• Breaking News

    উদ্দেশ্য-বিধেয়হীন দৌড়ে দৌড়েই বিদায় ইংল্যান্ডের, কোচের পদত্যাগ

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    iceland

    প্রতি দু’বছরে আসে বড় প্রতিযোগিতা। আর ফিরে ফিরে আসে আশার বহর, দ্বিগুণ হয়ে!

    কোনওবার দুরন্ত মিডফিল্ড, কোনওবার দুর্দান্ত স্ট্রাইকার, কখনও নাকি বিশ্বের সেরা ফ্রিকিক-বিশেষজ্ঞ। ফুটবল-বোধের তো কথাই নেই! স্ট্যাটিসটিক্সের বাহার, কে কত মাইল ছুটল, কার পায়ের ছাপ কোথায় কোথায় পড়ল! শেষ বিচারে তবু প্রতি সপ্তাহের মাইনে কত! উইকলি ওয়েজেস। সপ্তাহান্তের দৌড় দৌড় আর দৌড়। বল পায়ে পেলে ‘আরে, তোল্ তোল্ তোল্’! এত টেকনিক্যাল ও আধুনিক বিশ্লেষণের পরে প্রাগৈতিহাসিক ফুটবল। বলে সোজা শট মেরে যত দূরে সম্ভব পাঠানোর প্রতিযোগিতা। বিদায় নেওয়ার পর কোচের পদত্যাগ বা চাকরি যাওয়া। এই তো ইংল্যান্ডের ফুটবল, চুম্বকে!

    এত চর্চার পর এত কুৎসিত ফুটবল বছরের পর বছর যদি কোনও দেশ খেলে যেতে পারে, একমাত্র ইংল্যান্ড। নকআউটে সহজ দিকে পড়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত কোনও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু, ইংল্যান্ড তো!  খেলার একেবারে শুরুতে একটা পড়ে-পাওয়া পেনাল্টি পেয়েই ভাবল কাজ শেষ। ওয়েন রুনি গোল করলেন পেনাল্টি থেকে, ধারাভাষ্যকারের গলা সপ্তমে। ঠিক কত রকম দিক থেকে বিশ্লেষিত হবে কেন পেনাল্টিটা সর্বোচ্চ স্তরের, আন্দাজ করাই কঠিন।

    কিন্তু বাস্তবে নেমে আসতে মাত্র ১৪ মিনিট। দু’মিনিট পরই গোলশোধ, ১৮ মিনিটে এগিয়ে যাওয়া এই ইউরোয় সবচেয়ে ছোট দেশের। বিরাট বিরাট ক্লাবের হয়ে খেলা গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডাররা দেখলেন তাকিয়ে তাকিয়ে, কী করে গোল খেতে হয়! আইসল্যান্ডের অ্যারন গুনারসন থ্রো-টা ভালই করেন। আজকের এই ভিডিও অ্যানালিসিস-এর যুগেও ইংল্যান্ড বোধহয় তা জানত না। প্রথম থ্রো থেকেই গোল! বক্সের মধ্যে থেকে সিগুর্ডসন ভলি করলেন, ১-১।

    দ্বিতীয় গোলের সময় গোলরক্ষক জো হার্ট বলে হাত লাগালেন, কিন্তু বলটা বের করে দিতে পারলেন না! গ্রুপ লিগে ওয়েলসের বিরুদ্ধে ম্যাচে গ্যারেথ বেলের ফ্রি কিক থেকে গোলটা খাওয়ার পর নাকি কোচের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু জয়ের আনন্দে কোচ মাথা ঘামাননি। হার্ট এমন গোল নিয়ম করেই খান, যেমন তাঁর আগের গোলরক্ষকরাও খেতেন। সিগথরসনের শটে জোর ছিল, ঠিক। কিন্তু গোলরক্ষক হাত বাড়িয়ে পেয়ে গিয়েও গোলের বাইরে বের করে দিতে পারবেন না, এমন ছিল কি?

    ১৮ মিনিটে ১-২, তারপর ৭২ মিনিট হাতে পেয়েও আর একটি গোল খুঁজে বের করে আনতে পারেননি রুনি বা তাঁর দলের তরুণ প্রতিভারা, ইংরেজ প্রচারমাধ্যম যাঁদের প্রতিভা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ। অনোক দৌড়, মাথা কুটে মরা বিপক্ষের ডিফেন্সিভ থার্ডে পৌঁছে। আইসল্যান্ড বরঞ্চ বাড়িয়ে ফেলতে পারত ব্যবধান। হার্ট দ্বিতীয় গোল খাওয়ার পর অবশ্য নিজের কাজে সুস্থির।

    বেঞ্চ থেকে আরও প্রতিভাবানদের মাঠে আনতে কসুর করেননি রয় হজসন। রাতে আগের ম্যাচেই আর এক পাকা চুলের কোচ বিদায় নিয়েছেন হ্যাটট্রিকের স্বপ্ন সফল করতে না পেরে। দেল বস্কের তবু সান্ত্বনা, একটা ইউরো আর একটা বিশ্বকাপ দিতে পেরেছিলেন। হজসন বা ইংল্যান্ডের কোচদের সেই সান্ত্বনা কোথায়? তাই, আইসল্যান্ডের কাছে হেরে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেওয়া, ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ হারের পর, চুক্তি শেষের দোহাই দিয়ে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কী-ই বা উপায় থাকতে পারত হজসনের!

    আইসল্যান্ড নিজেদের ফুটবল নিয়ে এত কিছু বলেনি। উল্টে শুনেছে প্রচুর, সেই প্রথম ম্যাচে তাদের হারাতে না-পেরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর কুরুচিকর কথাগুলো দিয়ে শুরু। নেতিবাচক মানসিকতা নিয়েও তারা কোয়ার্টার ফাইনালে, ঠিক যেখানে আছে রোনালদোরও দল, ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে যারা ১২০ মিনিটের ফুটবলে ১১৭ মিনিটে একটি গোল পেয়েছিল। ম্যাচ শেষে আইসল্যান্ডের ফুটবলার, কোচ ও সাপোর্ট স্টাফদের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তালে তালে তালি বাজিয়ে নীল গ্যালারির দর্শকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জাতীয় সঙ্গীত, দৃশ্য হিসাবে এই ইউরোয় নিশ্চিতভাবেই সেরা!

    No comments