• Breaking News

    ৩৪ বছর পর আর ভুল হয়নি এবার!

    রেফারির সিদ্ধান্ত অযাচিতভাবে পক্ষে যায়নি এবার। বিদায় নিল জার্মানি,


    গ্রিজমানের জোড়া গোলে। ফাইনাল পর্তুগাল-ফ্রান্স!


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    griezmann pen

    ভুলটা সংশোধিত হল না। হয়ও না এভাবে। তবে, ঠিক সিদ্ধান্তটা নেওয়া হল ৩৪ বছর পর!

    ১৯৮২-র ৮ জুলাই টনি শুমাখারকে লাল কার্ড দেখানো উচিত ছিল, পেনাল্টি পাওয়া উচিত ছিল ফ্রান্সের। নেদারল্যান্ডসের রেফারি চার্লস কোর্ভার দেখাননি। দু’বছর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে ছিলেন এই ইতালীয় রেফারি নিকোলা রিজোলিই। তিনিও দেখতে পাননি, কীভাবে জার্মানির গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার ঘাড়ে উঠে পড়েছিলেন গোনজালো ইগাইনের, মুখে ঘুসি, মেরেছিলেন হাঁটু দিয়েও। লাল কার্ড তখনও বেরয়নি রিজোলির পকেট থেকে। দিন চারেক আগে কোয়ার্টার ফাইনালে যখন জেরোম বোয়াতেং প্রায় কীর্তনীয়া হয়ে দু’হাত তুলে পেনাল্টি বক্সে বল আটকেছিলেন, হাঙ্গেরির রেফারি ভিক্টর কসাই পেনাল্টি দিতে দ্বিধা না করলেও বোয়াতেংকে হলুদ কার্ড দেখাননি। এই সেমিফাইনাল খেলারই অধিকার ছিল না বোয়াতেংয়ের!

    ইতালীয় রেফারি এবার ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে যখন সোয়াইনস্টেগারও ওভাবেই দু’হাত ছড়িয়ে পেনাল্টি বক্সে আটকাতে গেলেন এভরা-র হেড। ঠিকঠাক দেখলেন এবার রিজোলি। নিজের দুহাত তুলে দেখিয়ে দিলেন সোয়াইনস্টেগারের ভুল। এবং, পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেওয়ার পাশাপাশি হলুদ কার্ড দেখাতেও ভুললেন না সোয়াইনস্টেগারকে।

    গ্রিজমান এগোলেন পেনাল্টি নিতে। আতলেতিকো মাদ্রিদের ছোটখাটো চেহারার স্ট্রাইকার নয়ারকে ফেললেন উল্টো দিকে, জোরালো আত্মবিশ্বাসী শটে নয়ার দ্বিতীয়বার পরাস্ত এই ইউরোয়, দুবারই পেনাল্টি থেকে। বিরতির বাঁশি রেফারির। কিন্তু, মার্সেই জেগে উঠল, জেগে উঠল ফ্রান্স!

    ম্যাচের শুরুটা ফ্রান্সেরই ছিল যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিয়ে মিনিট দশেক খেললেন ফরাসিরা। নয়ারকে পরীক্ষায় ফেললেন গ্রিজমানই, যদিও সেই ডানপায়ের শটে বাঁপায়ের সহজাত জোর ছিল না। নয়ার বাঁচালেন। তার খানিক পর থেকেই জার্মান আধিপত্য শুরু। উগো ওরিস-কে (Lloris) বাঁচাতে হল এমেরি ক্যানের শট, অনেকটা একইরকম, যেভাবে বাঁচিয়েছিলেন নয়ার। জার্মান শুরু করল বল ধরে খেলা, পজেশনভিত্তিক ফুটবল। স্পেনের কাছে ২০০৮ ফাইনালে বল খুঁজে না-পেয়ে হেরে গিয়ে যে-খেলাটার প্রতি আকর্ষিত হয়ে জার্মান ফুটবলের সাবেক ধরন পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন জোয়াকিম লো, কিন্তু যে-প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর রাগের শেষ থাকে না!

    জার্মানরা আধিপত্য রেখেও গোল করতে পারেনি। খুলে ফেলতে পারেনি দিদিয়ের দেশঁ-র ফরাসি রক্ষণ। সোয়াইনস্টেগার উঠে-নেমে চেষ্টা করলেন জার্মানির হয়ে ইউরো ও বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলে ফেলার দিনে। গোল পাননি তাঁর শট শেষ মুহূর্তে ওরিস আবার বাঁচিয়ে দেওয়ায়। মুলার এই ইউরোতে একেবারেই ছন্দে ছিলেন না। তাই শট নিলেন ফ্রান্স গোল লক্ষ্য করে, তা গেল অনেক দূর দিয়ে বাইরে। আগের ম্যাচেই মুলার, ওজিল, সোয়াইনস্টেগার ত্রয়ী পেনাল্টি মিস করেছিলেন, জার্মান-সমর্থকরাও বোধহয় মনে রাখেননি ইতালিকে প্রথম হারাতে পারার আনন্দে!

    প্রথমার্ধের শেষ দিকেই আরও একবার জার্মান রক্ষণকে পরাস্ত করে পায়ে বল পেয়ে গিয়েছিলেন জিরু। সামনে একেবারে একা নয়ার। কিন্তু জিরুর না আছে সেই গতি, না সেই প্রিসিশন। কোনও রকমে এগিয়ে শট নিতে গেলেন যখন, পেছন থেকে এসে হাওয়েডেস বাড়িয়ে দিয়েছেন পা। অবিকল ইগাইনের সেই মারাকানার মিস্! তারপরই সোয়াইনস্টেগার দিলেন পেনাল্টিটা। ঘুরে গেল ম্যাচ।

    দ্বিতীয়ার্ধে জার্মানি চেষ্টা করেছিল নিজেদের মতো করে। বল ধরে খেলতে গেলে পাসিংয়ে যে কল্পনার ছোঁয়া বার্সেলোনা শুরুতে পেপ গারদিওলার আমলে দেখিয়েছিল এবং যে-গতিতে, অধিকাংশ দলই তা আর ‘নকল’ করতে পারেনি, শুধু বল ধরে রাখা ছাড়া। মেসির মতো কোনও ফুটবলারও ছিল না জার্মানিতে। অবশ্য এটা শুনেও রাগ করেন জোয়াকিম লো! বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সাংবাদিক সম্বমেলনে এসে বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, মারিও গোটজে-কে নাকি তিনি মাঠে নামিয়েছিলেন এই বলে যে, মাঠে গিয়ে প্রমাণ করে এসো তুমি মেসির চেয়ে বড় ফুটবলার এবং গোটজের সেই গোলে নাকি সেটা প্রমাণিতও হয়েছিল! তো, সেই মেসির চেয়ে বড় ফুটবলারকে আবারও নামিয়েছিলেন লো, এবার বোধহয় গ্রিজমান বা পোগবার চেয়ে বড় ফুটবলার বলে, সেই অতিরিক্ত হিসাবেই, ৬৬ মিনিটে। এত ভাল ফুটবলারদের ম্যাচে প্রভাব ফেলতে ওইটুকু সময়ই যথেষ্ট ভেবে। যদিও, গোটজে মাঠে আসার ৬ মিনিটের মধ্যে পোগবা আর গ্রিজমান দেখিয়ে দিলেন, ফুটবলটা এখনও আসলে প্রিমিয়ার লিগের বাইরেই খেলা হয়!

    জুভেন্তাসের পোগবা স্রেফ খেললেন কিমিচকে নিয়ে, জার্মান বক্সে। তারপর ডানদিক দেখিয়ে বাঁদিকে ঘুরলেন যখন, কিমিচ মাটি ধরলেন। আর পোগবার উঁচু করে ফেলা ক্রস ধরতে এগিয়ে এসে নয়ার কোনওরকমে হাতের তালু দিয়ে বলটা ‘অ্যাসিস্ট’ হিসাবে জমা দিলেন আগুয়ান গ্রিজমানের পায়ে। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ছিলেন গ্রিজমান, আবারও (২-০)। ইউরোয় ৬ গোল এই মুহূর্তে। ঠিক যেমন মিশেল প্লাতিনি ৯ গোল করে ১৯৮৪-তে ইউরো এনে দিয়েছিলেন ফ্রান্সকে, গ্রিজমানও এগোচ্ছেন সেই দিকেই।

    জার্মানরা লড়েছিল তারপর। সুযোগ কিছু এসেছিল, গোল হয়নি। বিদায় ইউরোর সেমিফাইনাল থেকে, গতবারের মতোই। সেবার বালোতেলির জোড়া গোল, এবার গ্রিজমান!

    রবিবার পারি শহরে রোনালদো বনাম গ্রিজমান। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বদলা নেওয়ার সুযোগ আতলেতিকো-তারকার সামনে, মাস দেড়েকের মধ্যেই!

    No comments