• Breaking News

    ‘এতেরনো’ বাঁধা-বাহু, ব্রাজিলও শাশ্বত, আবার

    নেইমারের ৫০ গোল, ৩০ অ্যাসিস্ট! মেসির কাজ কঠিনতম এখন


    ব্রাজিল ৩  আর্জেন্তিনা ০


    (কুতিনিও ২৫, নেইমার ৪৫, পাওলিনিও ৫৮)


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    [caption id="attachment_2231" align="alignleft" width="289"]৫০তম গোলের পর, নেইমার। ছবি - টুইটার ৫০তম গোলের পর, নেইমার। ছবি - টুইটার[/caption]

    ‘এই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর’ লিখেছিলেন কাজি নজরুল ইসলাম। বেলো ওরিজোন্তে-র মিনেইরাও স্টেডিয়ামেই তো নেইমারহীন ব্রাজিলের সূর্য ডুবেছিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে!

    ‘উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার’। হুঁশিয়ার নতুন ‘কাণ্ডারি’ পেয়ে গিয়েছে ব্রাজিল। আদেনোর লিওনার্দো বাচ্চি নামে তাঁকে কেউই চেনে না। তিনি ‘তিতে’। ৬ ম্যাচ পর ৯ পয়েন্ট নিয়ে দুঙ্গার ব্রাজিল ছিল ষষ্ঠ স্থানে। দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখন। পরের পাঁচ ম্যাচে অর্জিত পয়েন্ট ১৫! ব্রাজিল এখন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে শীর্ষে। শুধু তাই-ই নয়, তিতের ব্রাজিল খেলছে ব্রাজিলের মতো। সত্তরের বিশ্বকাপ-অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তোর প্রয়াণের পর ‘এতেরনো কাপিতাও’ লেখা আর্ম-ব্যান্ড পরে ব্রাজিল হাঁটল সেই ‘শাশ্বত’ সুন্দর ফুটবলের পথেই!

    ‘কাণ্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ? / করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!’ এই পংক্তি আবার লিওনেল মেসির উদ্দেশে। মহাভার নিজেই নিয়েছেন, অবসর ভেঙে ফিরে। এই আর্জেন্তিনা দলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার। তিনটি ম্যাচে খেলেননি তিনি। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ছিটকে যাওয়ার আগে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে দেশকে জিতিয়ে শীর্ষে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। মাঝের তিন ম্যাচে ইগাইন-দিমারিয়া-আগেরোরা দেখিয়েছিলেন নিজেদের দক্ষতা! এক থেকে ছয়ে নেমেছিল আর্জেন্তিনা। আপাতত থাকলও সেখানে, ১১ ম্যাচে ১৬ নিয়ে। সাত ম্যাচ হাতে। হুঁশিয়ার হওয়ার এই তো সময়, আর্জেন্তিনীয় কাণ্ডারির!

    ১-৭ ভুলিয়ে ৭-০ করে ফেলতেই পারত ব্রাজিল। ৫৫ মিনিটে পাওলিনিও কাটিয়ে নিয়েছিলেন আর্জেন্তিনীয় গোলরক্ষক রোমেরোকেও। তারপরও পারেননি ফাঁকা গোলে বল পাঠাতে। এত আস্তে শটটা নিয়েছিলেন যে, পেছন থেকে খাবালেতা এসে ফিরিয়ে দেন বল, গোললাইন থেকে। ৬৮ মিনিটে আবারও খাবালেতা, এবার নেইমারের শট গোলে গেল না। ৭৯ মিনিটে নেইমার একা পেয়ে গেলেন রোমেরোকে। কিন্তু, দ্বিতীয়বার পায়ে-বলে হল যখন, একটু বড়, রোমেরোর বাড়ানো হাতের ছোঁয়া পেয়ে বল বাইরে গেল, রেফারি বুঝতেই পারলেন না, গোলকিক দিলেন! ফিরমিনিও ৮৪ মিনিটে পোস্টে মারলেন, বলে নয়। নেইমারকে আবারও সাজিয়ে দিয়েছিলেন মার্সেলো ৮৮ মিনিটে। বাঁপায়ে শট নিতে গিয়ে ফস্কালেন নেইমার। ওখানে ঠিকঠাক পায়ে-বলে মানে আবারও গোল। এই পাঁচটি নিশ্চিত গোলের সুযোগের চারটি থেকেও গোল মানেই তো ৭-০!

    তিতের ব্রাজিল আর দুঙ্গার ব্রাজিলে পার্থক্য কী? মানসিকতা। দুঙ্গা কখনও আক্রমণাত্মক ফুটবলের মানসিকতাকে সমর্থন করেননি। নিজে যেমন ফুটবলার ছিলেন, খেলাতেও সেই এক অনাকর্ষক পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। খেসুস, ফির্মিনো, কুতিনিওদের নিয়ে সমস্যা ছিল। দু-পাশে দানি আলভেস ও মার্সেলোর আক্রমণে ওঠার প্রবণতা সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, এই আশঙ্কায় দুজনকে একসঙ্গে খেলাতেনই না। মাঝমাঠে অযথা জোর দিতেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ভিড় বাড়ানোয়, খেলাটাকে ইচ্ছে করেই মেরে ফেলতে চাইতেন। কোরিন্থিয়ান্সের সময় থেকেই তিতের খ্যাতি জয়ের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলাতে চাইতেন বলে। দেশের দায়িত্ব নিয়েও তিনি যে সরে আসেননি, উল্টে দুঙ্গার নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছেন ফুটবলারদের, পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয়েই প্রমাণ!

    ১০৩ ম্যাচে ব্রাজিল এখন চিরশত্রুতার ইতিহাসে ৪০-৩৮ এগিয়ে গেল, ৩-০ জেতার পর। তিন গোলের সেরা নিঃসন্দেহে প্রথম গোল, ফিলিপে কুতিনিওর। কিন্তু, যত হইচই বা ইংরেজ ধারাভাষ্যকারদের ‘লিভারপুলের কুতিনিও’ বলে চিল চিৎকার মাইক হাতে, তার কাছাকাছি কিছু জোটেনি জনৈক খুনাপির, মাসখানেক আগেই!

    ভেনেজুয়েলার খুয়ান পাবলো আনিওর আকোস্তা খেলেন মালাগায়। কুতিনিও-র চেয়েও তাঁর গোলটা ভাল ছিল, এই আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে, এই বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের খেলাতেই, দু-ম্যাচ আগে। ডানদিক দিয়ে কাট করে ভেতরে ঢুকেছিলেন, আর্জেন্তিনার এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে। তারপর বাঁপায়ের শট রোমেরোর ডানদিকের জালে। অবিশ্বাস্য গোল প্রায়, ২২ বছরের ফুটবলারের পায়ে। কুতিনিওর গোলটাও দেখতে দুর্দান্ত। নেইমারের পাস ধরে বাঁদিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছিলেন। তারপর ডানপায়ের শটে গোল। রোমেরো কেন, কোনও গোলরক্ষকের পক্ষেই ধরা সম্ভব ছিল না।

    দ্বিতীয় গোল ব্রাজিলের আর-এক কাণ্ডারির! বিরতির ঠিক আগে গাব্রিয়েল খেসুসের পাস থেকে। ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের ৫০তম গোলের বেশি কৃতিত্ব অবশ্যই খেসুসের। আর্জেন্তিনীয় রক্ষণকে পরাস্ত করে বল রেখেছিলেন নেইমারের জন্য। রোমেরোর পক্ষে আটকানো সম্ভব ছিল না নেইমারকে তখন আর। পেলে (৭৭), রোনালদো (৬২), রোমারিও (৫৫) – নেইমারের আগে এখন। পেলেকে ধরতে সময় লাগবে, বাকি দুজনকে পেরিয়ে যাওয়া হয়ত সময়ের অপেক্ষা শুধু। আর গোলের এই হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে, যা জানিয়ে রাখা জরুরি, ৭৪ ম্যাচে ৩০টি ‘অ্যাসিস্ট’-ও রয়েছে নেইমারের!

    মার্সেলোর ক্রস থেকে অগুস্তো বল দিয়েছিলেন পাওলিনিও-কে, তৃতীয় গোলের সময়। আর্জেন্তিনার রক্ষণে ফুটবলাররা কে কোথায় কী করছিলেন তখন, এমন প্রশ্নে অযথা মাথাব্যথা বাড়বে নতুন কোচ এদগার্দো বাউজার। এমন জঘন্য ইগাইন, দিমারিয়াদের নিয়ে তাঁকে খেলতে হবে বাকি সাত ম্যাচ, পৌঁছতে হবে রাশিয়ায়, বিশ্বকাপের মূলপর্বে। কঠিন শুধু নয়, মেসির কাজটা এখন কঠিনতম বলাই ঠিক!

    No comments