• Breaking News

    ২৬ বছর পর কলকাতায় খেলবেন আনন্দ / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য
    কলকাতা, ১৫ সেপ্টেম্বর
    মাঝে ২৬ বছর। আবার কলকাতায় দাবা প্রতিযোগিতায় খেলতে আসছেন বিশ্বনাথন আনন্দ।
    সেই ১৯৯২ সালে ছিল গুডরিক। তার আগে, ১৯৮৬ সালে যখন এসেছিলেন, টাটা স্টিলই ছিল পৃষ্ঠপোষক। এবারও আগামী ৯ থেকে ১৪ নভেম্বর কলকাতায় আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় খেলবেন। র‍্যাপিড আর ব্লিৎজ, খেলা হবে দুভাবেই। প্রথম তিন দিনে র‍্যাপিডের ৯ রাউন্ড, পরের দুদিনে ব্লিৎজের ১৮ রাউন্ড। আইসিসিআর-এ খেলা। আসবেন বিশ্বের প্রথম সারির দাবাড়ুরা। হিকারি নাকামুরা, সের্গেই কারিয়াকিন, শাখরিয়ার মামেদিয়ারোভ, ওয়েসলি সো, লেভন আরোনিয়ানের সঙ্গে থাকছেন ভারতীয় তারকারাও। আনন্দের সঙ্গে খেলবেন পেন্টালা হরিকৃষ্ণ, সূর্যশেখর গাঙ্গুলি, নিহাল সরিন, বিদিত গুজরাতি এবং প্রজ্ঞানন্দ রমেশবাবু, সবচেয়ে কমবয়সি হিসাবে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন যিনি সদ্য।
    কলকাতায় গুডরিক দাবা একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। মাঝে বড় প্রতিযোগিতা হয়নি। স্পনসরদের তরফে জানানো হল, এই প্রতিযোগিতা শুধুই একবার নয়, প্রতি বছরই করার চেষ্টা করবেন তাঁরা। মোট ৪০ হাজার ডলার বা ২৮ লক্ষ টাকা পুরস্কার মূল্যের এই প্রতিযোগিতায় দুই বিভাগে জয়ীরা পাবেন যথাক্রমে ৭ লক্ষ এবং ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা করে।
    এমন প্রতিযোগিতা নিয়মিত হলে লাভ কী?
    সংগঠকরা জানাচ্ছেন, নানাবিধ। এই প্রতিযোগিতাগুলি যেহেতু ফিডে স্বীকৃত, পয়েন্ট পাওয়া যায় যা কাজে আসে র‍্যাঙ্কিং এবং জিএম ও আইএম নর্ম পাওয়ার জন্যও। ভারতে এখন এই ধরনের প্রচুর প্রতিযোগিতা হয়। কিন্তু কলকাতায় হত না এত দিন। নিজেদের র‍্যাঙ্কিং বাড়ানোর জন্য শুধুই বিদেশের প্রতিযোগিতায় খেলতে যাওয়ার প্রয়োজন আস্তে আস্তে কমছে, দাবি ভারতীয় দাবা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্তাদের।
    র‍্যাপিড দাবায় এখনও বিশ্বসেরা আনন্দ মনে করছেন, ‘দাবা ঘিরে উৎসাহ বেড়েছে প্রচুর। রাতারাতি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তৈরি হবে না, কারণ এক্স-ফ্যাক্টরটা সবক্ষেত্রেই বিশ্বসেরা হওয়ার জন্য জরুরি। কিন্তু, সিস্টেম থাকতেই হবে। নিয়মিত খেলোয়াড়রা উঠে আসবে তাতে। সার্বিকভাবে দেশের দাবার মান বাড়বে। মনে আছে, ১৯৮৮ সালে আমি প্রথম জিএম হয়েছিলাম। তারপরও সংখ্যাটা বেশ কমই ছিল। কিন্তু গত বছর দশেক সময়ে এতটাই বেড়েছে যে, ভারত থেকে এখন ঠিক কতজন জিএম, আমার তো গুলিয়েই যায় সংখ্যাটা। বিশ্ব দাবার আসরেও বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০৪০ সাল নাগাদ বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আসবেন ভারত বা চিন থেকেই। স্থানীয় স্তরে প্রতিযোগিতা নিয়মিত হলে এটাও একটা বড় লাভ, চোখের সামনে বড় বড় তারকাদের দেখতে পেয়ে অনেকেই বাড়তি উৎসাহিত হতে পারে। ’

    দাবা অলিম্পিয়াড ও অলিম্পিক
    বছর বারো পর আবার ভারতের পুরুষ দাবা দলের হয়ে অলিম্পিয়াডে খেলতে যাচ্ছেন আনন্দ। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর দাবা অলিম্পিয়াড, জর্জিয়ার বাতুমি-তে। ভারতের পাঁচ সদস্যের দলে আছেন আনন্দ, হরিকৃষ্ণ, বিদিত, ভাস্করণ অধিবান এবং কে শশিকিরণ। গতবার ২০১৬ সালে আজারবাইজানের বাকুতে চতুর্থ হয়েছিল ভারত। এবার আনন্দ থাকায় কি পদকের সম্ভাবনা বাড়ছে?
    আনন্দ সরাসরি তেমন কিছু বলেননি। ‘অলিম্পিয়াড মানে টিম ইভেন্ট ঠিকই, কিন্তু খেলাটা ব্যক্তিগতই। ব্যক্তি যদি ভাল খেলে, দলের পয়েন্ট বাড়বে। অন্যরা ভাল খেললে দলের সবারই ভাল লাগবে, আমি ভাল খেললেও একই ব্যাপার। দলের সবাই যদি খোলামনে আলোচনা করে, একে অপরকে মতামত দেয়, সবারই লাভ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত খেলাটা যদিও একজনের বিরুদ্ধে ভিনদেশের আর একজনের। আমাদের দলের খোলামেলা পরিবেশটাকে কাজে লাগিযে চেষ্টা করতে হবে সাফল্য পাওয়ার।’
    কেন মাঝের এই বারো বছর অলিম্পিয়াডে খেলেননি, সুনির্দিষ্ট কোনও উত্তর দেননি আনন্দ। ব্যক্তিস্তরে এত প্রতিযোগিতায় খেলতে হত এবং তাঁর প্রস্তুতিতেই সময় যেত, ধরে নেওয়া যায় সেই কারণেই। ‘হঠাৎ মনে হল, অলিম্পিয়াডে খেলা উচিত। জাতীয় সংস্থাকে জানানোর পর তাঁরাই সব ব্যবস্থা করে দিল।’
    কিন্তু নানা ধরনের খেলা যখন মূল অলিম্পিকে জায়গা পাচ্ছে, দাবারও কি পাওয়া উচিত নয়?
    আনন্দ মনে করছেন অবশ্যই। ‘সামার বা উইন্টার, যে কোনও অলিম্পিকের অংশ হতেই পারে দাবা। আমাদের এই দাবা অলিম্পিয়াড থাকা সত্ত্বেও মনে করি, মূল অলিম্পিকের অংশ হতে পারলে আরও বেশি ভাল লাগবে।’

    বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ
    চারবার তিনি ফিডের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন, দুবার র‍্যাপিড দাবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। শেষবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে খেলেছিলেন এখনকার বিশ্বজয়ী ম্যাগনাস কার্লসেনের বিরুদ্ধে, ২০১৪ সালে, রাশিয়ার সোচিতে। তার আগের বছর চেন্নাইতে হেরে খুইয়েছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন খেতাব, কার্লসেনের কাছেই। সোচিতেও হার বাঁচাতে পারেননি। আর কখনও হয়ে উঠতে পারেননি বিশ্বচ্যাম্পিয়নের চ্যালেঞ্জার।
    এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই লন্ডনের উইন্ডমিল ইন্টারন্যাশনালে, আগামী ৯ থেকে ২৮ নভেম্বর। ২৭ বছরের কার্লসেনকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন ২৬ বছরের ফাবিয়ানো কারুয়ানা। র‍্যাঙ্কিংয়ে দুজনে যথাক্রমে ১ এবং ২। খেলতেও ভালবাসেন আক্রমণাত্মক দাবা। আনন্দের মনে হচ্ছে, ‘খুব উত্তেজক হবে ম্যাচ। দুজনেই খুলে খেলতে ভালবাসে, জিততে চায় দ্রুত।  ওই সময় কলকাতায় থাকব, প্রতিযোগিতায় খেলতে। শুরুর ম্যাচগুলো এখানে বসেই দেখব।’

    কারপভ-কাসপারভ
    তিনি যখন খেলতে শুরু করেছিলেন, আনাতলি কারপভ ছিলেন বিশ্বসেরা। পরে সেই জায়গা নিয়ে নেন গ্যারি কাসপারভ। আনন্দ জানালেন, ‘শুরুতে কারপক্ষের খেলাই নকল করতাম। আমি একা নই, অনেকেই। কিন্তু ওর মতো খেলতে গিয়ে বুঝতে পারি, আপাত সহজ মনে হলেও মোটেই সহজ নয় কারপভের মতো খেলা। তারপর কাসপারভের খেলা দেখে ওর মতোও খেলতে চেষ্টা করেছি। মানে, দুজনের মতোই খেলার চেষ্টা করেছি কখনও না কখনও। কার্লসেন এখন যেমন কাসপারভের মতোই খেলতে চায়।’

    সূর্যশেখরে আপ্লুত
    সহায়ক হিসাবে সূর্যশেখর গাঙ্গুলিকে পেয়েছিলেন। আনন্দ জানালেন, ক্রমশ এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল তাঁর দল যে, কোনও বিষয়ে যদি জানা যেত সূর্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন, বাকিরা আর মাথাই ঘামাত না। সূর্যর ওপর এতটাই ভারসা ছিল আনন্দের। বেশ কয়েকবার সূর্যের পরীক্ষা করে দেওয়া চাল ম্যাচে ব্যবহার করে বাজিমাত করতে পেরেছিলেন, সানন্দে জানালেন আনন্দ।

    ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো
    তিনি রেয়াল মাদ্রিদের ভক্ত। মাঠে গিয়ে খেলাও দেখতেন নিয়মিত। এবার ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর রেয়াল ছেড়ে জুভেন্তাসে যাওয়া নিশ্চয়ই পছন্দ হয়নি তাঁর?
    ‘সবাইকেই যেতে হয় কখনও। কেন, কী কারণে, ভেবে তো লাভ নেই। আমি আসলে বিশ্বকাপ ফুটবলের জ্বরে এখনও কাবু। তাই এবারের লা লিগা দেখতে শুরু করিনি এখনও। জুভেন্তাসের খেলা আগে সেভাবে দেখতাম না। এখন মাঝেমাঝে দেখতে হবে। তবে, যা খবর পেয়েছি, ইতালি গিয়ে ক্রিস্তিয়ানো এখনও কিন্তু গোল পায়নি!’

    খেলার খিদে
    আনন্দের বয়স এখন ৪৮। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আর কতদিন? কিন্তু, আনন্দকে সেভাবে সরাসরি প্রশ্ন করাটা অনুচিত। তাই ঘুরিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন থেকেছেন বহুদিন, তারপরও এখন নিজেকে কী করে মোটিভেট করতে পারেন?
    আনন্দ জানালেন, ‘খেলতে ভাল লাগে, ভালবাসি, তা-ই খেলে যাচ্ছি। এখনও দাবা খেলাটাই আমার একমাত্র সহজাত। তাই যত দিন পারব খেলে যাব। জানি একদিন হয়ত সরে যেতে হবে। কিন্তু যতক্ষণ খেলে আনন্দ পাচ্ছি, সরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। আর খেলা ছেড়ে দিলেও খেলাটাকে ছাড়তে পারব না। দাবার সঙ্গেই যুক্ত থাকব, তখনও।’

    No comments