• Breaking News

    এই ইউরো রোনালদোরই, আর কারও নয়!

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    ront1


    মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছিলেন পেলে। ১৯৬২ বিশ্বকাপে। তা-ও বলা হয়, পেলের সংগ্রহে তিনটি বিশ্বকাপ। সেই মাপকাঠিতে, ২০১৬ ইউরো তো ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর অনেক বেশি করে!


    ফাইনালে ২৪ মিনিট পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতি। দুর্ভাগ্যজনক বিদায়। খেলায় থাকতে পারলেন না, কিন্তু কী করে বলবেন মাঠে ছিলেন না তিনি! পাশেই ছিলেন, বেঞ্চে। দু’বার কেঁদেছিলেন মাঠ থেকে বেরতে হচ্ছে বলে। তৃতীয়বার কাঁদলেন ১১০ মিনিটে। এদের গোলটা দেওয়ার পর। আর, শেষে আরও একবার। এদেরকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, ছাড়তেই চাইছিলেন না, আর কাঁদছিলেন অঝোরে। যে-কাজটা তিনি করতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে, এদের সেই কাজটা সেভাবেই করে দিয়ে গেলেন। গোল থেকে ২৫ গজ দূরে বলটা ধরেছিলেন যখন, কোসচিয়েলনি গায়ে। তাঁকে পেছনে ফেললেন, দূর থেকেই ডানপায়ের মাটিঘেঁষা দুরন্ত শটে পরাস্ত করলেন ওরিসকে! বিশ্বকাপ ফাইনালে যেমন পরিবর্ত মারিও গোটজে ১১৩ মিনিটে জার্মানিকে এনে দিয়েছিলেন ট্রফি, ২০১৪য়, দু’বছর পর ইউরো এনে দিলেন পরিবর্ত এদের, ১১০ মিনিটের গোলে! তুলনা আসবেই বিরাশির ইতালির সঙ্গে। গ্রুপ লিগে তিন ম্যাচে তিন পযেন্ট নিয়ে যারা বিশ্বকাপের নকআউটে পৌঁছে দুর্দান্ত খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু, এই পর্তুগাল নকআউটেও খোলস ছেড়ে বেরয়নি। বরঞ্চ বেশি করে জয়গান গেয়েছিল শৃঙ্খলার, অনেকটাই ২০০৪ গ্রিসের মতো।


    ম্যাচ প্রত্যাশিত। পর্তুগাল ট্যাকটিক্যালি ডিসিপ্লিনড, ফেরনান্দো সানতোসের আমলে যে-ছবি দেখতে অভ্যস্ত গোটা বিশ্ব। টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত এখন সানতোসের পর্তুগাল। ফাইনালে ফ্রান্সের তুলনায় দেখতে-সুন্দর ফুটবল মাথা তুলতে পারত, গ্রিজমানের হেডটা যদি দশ মিনিটে ওভাবে নিজের দক্ষতার শীর্ষে উঠে না-বাঁচাতেন পাত্রিসিও। পেপে বলের দখল হারিয়েছিলেন, পায়েতের উঁচু হয়ে-আসা বলটা গ্রিজমান পা দিয়ে আলতো চিপ নয়, মাথা দিয়ে আলতো চিপ করে রেখে দিয়েছিলেন তিনকাঠিতে। পাত্রিসিও শেষ মুহূর্তে শরীর বাঁকিয়ে বারের ওপর দিয়ে তুলে দেন। তার দু’মিনিট আগে পায়েত-রোনালদো সংঘর্ষে রোনালদোর ম্যাচে টিকে থাকার ওপর প্রশ্নচিহ্ন। সেই সময় গোল খেয়ে গেলে দমে যেতে পারত পর্তুগাল। যদিও এই প্রতিযোগিতায় বারবারই গোল খেয়ে পিছিয়েও গোল শোধ করেছিল, বারবার। কিন্তু, বড় পার্থক্য হতে পারত রোনালদোর অনুপস্থিতি।


    সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি পর্তুগালকে, পাত্রিসিওর দক্ষতায়। রোনালদো না-থাকায় ফরাসি দুই বয়স্ক সাইডব্যাককে যদিও গোটা ম্যাচে অস্বস্তিতে পড়তে হল কম, পর্তুগালকে রক্ষণাত্মক দিক দিয়ে আরও নির্ভরতা জুগিয়েছিল দুজনের ফিরে-আসা। রক্ষণে পেপে তো বটেই, মাঝমাঠে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসাবে উইলিয়াম কার্ভালিও প্রায় নিখুঁত, প্রায়-নির্ভুল! আর গোলে পাত্রিসিও, যাঁকে ম্যাচের সেরা বললে অত্যুক্তি হবে না একেবারেই। গ্রিজমানের সেই হেডের পর মাতুইদি, সিসোকো, জিরুর শট বাঁচিয়ে নিশ্চিত চারবার দলকে পিছিয়ে পড়তে দেননি। একই সঙ্গে যা প্রমাণ দেবে, ফ্রান্সও লড়েছিল সমানতালে। শেষে গিগনাকের শট পোস্টে লেগে ফেরে আর ৬৫ মিনিটে গ্রিজমানের সহজতম সুযোগ নষ্ট। প্রতিযোগিতায় ৬ গোল করে তিনি সোনার বুটের মালিক, ঠিকই। কিন্তু আসল দিনে তাঁর এই মিস বলে দিল, জিদান হয়ে উঠতে এখনও সময় লাগবে গ্রিজমানের!


    কিন্তু, এই ম্যাচটা ইংল্যান্ডের রেফারি ক্ল্যাটেনবার্গের সেই ভুলের নয় যখন এদেরের হাতে বল লেগে গেলে তিনি কোসচিয়েলনিকে হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফ্রি কিক দেন এবং সেই ফ্রি কিক থেকে গেরিরার শট বারে লেগে ফিরে আসে। এই ম্যাচ মাঝমাঠে দু’দলের তরুণ ফুটবলারদের পরস্পরের বিরুদ্ধে কখনও বেশ শারীরিক কখনও শৈল্পিক লড়াইয়েরও নয়।


    ront


    এই ম্যাচ একজনেরই। মাঠে থাকা বা না-থাকা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি? কে বলেছে তিনি ছিলেন না? সাইডলাইনে খোঁড়া হাঁটু নিয়ে তাঁর হাঁটাচলা, সতীর্থদের নির্দেশ দেওয়া, উৎসাহিত করা, প্রয়োজনে দৌড়ন আর সারাক্ষণ চিৎকার, কোচের মতো। এই ট্রফিটা তাঁর মতো করে আর কেউ চাননি। অধিনায়কের এই চাহিদাটুকু সতীর্থদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দেওয়াতেই তাঁর সাফল্য। সেই চাহিদাতেই দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠেন পাত্রিসিও, পেপে অনতিক্রম্য, কার্ভালিও দলের ইঞ্জিন, এদের চিরস্মরণীয় গোলের মালিক।


    পর্তুগালের ইতিহাসে এত দিন ইউসেবিও ছিলেন, লুইস ফিগো ছিলেন। কোনও ট্রফি ছিল না বড় আসরে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এখন সবচেয়ে গর্বিত পর্তুগিজ অধিনায়ক। তাঁর হাতে যে জ্বলজ্বল করছে ২০১৬ ইউরো! যে-ফুটবল নিষ্ঠুর হয়ে তাঁকে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল মাঠের মধ্যে, সেই ফুটবলই পরম করুণায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ম্যাচ-শেষে প্রথমে তাঁর কান্নায়, পরে অমলিন হাসিতে, ট্রফিহাতে!

    No comments