• Breaking News

    ছোট-মেসি দাইবালার দাপটে কুপোকাত বড়-মেসিরা!

    জুভেন্তাস ৩ বার্সেলোনা ০


    (দাইবালা ৭, ২২, কিয়েলিনি ৫৫)


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    ভাগ্যিস গোনজালো ইগাইন ছিলেন বিপক্ষে! লিওনেল মেসি মনে মনে ভাবলেন, বার্সেলোনাকে আধ ডজন গোল খেয়ে ফিরতে হল না তুরিন থেকে তো সেই এক ও অদ্বিতীয় কারণেই!

    আন্দ্রে ইনিয়েস্তাকে সহজতম সুযোগ দুরন্ত পাসে সাজিয়ে দিয়েছিলেন মেসি নিজেই। ইনিয়েস্তা শট নেন জিয়ানলুইগি বুফোঁর বাড়ানো হাতে। বলটা বুফোঁর হাতে লেগে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর যেভাবে লাফালেন বর্ষীয়ান গোলরক্ষক, ইউরো ফাইনালের বদলা নিলেন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়! অথবা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে হারের প্রতিশোধ!

    পাউলো দাইবালার বয়স তেইশ। ৮১ মিনিট মাঠে ছিলেন। যা করার করে দিয়েছিলেন অবশ্য সাত মিনিটেই। বার্সেলোনা বক্সের মধ্যে কুয়াদ্রাদোর পাস থেকে বল পেয়ে টকিত টার্ন। বাঁপায়ের শটটা নিলেন যখন, সামনে এতজন ফুটবলার যে তিনকাঠি কোথায়, টের স্টেগেনই বা কোথায়, কিছুই দেখার উপায় নেই। কিন্তু নিচু সোয়ার্ভিং শট স্টেগেনের হাতের নাগাল এড়িয়ে গোলে! দুর্দান্ত বললেও কম!

    ওই গোলেই আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দিল বার্সেলোনার। যে-কারণে দ্বিতীয় গোলও খেলেন স্টেগেন, নিজের প্রথম পোস্টে। দাইবালাকে এবার বল বাড়িয়েছিলেন মান্ডজুকিচ। বাঁপায়ের শট স্টেগেনের প্রথম পোস্টেই রেখেছিলেন আর্জেন্তিনীয়। মেসি-যুগে গোলরক্ষকদের প্রথম পোস্টে আক্রমণ করাটা এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে বুদ্ধিমান ফরোয়ার্ডদের জলভাত। ‘ওল্ড লেডি’ জুভেন্তাস সমর্থকরা তাঁর মতো করে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে নাক ও ঠোঁট ঢেকে রাখার ভঙ্গিটাকে তাই ‘ভাইরাল’ করে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়! মিনি-মেসি বলে কথা!

    কী করলেন আসল মেসি? একটা গোল তাঁর দলকে দিতে পারত প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। তিনি সেই কারণে দুবার দুটো পাস বাড়িয়েছিলেন। আর পেয়েছিলেন একটি ফ্রি কিক নেওয়ার ও একটি গোল করার সুযোগ, নিজে। ফ্রি কিকটা বেশ খারাপ মারলেন, যেমন মারছেন শেষ বেশ কিছু ম্যাচে। গোলের সুযোগটাও হারালেন, বাইরে মেরে। তাঁর পাস থেকে ইনিয়েস্তার গোল না-করাটা কঠিন ছিল যেমন, মেসির নিজেরও গোল না-করাটা অপরাধ বলেই বিবেচিত হবে, কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগের পর বার্সেলোনা ছিটকে গেলে। না, প্রতিবার পিএসজি হয় না। আর জুভেন্তাসের ইতালীয় ডিফেন্ডারদের সঙ্গে পিএসজি-র ব্রাজিলীয়দের রক্ষণে কোনও মিল নেই!

    তৃতীয় গোল দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। কিয়েলিনির হেড আটকাতে ব্যর্থ মাসচেরানো, অনেক ধাক্কাধাক্কি করেও। হেড করা বল মাটিতে ড্রপ খেয়ে পোস্টে লেগে গোলে। নবম ম্যাচে ১২ গোল খেয়ে ফেলল ছন্নছাড়া বার্সেলোনা। মাসচেরানোকে চেয়েছিলেন কোচ এনরিকে মাঝমাঠের মাঝখানে, বুসকেতসের ভূমিকায়। মাসচেরানো পারেননি সামলাতে। অ্যাওয়ে ম্যাচে পারি শহরের পর তুরিন শহরেও একইভাবে ভূপতিত বার্সেলোনা, যদিও গোল কম খেল একটি এবার। আর, পারি-তে গোল না পেলেও নেইমার ছিলেন উজ্জ্বল ভূমিকায়। রেফারিকে হাততালি দিয়ে ব্যঙ্গ করে এল ক্লাসিকোর বাইরে চলে যাওয়া নেইমার কিন্তু তুরিনে একেবারেই নিষ্প্রভ। তথৈবচ সুয়ারেজও।

    মাসিমিলিয়ানো আলেগ্রির এসি মিলান সান সিরোতে বার্সেলোনাকে ২-০ হারিয়েছিল কেভিন প্রিন্স বোয়াতেং ও সুলে মুন্তারির গোলে, ২০১৩ সালে। সেই ম্যাচেও এমনই দুর্দান্ত ছিল এসি মিলান। রক্ষণে সুদৃঢ়, প্রতি আক্রমণে অত্যন্ত দ্রুত, চকিত শটে পারদর্শী। কিন্তু ফিরতি ম্যাচ ০-৪ হেরে বিদায় নিয়েছিল মিলান, কাম্প নু থেকে। আলেগ্রির এই জুভেন্তাস সেই মিলানের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। রক্ষণে তো বটেই। আর রক্ষণের সামনে খেদিরা ও পিয়ানিকের প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোয় সাফল্য। মেসিকে বক্সের সামনে বল নিয়ে ঘুরতে-ফিরতে দিলেন ইতালীয়রা, শট নেওয়ার প্রয়োজনীয় ফাঁক চোখে দেখতেই দিলেন না। ফিরতি ম্যাচে তা হঠাৎ করে দিতে যাবেন কেন!

    ঠিক যখন মনে হতে শুরু করেছিল, বার্সেলোনা হয়ত মরসুমটা ভালভাবে শেষ করতে পারে, পরপর দুটি ম্যাচে সেই সম্ভাবনা নিজেরাই শেষ করলেন বার্সেলোনার ফুটবলাররা। মালাগার কাছে ০-২ আর জুভেন্তাসের কাছে ০-৩ হেরে, যথাক্রমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেতাবি যুদ্ধ থেকে বিদায়ের পথে চলে গিয়ে। পিএসজি-কে ৬-১ হারানোর রাতেই কি আবেগের সঙ্গে ছন্দের ভাঁড়ারও শূন্য করে ফেলেছিলেন মেসি-সুয়ারেজ-নেইমাররা?

    ম্যাচের একেবারে শুরুতে ইগাইন ফাঁকায় সুযোগ পেয়েও হেড করেছিলেন স্টেগেনের হাতে। পরে, ডিফেন্ডারদের গায়ে, গোলকিপারের হাতে আরও যে কতবার! অফসাইড এড়িয়ে পৌঁছেও গিয়েছিলেন গোলের কাছে, কোথাও কেউ নেই, তবু স্টেগেনের গায়েই। আলেগ্রি এবার বুঝলেন আর্জেন্তিনার কোচদের দুরবস্থা। তিনটি ফাইনালে আর্জেন্তিনাকে জিততে দেননি একা ইগাইন। আলেগ্রির সৌভাগ্য, তাঁর দাইবালা-রা আছেন, যে সৌভাগ্য থাকলে হয়ত বিদায় নিতে হত না আলেখান্দ্রো সাবেয়া বা তাতা মার্তিনোকে!

    No comments