• Breaking News

    আমাদের ছাপোষা বিশ্বাস! আমাদের ঠুনকো বিশ্বাস! - কাশীনাথ ভট্টাচার্য

     

     

     

    লুইস এনরিকে বলেছিলেন, ‘ওরা যদি চার গোল দিতে পারে, আমরাও পারি ছ’গোল দিতে।’

    আমরা বিশ্বাস করিনি। বলেছিলাম, কোচকে অমন বলতেই হয়।

    নেইমার জুনিয়রের মনে হয়েছিল, দ্বিতীয় পর্বের পর বার্সেলোনার কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা ১ শতাংশ। ‘তবে ওই এক শতাংশের সঙ্গে ৯৯ শতাংশ আস্থা রাখতে হবে বিশ্বাসে।’ সতীর্থদের কাছে নাকি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, দু’গোল দেবেন তিনিই।

    আমরা বিশ্বাস করিনি। বলেছিলাম, তারকা ফুটবলারকে অমন বলতেই হয়।

    লুইস সুয়ারেজ বলেছিলেন, ০-৪ পিছিয়ে শুরু করলেও নু কাম্পে বার্সেলোনা টপকে যেতে পারে পিএসজি-কে। বিশ্বাস রাখতে হবে নিজেদের দক্ষতা, ক্ষমতায়।

    আমরা বিশ্বাস করিনি। বলেছিলাম, সুয়ারেজই যদি খেলার আগে হার মেনে নেন, দলের মনোবল ভেঙে যাবে। তাই তাঁকেও এমন বলতেই হত।

    আমাদের আটপৌরে বিশ্বাস!

    আমাদের ছাপোষা বিশ্বাস!

    আমাদের ঠুনকো বিশ্বাস!

    প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যে বিশ্বাসের দৌড় হেরে যায় আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাবের কাছে। আমরা বিস্মিত হই, চমকিত হই। পণও করি হয়তবা, পরের বার ভুগব না এমন বিশ্বাসহীনতায়। আবার ফিরে যাই অসম্ভব শব্দটার কাছে মাথা নিচু করে। উচ্চাশার সীমায় গণ্ডি কেটে দেয় আমাদের দৈনন্দিন রিক্ততা। নাপোলিয়ঁ বোনাপার্তে নামের এক বেঁটেখাটো মানুষ ঠিকই তো বলেছিলেন – আমরা যে মূর্খ!

    আমাদের অগাধ জ্ঞানগম্যি, আমাদের অকারণ হম্বিতম্বির পরে আবির্ভূত হন নেইমাররা। ইউরোপের সঙ্গে গোটা বিশ্ব তাকিয়ে দেখে দক্ষিণ আমেরিকার এক চব্বিশের যুবকের জাদুপায়ের ছোঁয়ায় কী করে বদলে যায় রাত, সূর্য ওঠে নতুন ভোরে, নতুন করে। সাত মিনিটে তিন গোল। একটা ফ্রি কিক, আরেকটা পেনাল্টি, অন্যটা গোলের ঠিকানা-লেখা পাস যা গোলে পাঠাতে সের্খি রোবের্তোও ভুল করতে পারেন না। ততক্ষণে ভুলে যাওয়া গিয়েছে দলের তৃতীয় গোলের পেনাল্টিটাও তাঁরই এনে-দেওয়া, যা থেকে লিওনেল মেসির একমাত্র গোল ঐতিহাসিক ম্যাচে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি ‘অ্যাসিস্ট’-এর মেসি-রেকর্ডও খেলা শেষে নিজের নামে, ৮ গোলের পাস বাড়িয়ে। এবং, ইউরোপীয় মরসুম এখনও শেষ হয়নি!

    সপ্তাহ দুই আগেও বার্সেলোনার মরসুম নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন। লা লিগায় পিছিয়ে ছিল রেয়াল মাদ্রিদের কাছে। ইউরোপে বিদায় সুনিশ্চিত করে রেখেছেন বিশেষজ্ঞরা। হাতে রইল পেনসিল ‘কোপা দেল রে’। গোল করে বা করিয়ে সামান্যও খুশি দেখাচ্ছে না মেসিকে। লা লিগায় গোল করে চলেছিলেন রোজ তবু। পরপর দুটি ম্যাচে পাঁচ বা ততোধিক গোল সত্ত্বেও বার্সেলোনায় উচ্ছ্বাস নেই বিন্দুমাত্র। কোচ জানিয়ে দিয়েছিলেন, মরসুম শেষে বিদায় নিচ্ছেন। হিসাব তৈরি, তিন বছরে পাঁচের সঙ্গে আর একটাই ট্রফি জুড়তে পারে। কাম্প নু জুড়ে শুধুই হতাশা। সমর্থকরাও বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন হয়ত, মরসুম শেষ!

    ইতিহাস বোধহয় সন্ধানে থাকে এমন মুহূর্তেরই। সব আলো নিভে যায় যখন, নিভু-নিভু, কিন্তু-জ্বলছে, এমন একটা-দুটো শিখা লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া তখন। এদিনসন কাভানির দুর্দান্ত গোলের আগে একবার কাভানির শটই পোস্টে লেগে ফিরে-আসা, গোলটা হওয়ার পর আনখেল দিমারিয়ার সহজতম সুযোগ নষ্ট – দুটো টিমটিমে আলো। ৮৮ থেকে ৯৫, সাত মিনিটে সেই আলো জোরালো থেকে ক্রমশ চোখ-ধাঁধানো-উজ্জ্বল অদৃষ্টপূর্ব জ্যোতি। এমন জয় আগে দেখেনি বিশ্ব!

    বিশেষজ্ঞ জোনাথন উইলসন লিখেছেন, মরসুম শেষ হওয়ার মাস তিনেক আগে দল ছাড়ার কথা কখনও জানাতে নেই কোচদের। ফুটবলাররা যখন জেনেই যায় তিন মাস পর আর কোচ থাকছেন না, তাঁর কথা মেনে চলার কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না আর। সাম্প্রতিক ইতিহাস অবশ্য বলছে অন্য কথা। জাপ হেইঙ্কসকে তাড়ানো এবং পেপ গারদিওলাকে তাঁর জায়গায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল বায়ার্ন মিউনিখ, ২০১২-১৩ মরসুমের মাঝপথেই। বায়ার্ন ফুটবলাররা হেইঙ্কসকে বিদায় জানিয়েছিলেন ‘ত্রিমুকুট’ দিয়ে। বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও জার্মান কাপ। জার্মান ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি। এমনকি কাইজার বেকেনবাওয়ারদের স্বপ্নের বায়ার্ন মিউনিখ টানা তিনবার ইউরোপ-চ্যাম্পিয়ন হয়েও কখনও পায়নি ত্রিমুকুট।

    এনরিকের দল-ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণাও হয়ে উঠবে না তো তেমন?

    আমরা বিশ্বাস করছি না আবার। করতে চাইছি না। আমাদের আছে অবিশ্বাস। যা করার কথা ভাবতেই পারি না, কেউ করে দেখালে জন্মায় ইংরেজিয়ানাজনিত মধ্যচিত্ততার তুমুল সন্দেহবাতিক। আমাদের ভয় আছে। কীসের ভয়, জানা নেই যদিও। আসলে, সেই জোর নেই বিশ্বাসে। নেই কারণ, সেই দক্ষতাই নেই, যা এমন বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়, দিতে পারে। চিন্তিত শঙ্কিত হই আমরা। ‘কিছু নেই’ বলেই আমাদের ক্রমাগত তাড়া করে সব-হারানোর জুজু।

    নামের শুরুতে ‘নেই’ নিয়েও যে-জোর নিশ্চিত আছে নেইমারের। তাই তো অলিম্পিক সোনা, তাই তো রূপকথার জয়!

    No comments