• Breaking News

    ‘পারফেক্ট টেন’-এর ৪০ বছর, স্কোরবোর্ডে নাদিয়া কিন্তু পেয়েছিলেন এক!

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [caption id="attachment_809" align="alignleft" width="300"]comaneci perfect score1.00 সেই ঐতিহাসিক ‘ডিসপ্লে বোর্ড’, দশে দশ আদপেই নয়, যা দেখিয়েছিল প্রাপ্ত নম্বর ১.০০![/caption]

    প্রথম ‘দশে দশ’ করে স্কোরবোর্ডে জুটেছিল এক!

    ‘পারফেক্ট টেন’-এর চল্লিশ বছর পূর্তিতে নাদিয়া কোমানেচির মনে পড়বে হয়ত সেই কথাটাই। ১৯৭৬ মন্ট্রিল অলিম্পিক্সে চোদ্দর কিশোরী রোমানিয়ার নাদিয়া ‘আনইভেন বার’-এ পেয়েছিলেন দশে দশ। কিন্তু বোর্ডে দেখিয়েছিল ১.০০। সবাই অবাক। যাঁর পারফরম্যান্স দেখে মনেই হয়নি ‘ফ্লোর’-এ পারফর্ম করছেন না ‘বার’-এ, তিনি কিনা পেলেন এক পয়েন্ট? এ আবার কেমনধারা বিচার, গুঞ্জন উঠেছিল।

    ভুল ভাঙে খানিক পরেই। যখন ঘোষিত হয় অলিম্পিক্স ইতিহাসে প্রথমবার ‘দশে দশ’ পেলেন কোনও জিমন্যাস্ট। দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দিত করেছিলেন সেই অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্সকে। সেই ১৮ জুলাইয়ের পর চল্লিশ বছর কেটে গেল। অলিম্পিক্স ভালবাসেন যাঁরা তাঁদের স্মৃতিতে এখনও মেয়েদের জিমন্যাস্টিক্স মানেই সেই ‘পারফেক্ট টেন’ আর নাদিয়া কোমানেচি।

    কিন্তু, কেন দশের জায়গায় এক? অলিম্পিক্স আয়োজক কমিটি জানিয়েছিল কারণ, পরে। বহু বছর ধরেই অলিম্পিক্সের স্কোর জানায় ‘ওমেগা এসএ’। মন্ট্রিলে অলিম্পিক্স শুরুর আগে তাঁদের কর্তাদের সঙ্গে যখন কথা হয়েছিল আয়োজকদের, ওমেগা-র কর্তারা বলেছিলেন, ‘ডিসপ্লে বোর্ড’-এ জিমন্যাস্টিক্সে চারটি সংখ্যা দেখানোর জায়গা রাখা অর্থহীন। কেউ তো আর দশে দশ পাবে না। আয়োজকরা মেনে নিয়েছিলেন সেই প্রস্তাব। তাই, তিনটি ঘর রাখা ছিল, সর্বোচ্চ ৯.৯৯ যদি কেউ পান তা ঠিকঠাক দেখানোর জন্য।

    বিচারকরা যখন দশে দশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ১০.০০ লিখতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু, দশমিকের বাঁদিকে তো একটিই ঘর। সেখানে বসে যায় ‘এক’ সংখ্যাটি। আর দশমিকের পর দুটি শূন্য। ফলে, ঐতিহাসিক সেই ‘পারফেক্ট টেন’ ফুটেই ওঠেনি ‘ডিসপ্লে বোর্ড’-এ, দেখিয়েছিল ১.০০!

    নাদিয়া অবশ্য থেমে থাকেননি সেখানে। ওই অলিম্পিক্সেই পরে আরও ছ’বার বিচারকদের বাধ্য করেছিলেন পুরো নম্বর দিতে। একই অলিম্পিক্সে মোট সাতবার দশে দশ!

    সেই মন্ট্রিল অলিম্পিকেই নাদিয়া জিতেছিলেন তিনটি সোনা - অলরাউন্ড, বিম আর বার-এ। সঙ্গে একটি রুপো, দলগত বিভাগে, একটি ব্রোঞ্জও, ফ্লোর এক্সারসাইজে। চার বছর পর মস্কোতে আরও দুটি সোনা, ব্যালান্স বিম ও ফ্লোর এক্সারসাইজে। সঙ্গে অলরাউন্ড ও দলগত বিভাগে দুটি রুপো। মোট ৯ পদক জিমন্যাস্টিক্স থেকে। কিন্তু পাঁচ সোনার থেকেও নাদিয়ার পরিচিতি বেশি ওই প্রথম ‘পারফেক্ট টেন’-এর কারণে। সাত-সাতবার দশে দশ পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এমন জিমন্যাস্ট আর কখনও দেখেনি অলিম্পিক্সের আসর।

    নাদিয়ার আরও একটি রেকর্ড অধরাই থেকে গেল এবং যাবে আরও বেশ কিছু বছর, হয়ত চিরকাল। রেকর্ড সম্পর্কে সাধারণত এমন কথা বলা যায় না। কিন্তু, নাদিয়ার ক্ষেত্রে বলা যাচ্ছে কারণ, অলিম্পিক সংস্থা নিয়ম করে দিয়েছে, ১৬ বছর না হলে জিমন্যাস্টদের অলিম্পিক্সে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তাই চোদ্দর কিশোরীর সেই তিন সোনার রেকর্ডও থেকেই গিয়েছে। অলিম্পিক্সে সর্বকনিষ্ঠ জিমন্যাস্ট হিসাবে সোনা জয়ের রেকর্ড সরকারিভাবে আমেরিকার দমিনিক হেলেনা মোসিয়ানুর। আটলান্টা অলিম্পিক্সে যিনি সোনা পেয়েছিলেন দলগত বিভগে। মনে রাখার মতো তথ্য, দমিনিক হেলেনাও জন্মসূত্রে রোমানিয়ার এবং প্রথম কোচ হিসাবে পেয়েছিলেন নাদিয়ার কোচ-দম্পতি মার্তা ও বেলা কারোলি-কেই। কিন্তু, নাদিয়া তাঁর চেয়ে এগিয়ে থাকবেন দুটি কারণে। এক, নাদিয়ার তিনটি সোনাই ছিল ব্যক্তিগত বিভাগে। দুই, সোনার সংখ্যা তিন, চোদ্দ বছর বয়সে, প্রথম অলিম্পিক্সে। দমিনিক হেলেনার পরই বয়সসংক্রান্ত নিয়ম বদলেছে। সেই নিয়ম আবার না-বদলালে, নাদিয়ার সবচেয়ে কম বয়সে তিনটি ব্যক্তিগত সোনা জেতার অলিম্পিক্স রেকর্ড ভাঙা যাবে না আর, নিশ্চিত!

    পদকের সংখ্যায় লারিসা লাতিনিনাকে ধরতে পারেননি নাদিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের লারিসার মোট পদক সংখ্যা ১৮, সোনা ৯। কিন্তু মেয়েদের জিমন্যাস্টিক্সে নাদিয়া কোমানেচির নামই এখনও সবার আগে উচ্চারিত হয়। প্রধানত লাবণ্যের কারণে। অন্যান্য জিমন্যাস্টরা ‘ফ্লোর’-এ যতটা সাবলীল, বিম বা বার-এ ততটাই সাবলীল ছিলেন নাদিয়া, ততটাই সহজাত। ব্যালান্স অর্থাৎ ভারসাম্য বিরাট গুণ জিমন্যাস্টের। আরও যে পাঁচটি গুণ জরুরি একজন গ্রেট জিমন্যাস্টের – ফিটনেস, স্কিল (দক্ষতা), এজিলিটি (ক্ষিপ্রতা), ফ্লেকসিবিলিটি (নমনীয়তা) ও স্ট্রেন্থ (শক্তি)। কিন্তু এই সাতটি গুণের মধ্যে লাবণ্য ও নমনীয়তা বোধহয় ছাপিয়ে যায় বাকি গুণগুলিকে। নাদিয়া অনন্যা ছিলেন সেখানেই।

    সমাজতান্ত্রিক দেশে থাকার কারণে যথারীতি সমস্যায় পড়তে হয়েছিল নাদিয়াকে। ১৯৮১ সালে আমেরিকায় একটি জিমন্যাস্টিক্স প্রদর্শনীতে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিল রোমানিয়ার জিমন্যাস্টরা। তাঁর ব্যক্তিগত কোচ বেলা ও মার্তা কারোলি এবং রোমানিয়ার কোরিওগ্রাফার গেজা পোজসার আমেরিকা থেকে ফেরেননি। ফলে নাদিয়ারা ফিরে আসার পর দেশে তাঁদের নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, হাঙ্গেরি ছাড়া আর কোনও দেশে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আত্মজীবনীতে নাদিয়া লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘জীবনে তখন নতুন ধূসর পাতা’! অবশেষে ১৯৮৯ সালে তিনিও দেশ ছেড়েছিলেন। এখন তিনি দ্বৈত নাগরিক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং রোমানিয়ার।

    অলিম্পিক্সের ইতিহাসে সাঁতার যদি পুরুষদের হয় তো জিমন্যাস্টিক্স মহিলাদের। আরও বেশি করে নাদিয়া কোমানেচির!

    2 comments:

    1. দারুণ হয়েছে!

      ReplyDelete
    2. থ্যাঙ্ক ইউ, স্যর... :)

      ReplyDelete