• Breaking News

    ‘দুওদেসিমা’, রেয়ালের এক ডজন! জোড়া গোলে নায়ক রোনালদো / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    রেয়াল মাদ্রিদ ৪ জুভেন্তাস ১


    (রোনালদো ২০, ৬৪, কাসেমিরো ৬১, আসেনসিও ৯১)  (মান্দজুকিচ ২৭)


    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    প্রথা ভাঙতে প্রয়োজন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো সৃষ্টিছাড়া প্রতিভা, প্রমাণিত আরও একবার!

    ১৯৯০-এর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনও ক্লাব জেতেনি টানা দুবার। জিতল রেয়াল মাদ্রিদ ২৭ বছর পর। আর সেই প্রথা ভাঙার গান গাইলেন যিনি, গতবার সান সিরোয় শেষ পেনাল্টিতে গোল করেছিলেন টাইব্রেকারে। এবার জিয়ানলুইগি বুফোঁ গোটা প্রতিযোগিতায় ফাইনালের আগে মাত্র তিন গোল খেয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেই কার্ডিফে ফাইনালে জোড়া গোল রোনালদোর!

    চ্যাম্পিয়নস লিগে লিওনেল মেসির সঙ্গে পাঁচবার সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের যুগ্ম মালিক ছিলেন। ফাইনালের আগে মেসি এগিয়ে এবারের হিসাবে ১১-১০। ফাইনালের শেষে রোনালদোর দিকে হিসাব, ১২-১১। এবং, ষষ্ঠবার ইউরোপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে সেই রেকর্ডও ৬-৫ করে ফেললেন মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামে!

    বহু ফাইনাল জিতলেও রোনালদো ফাইনালের নায়ক হননি আগে।

    ২০০৮ - লুঝনিকিতে চেলসির বিরুদ্ধে হেডে গোল করলেও টাইব্রেকারে তৃতীয় শট মিস করে সুযোগ এনে দিয়েছিলেন চেলসির কাছে, ট্রফি জেতার। জন টেরি ঠিক সময় পিছলে না গেলে ট্রফি পেত না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

    ২০০৯ – বার্সেলোনার কাছে ০-২ হার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। পরপর দুবার খেতাব জেতার স্বপ্ন চুরমার রোমে, জাভি ও মেসির কাছে।

    ২০১৪ – আতলেতিকো মাদ্রিদের বিরুদ্ধে ৯৩ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছিলেন সের্খিও রামোস। রোনালদোর গোল ১২০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে, দলের চতুর্থ। নায়কোচিত পারফরম্যান্স নয় একেবারেই।

    ২০১৬ – আতলেতিকো মদ্রিদের বিরুদ্ধে এবার এগিয়ে দিয়েছিলেন সেই রামোস। যে-গোল পরে শোধ করেছিল আতলেতিকো। কিন্তু আর গোল হয়নি। টাইব্রেকারে শেষ শটে গোল রোনালদোর।

    ২০১৬ – ইউরো ফাইনাল। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ২৫ মিনিটে উঠে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন রোনালদো। তারও অনেক আগেই দিমিত্রি পায়েতের ট্যাকলে চোট পেয়ে কার্যত মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। পর্তুগাল শেষ পর্যন্ত জেতে এদের-এর গোলে। কিন্তু এই ট্রফি জেতার সময় রোনালদোর মাঠে না-থাকা দুর্ভাগ্যজনক।

    ২০১৭-র কার্ডিফে মিলেনিয়াম স্টেডিয়াম অবশেষে ফাইনালেও তাঁকে পেল নায়কের মতোই। দুটো গোলে রেয়ালের দুওদেসিমা বা দ্বাদশ ইউরোপীয় ট্রফি নিশ্চিত করে যান তিনিই। পঞ্চম ফাইনাল খেলে চতুর্থ জয়। ফাইনালে মোট গোল চার। ফেরেঙ্ক পুসকাসের সাত গোল আছে শুধু ফাইনালে, কিন্তু দুটিতে। আর, আলফ্রেদো দিস্তেফানোর আছে পাঁচ ফাইনালে পাঁচ গোল। আরও একটি ফাইনাল, আরও একটি গোল – দিস্তেফানোকে ধরে ফেলতেই পারেন রোনালদো!

    প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদই। এগিয়ে দিয়েছিলেন সেই ক্রিস্তিয়ানোই। ২০ মিনিটে, ম্যাচের গতির বিরুদ্ধে। দানি কার্ভাহালের সঙ্গে ওয়ান-টু, বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ডান পায়ে জোরালো শট নিয়েছিলেন রোনালদো। বক্সের মধ্যে বোনুচ্চির পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গিগি বুফোঁকে পরাস্ত করে জালে। ইউরোপে রোনালদোর ১০৪ গোল!

    কিন্তু, মারিও মান্দজুকিচের গোলটা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের সর্বকালের সেরা গোলগুলোর একটি হয়েই যা থেকে যাবে ইতিহাসে। গোনজালো ইগাইনের পাস বুকে রিসিভ করেন ক্রোয়েশীয় মান্দজুকিচ, রেয়ালের বক্সে ঢুকে, রেয়ালের গোলের দিকে পেছন ফিরে। ওই অবস্থা থেকেই মনের চোখ দিয়ে দেখে নিয়েছিলেন রেয়ালের তিনকাঠির তলায় নেই কেলর নাভাস। ওভারহেড কিক, ঠিক সেইখানে যেখানে নাভাস নিজের শরীর ছুড়ে দিয়েও বলের নাগাল পাননি। দুর্ভাগ্য তাঁর, অবিস্মরণীয় গোল করেও থাকতে হল পরাজিত দলেই।

    রেয়ালের দ্বিতীয় গোলও ডিফ্লেকশন থেকেই। যেন নিশ্চিত করেই মাঠে নেমেছিলেন রেয়ালের ফুটবলাররা যে, বুফোঁকে সরাসরি শটে পরাস্ত করতে পারা যাবে না যখন, একমাত্র রাস্তা কারও পায়ে লাগিয়ে বলের দিক পরিবর্তন করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা! কাসেমিরোর শটটা প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে। কিন্তু স্যামি খেদিরার পায়ে লেগে এতটাই পাল্টে যায় বলের দিক যে, বুফোঁ যখন সেটা বুঝে ঝাঁপালেন, দেরি হয়ে গিয়েছিল।

    দলের তৃতীয় গোলের ক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোনও ব্যাপারই ছিল না। দ্বিতীয় গোলটা খেয়ে জুভেন্তাস রক্ষণে একটু হলেও হতাশ। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মান্দজুকিচের ছোট ভুলের সুযোগ নিয়ে তাঁরই স্বদেশীয় মোদরিচ বল ধরে চলে গিয়েছিলেন বাইলাইনে। বলটে পেছনে রাখলেন যখন, কোত্থেকে এসেছিলেন রোনালদো, কেউ বুঝতেও পারেননি। নিশ্চিন্তে ফাঁকায় বুফোঁর প্রায় হাতের ওপর থেকে বলে পা লাগিয়ে চলে যান!

    শেষ গোল ইনজুরি টাইমে, পরিবর্ত আসেনসিওর। মার্সেলো চলে গিয়েছিলেন বাইলাইনে। পেছনে বল বাড়িয়ে দেন। ৮৩ মিনিটে ইস্কোর পরিবর্তে মাঠে-আসা আসেনসিওর বাঁ পায়ে্র শট জালে। গ্যালারি অবশ্য তৃতীয় গোলের পর থেকেই উৎসবে মেতেছিল। কুয়াদ্রাদোর দ্বিতীয় হলুদ এবং লাল কার্ড, রামোসের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে কিনা, বিতর্ক নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই কারও। ম্যাচ তো তখন ৩-১ ছিলই!

    জিনেদিন জিদান ২০০২ সালে জিতিয়েছিলেন রেয়ালকে, চ্যাম্পিয়নস লিগ, নিজে ফাইনালে গোল করে। দায়িত্বে এসেই পরপর দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেন। ফুটবলার হিসাবে তো বটেই, ক্লাব কোচ হিসাবেও বাকি থাকল না কোনও বড় খেতাবই। এবার আগেই লা লিগা জিতে নেওয়ায় দ্বিমুকুটও হল।

    শেষ চার বছরে ইউরোপে তিনবার চ্যাম্পিয়ন! ‘দুওদেসিমা’ জিতবেন ভেবেই তো ‘১২’ লেখা জার্সিগুলো আগে থেকেই তৈরি করে এনেছিলেন রোনালদোরা।

    আর, প্রতিযোগিতায় আগের ১২ ম্যাচে যত গোল খেয়েছিলেন, এক ম্যাচে তার চেয়ে বেশি গোল খেয়ে ইউরোপীয় হতাশা নিয়েই থেমে যেতে হল হয়ত, এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক, ‘ওল্ড লেডি’-র ‘ওল্ড ম্যান’, উনচল্লিশের  জিয়ানলুইগি বুফোঁকে!

    No comments