• Breaking News

    সাংবাদিক সম্মেলনে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নিখুঁত ছবি!

    দুই শিবিরই একমত, এই ম্যাচ ছাড়াও ৩০ পয়েন্টের খেলা বাকি


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য● শিলিগুড়ি


    20170211_164004a

    পাশাপাশি দুই কোচ, তিন ফুটবলার। বিদেশি কোচ বলছেন যখন, স্বদেশি কোচের মুখে মৃদু হাসি। উল্টোটা হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ, সঞ্জয় সেনের উদ্দেশে ধাবিত প্রশ্নগুলো বেশিরভাগই বাংলায়, সঞ্জয় উত্তরও দিচ্ছিলেন বাংলাতেই। ট্রেভর জেমস মর্গ্যানের পক্ষে সেই ভাষা বুঝে হেসে ওঠা অসম্ভব। বুঝলে হয়ত কখনও কখনও তিনিও মাথা নাড়তেন, হাসতেন, সঞ্জয়ের মতোই।

    আই লিগে দুই দলের কোচ ও ফুটবলারদের এক মঞ্চে পাশাপাশি বসিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন ‘ফুটবল বড় মধুর’ গোছের এমন কিছু মুহূর্তের জন্ম দেয়। কোনও এক প্রশ্নের উত্তরে মেহতাব হোসেন যেমন বিনা দ্বিধায় বলে ফেলেন ‘সঞ্জয়দা যেমন বললেন’। সচরাচর এমন কথাগুলো তো আর শুনতে পাওয়া যায় না! ‘ডার্বি’ মানেই বিশেষ করে কথার ‘মহারণ’ যখন, অন্যতম সেরা প্রভাবশালী ফুটবলারের মুখে বিপক্ষের কোচের কথার প্রতিধ্বনি বুঝিয়ে দেয়, মাঠের ৯০ মিনিট বাদ দিলে ওই চিরশত্রুতা বয়ে বেড়ানো ঠিক কতটা অর্থহীন।

    শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের নিচে ঘুপচি ঘর লোক উপচে পড়ছে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে। ‘হোম টিম’ ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে হাজির কোচ মর্গ্যান, বহু-ডার্বির ঘোড়া মেহতাব, আর অধিনায়ক রবার্ট। উল্টোদিকের শিবিরের কোচ ও অধিনায়ক কাতসুমি।

    যাবতীয় বিরোধিতা বজায় রেখেও দুই ক্লাবের পাঁচ প্রতিনিধিই একমত, বড় ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করবে না আই লিগ খেতাব।

    সঞ্জয় বললেন, ‘এই ম্যাচের পরও দশটা ম্যাচ থাকবে। মানে ৩০ পয়েন্ট। এই ম্যাচটা থেকে তিন পয়েন্ট পেতে পারি। তার বেশি তো পাব না। কিন্তু, আই লিগের খেতাব নির্ধারণ করে দেবে বাকি ওই ৩০ পয়েন্ট।’ বাঙালি বলে সঞ্জয় সেন যেমন ‘সঞ্জয়দা’ ডাক শুনতেই অভ্যস্ত, ইংরেজ মর্গ্যান-কে ‘মর্গ্যান-স্যার’ বলেন অনেক ভক্তই। সেই মর্গ্যান-স্যার আর মেহতাব সমর্থন জানালেন অবিকল একই কথা বলে। মোহনবাগান যেহেতু এএফসি-র কারণে একটি ম্যাচ কম খেলেছে, মোহনবাগানের ক্ষেত্রে বড় ম্যাচ বাদ দিলে পড়ে থাকবে ১১ ম্যাচ, ৩৩ পয়েন্ট, আর ইস্টবেঙ্গলের ১০ ম্যাচ ৩০ পয়েন্ট। তাই, তথ্যে সামান্য ভুল থাকবে ‘৩০ পয়েন্টের খেলা’ বললে। কিন্তু বক্তব্য একই, এই ম্যাচের তিন পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ বটেই, আরও গুরুত্বপূর্ণ বাকি ও ৩০ বা ৩৩ পয়েন্ট।

    ইস্টবেঙ্গলের তিন বিদেশির প্রথম ‘ডার্বি’। মর্গ্যান কি চিন্তিত? ‘ওরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের দেশে নানা বড় ম্যাচে খেলেছে। ওয়েডসন, প্লাজা, বুকেনিয়া। কাজেই চিন্তা করব কেন?’ সব দেশেই বড় ম্যাচ চরিত্রে তো একই রকম, ঠিকই।

    দুই কোচ এবারই প্রথম বড় ম্যাচে মুখোমুখি। তা নিয়েও খুব একটা হেলদোল নেই কারও। মর্গ্যান তো বলেই দিলেন, ‘আমি তো খেলব না!’ সঞ্জয় তো হেসেই ফেললেন। ‘আগেও খেলিনি তো তা নয়। তবে তখন উনি ছিলেন ইস্টবেঙ্গলে আর আমি ইউনাইটেড স্পোর্টসে। সুতরাং, সেই ম্যাচগুলো নিয়ে কথা ওঠেনি।’

    কাতসুমি আবার এক থেকে চার পর্যন্ত সেরা হিসাবে মোহনবাগানকেই রাখলেন। পাল্টা প্রশ্ন গেল, তা হলে কি পাঁচ নম্বরে থাকবে ইস্টবেঙ্গল? এবার কাতসুমির হাসি, ঘরেই হাস্যরোল। আসলে, র‍্যাঙ্কিং করায় সবারই অনীহা। কে আর বড় ম্যাচের আগ বাড়িয়ে এই সব নিয়ে মাথা ঘামাতে যাবে, কেনই বা যাবে!

    তাই, বাকি সব প্রশ্নোত্তরই, ময়দানি ভাষায়, বেশ গোল-গোল। বিতর্কের গন্ধ নেই তায়। থাকা সম্ভব নয়। নমুনা শুনুন –

    মর্গ্যান – তিন বিদেশি খেলবে। হয়ত গোলও করবে। কিন্তু প্লাজা বা ওয়েডসনকে গোল করাতে বলটা দেবে কে? কোনও এক ভারতীয় হয়ত। বাকি আটজন তা হলে কেন গুরুত্বপূর্ণ নয়? ফুটবল এগারজনেরই খেলা, কোনও একজনের নয়।

    সঞ্জয় – মানছি, তিন বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা খেলায় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, ব্যক্তিগত দক্ষতায়। সে তো বড় ম্যাচে বা যে কোনও ম্যাচেই হয়। যারা ব্যক্তিগত দক্ষতায় একটু এগিয়ে, সবসময়ই পার্থক্য গড়ে দেয়। কিন্তু, সেই পার্থক্য গড়ে দেওয়ার মুহূর্তটুকু বাদ দিলে দলের সবাইকেই খেলতে হয় একই রকমভাবে, একই রকম ভাল। না হলে সেই মুহূর্তটাই আসে না যখন ব্যক্তিগত দক্ষতার ঝলকানি দেখানো যায়।

    আর, ইস্টবেঙ্গলের চতুর্থ বিদেশিকে যদি মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়? সঞ্জয়র উত্তর, ‘অচেনা শত্রু সবসময়ই বিপজ্জনক। কোচরা এমন জুয়া মাঝে মাঝে খেলে থাকেন। লাভ হতেও পারে, ঝুঁকিও হতেই পারে।’

    মেহতাব বহু ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর প্রথম ডার্বি মোহনবাগানের হয়ে। ‘বাইচুংয়ের বিরুদ্ধে খেলেছিলাম, ব্যারেটোর সঙ্গে। আগের রাতে ঘুমোতে পারিনি! এই ম্যাচটায় খেলব, ভাবনাটাই অন্যরকম ছিল। এখন তত কিছু মনে হয় না। অন্যান্য ম্যাচের মতোই মনে করি। আর ভাবনাটাই পাল্টেছে। ওই যেমন আমাদের কোচ আর সঞ্জয়দা বললেন, ৩০ পয়েন্ট করে বাকি থাকবে। সুতরাং, সব ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ।’

    মোদ্দা যা দাঁড়াল শনিবারের সাংবাদিক সম্মেলনে, মাঠের বাইরে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি-একতার নিখুঁত ছবি। চব্বিশ ঘন্টা পর, রবিবার বিকেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে যার বিপরীত ছবিই দেখা যাবে, নিশ্চিত!

    No comments