট ইয়র্ক। সামনে অন্তত গোটা পঞ্চাশ কচিকাঁচা। মনে সবুজ, পিঠে লাল-হলুদ। হাজির ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এর তিন তারকার সামনে। পার্ক সার্কাসে কাসিয়া বাগান মাঠে। কোয়েস্ট মলের পেছনে সরু গলির ভেতর দিয়ে যেতে হয় যেখানে। শনিবার সকাল-সকাল।

    ‘আইলাভইউনাইটেড’-এর ইভেন্ট। ছোটদের সঙ্গে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকাদের এক সকাল। একটু ফুটবল, একটু আড্ডা। কিছু উপদেশ। হাসিঠাট্টা। এর-ওর পেছনে লাগা। ডোয়াইট ইয়র্ক, কুইন্টন ফরচুন ও বোইয়ান দিওরদিচ হাজির। সঙ্গে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এর সফরসঙ্গীরা। তাঁদের ভিডিও ও স্টিল ক্যামেরা কাঁধে। তুলে রাখা ম্যানচেস্টার থেকে বহু দূরের এক বস্তিতে বাচ্চাদের ফুটবল নিয়ে উৎসাহের স্বরূপ।

    যে এনজিও এই কাজ করে, মানে বাচ্চাদের ফুটবল শেখায় অনুন্নত অঞ্চলে, তাদের কথানুযায়ী, রাস্তায় সময় কাটিয়ে বখে না গিয়ে ফুটবলে মন দিলে দুদিক দিয়ে সুবিধা। এক, খারাপ কাজের দিকে মন যায় না। দুই, ফুটবল খেলাটা শিখতে পারে। খেলাটা একবার রক্তে ঢুকে গেলে বেরনোর রাস্তা নেই। সমাজ যে অংশকে অধঃপতিত বলে সেখান থেকেই তুলে আনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলারদের।

    কিন্তু, এ সব গম্ভীর কথাবার্তায় ওই ছোটদের কী? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শুনেছে তারা, শোনানো হয়েছে। তারা এটুকুই জানে যে, যাঁরা এসেছেন তাদের সঙ্গে ঘন্টাখানেক সময় কাটাতে, বিরাট বিরাট ফুটবলার। কী শেখাবেন তাঁরা, যা তাদের কোচরা শেখাননি? দেখতে চাওয়ার ইচ্ছে, ওই বড় বড় ফুটবলারদের গা ঘেঁষে একটু দাঁড়ানো, একটা সেলফি হলে মন্দ হয় না – এটুকুই।

    প্রাথমিক একটা জড়তা থাকে, থাকা উচিত। একে বিরাট ফুটবলার, তা-য় ইংরেজি ছাড়া কিছু বলেন না। ‘ফরেন’ থেকে এসেছেন। একটু গুটিসুটি, এর-ওর গায়ে লেগে থাকা। শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিকতা।

    কেটে গেল ইয়র্কের কথায়। মজার তো বেশ ব্যাপারটা। ‘হেড’ বললে ‘ক্যাচ’, বা উল্টোটা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যা হয় না। কিন্তু, করে দেখাতে হবে। তিনভাগে ভাগ হয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলের দল। মাঝে ইয়র্ক, ফরচুন আর বোইয়ান। বল ছুড়ছেন, মুখে অনবরত ‘হেড’ আর ‘ক্যাচ’।

    ভুল করলে কী হবে? মানে, ‘হেড’ বললে যদি ‘হেড’-ই করে ফেলে কেউ? ইয়র্ক বললেন, শাস্তি! কী শাস্তি? পাঁচটা করে পুশ-আপ! ‘শুয়ে পড়ো, শুয়ে পড়ো’ – ভুল করলেই কড়া নির্দেশ! মুখের হাসি অমলিন। যেমন কোচের তেমন শাস্তি-পাওয়া বাচ্চার। এক ছেলের দিকে চারবার বল ছুড়লেন ইয়র্ক, ‘হেড’ আর ‘ক্যাচ’ বলতে বলতে। চারবারই ছাতর ঠিক-ঠিক কাজ করল। মানে, উল্টোটা, ঠিকভাবে। কোচের কী উল্লাস! স্বতঃস্ফূর্ত চিৎকার বুঝিয়ে দেয়, আনন্দ পেয়েছেন, আনন্দ দিতে পেরেছেন। ছড়িয়ে দেওয়া সেই আনন্দ, ঘাসের চিহ্নহীন মাঠে। অল্প শীতের আবেশ-জড়ানো ফুটবল-সকালে।

    এমন করে কী হবে? উত্তর তৈরি। ‘খেলতে খেলতে চিন্তা করতে হয়, চিন্তা করতে করতে খেলতে। মস্তিষ্ক সজাগ রাখতে হবে। সচলও। এটাও একটা প্র্যাকটিস। রোজ অনুশীলনে যা তৈরি হয়ে যায় অজান্তে। খেলার সময় মস্তিষ্ক ঘুমিয়ে থাকবে না আর।’

    বোইয়ান যেমন আর একটি এমন ‘থিঙ্কিং এক্সারসাইজ’ দিলেন সবুজ বাচ্চাগুলোকে। বলটা তিনি ছুড়বেন যখন, যদি বলেন ‘লেফট’, খেলতে হবে ‘রাইট’ মানে ডান পা দিয়ে। বলা বাহুল্য, ‘রাইট’ বললে ‘লেফট’। মনে রাখুন, বলটা ছোড়া হচ্ছে তিন মিটার দূরত্ব থেকে। ‘লেফট’ শুনে ‘রাইট’ ভেবে ডান পা বাড়ানো ঠিক কতটা কঠিন, মাঠে বল পায়ে দিয়েছেন যিনি, বুঝবেন। বাচ্চাগুলো কী চটপট তুলে নিল! এক-দুবার ভুল তো বটেই। স্বাভাবিক। কিন্তু তুলে নেওয়ার এই সহজ স্বাভাবিকতা ওই বয়সেই সম্ভব!

    পরে বলছিলেনও বোইয়ান, ‘এই বয়সটাই আসল। ফুটবলের প্রতি ভালবাসা জাগবে এই বয়সে। তবেই তো খেলতে চাইবে। রাস্তায় হোক, মাঠে হোক, বা মাঠের মতো এই মাঠটাতে। বন্ধুদের সঙ্গে, রাস্তার সঙ্গীদের সঙ্গে। এখন খেলাটা মজা। আর এই মজাটা একবার যদি পেয়ে যায়, ছাড়বে না। ছাড়তে পারবে না। তখন ওই মজার টানেই ছুটে আসবে মাঠে।’

    কিন্তু, মাঠ? ওই মাঠে ফুটবল খেলা যায়? ধূলো-ওড়া, ন্যাড়া মাঠ। ঘাস বলে কোনও পদার্থই নেই। বোইয়ান অবশ্য তাতেও খুঁজে পেলেন ফুটবলের আনন্দ। ‘এই মাঠে কতটা নিশ্চিন্ত হয়ে ফুটবল খেলছিল ওরা, দেখলেন? এটা মাঠ? ভাবাই যায় না। কিন্তু পায়ে বল পড়তেই ওরা সব ভুলে গেল। চোট পেতে পারে কিনা, বলের বাউন্স কী হবে – মাথাতেই থাকল না কিছু। স্রেফ খেলার আনন্দে খেলল। এটাই আসল।’

    20161210_104422

    বাচ্চাদের বলার সময় আরও পরিষ্কার। ‘মাঠে আসতে ভাল লাগে? ট্রেনিং করতে ভাল লাগে? যদি লাগে, যদি পায়ে বলের ছোঁয়া পেলে মনটা খুশি-খুশি হয়ে যায়, মাঠে এসো, রোজ এসো, আবার এসো। যদি না-লাগে, যদি মনে হয় এই অনুশীলন বিরক্তিকর, ভাল লাগছে না, চাপ পড়ছে শরীরে, মনে - কিছু মনে কোর না, ফুটবল তোমার জন্য নয়। তুমি আর এসো না। চাপ নিও না। অন্য অনেক বিষয় আছে, মনোনিবেশ করো। কখনও, যদি কখনও মনে হয়, মাথায় চাপ পড়ছে, ছেড়ে দাও। ফুটবল খেলতে হলে এসো মজা করতে চেয়ে, আনন্দ পেতে চেয়ে। এই বলটায় এত মজা ভরে আছে, সেই মজাটা লুটেপুটে নাও, আনন্দটা নাও। ফুটবল তখনই ফুটবল।’

    সত্যিই কী সহজ! ফুটবল-দর্শন!

    একরত্তি একটা ছেলে। মাথার তুলনায় দু-নম্বর ফুটবলটাও বড়। মাথায় চুলগুলো এত ছোট যে, দাঁড়িয়ে আছে। কদমছাঁট। ফরচুন নাম দিয়ে দিলেন ‘রোনালদো’! পরম মমতায় মাথার চুলগুলোয় আঙুল বোলালেন। মেসির ড্রিবলের মতো, কোত্থাও আটকাল না। ‘এ-ই রোনালদো’, মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন যখন আবার ডাক। রোনালদোর বয়েই গেছে! পাত্তাই দিল না। ওর যে পায়ে তখন  বল! নিজের মনে বল নিয়ে এগিয়ে গেল।

    ফরচুন হাসলেন, অমলিন। মনে মনে নিশ্চিত বললেন, ‘ফরচুনেট’!

    No comments