• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১১/ জার্মান কেলেঙ্কারি, যথারীতি!/কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    অ্যান্টি–ফুটবল! গত শতাব্দীর ছয়ের দশকজুড়ে বিশ্বব্যাপী ধারা, যা শুরু হয়েছিল কার্ল রাপ্পানের হাত ধরে, যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এলেনিও এরেরার ইন্তার মিলানে, যা আবার ফিরে এসেছিল আধুনিকতার মোড়কে মোরিনিওর হাত ধরে সেই ইন্তারেই। সংজ্ঞা সহজ। ইন্টারনেটের এনসাইক্লোপিডিয়া বলছে, ‘অ্যান্টি–ফুটবল মানে বোঝায়, অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ধ্বংসাত্মক শারীরিক ঘরানার ফুটবল যেখানে স্ট্রাইকার বাদে গোটা দলের ফুটবলারদের দাঁড় করানো হয় বলের পেছনে। এভাবেই তারা বিপক্ষের গোল–দেওয়া আটকাতে চায়।’

    এই ধারার ফুটবল প্রবর্তনের সময় এরেরার মাথায় ছিল ‘হারব না’ মনোভাব। বিপক্ষ যত স্কিলফুলই হোক না কেন, রক্ষণের পেছনে আর্মান্দো পিচি মানে ওই রক্ষণ পেরিয়ে এসেও পিচির পায়ে বল জমা দিয়ে যাওয়া। তাতে, সান সিরোয় ইন্তার–শিবিরে ট্রফির বরসাত! পরপর দুটো ইউরোপ–সেরার ট্রফি, রেয়াল মাদ্রিদও কুপোকাত। ফ্রান্স–স্পেন বাদে গোটা ইউরোপ পাগল। সাফল্যের এক ও একমাত্র শর্ত হিসেবে উঠে এসেছিল কাতানেচিও। ১৯৬৪–৬৫, ইন্তারের সাফল্যের প্রত্যক্ষ ফল পাওয়া গিয়েছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ এত কুৎসিত, এত মারকুটে, এত নেতিবাচক কখনও হয়নি। যার আভাস পাওয়া গিয়েছিল ২০১০ বিশ্বকাপেও, মোরিনিওর ইন্তারের সাফল্যে–অনুপ্রাণিত হল্যান্ডের (‌কী আশ্চর্য!)‌ দে জংয়ের কুংফু–তে। এরেরার ক্লাবে গিয়ে হোসে ফিরিয়ে এনেছিলেন সেই প্রায়–প্রাগৈতিহাসিক ফুটবল, যা খুন করে ফেলে ফুটবলের প্রাথমিক ধর্ম, গোল–করে–জেতাকেই।

    সুখের কথা, প্রাথমিক সাফল্যের এই ধারা বেশিদিন টেকেনি। ফুটবল–বিশ্ব মন থেকে মেনে নিতে পারেনি খেলার ওপরই এই অত্যাচার। বেঁকে বসেছিলেন অনেকে, সেই ছয়ের দশকেই। সাফল্য পেতে গিয়ে খেলাটাকেই মেরে ফেলতে হবে, দর্শককে মাঠে আসতে বা টিভির সামনে বসতে নিরুৎসাহিত করতে হবে — তীব্র অনীহা ছিল তাঁদের এই মতবাদে। প্রতিবাদে অন্য পথ খুঁজছিলেন, যে–পথে রক্ষণাত্মক মানসিকতাকে কখনই গুরুত্বহীন ভাবা হবে না, কিন্তু, জোর থাকবে আক্রমণে, গোলমুখ খুলে গোল করায়। মরিয়া হয়ে গোল–বাঁচানোই ফুটবল নয়। খ্যাপার পরশপাথরের মতো, ফুটবল আসলে গোল করার উপায় খুঁজে–ফেরা।

    ইতালিতে তৈরি–হওয়া এই চরম নেতিবাচক ঢেউ প্রথম আক্রান্ত ব্রাজিলের কাছে। ১৯৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালে। শতাব্দী–সেরা ব্রাজিলের আক্রমণ বনাম ইতালির কাতানেচিও, বিশ্বকাপ ফাইনালের শিরোনাম। পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল জিতল ৪–১। থই পেলেন না ফাচেত্তি, এরেরা। ‘কাতানেচিও পরাস্ত, হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে শিখল ফুটবল, আনন্দে’, লিখল বিশ্বের প্রচারমাধ্যম।

    সেই পথে আরও আগেই হাঁটতে শুরু করেছিলেন যাঁরা, ওলন্দাজ রাইনাস মিশেল তাঁদের পথিকৃৎ। ফুটবল–বিশ্বে তাঁকেই জনক বলা হয় প্রেসিং ফুটবল–এর। যদিও, ফুটবল–উৎসাহী পাঠক সেখানে জ্যাক রেনল্ডস–এর নাম স্মরণ করেন শ্রদ্ধায়। রেনল্ডস ছিলেন আয়াক্সেই। কোচ হিসেবে, ১৯১৫–২৫, ১৯২৮–৪০ ও ১৯৪৫–৪৭ (‌মাঝের বছরগুলোয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফুটবল বন্ধ)‌। তাঁর প্রশিক্ষণেই খেলতেন রাইনাস। পরে, ১৯৬৫–তে কোচ হয়ে আসেন আয়াক্সে। আর, পেয়ে যান বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার জোহান ক্রুয়েফকে, যাঁর পায়ে প্রেসিং–এর স্বরূপ দেখে বিশ্ব বাকরুদ্ধ, মুগ্ধ।

    প্রেসিং ঠিক কী? সহজ ভাষায়, টেকনিক্যাল জারগন বাদ দিয়ে বলতে গেলে, বলের দখল ফেরত পেতে বলের দখল–থাকা সামনের ফুটবলারকে চাপ দেওয়া।

    এতে কী হবে? ধরুন, আপনি বল নিয়ে গিয়েছেন বিপক্ষ রক্ষণে। রক্ষণের ফুটবলার কেড়ে নিয়েছেন সেই বল। তখনও পর্যন্ত বলা ছিল, ওই হারানো বলের দখল ফেরত পেতে চেষ্টা করবেন রক্ষণের ফুটবলাররা, বা কখনও কখনও মাঝমাঠের কেউ। মিশেল বললেন, না। ‘যেখানে বলের দখল হারাচ্ছ সেখানেই ফেরত পেতে চেষ্টা করো।’ ফলে, আক্রমণভাগের যে–স্ট্রাইকার গিয়েছিলেন বিপক্ষ রক্ষণে, বলের দখল হারানো মাত্রই তিনি হয়ে গেলেন ডিফেন্ডার। তাঁকে শিখতে হল বল কেড়ে নেওয়ার কৌশলও। অল–রাউন্ড এবিলিটি বাড়ানো হল প্রত্যেক ফুটবলারের। ফাঁকা জায়গা ছাড়া চলবে না। উইং ব্যাক আক্রমণে গেলে মাঝমাঠের ফুটবলার নেমে আসবেন সেই জায়গায়। গোলরক্ষক ছাড়া কারও কোনও নির্দিষ্ট জায়গা থাকল না মাঠে। এই যে ফাঁকা জায়গায় সবসময়ই কেউ না কেউ পৌঁছে যাচ্ছেন, এতে তৈরি হল ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’ যা ৫৪–র হাঙ্গেরি সম্পর্কে আলোচনার সময়ও উঠে এসেছিল। এক সার্বিক চলমানতা, গোটা দল এমন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলছে বিপক্ষকে যে থই পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রুয়েফ মাঝমাঠ থেকে পরিচালনার দায়িত্বে। আয়াক্স ইউরোপের ফাইনালে উঠল ১৯৬৯, হারল এসি মিলানের কাছে, যাঁরা সান সিরোয় তাঁদের প্রতিবেশীদের আদর্শে কমবেশি উদ্বুদ্ধ। মানসিক দিক দিয়ে আরও শক্ত হলেন মিশেল। ১৯৭১–এ এল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আয়াক্স পেল ইউরোপ–সেরার সম্মান।

    ব্রাজিলের ১৯৭০ বিশ্বকাপ আর আয়াক্সের ১৯৭১ ইউরোপ–জয় ফুটবল থেকে প্রায় ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছিল নেতিবাচকতাকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল ফুটবল, সেই অস্বাভাবিক দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে। ফুটবলে ফিরেছিল প্রাণ। ক্রুয়েফ–নিসকেন্স–রুডি ক্রল–রেনসেনব্রিঙ্ক, পাসিং–এর নতুন দিগন্ত উন্মোচিত। পরপর দু–বছর আয়াক্স কোনও ম্যাচ হারেনি নিজেদের মাঠে, তারও পরের দু–বছরে, মিশেল যখন ৭১–এর পর বার্সেলোনায়, স্টেফান কোভাকস–এর হাতে আয়াক্স ও প্রেসিং অপ্রতিরোধ্য। পরের দুবারও ইউরোপ–সেরার মুকুট তাঁদের। সত্যিই, হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল ফুটবল, প্রাণের স্পন্দন নতুন করে আবিষ্কার করে।

    এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭৪ বিশ্বকাপ। বার্সেলোনাতে তত দিনে ক্রুয়েফকে নিয়ে এসেছিলেন মিশেল। বার্সেলোনা জিতল লা লিগা, মিশেলকে দায়িত্ব দেওয়া হল ১৯৭৪ বিশ্বকাপের রং ‘কমলা’ করে দেওয়ার!

    ট্রফি পাল্টাল

    জুলে রিমে কাপ চিরতরে নিয়ে গিয়েছে ব্রাজিল। মেহিকো বিশ্বকাপের পরই তাই নতুন সমস্যা। ১৯৭৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নদের হাতে কী তুলে দেওয়া হবে? ফিফা নতুন করে ভাবতে বসল, দশম বিশ্বকাপের আগে। আবেদন করল শিল্পীদের কাছে, নতুন ট্রফির ডিজাইন পাঠাতে। শিল্পীরাও সাড়া দিলেন সেই আবেদনে। সাতটি দেশ থেকে মোট ৫৩টি ডিজাইন ছিল চূড়ান্ত লড়াইতে। শেষ পর্যন্ত ফিফা বেছে নেয় ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগা–র নকশা। সেই নকশা মেনেই তৈরি হয় নতুন ট্রফি। এখন বিশ্বকাপ বললেই যে–ছবিটা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

    ট্রফিটি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। ওজন ৬.১৭৫ কিলোগ্রাম যার মধ্যে ৪.৯২৭ কিলোগ্রাম সোনা। উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার। ট্রফিটি তৈরি করেছিল ইতালির মিলানের বার্তোনি জিডিই এসআরএল সংস্থা। সেই সংস্থাতেই আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে জড়িত ছিলেন ট্রফির নকশাকার সিলভিও।

    নিজের নকশা সম্পর্কে বলেছিলেন সিলভিও, ‘The lines spring out from the base, rising in spirals, stretching out to receive the world. From the remarkable dynamic tensions of the compact body of the sculpture rise the figures of two athletes at the stirring moment of victory.’

    ট্রফির নিচের দিকে খোদাই করা আছে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ’। আর, প্রতিবার বিশ্বকাপের শেষে ট্রফির তলায় লেখা হয় জয়ী দেশের নাম ও সেই সালটি। দেশের নাম আবার লেখা হয় সেই দেশেরই ভাষায়। যেমন, ২০১০ সালে স্পেন জিতেছিল বিশ্বকাপ, লেখা হয়েছিল ‘২০১০ এস্পানা’। সেভাবেই, প্রথমবার এই কাপজয়ী ফ্রানজ বেকেনবাওয়ারের হাতে যখন তুলে দেওয়া হয়েছিল বিশ্বকাপ, লেখা হয়েছিল ‘১৯৭৪, ডয়েশল্যান্ড’।

    জুলে রিমে কাপ থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিফা আর এবার বলেনি, তিনবার জিতলেই কোনও দেশ চিরতরে নিয়ে যেতে পারবে এই কাপ! আর, জুলে রিমে কাপ যেহেতু ব্রাজিল চিরতরে নিয়ে যাওয়ার পর ১৯৮৩ সালে চুরি হয়ে গিয়েছিল, এই বিশ্বকাপটিকে ফিফা আর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশকেও নিয়ে যেতে দেয় না নিজেদের দেশে। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক হাতে পান এই ট্রফি। দলের সবাই–ই অন্তত একবার করে ছুঁয়ে দেখেন, চুম্বন অাঁকেন তার গায়ে, তুলে ধরেন আকাশে। কিন্তু, সেই সেলিব্রেশন শেষ হয়ে যাওয়ার পরই আসল বিশ্বকাপটি নিয়ে নেওয়া হয় ফিফার তরফে। দেওয়া হয় একটি রেপ্লিকা, যা নিয়ে নিজেদের দেশে ফেরেন বিশ্বজয়ীরা।

    কাপের তলায় বিশ্বজয়ীদের নাম এবং সাল খোদাই করা হলেও, সাড়ে বার সেন্টিমিটার ব্যাসের বৃত্তে আরও কতগুলি চ্যাম্পিয়ন দেশের নাম ধরবে? ফিফার জবাব, ২০৩৮ সাল পর্যন্ত কোনও সমস্যা নেই। তারপর? আপাতত ফিফা এখনও কিছু জানায়নি, ২০৪২ সাল থেকে আবার নতুন কোনও ট্রফি দেওয়া হবে কিনা, এই ট্রফির পরিবর্তে।

    জার্মানির নিয়ম!

    ১৯৭৪ বিশ্বকাপেই অদ্ভুত নিয়ম হয়েছিল যে, গ্রুপ পর্যায়ের পর আবারও একটি গ্রুপ পর্যায় থাকবে, সেরা আট দল দু’ভাগে। গ্রুপ ওয়ান–এ ছিল অস্ট্রিয়া, চিলে, পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি; গ্রুপ টু–তে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া ও জাইরে; গ্রুপ থ্রি–তে বুলগেরিয়া, হল্যান্ড, সুইডেন ও উরুগুয়ে এবং গ্রুপ ফোর–এ আর্জেন্তিনা, ইতালি, হাইতি ও পোল্যান্ড। গ্রুপ লিগের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির একটি হল পোল্যান্ডের কাছে শেষ ম্যাচে ইতালির হার। ওই ম্যাচে ড্র হলেই ইতালি চলে যেত দ্বিতীয় পর্বে। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই আনাসতাসি সুযোগ পেয়েছিলেন ফাঁকা গোলে বল ঠেলার। কিন্তু, পেছন থেকে কষে ল্যাং মেরেছিলেন পোল্যান্ডের জিমানোস্কি এবং জার্মান–রেফারি জোয়াকিম ওয়েল্যান্ড পেনাল্টি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। পোল্যান্ড দুটি দুর্দান্ত গোল করে তারপর, কাপেলো একটি শোধ দেন খেলা শেষ হওয়ার মিনিট পাঁচেক আগে, যখন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর, ইতালির হয়ে সেটাই ছিল শেষ ম্যাচ বুর্গনিচ–মাজোলা জুটির।

    তবে, পশ্চিম জার্মানি আছে যখন, কেলেঙ্কারি নিয়ে চিন্তা কীসের! নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ তার ওপর। কোনও কিছুতেই পিছপা ছিলেন না বেকেনবাওয়াররা তাই। আবারও ছক কষে নিয়েছিলেন। গ্রুপে তাদের সঙ্গে পূর্ব জার্মানি। ইতিহাসে প্রথম ও শেষবার বিশ্বকাপে দুই দল মুখোমুখি। শেষ ম্যাচের আগে পূর্বের পয়েন্ট ৩, পশ্চিমের ৪। ড্র হলে পশ্চিম জার্মানি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন, জিতলে পূর্ব। বেকেনবাওয়াররা দেখে নিয়েছিলেন, জিতলে হল্যান্ড, ব্রাজিল আর আর্জেন্তিনার গ্রুপে যেতে হবে। পশ্চিম জার্মান প্রচারমাধ্যমও বুঝে নিয়েছিল কী করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ উল্টোপারের বাসিন্দা পূর্ব জার্মানি অলিম্পিকে সাফল্যের জন্য যেভাবে দেশজুড়ে কাজ করত, ফুটবল নিয়ে কখনও সেভাবে ভাবেনি। মাঝে বার্লিন ওয়াল থাকলেই বা কী, হাজার হলেও নিজেদেরই দেশ তো। পূর্ব আদর্শগত দিক দিয়েই তেতেছিল এই ম্যাচে জীবনপণ করতে। পশ্চিম জার্মানি, বরাবরের মতোই, ভেবে নিয়েছিল কী করা উচিত। ফলে, দেশের প্রচারমাধ্যমে সুপরিকল্পিত উপায়ে আরও তাতিয়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্বকে। কোনওভাবেই যেন বোঝা না যায় পশ্চিম আসলে কী চাইছে! চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। ফলে, ম্যাচের দিন নিজেদের ছাপিয়ে পূর্ব ওই ম্যাচ জিতে নিল ১–০। সঙ্গে জায়গাও পেল হল্যান্ড, ব্রাজিল ও আর্জেন্তিনার সঙ্গে, এক গ্রুপে! আর কাইজার বেকেনবাওয়াররা হেরে চলে গিয়েছিলেন পোল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া ও সুইডেনের তুলনামূলক অনেক সহজ দ্বিতীয় গ্রুপে। ফাইনালে যাওয়ার পথও সহজ, তাই!



    দ্বিতীয় পর্ব

    ক্রুয়েফের হল্যান্ডকে রুখবে কে তখন? আর্জেন্তিনাকে হারাল ৪–০, পূর্ব জার্মানিকে ২–০ ও শেষ ম্যাচে ব্রাজিলকেও ২–০। চার বছর আগের বিশ্বসেরা এবং সর্বকালের সেরা দলের দাবিদার ব্রাজিল তখন অতীতের ছায়াও নয়। মেহিকো বিশ্বকাপের পরই পেলে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর বিশ্বকাপে খেলবেন না। তাঁর অভাব অপূরণীয় তো হবেই। সঙ্গে, আরও তিনজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে পাননি চুয়াত্তরে মারিও জাগাও। সত্তরের অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তো, ক্লোদোয়ালদো, জেরসন এবং অবশ্যই তোস্তাও। সত্তর বিশ্বকাপেই রেটিনার সমস্যা কাটিয়ে কী করে খেলেছিলেন তোস্তাও, এখনও রহস্য। ১৯৬৯ সালে ব্রাজিলের স্থানীয় লিগে ক্রুজেইরোর হয়ে কোরিন্থিয়ান্স পাউলিস্তার বিরুদ্ধে খেলার সময় বলের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি প্রায় চলেই যেতে বসেছিল। কিন্তু, টানা চিকিৎসায় বিশ্বকাপের আগে ফিরে এসেছিলেন এবং কোচ জাগাও তাঁকে মাঝমাঠে না খেলিয়ে তুলে দিয়েছিলেন ফরোয়ার্ডে। দুটি গোল পেয়েছিলেন, নজর কেড়ে নিয়েছিলেন গোটা বিশ্বের। কিন্তু, বছর দেড়েক পর থেকেই আবার মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছিল রেটিনার সমস্যা। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। চলে গিয়েছিলেন ডাক্তারিতে। পরে অবশ্য ডাক্তারিও ছেড়ে ফিরে এসেছেন ফুটবলেই। কিন্তু, চুয়াত্তরে জার্মানি বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি।

    কার্লোস আলবের্তো আহত ছিলেন। ক্লোদোয়ালদো বরাবরই চোটপ্রবণ। বিশ্বকাপের ঠিক আগে বাধ্য হয়েছিলেন নাম তুলে নিতে এবং সে জন্য ব্রাজিলে যথেষ্ট সমালোচিত হতে হয়েছিল জাগাও-কে, ক্লোদোয়ালদোর ব্যাপারে সতর্ক না–থাকায়। ইউরোপে বিশ্বকাপ বলেই জাগাও সম্ভবত গায়েগতরে ফুটবলারদের বেশি প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন। তাতে হিতে বিপরীত। ছন্দই হারিয়ে ফেলেছিল ব্রাজিল। তারই মধ্যে উল্লেখ্য, প্রথম যে ফুটবলারের সঙ্গে ‘দ্বিতীয় পেলে’ বিশেষণ যোগ হয়েছিল, পাওলো সিজার। হল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে একটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেছিলেন, এ ছাড়া ‘দ্বিতীয় পেলে’ তেমন কোনও অবদান রাখেননি বিশ্বকাপে!

    পশ্চিম জার্মানি সহজ গ্রুপে গিয়ে সহজেই ফাইনালে পৌঁছেছিল। যুগোস্লাভিয়াকে ২–০ হারানোর পর, সুইডেন প্রথমে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ৪–২ জেতে, পোল্যান্ডকে হারায় মুলারের একমাত্র গোলে।

    ফাইনাল

    ক্রুয়েফের হল্যান্ড প্রথম ছয় ম্যাচে দিয়েছিল ১৪ গোল, খেয়েছিল একটি। ৫ জয়, এক ড্র। তার মধ্যেই আর্জেন্তিনা ও গতবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলকে হারানো। ফাইনালে তাঁদের কে আটকাবে?

    কুড়ি বছর আগের ফাইনালে হাঙ্গেরির মতোই ’৭৪ বিশ্বকাপ ফাইনালেও ডাচরা ভাবেনি জার্মানদের কাছে হারতে হতে পারে। দু’মিনিটেই গোল, গোটা কুড়ি পাসের পর তখনও জার্মানি বলে পা ছোঁয়াতে পারেনি। ক্রুয়েফকে দিয়ে শুরু হওয়া আক্রমণ শেষে ক্রুয়েফেরই পায়ে, ফোগটসকে পেরিয়ে গিয়ে গোলে ঠেলতে যাচ্ছেন, পেছন থেকে ল্যাং উলি হোয়েনেসের। বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি, গোল নিসকেন্সের। ডাচদের সঙ্গে জার্মানদের বিরোধিতার ইতিহাস সুবিদিত। নাৎসিদের অত্যাচার ভোলেননি ডাচরা। ভেবেই রেখেছিলেন, বিশ্বের সামনে জার্মানদের অপদস্থ করতে হবে। গোল করার থেকেও বেশি চেষ্টা হল জার্মানদের নাকানিচোবানি খাওয়ানোর। পজেশনাল ফুটবলের চূড়ান্ত রূপ, বলই দিচ্ছেন না জার্মানদের পায়ে, নিজেদের মধ্যে খেলে চলেছেন নিরন্তর পাস, ছোট ছোট। উল্টোদিকে, বার্টি ফোগটস ক্রমাগত মারতে শুরু করেছিলেন ক্রুয়েফকে, মাঠের যেখানে সম্ভব। সেই রাপ্পানের নিয়মানুযায়ী নাট–বোল্ট! সাতের দশকের ইস্টবেঙ্গলের জীবন–পল্টুর মতো ক্রুয়েফের সঙ্গে বল্টু হয়ে সেঁটে রইলেন ফোগটস। বিরক্ত ক্রুয়েফ প্রথমার্ধের শেষে ফোগটস সম্পর্কে রেফারির কাছে অভিযোগ জানিয়ে নিজে হলুদ কার্ড দেখলেন। নিজেদের দর্শকদের সমর্থন পেছনে নিয়ে জার্মানরা খেলায় ফিরল প্রত্যাশামতোই। দুটো গোলও পেল, যার মধ্যে প্রথমটা ইংরেজ রেফারি জ্যাক টেলরের বদান্যতায়। পেনাল্টি বক্সে জার্মান হোলজেনবেন পড়ে গিয়েছিলেন জানসেনের বাড়ানো পায়ের ওপর দিয়ে। যেহেতু দু–মিনিটেই পেনাল্টি দিয়েছিলেন ইংরেজ রেফারি, যেন আত্মগ্লানিতে ভুগে শোধ দেওয়ার অপেক্ষায়ই ছিলেন! ক্রিস ফ্রেডি পরিষ্কার লিখেছেন, টেলর নিজে নিশ্চিত ছিলেন না জানসেনের পা লেগেছিল কিনা হোলবেনজেনের পায়ে। ‘পেনাল্টি দিয়েছিলাম জানসেনের প্রচেষ্টায়’! বাঁশি, দ্বিতীয় পেনাল্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে এবং ব্রাইটনারের গোল।

    ক্রুয়েফ তবুও নিজের মতো করেই চেষ্টা করেছিলেন। টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন বেকেনবাওয়ারকে, জার্মান রক্ষণে তখন জায়গায় নেই কেউ। ফাঁকায় বল সাজিয়ে দিয়েছিলেন রেপের পায়ে। কিন্তু, রেপের দুর্বল শট শেপ মাইয়ার বাঁচিয়ে দেন সহজেই। হয়ত, একই সঙ্গে পশ্চিম জার্মানিকেও এগিয়ে দেন বিশ্বকাপের দিকে। ৪৩ মিনিটে বনহফের পাস বক্সের মধ্যে বাঁ পা দিয়ে থামিয়ে ডান পায়ের শটে জংব্লোয়েডকে পরাস্ত করেন মুলার, ওই বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ গোলটি পেতে। দ্বিতীয়ার্ধে আহত রেনসেনব্রিঙ্ক খেলতে পারেননি আর। পরিবর্ত কেরকফের ক্রস থেকে নিসকেন্সের ভলি মাইয়ার বাঁচিয়েছিলেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। তেমনি, জানসেন আবার হোলজেনবেনকে ফেলে দিয়েছিলেন যখন, জার্মানরাও নিশ্চিত পেনাল্টি পেতে পারত। কিন্তু ইংরেজ রেফারির মনে হয়েছিল বোধহয়, একটা বিশ্বকাপ ফাইনালে তিন–তিনটি পেনাল্টি দেওয়া উচিত কাজ হবে না!

    ক্রুয়েফ সেই যে বিশ্বকাপের আসর ছাড়লেন মাথা নিচু করে, চার বছর পর শুধু নয়, আর ফেরেননি কখনও! কিন্তু, ফুটবল তাঁকে ছাড়েনি, যেমন ছাড়েনি তাঁর গুরু রাইনাস মিশেলকেও। ‘জেনারেল’ বলা হত মিশেলকে, কঠোর শৃঙ্খলার কারণে। কিন্তু, তাঁর শৃঙ্খল ছিল মাঠের বাইরে। মাঠের ভেতরে ফুটবলারদের দিয়েছিলেন অবাধ স্বাধীনতা। এই বৈপরীত্যই তাঁকে আরও মহান করেছিল ‘ছাত্র’দের কাছে। পজেশন, জায়গা তৈরির সৃষ্টিশীলতা আর পাসিং–এর অবাধ বৈচিত্র‌্য ছিল প্রেসিং–এর মূলমন্ত্র। অনেকেই এই ফুটবলকে ‘টোটাল ফুটবল’ বলেন। ‘ভুল’ বলা উচিত হবে না, এতটাই প্রচলিত বলে। কিন্তু, সৃষ্টিকর্তার পছন্দ ছিল ‘প্রেসিং’ নামটাই। ‘টোটাল ফুটবল’ নামটা দেওয়া এক ইংরেজ সাংবাদিকের, মাঠে প্রথমবার মিশেলের দলকে খেলতে দেখে, সব ফুটবলারকে জায়গা এবং ভূমিকা ইচ্ছেমতো বদলাতে দেখে যিনি পরম উৎসাহে নিজের মতো করে নামকরণ করে ফেলেছিলেন এবং পরবর্তীতে ইংরেজ ও ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে ফুটবল–জ্ঞান বাড়ানো যে–প্রজন্মের একমাত্র উদ্দেশ্য, তাঁরা মাথায় তুলে রেখেছেন ওই ইংরেজি টোটালিয়ানা! ফুটবলের উপরিতলের ছাত্র না হলে তা ‘প্রেসিং’ নামেই পরিচিত।

    সর্বার্থে আধুনিক আর যুগান্তকারী এই প্রেসিং ফুটবল, কারণ, ফুটবলই পাল্টে গিয়েছিল মিশেলের পর। কোনও ক্লাবে বেশ কিছু বছর থেকে–যাওয়া আর বেশ কয়েকটা ট্রফি এনে–দেওয়া যে–কৃতিত্বের মাইল দশেকের মধ্যে আসতে পারে না কখনও। মিশেলও তাই পেয়েছিলেন শতাব্দী–সেরা কোচের সম্মান; এরেরা, রাপ্পান বা তাঁদের উত্তরসূরি হয়ে যাঁরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে, তাঁরা নন। ফুটবলকে খাঁচার বাইরে আনার সেই কৌশল আজও, এই প্রায় ৪৪ বছর পরের ফুটবল–বিশ্বে শিরোধার্য। বাকিদের হাতে ফুটবলের টুঁটি–চেপে ধরা ফাঁস। মোরিনিওরা আছেন তো!

    No comments