• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৩/‌ মুসোলিনির ভয়ে ফিফা চুপ /‌ কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    ফাসিস্ত ইতালিমুসোলিনির ইতালিরঙ্গমঞ্চের ইতালিফুটবলের ইতালি!

    অ্যাডলফ হিটলারের বছর দশেক আগে থেকে ক্ষমতায় থাকা বেনিতো মুসোলিনির দেশকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া উচিত কিনাদ্বিধায় ছিল ফিফাও। আটবার তাই বিশেষ বৈঠক। শেষ পর্যন্ত ১৯৩২ ফিফা কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।

    উরুগুয়ে বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছিলঠিকঠাক এগোলে অংশগ্রহণকারী সব দলের খরচ মিটিয়েও লাভ ভালই করা যায়। মুসোলিনির তাই সহজ দুই লক্ষ্য — বিশ্বকে বোঝানো তাঁর সরকার ভালভাবেই দেশ চালাচ্ছে এবং লাভের বিরাট অঙ্ক।

    সমস্যা হলবিশ্বকাপ ইউরোপে পৌঁছনমাত্র ৩২ দেশ আগ্রহী হয়ে পড়ল খেলতে। ফলেকোনও এক শহরে আর বিশ্বকাপকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় নিশ্চিত হয়ে গেল যেমনসংগঠকরাও বাধ্য হলেন বাছাইপর্বের খেলার আয়োজনে।

    এখন যা ভাবাই যায় নাসেবার আয়োজক ইতালিকেও খেলতে হয়েছিল বাছাইপর্বে। গ্রিসকে ০৪ উড়িয়ে দিয়ে মূলপর্বে গিয়েছিল ভিত্তোরিও পোজোর ইতালি।

    পোজো এবং উগো মেজলসে সময় ফুটবল বিশ্বের দুই বন্দিত কোচ বা ম্যানেজার। ট্যাকটিসিয়ান হিসেবে তত খ্যাতি ছিল না পোজোরম্যানেজার হিসেবে দল চালানোয় অবশ্য অনন্য। তাঁর সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং সেন্টার হাফের সম্পর্ক খারাপ। কোমিশারিও তেকনিকো’ (‌Commissario tecnico) পোজোর নিয়মে দুজনকে থাকতে হল এক ঘরে। মারামারিকাটাকাটিফাটাফাটিযাই হোকঘরের ভেতর। মাঠে বোঝাপড়া বাড়াতেই হবেহলও! এছাড়াওসেই গত শতাব্দীর তিনের দশকেই পোজো ভেবে ফেলেছিলেন প্রান্ত বদলে বিপক্ষকে চমকে দেওয়ার কথা। শুধু ভাবেননিকরেও দেখিয়ে ছিলেন ১৯৩৪ বিশ্বকাপের প্রথম এবং শেষ ম্যাচে। সিয়াভিও এবং গুয়াইতার প্রান্ত বদলে দিয়েছিলেনফলে ফাইনালে দিশাহীন বিপক্ষ চেকোস্লোভাকিয়া। আজ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে প্রেসিং ফুটবলের ৪৮ বছর পরপ্রান্ত বদলানো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুসেই ১৯৩৪ সালে কোথায় রাইনাস মিশেল!

    অস্ট্রিয়ার ওয়ান্ডারটিম’ তৈরি মেজলের হাতে। কর্মসূত্রে ইংল্যান্ডে এসে সেখানকার লাইন বরাবর সোজা দৌড় এবং উঁচু করে তোলা বল দেখতে দেখতে একঘেয়েমির শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া এবং সেই নতুন কিছুর ভাবনায় পাগলামি ভরা দিনগুলোর কথা মেজল লিখে গেছেন ফুটবলছাত্রের অবশ্যপাঠ্য সকার রেভলিউশনবইতে। অস্ট্রিয়ার ‘Wunderteam’ হয়ে ওঠার রহস্য জানতে তাঁর দ্বারস্থ হতেই হবে। আসলেগত শতাব্দীর তিনের দশক ফুটবলভাবনায় অন্তঃসত্ত্বা। হাইবেরিতে সেই সময় ভেবেই চলেছেন হারবার্ট চ্যাপম্যানসেন্টার হাফকে একটু নিচে নামিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে দুদিকে আরও সরিয়ে দিলে কেমন হয়বিপক্ষের দুই ইনসাইড ফরোয়ার্ডের কাজ কি তা হলে আরও কঠিন হয়ে যাবে নাথার্ডব্যাক সিস্টেম আসছেঅফসাইড নিয়ম পাল্টেছেহাডার্সফিল্ড থেকে ২৫ ভেঙে থার্ড ব্যাকএনেছেন চ্যাপম্যানপেয়ে গেছেন স্যর অ্যালেক্স জেমসকেব্রিটিশ ফুটবলে চলছে আর্সেনালের দশকফুটবলে প্রথম ট্যাকটিকাল ইনোভেশন’–এর যুগ। তবুও১৯৩৪ বিশ্বকাপেও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের কোনও দল যোগ দেয়নি। বাছাইপর্বে অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশের মধ্যে ২২ দেশ ইউরোপেরআমেরিকার ৮ দলআফ্রিকা ও এশিয়া থেকে একটি করে দেশ। মূলপর্বে আফ্রিকা থেকে প্রথম দেশ খেলল বিশ্বকাপে মরক্কো।

    যায়নি উরুগুয়েও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেই প্রথম (‌এবং শেষবারও!)‌ কোনও দেশ বিশ্বজয়ী খেতাব ধরে রাখতে উৎসাহ দেখায়নি। তাঁদের দেশে খেলতে আগ্রহী নাহওয়া ইউরোপীয় দেশগুলিকে জবাব দেওয়ার প্রশ্ন তো ছিলইউরুগুয়ের সেরা দলও তখন ভেঙে গিয়েছে। তা ছাড়ানকআউট প্রতিযোগিতা। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে একটা ম্যাচ খেলার জন্য যাওয়া কঠিন। ব্রাজিলআর্জেন্তিনার যেমন হয়েছিল। ৮০০০ মাইল গিয়ে একটি করে ম্যাচ খেলে হেরে আবার ৮০০০ মাইল পাড়ি জমানো — তখনকার হিসেবে পরিশ্রম প্রচুর।

    [caption id="attachment_4221" align="aligncenter" width="1280"] বিশ্বকাপ দেখেছিল ফুটবলারদের নাৎসি স্যালুটও[/caption]

    মুসোলিনির প্রভাবে ফিফাও বিশেষ কথা বলেনি তখন। পোজোর দলে বেশ কয়েকজন বিদেশি ছিলেনবিশেষত আর্জেন্তিনা থেকে। সবার আগে মন্তি। উরুগুয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার হয়ে ফাইনালে হারার পর মন্তি যোগ দেন পোজোর দলে। দুই বিভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড আর কারও নেই। জুভেন্তাসকে চারবার ইতালীয় লিগ এনে দেওয়ার পর পোজোর দলে মন্তির জায়গা নিয়ে সংশয় ছিল না। গুয়াইতাস্কোপেলিওরসি–‌রাও ছিলেনসঙ্গে ব্রাজিলের ফিলোউরুগুয়ের মাসেরোনি। জানতেনউইঙ্গার সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথদক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু ফুটবলার দলে নেওয়া। ফিফা চুপ করে ছিল। ইতালীয় ভাষায় বলা হতওরিউন্দি’ (‌Oriundi)। ভিনদেশি তাঁদের অনেককেই সেনাবাহিনীর জন্য ডাকা হয়েছিল। পোজো তাই পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘If they can die for Italy, they can play for Italy.’

    প্রাথমিক রাউন্ডেই বড় দলগুলিকে জয় পেতে ঘাম ঝরাতে হয়েছিল বেশ কয়েকটি ম্যাচে। চেকদের সমস্যা বাড়িয়েছিল রোমানিয়া (‌২১)‌অস্ট্রিয়াকে শেষ পর্যন্ত লড়তে বাধ্য করেছিল ফ্রান্স (‌৩২)‌স্পেনের কাছে ব্রাজিলের হার ৩সুইটজারল্যান্ড ৩২ জিতেছিল হল্যান্ডের বিরুদ্ধেএকই ফলে সুইডেন হারিয়েছিল আর্জেন্তিনাকে,হাঙ্গেরিমিশর ৪জার্মানিবেলজিয়াম ৫ইতালিযুক্তরাষ্ট্র ৭১!

    কোয়ার্টার ফাইনালের চার ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি। জার্মানিবেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়াহাঙ্গেরি ২চেকরা ৩২ জিতেছিল সুইটজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সবচেয়ে সমস্যায় আয়োজকরা। স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম দিন ১বিশ্বকাপের প্রথম রিপ্লে ম্যাচে শেষ পর্যন্ত মেয়াজার গোলে ইতালি সেমিফাইনালে।

    চেকোস্লোভাকিয়া ৩১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে সহজে ফাইনালে পৌঁছলেও ইতালিঅস্ট্রিয়া ম্যাচ নিয়ে ফুটবল বিশ্ব আলোড়িত হয়েছিল। এখন খেলা হলে দুই কোচের লড়াইঅর্থাৎ পোজো বনাম মেজল’ নাম দিয়ে দেওয়া হত। বিশ্বকাপের আগেই ওয়ান্ডারটিম ৪২ হারিয়েছিল ইতালিকে। বিশ্বকাপে অবশ্য প্রতিশোধ নেয় ইতালি। সান সিরোয় গুয়াইতার একমাত্র গোলে কোনওরকমে জিতে ফাইনালে আয়োজকরা।

     

    ফাইনাল

     

    এবার আর প্রাণের ভয় ছিল না মন্তির!

    দুই গোলরক্ষকঅধিনায়কের প্রথম এবং শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ইতালির নেতৃত্বে কোম্বিচেকদের প্ল্যানিকা। অর্থাৎ একজন গোলরক্ষক অধিনায়কের হাতে প্রথমবার বিশ্বকাপ উঠছেনিশ্চিত ছিল ম্যাচের আগেই। ম্যাচ শেষে তা ওঠে কোম্বির হাতে। পরে১৯৮২ সালে ইতালিরই দিনো জোফ এবং ২০১০ সালে স্পেনের ইকের কাসিয়াসগোলরক্ষকঅধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন বিশ্বকাপ।

    ড্রাগের প্রভাবও ছিল সেই ১৯৩৪ ফাইনালে। ফেরারিসএর সঙ্গে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছিল পুককে। বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুকের নাকের সামনে ধরা হয়েছিল অ্যামোনিয়ার পুঁটলি। চেগে উঠে মাঠে নেমে নেইয়েডলির পাস ধরে মোনজেগলিওর ট্যাকল পেরিয়ে নিচু শটে সমতা ফিরিয়ে ছিলেন পুক।

    অতিরিক্ত সময়ে পোজোর মাস্টার স্ট্রোকসিয়াভিও এবং গুয়াইতাকে প্রান্ত বদলাতে বলা। চেকরা খেয়ালই করেনি। তাঁদের সেন্টার হাফ কাম্বাল ওপরে উঠে খেলতেই পছন্দ করতেন। তাইমেয়াজা যখন গুয়াইতাকে খুঁজে পেলেন ৯৫ মিনিটেকাম্বাল ধারেকাছে নেই। গুয়াইতা বল ধরে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে আবিষ্কার করলেন যেন,সিয়াভিও আছেন অরক্ষিত। ২১ করতে ভুল করেননি সিয়াভিও।

    ফাসিস্তরা এই জয়ের কথা ফলাও করে তাঁদের পুস্তিকায় প্রচার করলেওইতালিতে বিশ্বকাপ খুব উঁচু মানের ফুটবল দেখায়নিসন্দেহ ছিল না কোনও বিশেষজ্ঞেরই। এমনকিযোগ্য দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়নিএমন কথাও বলেছিলেন কেউ কেউচুপিসারে। মুসোলিনির ভয়ে জোরে বলার ক্ষমতাও ছিল না কারও।

    কিন্তুচার বছর পরই যোগ্যতা সম্পর্কিত সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছিল পোজোর ইতালিফ্রান্সে গিয়ে!

    (‌‌আগামিকাল ১৯৩৮ ফ্রান্স)‌

    No comments