• Breaking News

    ১০০য় পৌঁছনো ভারতীয় ফুটবলের ‘এক’টাই সমস্যা, ‘দুই’ লিগ! - কাশীনাথ ভট্টাচার্য



    • আই লিগই দেশের সরকারি লিগ।




    • আইএসএল দেশের আরও একটা ফুটবল প্রতিযোগিতা।




    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    দুই লিগ আপাতত মিলছে না। দেশের সেরা প্রতিযোগিতা হিসাবেই থেকে যাচ্ছে আই লিগ। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আইএসএল স্রেফ আরও একটা ‘টুর্নামেন্ট’!

    পরিষ্কার করে বলে দিলেন সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার সভাপতি প্রফুল প্যাটেল। মুম্বইতে শনিবার মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের কর্তাদের সঙ্গে সভায়। যা বসেছিল সভাপতির বাড়িতে। উপস্থিত ছিলেন দুই ক্লাবের কর্তাদের সঙ্গে এআইএফএফ-এর সচিব কুশল দাস, সিইও সুনন্দ ধর এবং সহসভাপতি সুব্রত দত্ত। আর ভাগ্যিস প্রফুল প্যাটেল বললেন! না বললে কে জানত এই কথাগুলো!

    সভার আলোচ্য বিষয় ছিল, দুই লিগের মেলবন্ধন। কিন্তু, কলকাতার দুই ক্লাব আইএমজি রিলায়েন্সের দেওয়া শর্ত মানতে নারাজ। সেই প্রথম দিন থেকেই বলে এসেছে, এখনও সেই দাবিতেই অনড়। তাঁরা ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসাবে খেলবে না, ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসাবে প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য ১৫ কোটি টাকা দেবে না এবং কলকাতার বাইরেও খেলবে না। আইএমজি রিলায়েন্সও তাদের দাবিতে অটল থাকছে যেহেতু, এই দুই লিগ মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই।

    প্রফুল প্যাটেল সেই কথাটাই খোলসা করে বলে দিয়েছেন। সঙ্গে জুড়েছেন, যেহেতু ভারতের ফুটবল এখন দুর্দান্ত গতিতে এগোচ্ছে(!), তিনি এই দুই লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলবেন এশীয় স্তরে এএফসি কর্তাদের সঙ্গে। ১১ মে তিনি বাহরিনের মানামায় যাচ্ছেন ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে। সেখানেই আলোচনা করবেন এএফসি কর্তাদের সঙ্গে, জেনে নেবেন তাদের মতামত।

    সমস্যা হল, আই লিগই যে দেশের সরকারি লিগ, এ নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি-দুনিয়া এবং রিলায়েন্স-পন্থী কর্তারা ছাড়া, আর কারও কোনও সংশয় ছিল কি?

    আই লিগে চ্যাম্পিয়ন দল পায় এএফসি কাপে খেলার সুযোগ। ফেডারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন ক্লাব পায় এএফসি-তে দ্বিতীয় ভারতীয় ক্লাব হিসাবে খেলার সুযোগ। আইএসএল জিতে কী পাওয়া যায়? ট্রফিটা রাখার জন্য একটা ক্লাবঘরই পাওয়া যায় না যেখানে, বাড়তি আর কী-ই বা পাওয়া যাবে!

    কিন্তু, ভারতে কিছু কর্তার মুখে শুনতে পাবেন, ‘দেশের সেরা লিগের সঙ্গে’ আই লিগের মিশে যাওয়া প্রসঙ্গে কথা। এমনকি, আই লিগে খেলা কোচরাও ব্যবহার করছেন এখন সেই একই শব্দবন্ধ। ‘দেশের সেরা লিগ’ কবে থেকে আইএসএল হল? কোন সরকারি যুক্তিতে? টাকাপয়সা, আলো ঝলমলে ব্যাপার আছে বলেই একটা হঠাৎ-গজানো লিগ দেশের ‘সরকারি’ লিগ হয়ে উঠতে পারে কি?

    দেশে দুটো লিগ একসঙ্গে চলতে পারে না, এ নিয়েও সন্দেহ নেই। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো তো তিন-চারমাসের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠিত ফুটবল ক্লাবগুলো থেকে ফুটবলার নিয়ে খেলায়। সেই ফুটবলাররা তাঁদের প্রতিঠিত ক্লাবে ফিরে এসে আই লিগ খেলেন। দুটো লিগ যদি সাত মাস করে চালাতে হয়, কে কোন লিগে খেলবেন তখন? ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ফুটবলার পাবে কোত্থেকে? আই লিগে খেলা ক্লাবগুলো থেকে ফুটবলার নেওয়া যাবে না বলে দিল তো ফ্র্যাঞ্চাইজিই তুলে দেওয়ার জোগাড়!

    তাই এআইএফএফ-এর এই ধীরে চলো নীতি। কাউকে না চটানোর চেষ্টা। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল সন্তুষ্ট থাকলে শুনে যে, আই লিগই সরকারি লিগ, দেশের। আবার, রিলায়েন্সের টাকা বন্ধ হচ্ছে না, আইএসএল চলবে বলে। দুতরফকেই সন্তুষ্ট রেখে এআইএফএফ নিজেদের জায়গাটা সুরক্ষিত রাখছে, সমাধানের পথ খুঁজতে বেরলে কোনও এক পক্ষকে চটাতেই হবে এবং সমস্যা বাড়বে, বুঝে!

    প্রফুল প্যাটেল শুক্রবারই বলেছিলেন, আইজলের দাবির কাছে মাথা নোয়ানো হবে না। এআইএফএফ কারও দাবি মেনে সিদ্ধান্ত নেয় না। আরও একটি হাস্যকর দাবি, কারণ, আইজলের জায়গায় রিলায়েন্স দাবি করলে এআইএফএফ সেই দাবি শুনে আইএসএল-এর মতো প্রতিযোগিতা করার ছাড়পত্র দিতে তো বসেই ছিল! কিন্তু, দেশের সেরা ক্লাব হয়েছে বলেই আইজলের দাবিতে কর্ণপাত করতে হবে, এআইএফএফ সেভাবে ভাবতে যাবে কেন! আইএমজি-রিলায়েন্স চটে যেতে পারে তো! তাই সেই বার্তাটাও দেওয়া জরুরি ছিল।

    আসলে আইজল চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার সমস্যা বেড়ে গিয়েছে। আট ফ্র্যাঞ্চাইজি আর মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-বেঙ্গালুরুকে নিয়ে ১১ দলের আইএসএল ভেবে এগোনোর রাস্তা খুঁজছিলেন তাঁরা। আইজলকে নিতে হলে ১২ দল তো হবেই, তার চেয়েও বড়, নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র সঙ্গে সরাসরি স্বার্থের সংঘাত এড়ানো যাবে না।

    তাই, আপাতত সরিয়ে রাখা সব। অনূর্ধ্ব ১৭ ফিফা বিশ্বকাপ আছে। ভারতকে ফিফা এখন ১০০য় তুলে এনেছে, কারণ ভারতের বাজারটা এতটাই বড় যে, ফিফা নিজেদের প্রসারে এই বাজারটাকে কাজে লাগানো জরুরি, ভাবতে শুরু করেছে এতদিনে। তাই ফিফা সভাপতিও এখন আইজল এফসি-কে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠাচ্ছেন!

    প্রফুল প্যাটেলও তাই যা করা সমীচীন, করলেন শনিবার। নিজের বাড়িতে ক্লাবকর্তাদের ডেকে জানিয়ে দিলেন, ‘রোডম্যাপ’ এখনও তৈরি নয়। মানে, ভারতীয় ফুটবল কোন পথে এগোবে, জানেন না তিনি। অথচ, ভারতীয় ফুটবল দুর্বার গতিতে এগোচ্ছে, এব্যাপারে তিনি নিঃসন্দেহ!

    অতএব, যা চলছে চলুক। তিন মাসের আইএসএল থাকুক রমরমিয়ে, আলো জ্বালিয়ে, টাকা ছড়িয়ে। পাঁচমাসের আই লিগও চলুক, দর্শকহীন, পরিকল্পনাহীন, টেলিকাস্টহীন।

    আর, থাকুক এএফসি কাপে খেলার খু্ড়োর কল, সান্ত্বনা পুরস্কার হিসাবে। যে প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পেলে কলকাতার ক্লাবগুলো ভাবতে শুরু করে ‘এই রে, আরও খেলা’। তাই ইচ্ছে করেই প্রায়, তাড়াতাড়ি কোনও রকমে বিদায়ের রাস্তাটা পরিষ্কার করে। আবার প্রয়োজনে বুক ফুলিয়ে বলতেও ছাড়ে না, ‘আমরা এএফসি খেলি’!

    ১০০য় পৌঁছনো ভারতীয় ফুটবলের আপাতত ‘এক’-টাই সমস্যা, ‘দুই’ লিগ!

    No comments