• Breaking News

    বর্ষণসিক্ত বিকেল-বোধন / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    [caption id="attachment_3949" align="alignleft" width="2322"] লালহলুদের লজেন্স-দিদি, মুখে তাঁর ‘স্বপনদা’! শনিবার ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে[/caption]

     

    ময়দানে বল পড়ল।

    পড়ল বটে, নড়ল না বিশেষ! আটকে গেল আঠালো মাটিতে। হাঁটলে টাল সামলানো দায়। কাদা বাঁচিয়ে যায় না পা-ফেলা। তবু, এমন মাঠেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শঙ্করীপ্রসাদ বসুর কাছে আজন্ম ঋণ -  বল পড়ে, পা নড়ে!

    গঙ্গাপারের কলকাতা ময়দান গঙ্গাসাগর নয়। একবারে যাওয়া ফুরোয় না। অমোঘ সে টান। সটান! সেই 'সব-তীর্থ' যেখানে যাওয়া 'বারবার'। কীসের টানে, কীসের খোঁজে, বলা-বোঝা মুশকিল। বিশেষত এই বর্ষণসিক্ত বিকেল-বোধনে। 'ভিপি' বলতে আমরা যারা 'সত্যেন' বুঝি, হয়ত তেমন কোনও 'সুহের'-এর খোঁজে, যাঁদের পালাক্কড থেকে খুঁজে আনেন কোনও এক নবাব ভট্টাচার্য, এই ময়দানে। কখনও সে ইস্টবেঙ্গলকে গোল দেয়, কখনও ইস্টবেঙ্গলের হয়েই করে নবাবি!

    যাঁরা খেলেন, আসেন। তাঁদের কাজ। যাঁরা খেলা দেখেন তাঁরাও আসেন। তাঁদেরও কাজ! পক্ককেশ মনে করিয়ে দেন, তেষট্টিতে অসীম মৌলিকের অভিষেকে হ্যাটট্রিক। 'এগেইন্সট স্পোর্টিং ইউনিয়ন'। তাঁরা ওইটুকু ইংরেজিতেই বলতে ভালবাসেন। স্বভাব। অনেকটা ওই 'ইন দ্য ইয়ার নাইনটিন টোয়েন্টি টু'-এর মতো। 'জার্সি ছিঁড়ে ফেলেছিল মৌলিক', মনে রেখে দিয়েছেন। পাশের স্বল্পকেশ জুড়ে দেন, 'তখন কিন্তু টানা তিন গোলেই হ্যাটট্রিক। এখনকার মতো ম্যাচে যখন খুশি তিন গোল করলেই নয়।' কে বলেছে 'নয়'? সে বড় সুখের সময়!

    আরও এক দল আসেন। তাঁদেরও কাজ! রোদ-ঝড়-জল, তাঁদেরও গা-সওয়া। সকাল আটটা বা দুপুর একটা। সন্ধে সাতটাও হতেই পারে। রোজ হাজিরা তাঁদের। এমনকি, ম্যাচ না থাকলেও। বরঞ্চ তখনই তো আরও বেশি। ম্যাচের সময় টিভিহীন প্রেস বক্সে, বিভিন্ন প্রজন্মে দু-তিনজন, ঠিক থাকেন। ম্যাচের প্রতিটি মুভ-মিনিট বলে দেওয়ার জন্য। কী করে পারেন, বিস্ময়! সঙ্গেই চলে বৈঠকি গপ্পো। মোট ৩০-৩৫ জন, কয়েকটা ছোট ছোট গ্রুপ। স্মৃতি দৌড়য় পেছনে। ‘হ্যাঁ রে, ওই ম্যাচটা মনে আছে, সেই যে রে, উফ্ তোর তো কিছুই মনে থাকে না!’ হাতে-মুখে স্মার্ট, তরুণতর প্রজন্ম। ম্যাচের মাঝে ‘এই লেবু-চা’ তাঁরাও ডাকেন। হাত বাড়িয়ে, নিচু হয়ে তুলে নেন ঘটিগরম। সকাল থেকে সন্ধের মাঝে কখনও কাস্টমস টেন্টে পাউরুটি-ঘুগনি, কখনও ডেকার্স লেন। পরদিন সকালে কাগজ পড়ে কোনও কর্তার সাবাসি, কারও বিষের বাঁশি!

    তাঁদের ভিড়ে মরসুমি ময়দানি এক। নিয়ম করেই অনিয়ম, বেনিয়ম, রবাহুত। নানা কারণ। জীবন-জীবিকা-জিজ্ঞাসা, অবোধ্য শব্দের ভিড়। হঠাৎ এসে ঢুকে পড়া সেই আনন্দঘন সংসারে। এক ঝলক টাটকা হাওয়া। বুকের ভেতর বৃষ্টি পড়ে, কবীর সুমন। সম্মোহনী অথচ কাজের মজলিসি পরিবেশ। আলো কমে গিয়ে ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হলে কেন ডাকা হয় না ডাকওয়ার্থ-লুইসকে?

    ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রেসবক্সে ঘোরানো সিঁড়ির চল্লিশ ধাপ গুনে ওঠে, এখনও। মনে থেকে যাওয়া অকারণ। নেমেও আসা চল্লিশ ধাপ। নেমে থমকে যাওয়া এক মুহূর্ত। মাথা ঘোরেনি, তবুও। বিদ্যুৎচমকের মতো ভাবনা খেলে যায়, থামিয়ে দেয়। পেছন ফিরে তাকানো আর একবার।

    লোহার সেই ঘোরানো সিঁড়ি বেয়েই যে বছর চল্লিশ আগেও বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতাকে অমর্ত্যলোকে নিয়ে যাওয়ার দিকে অজয় বসু-মতি নন্দীরা।

    ওই চল্লিশ ধাপ তখন অনতিক্রম্য!

    No comments