• Breaking News

    এল মেসিকো! মেসি ২ রোনালদো ০! – কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    রেয়াল মাদ্রিদ ২ (কাসেমিরো ২৮, রদরিগেজ ৮৬)


    বার্সেলোনা ৩ (মেসি ৩৩, ৯০+২, রাকিতিচ ৭৩)


    লুইস সুয়ারেজ যদি হঠাৎ এক রাতের জন্য গোনজালো ইগাইন না-হয়ে যেতেন!


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    অফসাইড থেকে গোল। মার্সেলোর কনুইতে লিওনেল মেসির মুখ ফেটে যাওয়ার পরও রেফারির মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। কাসেমিরোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানোয় প্রবল অনীহা। সবই চলছিল বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে ম্যাচের মতোই। একই মাঠ, দিন পাঁচেক আগের ছবি, আঁকা হচ্ছিল একই তুলিতে।

    পার্থক্য শুধু, এবার মাঠে ছিলেন মেসি, নিজস্ব ছন্দে।

    মেসি এমন খেললে বিপক্ষ ফালাফালা হয়, রক্তাক্ত হয়। হলও। সের্খিও রামোস পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে মারতে গিয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখলেন। যেমন দেখতেন কোনও এক স্পেশ্যাল কোচের আমলে, নিয়মিত। গার্ডিয়ান লিখল, স্কাই ইতালিয়া-তে রামোসের ট্যাকলটাকে ‘ক্রিমিনাল’ বলেছেন ফাবিও কাপেলো। কিন্তু নিজের মাঠ থেকে বেরনোর সময় রামোসকে বীরোচিত আচরণ তো করতেই হবে! অঙ্গভঙ্গি যেমন করলেন, হাততালি তো দিলেনই, রেফারির উদ্দেশেও যা যা বললেন, কথাগুলো নেইমার যা যা বলেছিলেন সেই তুলনায় কতটা কম বা বেশি, স্পেনীয় ফুটবল সংস্থার কর্তারা নিশ্চয়ই শুনবেন, বুঝবেন। রেফারিও নিশ্চয়ই রিপোর্টে সত্যি কথাগুলোই দেবেন, আশা করা যায়। নেইমার কিন্তু হাততালি আর সহকারী রেফারিকে গালাগাল দিয়ে মাত্রই চার ম্যাচ নির্বাসিত!

    জিনেদিন জিদান সাহসী হতে গিয়েছিলেন। বোধহয়, যেভাবেই হোক, জয় পেতে পেতে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তাতে সওয়ার হয়ে। ডিফেন্সিভ স্ক্রিন ছিল না, রাখেননি। লুকা মোদরিচ আর টোনি ক্রুস, সামলে নেবেন আশায়। দুজন মাঠে ছিলেন কিনা, বোঝা গেল না! সের্খিও বুসকেতস ট্যাকলে ফিরে পেলেন বছর তিন-চার আগের ফর্ম। লুইস সুয়ারেজ যদি হঠাৎ এক রাতের জন্য গোনজালো ইগাইন না-হয়ে যেতেন, ফিরতেই পারত ৬-২ রাত!

    চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে নিস্তেজ বিদায়। লা লিগা থেকেও ছিটকে যাওয়ার মুখে। একটাই পথ খোলা ছিল। রেয়াল মাদ্রিদকে বড় ধাক্কা দেওয়া, তাদের ঘরের মাঠে। সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে সেই কাজের দায়িত্বে মেসি। এগিয়ে-পিছিয়ে, বল নিয়ে আঁকাবাঁকা দৌড়ে বিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে, অনেকটা সময় বল পায়ে রেখে – ঠিক সেই মেসি যাঁকে বিপক্ষ ভয় পায়। যিনি পায়ে বল নিলে আতঙ্ক তৈরি হয় বিপক্ষ রক্ষণে। বাধ্য হয়ে আটকাতে গিয়ে লাথি-কনুই চালাতে হয়, পায়ের ওপর পা দিয়ে দাঁড়াতে হয়। তবু, পারা যায় না। পিএসজি-র বিরুদ্ধে ছ’গোলের ম্যাচেও দুরন্ত খেলেছিলেন। কিন্তু, এল ক্লাসিকোয় এবারের পারফরম্যান্স আরও ক্ষুরধার। আবার ‘এল মেসিকো’!

    পাঁচ গোল


    প্রথম গোলের সময় ডানদিকে কর্নার পেয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদ। ক্রুসের কর্নার হেডে পাঠানো হল মার্সেলোর পায়ে। মার্সেলো বল তুললেন যখন বার্সেলোনা বক্সে, রামোস তখন পরিষ্কার অফসাইডে। কিন্তু, সহকারী রেফারি পতাকা তোলেননি। ফলে, রামোসের ভলি পোস্টে লেগে ফিরে গেল মাঝখানে যেখানে ছিলেন কাসেমিরো। একেবারে অরক্ষিত কাসেমিরোর পক্ষে গোল করতে কোনও অসুবিধাই হয়নি।

    বার্সেলোনা গোল শোধ করে পাঁচ মিনিটে। বুসকেতস বলটা দিয়েছিলেন রাকিতিচকে। ক্রোয়েশীয় ফুটবলার বাড়িয়ে দেন মেসির দিকে। বল-পায়ে হঠাৎ গতি বাড়ালেন মেসি। কার্ভাখালকে পেরিয়ে গেলেন সহজেই। বাঁপায়ের শট আটকানোর ক্ষমতা ছিল না নাভাসের।

    রাকিতিচের গোলটা মেসিকেও গর্বিত করত! প্রতিটি পদক্ষেপে লেখা ছিল মেসির নাম। বক্সের বাইরে ডানদিকে, ডানপায়ে বলটা রিসিভ করে ছোট টোকায় ভেতরে আনলেন। সামনে রেয়ালের ডিফেন্ডাররা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। বাঁপায়ের সোয়ার্ভিং শট দ্বিতীয় পোস্ট লক্ষ্য করে, নিখুঁত। ট্রেডমার্ক, আগমার্কা মেসি-গোল। হয়ত সেই কারণেই মেসিও লাফিয়ে উঠে পড়েছিলেন কোলে!

    ৮২ মিনিটে মাঠে এসে ৮৫ মিনিটে রেয়ালের লা লিগা জয়ের স্বপ্ন প্রায় নিশ্চিত করে দিয়ে গিয়েছিলেন হামেস রদরিগেজ। ৭৭ মিনিট থেকে দশজনে রেয়াল। জিদান, পিছিয়ে থাকায়, ঝুঁকি নিলেন আরও। বেনজেমাকে তুলে নামালেন রদরিগেজকে, রক্ষণে একজন কমে যাওয়া সত্ত্বেও। ঝুঁকির পুরস্কারও পেলেন। আবারও মার্সেলোর ক্রস, এবার রদরিগেজের উদয় সবার মাঝখান থেকে, একেবারে ফাঁকায়। বাঁপায়ের শটে গোল, ২-২।

    ড্র এবং খেতাবি দৌড় থেকে ছিটকে যাওয়া। মানতে চাইলেন না মেসি। এবার ৯২ মিনিটে জয়ের গোল। সের্খি রোবের্তো বল নিয়ে অনেকটা উঠে এলেন, মাঝখান দিয়েই। দুর্দান্ত দৌড়। ঠিক সময়ে পাস দিলেন বাঁদিক থেকে উঠে আসা আলবার পায়ে। আলবা বলটা ফেরত দিলেন মাঝখানে। সুয়ারেজ, গোটা ম্যাচে যিনি অসংখ্য ভুল পাসের নায়ক, বোধহয় টেলিপ্যাথিতে বুঝলেন, পেছনে ধেয়ে আসছেন এই ম্যাচের নায়ক। ছেড়ে দিলেন। ঝলসে উঠল মেসির বাঁ-পা, আবার। নাভাস পরাস্ত, রেফারি গোল আর খেলা শেষের বাঁশি বাজানোর আগে মেসিকে একবার হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফেললেন জার্সি খোলার কারণে।

    এল মেসিকো


    ৩৪ ম্যাচে জিতলেন ১৬বার। মোট গোল ২৩। সর্বোচ্চ তো বটেই! ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো রেয়ালে আসার পর ২৭তম ম্যাচে ১৩তম জয়। নিজের গোল ১৭। রোনালদোর ১৬ গোল, কিন্তু, জয় মাত্র ৭ ম্যাচে।

    পরিস্থিতি


    দুই দলেরই পয়েন্ট সমান – ৭৫। কিন্তু, বার্সেলোনা খেলেছে ৩৩ ম্যাচ, রেয়াল ৩২। এগিয়ে থাকল তাই রেয়ালই। বাকি ৬ ম্যাচ রেয়াল জিতলে, পাঁচ বছর পর খেতাব তাদের। কিন্তু, কোনও ম্যাচে পা পিছলে গেলে ঘাড়ের ওপর গরম নিঃশ্বাস বার্সেলোনার।

    স্পেনের লিগেও পয়েন্ট সমান হলে পরস্পরের মুখোমুখি খেলার ফল দেখা হয়। আর সেখানে কিন্তু এগিয়ে থাকল বার্সেলোনা!

    পুনশ্চ


    ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো মাঠে ছিলেন। বারদুয়েক তাঁর শট আটকাতে হল টের স্টেগেনকে। বার দুই অবিশ্বাস্য মিস! বিশেষ করে ফাঁকা গোলে বল পাঠাতে গিয়ে ডানপায়ে বারের ওপর দিয়ে ওড়ানোর মুহূর্ত সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ের সমর্থকরা সহজে ভুলবেন না। আর হ্যাঁ, রেফারির সিদ্ধান্ত যে বিপক্ষেও যায় রেয়ালের, ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল। উমতিতির বাড়ানো পা লেগেছিল রোনালদোর পায়ে। বলে নয় এবং বক্সের মধ্যেই। রেফারি কিন্তু পেনাল্টি দেননি!

    একই সঙ্গে, সাম্প্রতিক অতীত অবশ্য এত ভাল ম্যাচও দেখেনি, ক্লাব ফুটবলে।

    No comments