• Breaking News

    মেসির দাড়ি নয়, দক্ষতাই জেতাতে পারে এই ফাইনাল!

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    messi copa2

    ফাইনালে আর্জেন্তিনার যে কী হয়!

    ২০০৭ কোপার ফাইনালে তাঁরা ছিলেন ফেভারিট। লিওনেল মেসি তখন আর্জেন্তিনার সেরা ফুটবলার মোটেও নন। ছিলেন খুয়ান রিকেলমে, এরনান ক্রেসপো, পাবলো আইমার। মাসচেরানো গোলও করতেন তখন। ওই কোপাতেই দুটি গোল ছিল মাসচেরানোর, ৯ বছর পর এমন শুনলে বার্সেলোনা-সমর্থকরা ভিডিও দেখতে চাইতে পারেন! তেভেজ-মেসি উঠতি প্রতিভা। রক্ষণে রোবের্তো আয়ালা। সেই আর্জেন্তিনা ফাইনালে ওঠার পথে ১৬ গোল করেছিল, খেয়েছিল মাত্র তিন। ফাইনালে ব্রাজিল তাদেরই গুনে গুনে দিয়েছিল তিন গোল!

    হালের দুটি ফাইনাল বহুচর্চিত। বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ০-১ হার, অতিরিক্ত সময়ে। কোপায় চিলের কাছে টাইব্রেকারে হার। দুবারই গোনজালো ইগাইন খলনায়ক। একা জার্মান গোলরক্ষক নয়ারকে পেয়েও ইগাইন তিনকাঠিতেই রাখতে পারেননি বল, বিশ্বকাপ ফাইনালে। আর চিলের বিরুদ্ধে তো ইগাইন আর লাভেজি এমন কিছু সুযোগ নষ্ট করেছিলেন, ফুটবলে যার ব্যাখ্যা হয় না। সান্তিয়াগোতে ফাইনাল শেষ হওয়ার ঠিক আগে, লাভেজির জন্য মেসি বের করে এনেছিলেন আবারও একটি পাস। লাভেজি নিজে গোল করতে পারতেন। তা না করে তিনি বাড়িয়ে দেন উঠে আসা ইগাইনের জন্য। অতিরিক্ত উৎসাহে ইগাইন সেই বল পাঠান নেটের বাইরে।

    তবু, অধিনায়ক বলেই শুধু নয়, দেশ ও বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসাবে শেষ বিচারে অবশ্য সব দায়ই থেকে যায় মেসির। টানা তৃতীয় ফাইনালে তুললেন দলকে, তৃতীয় বছরে। ৫ গোল, ৪ গোলের পাস। একটি ম্যাচ না খেলেই। সেই ম্যাচটা অবশ্য ছিল এই চিলের বিরুদ্ধে, গ্রুপ লিগে প্রথম ম্যাচ। সবাই জানেন, ফাইনালে তাঁকে বিশেষভাবে মার্ক করা হবে। ফাইনাল কেন, সব ম্যাচেই হয়। এই বিশ্বে এমন কোনও ফুটবল কোচ কি আছেন, বিপক্ষে-থাকা মেসিকে স্বাধীনভাবে খেলতে দেওয়ার সুযোগ দেবেন? সবাই চেষ্টা করেন আটকাতে। কেউ কেউ পারেন, কেউ পারেন না। সেই জন্যই তিনি পাঁচবারের বালন দি’ওর জেতা মেসি, এই মুহূর্তে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার।

    সত্যিই ট্রফি জেতা খুব জরুরি আর্জেন্তিনার। ২৩ বছর কোনও ট্রফি জেতেনি দেশ। তা ছাড়া, ট্রফিটা জরুরি তো মেসিরও। তাঁর দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়ার পথে যাঁর রেকর্ড ভাঙলেন সেই বাতিস্তুতাও স্বীকার করেছেন, ‘এই বিশ্বের নয়, মেসি অন্য গ্রহের’। কিন্তু, দেশের হয়ে ট্রফি কই, এই ইঙ্গিতটা সরবে থেকেই যাচ্ছে, যতদিন না অন্তত একটি ট্রফি দিতে পারছেন আর্জেন্তিনাকে। ভারতীয় সময়ে সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে শুরু-হওয়া ম্যাচে কি সেই শাপমুক্তি?

    Copa-America-Centenario-2016-1024x768

    আর্জেন্তিনার অবশ্য সমস্যা থাকছেই। দিমারিয়া ফাইনালে খেলার সুযোগই পান না, আহতদের তালিকায় চলে গিয়ে। বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারেননি, গত বছর কোপার ফাইনালেও নয়। এবারও শতবার্ষিকী কোপায় খেলতে পারবেন কিনা, ঘোর সন্দেহ। সুস্থ হয়ে উঠেছেন, শোনা যাচ্ছে। পরিস্থিতি খুব জরুরি না হয়ে পড়লে তাঁকে হয়ত নামাবেন না কোচ তাতা মার্তিনো। লাভেজিও নেই, তবে এই না-থাকা আগের দুটি ফাইনালের পারফরম্যান্সের বিচারে খুব বেশি চিন্তায় ফেলবে না দলকে। তা ছাড়াও, সেমিফাইনালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেভাবে মাঠের অতটা বাইরে চলে-যাওয়া বল বুঝতে না-পেরে ধরতে গিয়ে বিজ্ঞাপনের বোর্ডের ওপর বিপজ্জনকভাবে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেললেন, তাঁকে নিয়ে ভাবলে বাড়বে হতাশাই। আগেরো আছেন, বেঞ্চে। ইপিএল-এ প্রচুর গোল করেন, আর্জেন্তিনার জার্সিতে কখনও তাঁকে তেমন প্রভাবশালী ফুটবলার মনে হয়নি।

    আর্জেন্তিনার আরও সমস্যা, মাঝমাঠে অগুস্তো ফেরনান্দেজের চোট। রক্ষণ এবং আক্রমণে ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি মাসচেরানোর সঙ্গে যোগ্য সঙ্গতে যিনি আর্জেন্তিনাকে নিরাপদ রাখছিলেন, ফাইনালে খেলতে পারবেন না। ফলে চাপ বাড়বে ফুনেস মোরি ও নিকোলাস ওতামেন্দি জুটির ওপর। রক্ষণে ভরসার প্রশ্নে পাঁচ ম্যাচে মাত্র দুটি গোল খাওয়ার কথা বললে নজর বেশি করে পড়বে মাঝমাঠ থেকে নেমে আসা মাসচেরানোর দিকে। চিলের ভার্গাস ৬ গোল নিয়ে এই কোপার সর্বোচ্চ গোলদাতা। সঙ্গে আলেক্সি সানচেজও, ভাল খেলার পাশাপাশি ফাউল আদায়েও যিনি বেশ দক্ষ।

    শতবার্ষিকী কোপা দক্ষিণ আমেরিকার সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে এলেও ফাইনালে সেই দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশই, এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের গ্রুপে যারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই দিন আর্জেন্তিনায় ছিলেন না মেসি। দিমারিয়া-বানেগা দুজনে দুজনের জন্য গোলের বল সাজিয়ে দিয়েছিলেন, আর্জেন্তিনা জিতেছিল ২-১। কিন্তু, এবার ফাইনাল আবার এবং চিলে শেষ দুটি ম্যাচে মেক্সিকোকে ৭-০ ও কলম্বিয়াকে ২-০ হারিয়ে ফাইনালে উঠে আর্জেন্তিনা ও মেসিকে আবারও আঘাত করতে প্রস্তুত। আর্তুরো ভিদাল ফিরে আসছেন, আছেন বার্সেলোনায় মেসির একদা-সতীর্থ সানচেজ ও বর্তমান সঙ্গী ক্লদিও ব্রাভো। আর, সেই চার্লস আরানগিজ, গতবছর ফাইনালের সেরা ফুটবলার। ভিদালের থেকেও বেশি কৃতিত্ব ছিল যাঁর, মেসিকে আটকানোর ক্ষেত্রে।

    এবার একটু বেশি তরতাজা মনে হচ্ছে মেসিকে, আর্জেন্তিনার সমর্থকরা যে-কারণে আশায় বুক বাঁধছেন আবার। ফাইনালে উঠতে অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারের ঝক্কি সামলাতে হয়নি। পড়তে হয়নি মেক্সিকো, কলম্বিয়ার মতো দলের বিরুদ্ধেও। শেষ দুটো ম্যাচে শুরু থেকে খেললেও গ্রুপ লিগে মেসি খেলেছিলেন মাত্র ৭৫ মিনিট। ফুরফুরে থাকতে পেরেছেন। দলের প্রায় সবাই গোল করেছেন নিয়ম করে। ফাইনালে চাপমুক্ত মেসিকে পেলে আর কী-ই বা চাই আর্জেন্তিনার!

    সব মিলিয়ে চাপটা আবার তাই মেসির ঘাড়েই। জাতীয় সংস্থাকে সমালোচনা করে ২৪ ঘন্টা আগেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ছবি দিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়েছিলেন। ফাইনালের আগে বিতর্ক থেকে সরে আসতে তুলে নিয়েছেন সেই অভিযোগ। দাড়ি রেখেছেন এবং তা এখন সংস্কার হয়ে পড়েছে সতীর্থদের কাছে। যেহেতু আর্জেন্তিনার গাড়ি গড়গড়িয়ে চলছে তিনি দাড়ি রাখার পর থেকে, ফাইনালের আগে তাঁকে আর দাড়ি কাটতে দিচ্ছেন না সতীর্থরা। ভুলে গিয়ে যে, দাড়ি নয়, মেসির দক্ষতাই জেতাতে পারে এই ফাইনাল!

    No comments