• Breaking News

    সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আলির প্রয়াণের আজ এক বছর

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    [caption id="attachment_3826" align="alignleft" width="1455"] সানতোসের পেলে-মুসেউ (মিউজিয়াম), দেওয়াল জুড়ে দুই কালো মানুষের ছবিতে গোটা ঘরটাই যেন আলোকিত। ১১ জুন, ২০১৪, লেখকের তোলা ছবি, পেলে-জাদুঘরে[/caption]

    সেই সাইকেল-চোর কে ছিলেন? নামটা জানা নেই কারও। খেলার ইতিহাসে মহম্মদ আলি সর্বকালের অন্যতম সেরা হয়ে ওঠার পরও সে কখনও জনসমক্ষে এসে দাবি করেনি, ‘আমার জন্যই তোমার এই অবিস্মরণীয় উত্থান হে আলি, আমাকে কৃতজ্ঞতা জানাও!’

    অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সেই সাইকেল-চোর না-থাকলে ক্যাসিয়াস ক্লে হয়ত কখনও হয়ে উঠতে পারতেন না মহম্মদ আলি!

    ক্যাসিয়াসের তখন বয়স বারো। ক্যাসিয়াস ক্লে সিনিয়র আর ওডেসার বড় ছেলে লুইসভিলে সাইকেল নিয়েই ঘুরে বেড়াত। ১২ অক্টোবর, ১৯৫৪, সাইকেলটা রেখে ঘুরে এসে আর দেখতে পায়নি। পাশের লোকজনের পরামর্শে স্থানীয় পুলিস শ্বেতাঙ্গ জো মার্টিনের কাছে গিয়েছিল ক্যাসিয়াস, সাইকেল-চুরির কথা জানাতে। শহরের কলম্বিয়া অডিটোরিয়ামে মার্টিনের বক্সিং ক্লাব ছিল। কথার ফাঁকে ক্যাসিয়াসের কৌতূহলী চোখ দেখে হাতে একটা অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম ধরিয়ে দিয়েছিলেন মার্টিন। বক্সিং শিখতে শুরু করে ক্যাসিয়াস। কৃষ্ণাঙ্গ ট্রেনার ফ্রেড স্টোনারের কাছে। তারপর তো, কথায় যেমন বলে, ইতিহাস!

    পরের ছ’বছরে ১০৭ জুনিয়র লড়াই, দুবার গোল্ডেন গ্লাভস ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামেচার অ্যাথলেটিক ইউনিয়নের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন খেতাব জিতে সরাসরি ১৯৬০ রোম অলিম্পিকের দলে। সোনা জয় তিনবারের ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন জিগনিউ পিয়েটারজাইকোস্কি-কে হারিয়ে। অলিম্পিকের আসর এমন আর দেখেনি কখনও। এক বক্সার যাঁর হাত-পায়ে কবিতার ছন্দ। বিদ্যুৎ খেলছে ঘুষিতে। বিপক্ষের কোনও ঘুষি ছুঁতেই পারছে না তাঁকে। আমেরিকা যেন এমন কারও জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় জেগে উঠবে বলে বসেছিল!

    পরের বছরই পেশাদার। আর পেছন ফিরে তাকানোর ব্যাপার ছিল না। লুইসভিলের সেই কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটা কখনও ভোলেনি তাঁর অতীত। শ্বেতাঙ্গ সমবয়সী ছেলেদের ‘এই নিগারটা, সরে দাঁড়া তো’ ডাকের অপমানের জবাব দিত রিংয়ে। পরে হেভিওয়েট বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঘোষণা করেন, ধর্ম বদলে মুসলমান হয়েছেন। আমেরিকার দলিত মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে। নিজের ক্যাসিয়াস ক্লে নামটা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওটা আমার নাম নয়। একটা ক্রীতদাসের নাম যা আমি বয়ে বেড়াচ্ছিলাম। যখন সুযোগ পেলাম নিজের নাম বেছে নেওয়ার, আমি বেছে নিলাম মহম্মদ আলি নামটাকে। এই নাম ঈশ্বরের আদরের, ভালবাসার। চাই, মানুষ আমাকে এই নামেই ডাকুন, মহম্মদ আলি।’

    সাদা চামড়ার মানুষ চিরকালই নিজেদের প্রভু ভেবে এসেছে, কালো চামড়ার মানুষকে তাদের কেনা দাস। দক্ষিণ আফ্রিকা খেলার জগত থেকে বহিষ্কৃত হয়েও বর্ণবৈষম্যের সপক্ষে থেকেছে, খোলামেলা। অন্য শ্বেতাঙ্গ দেশগুলোতেও একই অসভ্যতা চলত। একটু রেখেঢেকে, এই যা! এখনও ইউরোপ নিজেদের সেরা ভাবে, কালো চামড়ার মানুষদের দেখে নাক সিঁটকোয়।

    ফুটবল-মাঠে সাদাদের এই প্রভুত্বকে ততদিনে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া শুধু নয়, দাপটে শাসন করতে শুরু করেছিলেন ব্রাজিলের পেলে। ১৯৫৮ ও ১৯৬২-র বিশ্বকাপ জয় তাঁকে এনে দিয়েছিল নাম ‘ব্ল্যাক পার্ল’। নামটা দেখুন, মানিক বললেও সেই ‘কালো’! বিশ্বের সাধারণ মানুষের তাতে কিছু যায় আসে না। পেলের ড্রিবলে বেকেনবাওয়ারকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে তাঁদের যত আনন্দ, মহম্মদ আলির ঘুষিতে বিপক্ষ রিংয়ে আছড়ে পড়লে ততোধিক খুশি। যত মার খেয়ে এসেছেন তাঁরা, সব যেন রিংয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন সেই কালো মানুষ। দিচ্ছেন সব বঞ্চনা, অপমানের জবাব, তাঁর দৃঢ়বদ্ধ মুষ্টিতে। আলি ক্রমেই হয়ে উঠেছিলেন নয়নমণি, বিশ্বের।

    রিংয়ে তিনবার হেভিওয়েট বক্সিংয়ের বিশ্বখেতাব জেতা তাঁকে সাহায্য করেছে ‘গ্রেটেস্ট’ বক্সার হয়ে উঠতে। কিন্তু বিশ্বের সমস্ত প্রান্তের মানুষের কাছে আদরের আলি হয়ে উঠেছিলেন সামাজিক আন্দোলনে সমিল হয়ে। রোমে জেতা সোনার পদক নিয়ে গল্প প্রচলিত আছে যে, কেউ একজন তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর চামড়ার রঙটা উল্লেখ করেননি আলি। শুধু, নিজের দক্ষতা দিয়ে, শক্তি দিয়ে, বাঁচিয়ে আনতে পেরেছিলেন সেই পদক।

    পরে নাকি বিসর্জন দেন পদকটা ওহিও নদীর জলে। আর বলেন যে, ‘এর আর কোনও প্রয়োজন নেই আমার কাছে, এই ঘটনার পর।’ কারা কীভাবে এই গল্প রটিয়েছিল, অজানা। আসল সত্যি অবশ্য অন্য, পদকটা হারিয়ে ফেলেছিলেন আলি! কিন্তু গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে আলির জনপ্রিয়তার এমনই বহর ছিল যে, বিন্দুমাত্রও অবিশ্বাস করেননি কেউ!

    ৭৪ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ প্রায় বছর তিরিশেক আক্রান্ত ছিলেন পার্কিনসন্স রোগে। কিন্তু জনপ্রিয়তায় ঘাটতি পড়েনি এতটুকু। আটলান্টা অলিম্পিকে কাঁপা কাঁপা হাতে তাঁর অলিম্পিক মশাল জ্বালানোর ছবি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছিল নতুন করে, ঠিক কতটা ভালবাসেন মানুষ তাঁকে, তাঁদের প্রিয় আলিকে। সেই আমেরিকা যা তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়ের চার-চারটি বছর কেড়ে নিয়েছিল বক্সিং রিং থেকে, ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে আলি অস্বীকার করেছিলেন বলে।

    ৪ জুন ২০১৬ তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসার পর শ্রদ্ধার ঢল নেমেছিল সেই আমেরিকাতেই। গোটা বিশ্ব শোকাহত। এমন কেউ বাকি ছিলেন না যিনি শ্রদ্ধা জানাননি।

    তাঁর মৃত্যুর প্রথম বর্ষপূর্তিতে মনে পড়ছে আলিরই কথা, ‘আমি বক্সিংকে মিস করব না। বক্সিংই আমাকে মিস করবে!’

    No comments