• Breaking News

    ফ্রান্স-জার্মানি মানেই স্মৃতিতে শুমাখারের জঘন্যতম ফাউল…

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [caption id="attachment_630" align="alignleft" width="300"]schu2 বলের অবস্থান আর শুমাখার কীভাবে ঝাঁপাতে চলেছেন বাতিস্তঁর ওপর, বিরাশির সেই অভিশপ্ত সেমিফাইনালে[/caption]

    ফ্রান্স-জার্মানি মানেই স্মৃতির পিছুটান। ফিরে-যাওয়া কৈশোরে। সেই ১৯৮২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। আর চিরকাল স্মৃতিতে বয়ে বেড়ানো একটা দগদগে ঘা। ফুটবলকে অমন কলঙ্কিত আর কলুষিত মনে হয়নি আর কখনও!

    খেলা হয়েছিল সেভিয়ায়, ৮ জুলাই ১৯৮২। শুরুতেই পশ্চিম জার্মানি এগিয়ে গিয়েছিল পিয়ের লিটবারস্কির গোলে, ১৭ মিনিটে। দশ মিনিট পর গোলশোধ। দমিনিক রোশতু-কে বক্সের মধ্যে আটকেছিলেন বার্নড ফরস্টার, অবৈধভাবে। পেনাল্টি, গোল করতে ভুল করেননি মিশেল প্লাতিনি। ১-১।

    ঘটনা দ্বিতীয়ার্ধে। প্লাতিনির পা থেকে বেরিয়েছিল সেই পাস যা বাতিস্তঁর সামনে এনে দিয়েছিল গোলের সুযোগ। মাঝমাঠের ডানদিক থেকে বলটা ফাঁকায় রেখে গিয়েছিলেন প্লাতিনি, আর টেলিপ্যাথিক যোগাযোগে চলে এসেছিলেন বাতিস্তঁ। পশ্চিম জার্মানির গোলে তখন টনি শুমাখার। এগিয়ে এসেছিলেন দৌড়ে। বড় বক্সের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাতিস্ত্ঁর মাথায়। দৌড়ে আসায় ভরবেগ নিয়ে অমন চেহারার গোলরক্ষক বাতিস্তঁর ঘাড়ে সরাসরি আঘাত করলে যা হয়, অচৈতন্য বাতিস্তঁ পড়ে রইলেন বক্সে।

    এরপর যা হওয়া উচিত ছিল – শুমাখারকে লাল কার্ড, ফ্রান্সের আরও একটি পেনাল্টি।

    যা হল, শিউরে উঠতে হয় ভাবলেই এখনও। এত বড় জোচ্চুরি বা ডাকাতি খুব কমই হয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে। শুমাখার ফিরে গিয়ে বলটা বসালেন বক্সের মাথায়। কিছুই তো হয়নি! ফরাসি ফুটবলাররা সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন বাতিস্তঁর সংজ্ঞাহীন দেহ। স্ট্রেচার এল, তা-ও রেফারিকে জোরাজুরি করেছিলেন ফরাসিরা, সেই কারণেই। ডাচ রেফারি চার্লস কোর্ভার, এমনকি ফাউলও দেননি! শুমাখার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত যেন! ভাবখানা এমন, ‘হচ্ছেটা কী, খেলাটা শুরু করা হচ্ছে না কেন, এই নাটক আর কতক্ষণ?’

    সেই বিশ্বকাপে এমনিতেই তার আগে গ্রুপ লিগে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে গটআপ খেলে ১-০ জিতে আলজেরিয়াকে বাড়ি পাঠিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। যেহেতু বিশ্বকাপের প্রথম খেলার আগে পশ্চিম জার্মানি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল আফ্রিকা মহাদেশের আলজেরিয়াকে এবং আলজেরিয়া শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দিয়েছিল জাপ ডারওয়েলের পশ্চিম জার্মানিকে, পড়শি অস্ট্রিয়ার সঙ্গে হিসাব কষে এক গোল দিয়ে দর্শক এবং ফুটবলের সঙ্গে প্রতারণা করে পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া চলে গিয়েছিল নকআউট পর্বে। ন্যক্কারজনক ঘটনা, সন্দেহ নেই। জার্মান ধারাভাষ্যকাররাই ম্যাচে ধারাভাষ্য দিতে অস্বীকার করেছিলেন, কেঁদে ফেলেছিলেন এমন অন্যায় দেখে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেই ম্যাচের নাম ‘Schande von Gijon’ বা ‘খিওনের লজ্জা’।

    তারপর এই সেভিয়ার কেলেঙ্কারি! ডাচ রেফারির কথানুসারে, তিনি নাকি বল দেখছিলেন, কীভাবে শুমাখার লাফিয়ে উঠেছিলেন বাতিস্তঁর ঘাড়ে, দেখতে পাননি। এমনকি তাঁর সহকারীরাও দেখেননি। এক্ষেত্রে সহকারী ছিলেন স্কটিশ রেফারি ভ্যালেন্টাইন।

    [caption id="attachment_631" align="alignleft" width="300"] নয়ার কীভাবে ইগাইনের ঘাড়ে চেপে ঘুসি আর হাঁটু চালিয়েছিলেন, ছবিতেই পরিষ্কার![/caption]

    প্রায় একই ঘটনা ঘটবে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে যখন ম্যানুয়েল নয়ার একইভাবে লাফিয়ে উঠে হাঁটু ও ঘুসি মারবেন গোনজালো ইগাইনের গালে, আঘাত করবেন হাঁটু দিয়ে, একই রকমভাবে ইতালীয় রেফারি নিকোলা রিজোলি ‘দেখতে পাবেন না’ কী ঘটেছিল! মারাকানা স্টেডিয়ামে চাক্ষুষ সেই ফাউল দেখে শিউরে উঠেছিলাম। কিন্তু, ফাউলই দেওয়া হবে না, আবার জেনেছিলাম, লাল কার্ড তো অনেক দূরের কথা!

    রেফারি কোর্ভারকে অনেক বছর পরে ডাকা হয়েছিল ডাচ টিভির একটি অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছিলেন, ‘ভেবেছিলাম গোল হতে চলেছে। তাই বলের দিকেই নজর ছিল। সহকারীকে জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারিনি যখন, আমার তো আর কিছু করার ছিল না! হ্যাঁ, ওই ঘটনার কিছু দিন পর টেলিভিশনেই পেছনের ক্যামেরা থেকে ঘটনাটা দেখানো হয়েছিল। যদি সেই সুযোগ তখন থাকত? শুমাখারকে লাল কার্ড দেখাতাম, নিশ্চিত! কিন্তু, ম্যাচের সময় নিশ্চিত ছিলাম, যা করেছি ঠিক করেছি।’

    বাতিস্তঁ-কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে, সঙ্গে সঙ্গেই। মেরুদন্ডে গুরুতর চোট, পাঁজর ভেঙে গিয়েছে, দুটো দাঁত তো পড়েইছিল সেভিয়ার ওই মাঠেই। যা শুনে শুমাখার পরে বলেছিলেন, ‘ও, এই ব্যাপার? তা ওই দুটো দাঁত বাঁধানোর খরচাটা আমি দিয়ে দেব না হয়!’

    এমন ‘গুণী’-সদস্য দলে না থাকলে কি আর সেই পশ্চিম জার্মানি আফ্রিকার দেশকে বাড়ি পাঠানোর জন্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে গটআপ খেলে!

    No comments