• Breaking News

    ‘তুর্ তুর্ তুর্!’

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    ‘তুর্ তুর্ তুর্!’

    তাঁকে নিয়ে লিখতে হবে শুনলে, তাঁর প্রিয় এই শব্দগুচ্ছই বেরত অনণুকরণীয় অমল-ভঙ্গির বিদ্রুপে, নিশ্চিত!

    তিনি তখন ‘ডায়মন্ড’ দত্ত। সাতানব্বইয়ের ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে মোহনবাগানের সামনে ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগান ক্লাবে ঢুকলে বাঁদিকে বাগান। সামনে ছোট রেলিং। উচ্চতা খুব বেশি হলে হাঁটু সমান। সেই রেলিং বেঁকে দুমড়ে গিয়েছে মানুষের চাপে। বড় ম্যাচের আগের সকালে ময়দানি রিপোর্টারের অবশ্যকর্তব্য ক্লাবে ঢুঁ-মারা। অনুশীলন দেখা, কোচের ‘কোট’ কপি, পারলে কিছু ফুটবলারেরও মন্তব্য।

    তখন এত কড়াকড়ি ছিল না। চার-পাঁচ বছর ময়দানে নিয়মিত যাতায়াত সবে, গলি-ঘুঁজি আটঘাঁট ঘাঁতঘোঁৎ প্যাঁচপয়জার তত শিখে উঠতে পারিনি। এখনও যে পেরেছি, একেবারেই এমন নয় যদিও! কিন্তু, ক্লাবের সাজঘরে অবাধ বিচরণের জায়গা ছিল। দুটো ক্লাবেই। মোহনবাগানে ঢুকেই একটা বিরাট টেবিল। সবাই প্র্যাকটিসের পর জলখাবার খেতেন। তার মধ্যেই এপাশে সত্যজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা বলে ওপাশে যেতে যেতে কম-কথা-বলা বাসুদেব মন্ডলের আমাদের আসতে দেখেই কলার খোসাটা ছাড়াতে হঠাৎ বিরাট মনোযোগী হয়ে-পড়া। যদ্দূর মনে পড়ছে, টেবিলটার পেছনে বাঁদিকে একটা ছোট ঘরে তখন বসতেন অঞ্জনদা, অঞ্জন মিত্র। পাশে আরও ছোট একটা ঘুপচি ঘর, কোচের। সেখানে অমল দত্ত তখন উত্তর কলকাতার সাবেকি রকের আড্ডা বসিয়ে ফেলেছেন। ঘর্মাক্ত সবাই অধীর আগ্রহে শুনছে। লোভনীয় ‘কোট’ আসছে একের পর এক। বাইচুং ভুটিয়া? ‘কে, চুংচুং?’ সোসা তো বেশ ভাল খেলছে? ‘শসা আবার ফুটবল খেলে নাকি?’

    বুমধারীরা নেই। কলকাতায় কাগজই বা তখন ক’টা! সব কাগজের নিয়মিত ফুটবল-মাঠে যাওয়া রিপোর্টাররা অমল দত্তর কথা শুনেই দৌড় দৌড় দৌড়। ওপাশের ক্লাবে ইস্টবেঙ্গলে প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কী বলেন, পাল্টা কী দেন, শুনতে হবে। ইস্টবেঙ্গলে কোচের কথা বলার জায়গাটা বড়। তবু, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’। চেয়ার থেকে উঠে প্রদীপদা, পিকে ব্যানার্জি তখন অভিনয় করে দেখাচ্ছেন, ‘দানীবাবু’! বিপক্ষ কোচের ‘চুংচুং, শসা’-র পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর শংসাপত্র! দু-জায়গাতেই দর্শক-শ্রোতা আমরা হেসে লুটিয়ে পড়ি প্রায়।

    ম্যাচ শেষ। আবার আমরা সবচেয়ে খারাপ কাজটায় তখন। খেলা শেষে সরকারি কোনও সাংবাদিক সম্মেলন হত না তখন যুবভারতীতে। দুই দলের দুই সাজঘরেই ঢুকে পড়া যেত। একগুচ্ছ সোমত্ত যুবক, খালি গায়ে, পরণে লজ্জা নিবারণের ক্ষুদ্র অন্তর্বাস, তাদের একান্ত নিজস্ব সেই ঘরে, দিব্য সুসজ্জিত কাগজ-পেন হাতে, কাঁধে-ব্যাগ আমরা ঢুকে পড়তাম, নিজ নিজ ‘সোর্স’-এর কর্তাদের বলে। গল্প পাওয়া যেত, ঠিক। কে কাকে জলের বোতল ছুঁড়ল, কোন কর্তা কোন প্লেয়ারকে খিস্তোলেন – সবই ঘটত আমাদের চোখের সামনেই। টিভি-চ্যানেল না-থাকায় পরদিন কাগজে খবর বেরনোর পর চলত অস্বীকারের পালাও।

    অমলদার ভ্রুক্ষেপ নেই। ১-৪ হারের কারণ তিনি পেয়ে গিয়েছেন। ‘ওই পাঁচফুটিয়া গোলকিপারটা’। মানে, হেমন্ত ডোরা। তাঁর বলা ‘চুংচুং’ হ্যাটট্রিক করে চলে গেলেন, ইস্ট-মোহন ম্যাচে প্রথম হ্যাটট্রিক, তাঁকে কি বাড়তি তাতিয়ে দিলেন না আপনিই – এই প্রশ্নের উত্তর কিনা ‘ওই পাঁচফুটিয়া গোলকিপারটাই ডুবিয়ে দিল’!

    অমল দত্ত-র এমন অনেক ব্যাপার ছিল, আগে শুনেছিলাম। চাক্ষুষ সেই দিন। আগে সত্যজিৎ চ্যাটার্জিকে ৩৫ মিনিটের প্লেয়ার বলেছেন, সুদীপ চ্যাটার্জি সম্পর্কে কী বলেননি, আবার সেই সুদীপকেই নিজের সর্বকালের সেরা ভারতীয় ফুটবল দলে রেখেছেন সবার আগে, ফুটবলের খবর গোগ্রাসে গেলার সময় এগুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বহু তর্কাতর্কি করেছি সান্ধ্য আড্ডায়। কাজ করতে এসে নিজের কানে শুনে, নিজের চোখে দেখে, খানিকটা অবাকও। সত্যিই কেমন যেন লোক!

    কিন্তু, তিনি ছিলেন বলেই যুবভারতীতে সেবার ১ লক্ষ ৩১ হাজার লোক। যুবভারতীর প্রেসবক্সে তিলধারণের জায়গা নেই। এতসব ল্যাপটপ, পাওয়ার পয়েন্ট, এসি-র আধুনিকতা ছিল না। ডেস্ক আর চেয়ার। বসার জায়গা পেতে সমস্যা হবে ভেবে আগের রাতেই আমরা কয়েকজন ‘জুনিয়র’ ভেবেছিলাম আগে আগে চলে যাওয়ার কথা। ভাগ্যিস ভেবেছিলাম! বসতে পেরেছিলাম তাই, ঘন্টা তিনেক আগে যুবভারতী পৌঁছে। কাতারে কাতারে লোক ফুলবাগানের রাস্তায়। বাইপাসে উঠে দেখি হাঁটতেও পুজোর ভিড় যেন। এত মানুষ! সিনিয়ররা আগের দিনই তো বলছিলেন ‘ফিরে এসেছে সাতের দশক’। কলকাতা ফুটবলের সোনার সত্তর।

    প্রদীপ ব্যানার্জি ম্যাচ শেষে তুলে আনলেন কাতানেচ্চিও-প্রসঙ্গ। ডায়মন্ডকে আটকাতে যা তাঁর অস্ত্র ছিল সেই দিন। ‘কাতানেচ্চিওটা বুঝতে হবে বাবা। ইতালীয়রা খেলে। টেনে নিয়ে আসে। গাড়িতে দেখবে শক-অ্যাবজর্বার থাকে। ধাক্কা সহ্য করে নিজে। গাড়িকে রাখে মসৃণ। ওভাবে বিপক্ষকে টেনে এনে শুষে নিতে হয় ঝাঁঝ। তারপর বেসামাল মুহূর্তে প্রতি-আক্রমণ। সেট পিস। কর্নার থেকে ক’টা গোল, গুনলে?’

    ময়দান জমজমাট। দুই শিবিরে ছোটাছুটিকে কখনও মনে হত না পরিশ্রম!



    নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। দ্য স্টেটসম্যান কাগজে তখন সপ্তাহের মাঝে, বুধবার, খেলা নিয়ে বিশেষ সাপ্লিমেন্ট বেরত, ‘মিডউইক’। সেই পাতার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনায় ঠিক হল, অমল দত্ত লিখবেন নিজের ফুটবল অভিজ্ঞতার কথা, কয়েকটি সংখ্যা ধরে। লেখার নাম ‘মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ফুটবল’। অমলদার সঙ্গে যোগাযোগ, লেখা নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি এবং বাকি সবের জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কাজ। তার আগে অমলদা মানে মাঠে যতটুকু দেখা। আলাদা করে বসা হয়নি। সাক্ষাৎকার বা তেমন কোনও ব্যাপারে কিছু বললেই ওই ‘তুর্ তুর্ তুর্!’

    কিন্তু, স্টেটসম্যান কাগজের ওই লেখার সূত্রে কাছাকাছি আসার সুযোগ পাওয়া গেল। নিয়মিত দেখা, আলাপ-আলোচনা, তাঁর লেখা তখনও তিনি নিজের হাতেই লিখে দিতেন। কিন্তু কোন সংখ্যায় কী লিখবেন, কী কী লিখতে চান, আর সেই প্রসঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে বেশ কিছু গল্প। কীভাবে বিদেশে পারি দিয়েছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে। কেন কোচিং টানত তাঁকে? ফুটবলের আকর্ষণে সব চেয়ে যখন তখন বেরিয়ে পড়া। কলকাতা ছেড়ে, রাজ্য ছেড়ে। ‘আমি প্রোফেশনাল, যে ডাকবে চলে যাব।’

    বাড়িতে প্রচুর বই। ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, এনেছিলেন বেশ কিছু, কোচিং সম্পর্কিত। অ্যানাটমি-র ওপর, হিউম্যান সাইকোলজি, ফুটবল কোচিং তো বটেই। ওয়ার্ল্ড সকার পত্রিকা ছিল অনেকগুলো। মাঝে মাঝে দেখাতেন বিশেষ বিশেষ সংখ্যাগুলো। সাতের দশক পর্যন্ত অনেক বই। যে সময়টায় নিজেকে গড়েছিলেন তিনি। কিন্তু, নিরবচ্ছিন্ন কাজ করতে পারেননি কখনও। তাঁর সঙ্গে কারও বনে না। কোনও না কোনও ইস্যু উঠে আসে ঠিক। কার দায়, কীসের দায় ইত্যাদি গভীরে না-গিয়েও বলা যায় যে, অমল দত্ত কোনওদিন থিতু হতে পারেননি কোনও দলে, টানা কাজ করে যেতে পারেননি। যে-কারণে হয়ত তাঁর বদলে-দেওয়ার পদ্ধতির ঠিকঠাক মূল্যায়ণ হয়নি। একই ফুটবলারদের নিউক্লিয়াস ধরে রেখে দীর্ঘদিন অনুশীলন যদি করাতেই না-পারেন কোনও কোচ, কী করেই বা সম্ভব তাঁর চিন্তার সম্পূর্ণ প্রতিফলন খেলার মাঠে দেখানো? আর, তিনি সব চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন, কোচিং-ই তাঁর রুটিরুজি। কোথাও কোচের চাকরি চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তো নতুন চাকরির খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হবে, না হলে সংসার চালাবেন কী করে? তাই, চাকরিহীন অবস্থায় যে যেখান ডেকেছে, চলে গিয়েছেন। সে ওডিশা হোক বা মুম্বই, গোয়া। কিন্তু শান্তি পাননি কোথাও। যা যা চাইতেন, ফুটবল সংক্রান্ত প্রাথমিক পরিকাঠামো, তাঁর সময় ভারতে কলকাতা ছাড়া আর কোথাও সেটুকুও পাওয়া যেত না। আবার মনোমালিন্য হয়েছে। ছেড়ে চলে এসেছেন নিজেই। এসে আবার খুঁজতে শুরু করেছেন নতুন চাকরি। চরৈবেতি জীবন।



    আলাপ হয়েছিল পেশাদার জীবনের শুরুতেই। যুগান্তর কাগজ নতুন করে বেরিয়েছিল ১৯৯৩ সালে। তখন কাজ শুরু, ট্রেনি জার্নালিস্ট হিসাবে। আর যুগান্তরের খেলার পাতা তখন শুরু থেকেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে গিয়েছিল যার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, প্রদীপ ব্যানার্জি এবং অমল দত্ত, দুজনেই ফুটবল নিয়ে বিশেষজ্ঞ হিসাবে লিখতে শুরু করেছিলেন, যুগান্তরে।

    যে-সময় দুজনের সম্পর্ক বেশ খারাপ, এক কাগজে দুজনে লিখেছিলেন বেশ কিছুদিন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সময় দুই বিশেষজ্ঞকে বেশি ব্যবহার করানো হবে, সম্পাদকীয় দফতরের নির্দেশ। আমাদের উৎসাহের শেষ নেই। এমন বরেণ্য মানুষদের দেখা যাবে কাছ থেকে। কাজ তো বড়রাই করবেন, আমরা দু-চারটে কথা তো বলতে পারব!

    তখন ইমেল নেই, মোবাইল ফোন নেই, ল্যাপটপও নেই। হাতে লেখা হয়। নিয়ম ছিল, অমলদা লিখবেন, সেই লেখা তাঁর বাগুইআটি জ্যাংড়া অঞ্চলের বাড়ি থেকে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আনা হত, তারপর বেশ ঝাঁপিয়েই পড়ে নিতাম। হাতের লেখার সঙ্গে পরিচয় তখন থেকে। একটু গোল-গোল অক্ষরগুলো। পরিষ্কার, পড়তে কোনও অসুবিধে হবে না কারও। সাদা কাগজে লিখলে লাইনগুলো একটু নিচের দিকে নেমে যেত।

    বিশ্বকাপ চলাকালীন এলেন অফিসে। রাতে ম্যাচ-রিপোর্ট করবেন। ক্রীড়া সম্পাদক দায়িত্ব দিলেন, সঙ্গে থাকতে হবে। এসে পৌঁছলেন অনেক আগে। প্রায় ঘন্টা তিনেক আগেই। কী খাবেন তিনি? খানিকটা চিন্তা আমাদের। জিজ্ঞেস করতেই অবশ্য চিন্তামুক্তি। ‘প্লেন টোস্ট, চিনি দিয়ে, আর চা।’ রাতে অনেকক্ষণ থাকবেন, আর কিছু নয়? খেলা শেষ হতে হতে তো গভীর রাত। তারপর গাড়ি পাওয়া, নোনাপুকুর থেকে বাগুইআটি যাওয়া, ভারী কিছু খেলে হত না? পাশেই সিরাজ, অমলদার জন্য কি বিরিয়ানি আনা হবে? পত্রপাঠ না! কী অদ্ভুত যুক্তি, ‘ম্যাচ লিখতে হবে না?’ বুঝতেই পারিনি, ম্যাচ লেখার সঙ্গে বিরিয়ানি না-খাওয়ার কী সম্পর্ক! তিনি জানিয়েছিলেন, ম্যাচ লেখার দিন তিনি তখন নিরামিষাশী। ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচ রিপোর্ট লেখার প্রস্তুতি নিতে নাকি ভাত-ডাল-আলুপোস্ত যথেষ্ট তাঁর, দিনের আহার হিসাবে। আমরা অবাক! ম্যাচ খেলার দিন খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে নানারকম নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে ফুটবলারদের, শুনেছিলাম। ম্যাচ লেখার দিনও আমিষ খাওয়া যাবে না, প্রথম শুনেছিলাম সেই দিন, অমলদার মুখে। আর, সেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জুড়ে প্রায় প্রতিদিনই ম্যাচ লিখতে তিনি যখন আসতেন, এমনকি অমলেটও খেতেন না, ম্যাচ লেখা শেষ হওয়ার আগে!

    একটা অদ্ভুত মিল আছে, বা ছিল বলা উচিত, অমল দত্ত আর পিকে ব্যানার্জির। দুজনের উচ্চারণেই ‘ক্রিকেটিয়ার’। হয়ত ওই সময়ের মানুষ যাঁরা, ‘ক্রিকেটার’ শব্দটা ওভাবেই উচ্চারণ করতেন। জানতে চাইলে বলতেন, ওভাবেই তো বলতে শিখেছিলাম, ছোট থেকে।

    সেই প্রথম দিকের প্রায় বছর ১৫ পর, আবার নিয়মিত কাজের সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল, আজকাল কাগজের সুবাদে। বিশ্বকাপ এবং ইউরো প্রতিযোগিতা, সঙ্গে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের কিছু বিশেষ ম্যাচ। অমলদা তখন আর নিজের হাতে লেখেন না। ওঁর কাছে গিয়ে শুনে নিতে হয়, কী বলতে চাইছেন। এবার শেষ বয়সে। যখন তাঁর স্মৃতি ততটা কাজ করছে না। কিন্তু, পাঁচ বা ছয়, এমনকি সাত দশক পর্যন্তও তথ্য অনেকটাই ঠিকঠাক। তার পরের দিকগুলো নিয়ে একটু ভাবেন, বলেন। আর, তিনি যা বলেছেন তা লিখেছি কিনা দেখাতে বা পড়াতে গেলে বলেন, ‘তুর্ তুর্ তুর্!’

    স্ববিরোধিতা ছিল, সে কার না থাকে? তাঁর হয়ত একটু বেশিই ছিল। কিন্তু অপ্রাপ্তিও তো প্রচুর। তিনি বেশি সফল তুলনায় কম-তারকাদের নিয়ে কাজে। ভারতীয় ফুটবলে সাইডব্যাকদের ওভারল্যাপিং, ৪-২-৪ সিস্টেম এনেছিলেন তিনি। না, তিনি কোনও সিস্টেমেরই প্রবর্তক নন, কিন্তু ভারতীয় ফুটবলে তিনিই এনেছিলেন প্রথম। কলকাতা ও ভারতীয় ফুটবলকে শিখিয়েছিলেন ফুটবলে কোচিংয়ের গুরুত্ব। ভারতীয় দলের দায়িত্ব পাননি কখনও সেভাবে, টানা বেশ কিছু দিনের জন্য।

    ফুটবল নিয়ে লেখালেখি করেছেন প্রচুর। তাঁকে দিয়ে লেখানো শুরু করেছিলেন মতি নন্দী। তাঁর ‘ফুটবল খেলতে হলে’ বইটা এখনও বাংলা ভাষায় ফুটবল কোচিংয়ের প্রাথমিক ব্যাপারগুলো জলের মতো করে বাংলায় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আদর্শ। এ ছাড়াও, কত লিখেছেন! অন্তত দু-ভল্যুমে সমগ্র তো বেরতেই পারে, যদি তাঁর সব লেখা একসঙ্গে করা যা্য়। বাংলা ভাষায় ফুটবল লেখার বিবর্তন নিয়ে যাঁরা কাজ করতে আগ্রহী, তাঁর লেখাগুলো যত্ন নিয়ে পড়লেও কত কিছু শিখতে পারবেন। মাঠে তাঁর কাজের কোনও ডকুমেন্টেশন হয়নি, আজ আর সম্ভবও নয়। শুধু কিছু মানুষের স্মৃতিনির্ভর থেকে যেতে হবে সেখানে। কিন্তু অমল দত্তর লেখার সংকলন যদি করা যায়, বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাঠক মহলে সমাদৃত হবে, নিশ্চিত।

    পাননি কোনও সরকারি স্বীকৃতি। ক্ষোভ ছিল, প্রচুর। শেষ দিকে অবশ্য সোচ্চারও হতেন না আর। কী হবে, ধুসস! খুব ইচ্ছে ছিল, ২০১০ বিশ্বকাপে যাওয়ার। মাঝেমাঝেই জানতে চাইতেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় খুব গণ্ডগোল, না? একটু জেনে বোলো তো।’ বিশেষ বিশেষ শহর নিয়ে, সে-দেশের ভূগোল-ইতিহাস-অর্থনীতি নিয়ে পড়তে চাইতেন। আইনশৃঙ্খলার খবর রাখতেন। কিন্তু বয়সের কারণে, অসুস্থতার কারণে, যেতে পারেননি। বছর দুই পর কোনও একটি কাগজের বিশেষ পাতায় তাঁর লেখা পড়ে চমকে যাই। ২০১০ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছিলেন নাকি অমল দত্ত!

    এটা আবার হল কী করে অমলদা, আপনি তো তখন বাগুইআটিতে, আমিও নিয়মিত আপনার সঙ্গে দেখা করে লেখাগুলো করছিলাম?

    ‘কী বলি, কী শোনে আর কী লেখে! তুর্ তুর্ তুর্!’

    নিজের ঘরে খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে, শরীরটা আরাম কেদারায় এলিয়ে দিয়ে এক চিলতে হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখে, ভোলা যাবে না, তুড়ি মেরে যে কোনও বিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার ওই অনণুকরণীয় অমল-ভঙ্গি!

    No comments