• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১৬ / উত্তর আমেরিকাতেও ব্রাজিলের পতাকা ওড়ালেন রোমারিওরা/ কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল বিশ্বকাপ? ফিফার কি মাথা–টাথা খারাপ হয়ে গেল? আমেরিকা জানে, ফুটবল খায় না মাথায় দেয়?
    মজার ব্যাপার, ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে আমেরিকা হয়েছিল তৃতীয়। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোয় ইংরেজরাই বেশ হইচই করে আমেরিকার ফুটবলকে নিয়ে এসেছিলেন প্রথম পাতায়। কিন্তু, এ–ও সত্যি যে, ১৯৮৮ সালের ৪ জুলাই ফিফা যখন ঘোষণা করেছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আসর বসবে আমেরিকায়, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল এবং আফ্রিকার মরক্কোকে সবচেয়ে কম (মাত্র দশ) ভোটে হারিয়ে, ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ফিফার দিকে। বিশেষত ইউরোপ, আমেরিকার অর্থনৈতিক দাদাগিরি–র সঙ্গে যাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোনও কালেই ভাল নয়। সুযোগ পেয়ে এমনও লেখা হয়েছিল যে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের বিশ্বকাপ মানে আফ্রিকায় স্কিইং–এর বড় প্রতিযোগিতা!’ ইন্টারনেটে এখন হাতের সামনে সবই মেলে। এই লেখাটি পড়ে ফেলতে পারেন উৎসাহী পাঠক, ওয়েব–ব্রাউজারে লিখে ক্লিক করে — 1994 World Cup USA and the European Response," Written by Kelsey Ontko, Julia Fogleman and Lucas Nevola (2009), Edited and Updated by Daniel Carp (2013), Soccer Politics Pages, Soccer Politics Blog, Duke University, http://sites.duke.edu/wcwp. সন্দেহের লেশমাত্র ছিল না যে, ফিফা আর্থিক সাফল্যকে বড় করে দেখতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে, উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী অঞ্চলে ফুটবলের বিকাশে বিশ্বকাপকেই দেখতে চেয়েছিল একমাত্র অস্ত্র হিসেবে। আর তাই, প্রতিযোগিতা শেষে যখন দেখা গিয়েছিল, ৩৬ লক্ষের বেশি মানুষ টিকিট কেটে খেলা দেখেছেন, ম্যাচ–প্রতি দর্শকের সংখ্যা সব বিশ্বকাপের তুলনায় বেশি, ২১ কোটি মার্কিন ডলার লাভ হয়েছে এবং সবচেয়ে বড়, আগের বারের ইতালি বিশ্বকাপের তুলনায় বেশি গোল হয়েছে (‌১৪১, ইতালিতে সমসংখ্যক ৫২ ম্যাচে গোল ছিল ১১৫)‌ — ফিফাকে আর পায় কে!
    কিন্তু, ফুটবল বিশ্বকাপের সীমানা তো আর কিছু সসীম সংখ্যাতেই আবদ্ধ থাকে না! তার আবেদন বিশ্বজনীন। ঘরে ঘরে আনন্দযজ্ঞে সামিল কোটি কোটি মানুষ। কোনওভাবেই যারা জড়িত নয়, অতি–দূর কল্পনাতেও আসবে না বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সম্ভাবনার কথা, তাঁরাও মেতে ওঠে বিশ্বের বড় বড় ফুটবল খেলিয়ে দেশগুলির সমর্থকদের মতোই। ফিফা বিশ্বকাপ কোনও একটি দুটি বা সাত–আটটি দেশের খেলাও নয় যে, কয়েকটি দেশের টেলিভিশন সংস্থায় দেখা গেলেই হল, অন্য কোথাও না দেখা গেলেও কোনও ক্ষতি নেই! তখনও পর্যন্ত নিয়মই ছিল, দেশের জাতীয় চ্যানেল যা গোটা দেশজুড়ে প্রচারিত হয়, সেই চ্যানেলেই বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর অনুমতি দেওয়া হবে, প্রয়োজনে কম টাকাতেও। তাই দূরদর্শনই ভরসা ছিল ভারতে। কেবল টিভি তখনও ‘ঘর ঘর কি কহানি’ নয়, ডিজিট্যাল, সেট টপ বক্স, হাই ডেফিনিশন — শব্দগুলির অস্তিত্বই নেই টেলি–দর্শকের কাছে, পাঠক সময়টা খেয়াল করবেন প্লিজ! সমস্যা ছিল আমেরিকার সময়। সকাল এগারটায় খেলা না শুরু করলে ইউরোপীয় দেশগুলিতে ঠিক সময়ে খেলা পৌঁছে দেওয়া যাবে না। এশিয়ার দেশগুলিতে আরও সমস্যা কিন্তু এশিয়া তখনও ইউরোপের মতো ফুটবলের ‘বিরাট’ বাজার নয় (‌বছর পাঁচেক পর থেকেই যে–ভাবনায় ভাবিত হতে বাধ্য হতে হবে ফিফাকেও!)‌, তাই এশিয়াকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি তখন। কিন্তু ইউরোপের ড্রইং রুমে ঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়ার স্বার্থে আমেরিকার প্রচণ্ড গরমে দুপুর এগারটা–বারোটায় খেলা শুরু করেছিল ফিফা। লেগে গিয়েছিল দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে, ১৯৮৬–তেই মেহিকোতে যিনি ‘হাই অল্টিচুড’ আর ‘অসময়ে খেলানো’ নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়ে ফিফার চক্ষুশূল হয়েছিলেন প্রথম।
    এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপ শেষবার ২৪ দলের। প্রথম বার বিশ্বকাপে ম্যাচ জিতলে তিন পয়েন্ট আর গোলরক্ষকরা ব্যাক পাস হাত দিয়ে ধরতে পারবেন না। ইতালি বিশ্বকাপের রক্ষণাত্মক খেলার ধরন পাল্টাতে এবং গোলমুখী ফুটবলের দিকে নজর ফেরাতে ফিফার নয়া উদ্যোগ সাফল্য পেয়েছিল, পরিসংখ্যানই বলছে।

     

    প্রথম পর্ব, মারাদোনা

    সবচেয়ে বিতর্কিত এবং প্রচারিত ঘটনায় যাওয়ার আগে ফুটবল–সম্পর্কিত ঘটনায় চোখ ফেরানো জরুরি। রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড তখনও জ্যাকি চার্লটনের প্রশিক্ষণে। এবং নিজেদের গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ইতালিকে ১–০ হারিয়ে শিরোনামে! নিউ জার্সিতে সেই ম্যাচ তখনও পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র সরাসরি জয়, ইতালিকেও প্রথম ও শেষবারের মতো হারানো। আগের বার ভিচিনি ছিলেন এবার ইতালির দায়িত্বে আরিগো সাক্কি। সমস্যা যদিও এক, গোল করার লোকের অভাব। তার ওপর, সাক্কি আবার সিরি আ–তে শেষ দু–বছরের সেরা স্কোরার সিগনোরিকে বাঁদিকের প্রান্তে ব্যবহার করছিলেন। ফলে, ১২ মিনিটে গোল খেয়ে শোধ দিতে পারেনি ইতালি। ‘ই’ গ্রুপে এই দুই দেশের সঙ্গে ছিল মেহিকো ও নরওয়ে। এবং বিশ্বকাপে সেই প্রথম ও শেষবার, একই গ্রুপের চারটি দেশই শেষ করেছিল সমসংখ্যক ৪ পয়েন্টে। গোল–পার্থক্য, চারটি দেশেরই, শূন্য! ফলে, সবচেয়ে বেশি গোল দেওয়ার (‌৩)‌ জন্য মেহিকো শীর্ষে, আয়ারল্যান্ড যেহেতু ইতালিকে হারিয়েছিল, দুটি দেশই দুটি করে গোল দেওয়া সত্ত্বেও ইতালি তৃতীয়, আর মাত্র একটি গোল করায় নরওয়ের বিদায়!
    আর্জেন্তিনা বিশ্বকাপে আসার আগে ৩১ ম্যাচ হারেনি, পরপর দু–বার জিতেছিল কোপা আমেরিকা। কিন্তু, বিশ্বকাপের ঠিক আগে কলম্বিয়ার কাছে ০–৫ হারে ভিত নড়ে গিয়েছিল আলফিও বাসিলের বিশ্বাসের। ডেকে আনা হয়েছিল দিয়েগো মারাদোনাকে আবার, অধিনায়ক হিসেবেই। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নানা ধরনের চিকিৎসা এবং নিজের একান্ত বিশ্বস্ত চিকিৎসকদের অধীনে একা–একা অনুশীলনে ওজন কমিয়ে বিশ্বকাপে ফিরেছিলেন মারাদোনা। প্রথম ম্যাচ ছিল গ্রিসের বিরুদ্ধে এবং বাতিস্তুতার হ্যাটট্রিক ও মারাদোনার গোলে ৪–০ জয় দিয়ে দুর্দান্ত শুরু। পরের ম্যাচে নাইজেরিয়া পরাস্ত ২–১, আর্জেন্তিনার দুটি গোলই কানিজিয়ার। কিন্তু, আসল বোমাটি তারপর। ডোপ–পরীক্ষায় ধরা পড়ে মারাদোনা দেড় বছরের জন্য নির্বাসিত বিশ্বকাপ থেকে। শেষ তাঁর বিশ্বকাপ অভিযান, একই রকম কলঙ্কিত, যেভাবে শেষ করেছিলেন শুরুর বছর ১৯৮২–তে, লাল কার্ড দেখে।
    মারাদোনার আত্মজীবনীতেই ফেরা যাক আবার, এত বড় ঘটনাকে ‘নায়ক’ কী চোখে দেখেন, বুঝতে।
    ‘৫ জুনের বিকেল ভুলব না। ভোলা অসম্ভব। নাইজেরিয়াকে হারিয়েছি, তখনও মাঠেই। নার্স এল, আগেও ডোপ পরীক্ষার জন্য গিয়েছি, হাসতে হাসতেই গেলাম আবার। পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসে সাংবাদিক সম্মেলন এবং যে–সব সাংবাদিকরা ছিলেন সে দিন, সবাই সাক্ষ্য দেবেন ঠিক কতটা হাসিখুশি ছিলাম। চিন্তার কিছু ছিল না, থাকার কথাই নয়। পারফরম্যান্স–বর্ধক ড্রাগ নিইনি জীবনে কখনও, এমনকি যা নিয়ে আগে নির্বাসিত হয়েছিলাম সেই কোকেনও ছুঁইনি বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার দিন থেকে। খামোখা চিন্তা করব কেন? তখন তো উড়ছি, স্বপ্ন দেখছি আবার বিশ্বসেরার, অমন দল নিয়ে যা খুব স্বাভাবিক।
    ‘‘দিন তিনেক পর জমিয়ে আড্ডা মারছিলাম তখন ক্লদিয়া, গোয়কো, ওর বউ আর বাবার সঙ্গে। বাসিলে কয়েক ঘন্টা ছুটি দিয়েছিল। মশগুল সবাই আড্ডায়, এমন সময় থমথমে মুখ নিয়ে ঢুকল মার্কোস। মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল যেন কেউ মারা গিয়েছে! বলল, ‘দিয়েগো, তোমার সঙ্গে কথা আছে, বেরিয়ে এসো একটু’। বেরিয়ে আসছি, কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে তোমার ডোপ পরীক্ষার ফল পজিটিভ। এক্ষুনি বিচলিত হওয়ার কিছু নেই যদিও, এএফএ (‌আর্জেন্তিনীয় ফুটবল ফেডারেশন)‌ দেখছে সব কিছু।’
    ‘‘পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। অন্ধকার দেখছি চোখে, শেষদিকে কী বলেছিল মার্কোস তা–ও শুনতে পাইনি। পেছন ফিরে ক্লদিয়াকে শুধু বলেছিলাম, আমার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল। বলতে বলতেই ঘরে ঢুকে ভেঙে পড়েছিলাম কান্নায়। এত কষ্ট, এত পরিশ্রম — সব জলে। জানতাম এএফএ কর্তারা আমার জন্য কিছু করবে না। সব শেষ!
    ‘‘ডালাসে পরের খেলা ছিল বুলগারিয়ার বিরুদ্ধে। জানতাম খেলব না, তবু গিয়েছিলাম দলের সঙ্গেই। অনুশীলন শেষে ফিরছি, দেখি সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে সবাই। তাদের আগে হুলিও গ্রোন্দোনা। বুঝলাম খবর বেরিয়ে গিয়েছে। সবাই চিৎকার করছিল ‘দিয়েগো, একবার এদিকে এসো’ বলে। শুধু হাত নেড়ে চলে গিয়েছিলাম। রাতে মার্কোসই খবর দিল, দ্বিতীয় পরীক্ষাও পজিটিভ। ঠাণ্ডা স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে। এএফএ বাদ দিয়ে দিচ্ছে আমার নাম, আর্জেন্তিনা দল থেকে। আমি আর বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনা দলের সদস্য নই। চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম, ভয় পাচ্ছিলাম, কিছু না করে ফেলি। ফ্রাঙ্কি আর সিগনোরিনি ছিল সঙ্গে, সারারাত। ক্লদিয়াকে কথা দিয়েছিলাম, পরের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে আর যা–ই করি, কাঁদব না। তাই সব কান্নাই যেন সেই রাতেই শেষ।
    ‘‘আর, ক্যামেরার সামনে গিয়ে যা বলেছিলাম, আজও বলছি তাই–ই। ওরা এক ফুটবলারের পা কেটে নিল!
    ‘‘যে দিন ড্রাগ নিয়েছিলাম, বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, জরিমানা কত বলুন? দু’বছর ধরে ভুগেছি, নিয়মিত গিয়েছি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এখানে সেই সব প্রসঙ্গ কেন? বিচার স্বচ্ছ এবং ঠিক হওয়া উচিত, এখানে অবিচারের শিকার আমি।
    ‘‘হ্যাঁ, এই দশ বছর পরও জোরগলায় বলছি, কোনও পারফরম্যান্স–বর্ধক ড্রাগ নিইনি। জোরে দৌড়নো বা ভাল খেলার জন্য ড্রাগ নিইনি। মাঠে যেভাবে দৌড়তে দেখেছেন, কোনও ড্রাগের প্রভাবে নয়, ফুটবলের প্রতি ভালবাসায়, দেশ ও জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। আর্জেন্তিনায় যে যে ওষুধ খেয়েছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রে সব ওষুধ অত বেশি পরিমাণে নিয়ে যাওয়া হয়নি। একটা ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেরিনি দোকান থেকে ওই ওষুধেরই অন্য একাট ফাইল এনেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ওই ওষুধে কিছু ভেষজ মেশানো হত যা নাকি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এফিড্রিনের জন্ম দেয় শরীরে। এদোয়ার্দো দি লুকা বলেছিল, ওষুধ খেয়ে বিশেষ সুবিধে নেওয়ার চেষ্টা করিনি বলে আর একবার চেষ্টা করবে। কিন্তু, ক্ষমতায় যাঁরা ছিলেন, হাত বড্ড লম্বা তাঁদের।
    ‘‘অন্য একজনের নির্দোষ ভুলের জন্য শুধু আমার নয়, গোটা একটা দেশের স্বপ্ন এবং আশা ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছিল। করেছিল ব্লাটার, আভেলানজের মতো ডায়নোসররা। স্পেনের কালদেয়ারকে যেভাবে ছিয়াশিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, আমাকেও ছেড়ে দেওয়া যেত। কিন্তু, পাঠানো হল দেড় বছরের জন্য নির্বাসনে। আর কী ওষুধের জন্য? না, এফিড্রিন! আমেরিকায় বেসবল, বাস্কেটবল খেলোয়াড়রা যা রোজ নেয়। যে–ওষুধকে আজও পারফরম্যান্স–বর্ধক আখ্যা দেওয়া যায়নি। এমনকি ইতালির যে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা হয়েছিল সেখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।’’
    মারাদোনা এমনই বলবেন, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর্জেন্তিনায় বিশ্বকাপে মারিও কেম্পেসের ডোপ টেস্টের জন্য তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী–র মূত্রের নমুনা পাঠানো হয়েছিল, যা মিলিটারি–জুনতার চাপে চাপা দিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন চিকিৎসকরা। মারাদোনা এখানে নিজেও স্বীকার করেছেন যে, ‘অন্যের’ কারণে ‘তিনি’ নির্দোষ হয়েও দোষী। সমস্যা হল, বিশ্বকাপের আসরে যে–চিকিৎসক ওষুধ কিনছেন তিনি যদি ওষুধের গুণাবলী (‌বা দোষাবলী!)‌ সম্পর্কে অবহিত না হন, সংগঠকরা দোষী হয়ে পড়েন কোন যুক্তিতে? আর, বিশ্বকাপের সময় ওষুধ বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি দেশ থেকে, এমন যুক্তিও কি গ্রহণযোগ্য? কে জানে!
    ‘ট্র্যাজিক হিরো’ নামে বই লিখেছেন আজকাল–এর দেবাশিস দত্ত, বাংলাতেই। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপের সময়। মারাদোনার সঙ্গে তাঁর আলাপ–পরিচয় এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সেই দিনের কথাও লিখেছেন, যে দিন জানা গিয়েছিল ডোপ পরীক্ষায় ধরে পড়েছেন মারাদোনা। দেবাশিস দত্ত–র বই থেকে সেই দিনের কথা, অপরিবর্তিত বানানে —
    ‘‘বিশ্বাসই করতে পারিনি। আমরা, এত দূর থেকে যাওয়া ভারতীয়রাই যখন পারিনি, আর্জেন্টিনীয়রা কী করে পারবেন? ওঁদের তো যেন জীবন থেমেই গিয়েছিল। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় দেখতে এসেছিলেন ওঁরা, শুধুই মারাদোনার জন্য। সেই মারাদোনাই যখন থাকবেন না, বিশ্বকাপ আকর্ষণ হারিয়েছিল তাঁদের কাছে। এক–একজনের মুখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, নিকটাত্মীয়কে হারিয়েছেন। কেউ কোনও কথা বলছেন না। সবাই মিলে দাঁড়িয়ে আছেন হোটেলের সামনে, নিশ্চুপ। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া কাকে বলে, বুঝেছিলাম আরও ভাল করে। শোকে মুহ্যমান, শান্ত। মুখের কথাও যেন কেড়ে নিয়েছে সেই ঘটনা। কারও কোনও দাবি নেই, মুখে কথা নেই, শুধু দাঁড়িয়ে থাকা হোটেলের সামনে, যদি একবার আসেন মারাদোনা। তখনও ৯/১১ হয়নি, তাই মারাদোনা এলেনও। এসে হাত নাড়লেন সমবেত সমর্থকদের দিকে। প্রত্যুত্তর এল। সঙ্গে, কাতর প্রার্থনাও, যেন মারাদোনা থাকেন আমেরিকাতেই, সমর্থন করে যান আর্জেন্টিনীয়দের। তা হলে বাকি ফুটবলাররা বাড়তি মনোবল পাবেন।
    ‘‘ক্রমশ সমবেত সমর্থকদের মুখে কথা ফিরল, ফিরল ‘ওলে ওলে’ গান। সেবারই প্রথম শোনা, ওই আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের মুখে। অদ্ভুত লাগছিল দেখতে। মারাদোনা আর খেলবেন না, সবাই জেনে গিয়েছে। ওঁরা কিন্তু বাতিস্তুতাদের সমর্থন জানাতে আর্জেন্টিনার হোটেলের সামনে জড়ো হননি। এমনভাবে মারাদোনার হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করচিলেন, মনে হচ্ছিল যেন তাঁদের মনের মানুষকে পাহারা দিচ্ছেন। সারারাত জেগে রয়েছেন সবাই, হোটেলের ঘরে হয়ত বিনিদ্র রজনী কাটছিল মারাদোনারও। যে আশা নিয়ে এসেছিলেন আমেরিকায়, যে–স্বপ্ন আবার দেখাতে শুরু করেছিলেন দেশবাসী, বিশ্ববাসীকে, তার এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে, কে জানত?
    ‘‘এই বিশ্ব অনেক শোকের মুহূর্ত দেখেছে। সত্যি কথায়, মানুষকে তো বড়ই হতে হয় বিভিন্ন শোকের মুহূর্ত পেরিয়ে। এই লেখার কিছু দিন আগেই মারা গিয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। তখনও টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ কী করে কেঁদে ভাসাচ্ছেন। কিন্তু, মারাদোনা ডোপ টেস্টে ধরা পড়ার পর যে–দৃশ্য দেখেছিলাম সেই আমেরিকাতেই, কাছাকাছি আর কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
    ‘‘সাংবাদিক সম্মেলনে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন, সেই আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের কাছে। তাঁদের আশা পূরণ করতে পারেননি বলে। নিজের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন। উঠে এসেছিল অবশ্যম্ভাবী যা, ফিফার চক্রান্তের কথা। অনুগামীরা তখনও বিশ্বাস করেছিলেন, এখনও বিশ্বাস করেন তাঁকেই। ফিফাকে সেই জন্যই দেখা হয় সন্দেহের চোখেও। মারাদোনাকে ইচ্ছে করেই ফিফা সেই বার বিশ্বকাপ খেলতে দেয়নি, বদ্ধমূল ধারণা অনুগামীদের।’’
    ব্রাজিল উঠে আসছিল তরতর করে। রাশিয়া এবং ক্যামেরুন, দুটি দলেই ছিল অন্তর্কলহ। যথাক্রমে ২–০ ও ৩–০ জেতে ব্রাজিল, রোমারিওর দুটি গোল। ক্যামেরুনের মিল্লা যেমন সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে মাঠে এসেছিলেন, সঙ সবচেয়ে কমবয়সী হিসেবে লাল কার্ড দেখার রেকর্ডও করেছিলেন ওই ব্রাজিল ম্যাচে। শেষ ম্যাচে সুইডেনের বিরুদ্ধেও গোল রোমারিওর, তবে ড্র। বোঝা যাচ্ছিল, ব্রাজিল সরে এসেছে তাদের ‘সব ভুলে আক্রমণই একমাত্র পন্থা’ নীতি থেকে। মাওরো সিলভা, মার্সিও সানতোস ও মাজিনিও, কার্লোস আলবের্তো পেরিরার প্রশিক্ষণে ব্রাজিল নজর দিয়েছিল রক্ষণেও, তিনকাঠির তলায় ক্রমশ মহীরুহ হয়ে উঠছিলেন তাফারেল।

    নকআউট পর্ব

    আর্জেন্তিনা হেরেই গিয়েছিল মারাদোনার বিদায়ের দিন। তাই ‘রোমানিয়ার মারাদোনা’ হাজি আর দুমিত্রেস্কুর জোড়া গোলে ৩–২ জিতে রোমানিয়া পৌঁছেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। রাদুচিউ সেই ম্যাচে খেলতে পারেননি নির্বাসিত থাকায়। ফলে, দুমিত্রেস্কুর সামনে সুযোগ এসেছিল নিজেকে তুলে ধরার। আর্জেন্তিনায় মারাদোনার অনুপস্থিতিতে কেউই নিজেকে সে ভাবে তুলে ধরতে পারেনি। বার্গক্যাম্প আর ইয়ঙ্কের গোলে হল্যান্ডের তেমন কোনও অসুবিধে হয়নি আয়ারল্যান্ডকে বাড়ি পাঠাতে। নাইজেরিয়া সেবার বেশ ভাল দল। আমাদের কলকাতায় খেলতে শুরু করা এমেকা ইউজিগো ছিলেন সেই দলে। আর তারকা ছিলেন রশিদি ইয়েকিনি, আমুনিকেরা। আমেরিকার গরমে খেলতে কোনও অসুবিধে হবে না এবং আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নাইজেরিয়াকে নিয়ে সে বার বিশেষ প্রত্যাশা ছিল মানুষের। দ্বিতীয় রাউন্ডে অবশ্য তাদের সামনে ইতালি এবং মালদিনির কাঁধে লেগে বল লাফিয়ে চলে গিয়েছিল আমুনিকের কাছে যেখান থেকে পিছিয়ে–পড়া ইতালির। পরে, জোলা লাল কার্ড দেখারও ১২ মিনিট পর বাজ্জিও–র দুরন্ত গোলে সমতা। ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের পায়ে বেঁচে গিয়েছিল ইতালি, আবারও একটি হারের হাত থেকে। পরে, অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে দ্বিতীয় গোল বাজ্জিওর। বুলগারিয়া, যথারীতি, টাইব্রেকারে ন’জনের মেহিকোকে হারিয়ে প্রথম আটে। আর, আয়োজকদের হারিয়ে বেবেতোর গোলে ‘ছেলে–দোলানো’ সেলিব্রেশন শুরু রোমারিও–বেবেতো–মাজিনিওর।
    কোয়ার্টার ফাইনালে অবশ্য অন্য ছবি। ডাচদের বিরুদ্ধে ব্রাজিল। দ্বিতীয় পর্ব থেকেই অধিনায়ক রাই ছন্দহীনতায় বাদ গিয়েছেন দল থেকে, আর সোক্রাতেসের ভাইয়ের পরিবর্তে আর্ম–ব্যান্ড দুঙ্গার হাতে। মাঝমাঠকে আরও দুর্ভেদ্য করতে পেরিরার নতুন চাল। কিন্তু, এই ম্যাচে ব্রাজিলের জয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বেবেতো যখন দ্বিতীয় গোল করছেন, রোমারিও অফসাইড থেকে ডাচ গোলরক্ষক ডি’গোয়ে–র চোখের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বার্গক্যাম্প অদ্ভুত দক্ষতায় বুক দিয়ে বল নামিয়ে তাফারেলকে পরাস্ত করেছিলেন, উইন্টার শোধ করেছিলেন দ্বিতীয় গোলও। কিন্তু, নির্বাসিত লিওনার্দোর জায়গায় খেলতে নেমে ব্রাঙ্কোর ফ্রি কিক এনে দিয়েছিল ব্রাজিলের সেমিফাইনালে যাওয়ার ছাড়পত্র। আর, ফুটবলপ্রেমী অনেকেই আনন্দিত হয়েছিলেন বুলগারিয়ার কাছে জার্মানির হারে। ম্যাথাউস পেনাল্টিতে এগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্রি কিক থেকে স্টোইচকভের, আর পরে লেচকভের গোল, জার্মান পেশাদারিত্বকে হারিয়ে বিদায় দিয়েছিল বিশ্বকাপ থেকে, সেবারের মতো। সুইডেন–রোমানিয়া টাইব্রেকারে ব্রোলিনদের পক্ষে।
    সেমিফাইনালে ব্রাজিল–সুইডেন আর ইতালি–বুলগেরিয়া। বাজ্জিওর জোড়া গোল, যার মধ্যে প্রথমটিকে এখনও ক্লাসিক বলা হয়। থ্রো থেকে বল পেয়ে, গায়ের ওপরের ডিফেন্ডারকে টার্ন–এ এড়িয়ে, আরও খানিকটা এগিয়ে সোয়ার্ভিং শট রেখেছিলেন দূরের পোস্টে, বুলগারিয়ার গোলরক্ষকের যা ধরার ক্ষমতা ছিল না। চার মিনিট পরই আবার গোল। পেনাল্টি পেয়ে স্টোইচকভের গোলে ১–২ করলেও ইতালি আর কোনও সুযোগ দেয়নি। অন্য সেমিফাইনালে অবশ্য ব্রাজিলকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেকক্ষণ। ব্রোলিন–ডালিন–থার্ন–কেনেথ অ্যান্ডারসন, হলুদ জার্সির সুইডেন তখন ‘ইউরোপের ব্রাজিল’। কিন্তু, মাঠে ম্যাচটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্রাজিল বনাম রাভেলি, সুইডেনের গোলরক্ষকের। দুঙ্গাকে ফাউলের জন্য থার্নের লাল কার্ড দেখা নিয়ে ব্রোলিন ম্যাচের পর খাপ্পা হয়ে ফিফায় ব্রাজিলের ‘প্রভাব’ দেখতে পেয়েছিলেন! কিন্তু, লাল কার্ড দেখার জন্য সুইডিশ অধিনায়ক নিজেই যদি উতলা হয়ে থাকেন, রেফারির আর দোষ কী? রোমারিওর পঞ্চম গোল প্রতিযোগিতায়, সত্তরের ফাইনালের পুনরাবৃত্তি।



    ফাইনাল

    ‘বাজ্জিওর কিছু করার নেই, এই বিশ্বকাপ রোমারিও–র’, ১৫ জুলাই, যুগান্তর কাগজে, এই শিরোনামে লিখেছিলেন ফুটবল–বিশেষজ্ঞ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, ফাইনালের প্রিভিউতে। সেই প্রিভিউ–র কিছু অংশ তুলে দেওয়া যাক —
    ‘‘ব্রাজিল নাকি এবার শুধুই মনোরঞ্জনী ফুটবল খেলে হারতে আসেনি। ঠিকই, আক্রমণ–রক্ষণে তারা অসামান্য ভারসাম্য অর্জন করেছে। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্য যে, প্রতিযোগিতার সবচেয়ে অনুমানসম্পন্ন, দক্ষ ও নিশ্ছিদ্র রক্ষণ ব্রাজিলেরই। এমনকি দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়দের নিয়েও। হল্যান্ডের সৃষ্ট প্রচণ্ড চাপের মুখেও তারা বিপক্ষকে একটাও ওপেনিং দেয়নি। আর তাদের মাঝমাঠের বল জেতাটা তো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। মাঝমাঠের মতো একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে কী অসাধারণ দক্ষতায় মাউরো সিলভা, দুঙ্গা, জিনোরা একটা টাইট এরিয়া বানিয়ে ফেলেছে তা দেখছি আর স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি। অবশ্যই এটা প্রেসিং ফুটবলের একটা লুজ ভ্যারিয়েশন যেখানে জোনালিটি বা আঞ্চলিকতা বজায় রেখে গোটা ব্যাপারটা সম্পন্ন হচ্ছে অত্যন্ত মসৃণভাবে। মাঝমাঠের মতো একটা খোলা জায়গায়, যেখানে কমিট করলে কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেখানে যে ট্যাকলিং ব্যাপারটা একটা শিল্পের পর্যায়ে যেতে পারে তা এভাবে না দেখলে হয়ত বিশ্বাস হত না।’ আর বাজ্জিওকে পরিষ্কারই বলে দেওয়া হয়েছিল, ‘খুব সম্ভবত এই বিশ্বকাপের নাটকে আপনাকে সহনায়কের ভূমিকাতেই থেকে যেতে হবে। কারণ এটা রোমারিওর বিশ্বকাপ হচ্ছে। আপনি বড় ফুটবলার। যেমন প্লাতিনিও ছিলেন, তবু ’৮৬’র বিশ্বকাপ প্লাতিনির ছিল না, ছিল মারাদোনার। এতে আপনার কোনও ক্ষতি হবে না কিন্তু ফুটবলের লাভ হবে। ব্রাজিল, এবার সত্যিই, আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, কাপ জেতার ফুটবল খেলেছে। অন্যদিকে আপনার এই দলটার ট্রফিটা ছোঁয়ার কী অধিকার আছে বলুন তো?’
    সত্তরের পর আবার ফাইনালে ব্রাজিল ছিল সেই একই বিপক্ষের মুখোমুখি। কিন্তু, ২৪ বছরের খরা কাটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্রাজিল সেবার আঁটোসাটো বেশি। এতটাই যে, গ্ল্যানভিল ‘কোট’ করেছিলেন বেলো ওরিজোন্তের রেডিও রিপোর্টার চিকো মাইয়াকে, যিনি বলেছিলেন, ‘We journalists consider it an error to Europeanise the play of our national team. We have a tradition, a credibility and we are not disposed to sell if off or bargain it away.’ তিনি এবং তাঁর মতো অনেকেই নাকি চেয়েছিলেন ব্রাজিল ‘হেরে যাক, এই ফুটবল খেলার চেয়ে।’
    ফাইনাল হিসেবে বেশ জোলোই। কোনও দলই গোল করতে পারেনি। বাজ্জিও নিজে আহত ছিলেন, কিন্তু জোর করেই খেলেছিলেন। কোস্তাকুর্তা ছিলেন না বলে বারেসি ফিরে এসেছিলেন, প্রথম ম্যাচের পর শেষ ম্যাচে, মাঝে আবার হাঁটুতে অপারেশন করিয়ে। কী করে মাঠে ছিলেন জানা নেই, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে বেকেনবাওয়ারের পর সেরা সুইপার বেবেতো–রোমারিও টেলপ্যাথিক যোগাযোগের রাস্তাটাই কেটে দিয়েছিলেন ফাইনালে। তবুও মাউরো সিলভা, মাজিনিওরা সুযোগ পেয়েছিলেন, এমনকি রোমারিও–ও। কখনও পাগলিউকা, কখনও নিজেদের দোষেই সুযোগগুলো হারিয়েছিল ব্রাজিল। অতিরিক্ত সময়েও গোল করতে না পারায় শেষে টাইব্রেকার আবার, প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে। ইতালি আগের বিশ্বকাপে নিজেদের দেশে বিদায় নিয়েছিল সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে। এবার ফাইনালে টাইব্রেকার এবং রোবের্তো বাজ্জিও শেষ শট নিতে যাওয়ার আগে ব্রাজিল এগিয়ে ৩–২। ‘দ্য ডিভাইন পনিটেল’ বাজ্জিও বল ওড়ালেন বারের ওপর দিয়ে। দুপাশে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে দুজন — একজনের হাতজোড়া আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ, তাফারেল; অন্যজনের হাত ঢেকেছে মুখ, পেছনে দুলছে পনিটেল, বাজ্জিও।
    আহত ক্লান্ত, শ্রান্ত বাজ্জিওর বোধহয় সত্যিই কিছু করার ছিল না, এই বিশ্বকাপটা আসলে যে ছিল রোমারিও–র!



    পোস্ট স্ক্রিপ্ট

    ‘ফ্যান’ শব্দের উৎপত্তি না কি ‘ফ্যানসি’ থেকে, পরে ‘টিক’ জুড়ে বোঝানো হয়ে থাকে ফ্যান–দের আচরণ, ‘ফ্যানাটিক’। এই ‘টিক’–এর আগমন কি ইংরেজির আর এক শব্দ ‘লুনাটিক’ থেকে? কে জানে! পাগলামি না থাকলে আর ফ্যান কেন?
    কিন্তু, কোনও কোনও সময় এই পাগলামি জীবনঘাতী। দল বা ব্যক্তির প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁদের এত, এতটাই মিশে যান জয়–পরাজয়ের সঙ্গে, খেলা তখন তাঁদের কাছে সত্যিই ‘জীবন–মরণ’। মনে রাখতে ভুলে যান, দিনের শেষে খেলা আসলে খেলাই, বিনোদন। কোনও কোনও সমর্থকের দল আবার পরাজয়ের ‘রাগ’ বা ‘জ্বালা’ মেটাতে হাতে তুলে নেন অস্ত্র, ঝাঁপিয়ে পড়েন বিপক্ষ সমর্থকদের ওপর। গুলি ছোটে, ছুরি চলে, বোমাবাজি, ছিনতাই, কিছুই বাদ যায় না সেই ‘ফ্যানাটিক–লুনাটিক’–দের। এঁরা নিন্দনীয়। ‘ফ্যান’ বা ভক্ত–এর সঙ্গে ‘শক্ত’ বা ‘রক্ত’–এর সম্পর্ক নেই কোনও। আদর্শ ভক্ত তিনিই, দলের জয়ে যিনি উৎফুল্ল হবেন, হারে ক্ষুব্ধ বা দুঃখিত, রাগ হতে পারে, অভিমানও। প্রতিশোধস্পৃহা তাঁর থাকবে কেন? পরের বার আরও ভাল খেলে জেতার শপথ যেমন খেলোয়াড়রা নেন, ভক্তও নেবেন না কেন? কেন তাঁকে হাতে তুলে নিতে হবে অস্ত্র?
    বিশ্ব কেঁদে ফেলেছিল তাই আন্দ্রে এসকোবারের ঘটনায়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া খেলতে গিয়েছিল অন্যতম ফেবারিট হিসেবে। কিন্তু, হেরে যায়। গ্রুপের ম্যাচে আয়োজক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসকোবারের আত্মঘাতী গোলে হার এবং পরে বিদায়। দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়। স্বাভাবিক। লাতিন আমেরিকার ছোট দেশ কলম্বিয়া, মহাদেশের অন্যান্য দেশগুলোর মতোই নিত্যকার দারিদ্রনির্ভর জীবনযাত্রা থেকে একটু আনন্দের মুক্তি চেয়েছিল ফুটবলে। ফুটবলাররা পারেননি। যে কোনও দেশের সংবাদমাধ্যমই অনুরূপ পরিস্থিতিতে একই আচরণ করত, কলম্বিয়ার প্রচারমাধ্যমও করেছিল। অসুবিধে কোথায়, কেন?
    সমস্যা অন্য জায়গায়। কলম্বিয়ার ড্রাগ–মাফিয়ারা বিশ্বকুখ্যাত। বিশ্বকাপের আগে তাঁরা প্রচারমাধ্যমের প্রশংসায় প্রভাবিত হয়ে প্রচুর ডলার বাজি ধরে ফেলেছিলেন, কলম্বিয়ার বিশ্বজয়ের পক্ষে। কলম্বিয়া হেরে যাওয়ায় তাঁদের সব রাগ গিয়ে পড়ে সেই সব ফুটবলার ও কোচের ওপর। এসকোবার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে রেঁস্তোরায় গিয়েছিলেন খেতে। বাইরে বেরিয়ে আসার পর, ২ জুলাই, ১৯৯৪ গভীর রাতে তাঁকে ঘিরে ফেলে সেই দুষ্কৃতীরা। মাত্র, হ্যাঁ মাত্রই, বারোটি বুলেট গেঁথে দেওয়া হয় তাঁর শরীরে, পয়েন্ট–ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রতিবারই বুলেট ছোড়ার পর ‘আত্মঘাতী গোলের জন্য ধন্যবাদ’ বলে চিৎকার করেছিল আততায়ী। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ চেঁচিয়ে ছিলেন ‘গোল’ বলে, কেউ কেউ আবার ‘জাস্টিস’ বলেও। সুবিচার? বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে নিন্দা করার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছিল বিশ্বকাপ চলাকালীন। সবে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপে, তারই মাঝে এসেছিল এমন স্তব্ধ করে দেওয়ার খবর।
    এসকোবারের হত্যাকাণ্ডের পর ফুটবল আর ফুটবল ছিল না, একমত হতে দ্বিধা করেনি বিশ্ব।

    (আগামিকাল ১৯৯৮ বিশ্বকাপ)

    No comments