• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৮ / গারিনচার বিশ্বকাপ / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    এলেনিও এরেরার হাড়–হিম করা কাতানেচিও আছে, তবু তৃতীয় ম্যাচ থেকে পেলে–হীন ব্রাজিলের টানা দ্বিতীয় বার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল, ফুটবলে জয় বেশিরভাগ সময়ই ইতিবাচক শক্তির।

    কিন্তু, একইসঙ্গে ফুটবলের ভবিষ্যৎ যে উত্তর ইউরোপীয় শরীর–নির্ভরতার দিকে প্রবল বেগে দৌড়চ্ছে, পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল জলের মতো।

    ১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ সালে ইতালি টানা দুবার জেতার পর আর কোনও দেশ টানা দুবার বিশ্বকাপ জিতবে, ভাবা যায়নি। ইতালি তা–ও দুবারই জিতেছিল নিজেদের মহাদেশ ইউরোপে — নিজেদের দেশে প্রথম বার, কাছেই ফ্রান্সে পরের বার। ব্রাজিল প্রথমে সুইডেনে। এখনও পর্যন্ত ওই একবারই কোনও দক্ষিণ আমেরিকান দলের ইউরোপে বিশ্বকাপ জয়। তাই ইতালির তুলনায় ব্রাজিলের কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে বেশি।

    চিলেকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়েছিল ফিফাকে। ঠিক দুবছর আগে বিরাট ভূমিকম্পে চিলে প্রায় শ্মশান। কিন্তু, টানা দুবার ইউরোপে বিশ্বকাপ (‌সুইটজারল্যান্ড, সুইডেন)‌ আয়োজিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ আমেরিকার কোনও দেশকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি ছিল। আর, সবার বিরোধিতার মাঝে চিলের ফুটবল সংস্থার সভাপতি কার্লোস দিতবর্ন ফিফার সভায় যা বলেছিলেন, অমরত্ব পেয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে। ‘চিলেকেই বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া উচিত কারণ আমাদের আর কিছুই নেই।’ (‌We must have the World cup because we have nothing.)‌

    প্রেক্ষাপটে কাতানেচিও

    জন্মসূত্রে আর্জেন্তিনীয়, ছিলেন বার্সেলোনায়। ১৯৬০, এলেন সান সিরোয়, ইন্তার মিলানে। ইতালীয় ফুটবল এগোতে শুরু করল ঋণাত্মক দিকে!

    এলেনিও এরেরার নাম শুনলেই বুক কেঁপে যেত ফরোয়ার্ডদের। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ৪–২–৪ খেলে গোটা বিশ্বকে বাধ্য করেছিল ওই ছক মেনে ফুটবল খেলতে। তার ঠিক আগে, ১৯৫৪ বিশ্বকাপ আবার উত্তর ইউরোপীয় ‘হাই ওয়ার্করেট’ ফুটবলের আদর্শ খুঁজে পেয়েছিল পশ্চিম জার্মানির কাছে। ইংরেজ প্রচার মাধ্যমের ঢক্কানিনাদে মেহনতি ফুটবলের গৌরবগাথা প্রচারিত বিশ্বজুড়ে। ইতালি পড়েছিল দ্বিধায়।

    এমনিতে দক্ষিণ ইউরোপীয় ফুটবল উত্তরের সম্পূর্ণ আলাদা। ‘বিল্ড আপ’ বলে উত্তরে কিস্যু নেই। বল পেলেই সরাসরি উঁচু করে বিপক্ষ রক্ষণে পাঠিয়ে দাও, কিছু একটা ঠিক হয়ে যাবে মনোভাব। স্কিলের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে না বলে খেলায় গতি বাড়ানোর চেষ্টায় বল ছাড়া খেলা শুরু এবং সে জন্য লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল কত তাড়াতাড়ি বল বিপক্ষ বক্সে পাঠানো যায়। মাঝে, অর্থাৎ মিডল থার্ডে বল পায়ে ছোট পাস অর্থহীন, সময় নষ্ট। দক্ষিণ ইউরোপ কিন্তু মিডল থার্ডে এই বিল্ড আপ–এ বরাবর বিশ্বাস করে এসেছে। সে ফ্রান্স হোক, কিংবা স্পেন বা ইতালি। মিডল থার্ডে এই ‘স্লো বিল্ড আপ’ তাদের অ্যাটাকিং থার্ডে ইচ্ছেমতো প্যাটার্ন খেলা বা গতি বাড়ানোর ‘লঞ্চিং প্যাড’ হিসেবে ব্যবহৃত হত। ইতালিও বিশ্বাস করে এসেছিল এই একই পদ্ধতিতে যা তাদের দুর্দান্ত টেকনিকসম্পন্ন এবং ট্যাকটিকালি ওয়াকিবহাল ফুটবলারদের সাহায্য করত আরও ভাল ফুটবল খেলতে।

    এরেরার আগমনের পর চার ডিফেন্ডারের পেছনে বরফ–জমাট আর্মান্দো পিচি, গোল খাওয়া ভুলে গেল ইন্তার। সঙ্গে পাগল করে তুলল গোটা ইতালিকে। যেন এই সোনার কাঠির অপেক্ষাতেই ছিল ইতালি। রক্ষণ, রক্ষণ আর রক্ষণ। মাঝে মাঝে প্রতি–আক্রমণ। প্রতিপক্ষ যখন বেসামাল, হঠাৎ ঝড় তোলা, হারানো গতি ফিরিয়ে আনা আক্রমণভাগের ফুটবলারদের। ম্যাচে দুই বা তিনবার প্রতি–আক্রমণে উঠে এক গোল, তারপর কাতানেচিও তো আছেই। আসুক আক্রমণ। ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাবে ওই দেওয়ালে। এরেরার জয়জয়কারে ইতালি উত্তাল।

    প্রাথমিক পর্ব

    ব্রাজিলের গ্রুপে ছিল চোকোস্লোভাকিয়া, স্পেন এবং মেহিকো। এবং ব্রাজিলের কোচ আইমোর মোরেরা বলে দিয়ে ছিলেন, ‘যত ভয় চেকদেরই। অ্যাথলেটিক প্রত্যেকে,পরিশ্রমী, হাল ছাড়ে না। তাছাড়াও টেকনিকের দিক দিয়েও বেশ ভাল, আমাদের যথেষ্ট বেগ দেবে।’ গ্রুপ লিগে চেকরা কিন্তু সত্যিই গোল দিতে দেয়নি বিশ্বসেরাদের।

    জোসেফ ম্যাসোপুস্ত ছিলেন চেকদের মাঝমাঠের বাঁদিকে। ছোট চেহারা, অদ্ভুত বল কন্ট্রোল, রক্ষণচেরা থ্রু বাড়াতে ওস্তাদ। সঙ্গে স্কেরারের মতো স্কোরার। গোলে উইলিয়াম স্ক্রোইফ, রক্ষণে প্লাসকাল এবং টাকমাথা পপ্লুহার। চেকদের আরও সুবিধে, দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই খেলতেন ডুকলা প্রাগের হয়ে। আপাত কম গতি আসলে তাঁদের স্ট্র‌্যাটেজি, প্রয়োজনে সেই গতিতেই খেলতে পারতেন যে গতি সর্বোচ্চ ফুটবলে প্রয়োজনীয়।

    মেহিকোকে দুগোলে হারানোর পর চেকদের বিরুদ্ধে পেলে চোট পেলেন। কুঁচকির চোটে ভুগছিলেন বেশ কিছু দিন ধরেই। দলের চিকিৎসকের কাছে চোট লুকিয়েই খেলতে এসেছিলেন। মেহিকোর বিরুদ্ধে তিনজনকে কাটিয়ে দুর্দান্ত গোল ওই চোট নিয়েই। কিন্তু, চেকদের বিরুদ্ধে আর পারেননি। চলতি বলে পা বাড়াতে গিয়ে আবার চোট লাগে, ম্যাচের বাকি সময় সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেন। ফুটবলে তখন গা–জোয়ারি খেলার চল এসেছে। কিন্তু, পেলেকে ওই অবস্থায় দেখে চেকদের দুই ফুটবলার প্লাসকাল এবং পপ্লুহার কড়া ট্যাকল করেননি, পেলে যে জন্য প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন দুজনের। আত্মজীবনীতেও লিখেছেন, ‘one of those things I shall always remember with emotion, and one of the finest things that happened in my entire football career.’

    পেলের অবর্তমানে আমারিলদো স্পেনের বিরুদ্ধে দলকে জেতান দু’গোল করে। স্পেনেই কোচ ছিলেন এরেরা। রেয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে যে ইন্তার মিলানের সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল ইউরোপীয় কাপের পর, সেই ইন্তারের কোচ। ফলে দিস্তেফানো আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, চিলেতে গেলেও যাবেন দর্শক হিসেবেই, খেলবেন না। পুসকাস ফিরেছিলেন বিশ্বকাপে আবার, এবার স্পেনের হয়ে। কিন্তু, চেকোস্লোভাকিয়া এবং ব্রাজিলের কাছে হেরে এবারও স্বপ্ন সফল হয়নি গ্যালপিং মেজরের।

    ইংল্যান্ড ৩–১ আর্জেন্তিনাকে হারালেও উইন্টারবটমের শেষ বিশ্বকাপে দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরাট আশা ছিল না। কিন্তু, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ইংল্যান্ড উঠে আসছিল, সম্ভাবনা দেখাচ্ছিল আরও বড় হওয়ার। ইতালি, উরুগুয়ে দুই প্রাক্তন বিশ্বসেরা দেশ অবশ্য পড়তির দিকে। বরঞ্চ দুর্দান্ত খেলছিল যুগোস্লাভিয়া। জার্মানরাও কাতানেচিও তুলে এনেছিল নিজেদের খেলায়, পেশিবহুলতার প্রদর্শনী। তবে, বারবার কি আর ফাইনাল খেলা যায় সেভাবেই?

    কোয়ার্টার ফাইনাল

    চিলের বিরুদ্ধে রাশিয়া এবং দুবারই আয়োজকদের গোলের সময় লেভ ইয়াসিন ভুল জায়গায়। এমনও হয়!

    যুগোস্লাভিয়া টানা তৃতীয় বার শেষ আটে জার্মানদের মুখোমুখি এবং তৃতীয় বারে সফল জার্মানদের ছিটকে দিতে। কোচ জানিয়ে দিয়েছিলেন, জার্মানদের আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর দলের আছে। জার্মানরাও কাতানেচিও খেলছিল। বেশ ভাল ম্যাচ, যদিও গোলমুখ সেভাবে খোলেনি রক্ষণে দু’দলই সতর্ক থাকায়। একমাত্র গোল রাডাকোভিচের। গলিচের গোললাইন থেকে সেন্টারে ১২ গজ থেকে জোরালো শটে। শেপ হারবারজারের যুগ শেষ জার্মানিতে।

    চেকদের বিরুদ্ধে হাঙ্গেরিকেই ফেভারিট ধরে ছিলেন বিশেষজ্ঞরা, কিন্তু, চেকদের মাঝমাঠে তিন ফুটবলারের পরস্পরের মধ্যে দুর্দান্ত পাসিং আটকানোর রাস্তা জানা ছিল না হাঙ্গেরির ফুটবলারদের। ম্যাসোপুস্তের থ্রু তিন ডিফেন্ডারের নাগালের বাইরে, স্কেরার ভুল করেননি। হাঙ্গেরি আক্রমণ তুলে এনেছিল পরপর। কিন্তু, স্ক্রোইফ জীবনের সেরা ফর্মে, বুড়ো বয়সেও। অন্তত তিনবার নিশ্চিত পতন রুখে নিয়ে যান শেষ চারে।

    আবার ব্রাজিল–ইংল্যান্ড এবং এবার এই ম্যাচ গারিনচার!

    সুইডেন যে গারিনচাকে দেখেছিল দুর্দান্ত গতিতে সাইডলাইন ধরে দৌড়তে এবং গোলের গন্ধমাখা সেন্টার পাঠাতে, চিলের গারিনচা চার বছরে আরও ক্ষুরধার কারণ দু’পায়ে এসে গিয়েছে জোরালো শট। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আবার প্রথম গোল দেওয়ার সময় পাঁচ ফুট সাতের গারিনচা স্পট জাম্পে হারালেন ছ’ফুট দুইয়ের মরিস নোরম্যানকে! না, নোরম্যানের কিছু করার ছিল না সত্যিই, অমন অবিশ্বাস্যভাবে লাফাতে পারেন প্রয়োজনে শুধু ব্রাজিলীয়রাই।

    দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই খেলা ইংল্যান্ডের হাতের বাইরে নিয়ে যান গারিনচা। এবার তাঁর বাঁক খাওয়ানো ফ্রি–কিক ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক স্প্রিঙ্গেটের বুক থেকে ছিটকে বেরয় অপেক্ষারত ভাভার জন্য। তার ৬ মিনিটের মধ্যে আবার দূর থেকে নেওয়া শট স্প্রিঙ্গেটকে বোকা বানিয়ে জালে। আগে হিচেনসের গোলে সমতা (‌১–১)‌ ফিরলেও দ্বিতীয়ার্ধের এই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলক ইংল্যান্ডকে কোনও সুযোগ দেয়নি ফিরে আসার।

    গারিনচার জীবনীকার রুই কাস্ত্রো ‘Garrincha - The Triumph and Tragedy of Brazil's Forgotten Footballing Hero’ বইতে লিখেছেন এই কোয়ার্টার ফাইনাল সম্পর্কে — ‘‘ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই জীবনের সেরা ম্যাচটা খেলেছিলেন গারিনচা। ঠিক যেন মনে হচ্ছিল, পাউ গ্রান্দে–তেই আছেন। ওই পাউ গ্রান্দে–তে (‌যা গারিনচার জন্মশহর)‌ খেলতেন ‘ও কু ভাই এ মোল’–এর হয়ে। ওঁকে কেউ রাইট উইংয়ে খেলতে হবে বলে মাথার দিব্যি দেয়নি। এমনভাবে খেলতেন যেন বল এবং মাঠের মালিকানা তাঁরই। শহরটারও কি নয়? সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলতেন, কখনও বা সেন্টার ফরোয়ার্ড, অথবা যেখানে খুশি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও সেই একই রকম। ইংরেজরা দিশেহারা,মাঠের মাঝখানে ওঁকে খেলতে দেখে। একেবারে ফ্রি খেলছিলেন, ইংরেজরা একেবারেই আশা করেননি এমন গারিনচাকে দেখবেন। ব্রাজিলের প্রথম গোলটা করেন হেড দিয়ে, অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। দলের তৃতীয় আর নিজের দ্বিতীয় গোল সেই ক্লাসিক ফোলা সেকা (‌Folha Seca)‌ শটে, বক্সের বাইরে থেকে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে গারিনচা ছিলেন দক্ষতার শীর্ষে, যা খুশি করতে পেরেছিলেন।

    ‘একটা মজার ঘটনাও ঘটেছিল ওই ম্যাচে। গারিনচার উদ্দেশে যেরকমভাবে বল এসেছিল, ধরেছিলেন সব। একটা জিনিসই চেষ্টা করেও ধরতে পারেননি, যখন একটি কালো কুকুর ঢুকে পড়েছিল মাঠে! রেফারিকে বলে খেলা থামিয়ে চেষ্টা করেছিলেন কুকুরটিকে ধরে মাঠের বাইরে বের করে দিতে। পারেননি। শেষে জিমি গ্রিভস ধরে ফেলেন, একেবারে চার হাত–পায়ে মাঠে শুয়ে পড়ে! আর হ্যাঁ, আরও একটি কারণ ছিল গারিনচার ছন্দে ফেরার। শহরে এসে পৌঁছেছিলেন বান্ধবী এলজা সোরেস। আর গারিনচা তাঁকে বলেই এসেছিলেন, I am going to win the cup for you.’’

    সেমিফাইনাল

    অপ্রতিরোধ্য গারিনচা আবার একাই জেতাবেন বলেই যেন নেমেছিলেন মাঠে!

    ৯ মিনিটে ২০–গজের শট, ১–০। দ্বিতীয় গোলও তাঁর, জাগাও–‌র কর্ণারে হেডে। কোয়ার্টার এবং সেমিফাইনালে পরপর তাঁর মতো দু’গোলের কৃতিত্ব দেখতে বিশ্বকে আরও ২৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, মেহিকোয় দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা পর্যন্ত, ইংল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে পরপর দুগোল করে গারিনচার রেকর্ড ছুঁয়েছিলেন যিনি।

    চিলেকে কৃতিত্ব দিতে হবে, প্রথমার্ধের শেষে খেলায় ফিরে আসার জন্য। তোরোর দুর্দান্ত ফ্রি–কিকের জবাব ছিল না গিলমারের কাছে। কিন্তু, ব্রাজিলকে আটকাবে কে? ভাভা এবার মাথা ছোঁয়ালেন গারিনচার কর্ণারে, ৩–১। আয়োজকরা হাল ছাড়েননি, ২–৩ হল পেনাল্টিতে, বক্সের মধ্যে জোজিমো হাতে বল লাগিয়ে ফেলায়। জাগাও তার পর রক্ষাকর্তা ব্রাজিলের। বাঁদিক দিয়ে উঠলেন, সেন্টারে ভাভার হেড আবার, ৪–২।

    খেলায় তার পর শুধুই মারামারি। গারিনচা শেষে মেজাজ হারালেন, বারবার ডিফেন্ডারদের লাথি খেতে খেতে শেষে নিজেই লাথি মেরে বসলেন রোখাসকে, লাল কার্ড,ফাইনালে নেই গারিনচা!

    রুই কাস্ত্রোর লেখায়, ইংরেজিতেই, ‘The idea that Garrincha could be sent off for hitting an opponent was as unlikely as St Francis of Assisi taking part in a dove-shooting contest or Snow White getting stoned to death for cruelty to dwarves. But that's what happened during the Brazil-Chile World Cup semi-final on 13 June, 1962. The man responsible was Chile's brutal centre-half Eladio Rojas... with 39 minutes of the second half gone and the game over as a contest, Rojas kicked Garrincha once too often and the little man's patience snapped. He got up, walked over to Rojas and, more as a joke than in retaliation, kneed him in the backside. Rojas fell to the ground as if the Andes had come down on top of him. The linesman, who was standing just a few feet away, raised his flag and the referee ran over. After a quick conversation, Yamazaki pulled out the red card.’

    গারিনচার জীবনীকার এমন লিখবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু, বিশ্বকাপের ইতিহাসের দুই শ্রেষ্ঠ লেখক, দুজনেই ইংরেজ, গ্ল্যানভিল এবং ফ্রেডিও অস্বীকার করেননি,গারিনচাকে অক্লান্ত মারার বিষয়টি। গ্ল্যানভিল লিখেছেন, ‘Garrincha, kicked by Rojas and tired of being kicked, kicked back and was sent off.’ আর, কাস্ত্রো–র মতোই ফ্রেডিও বলেছেন সেই ঘটনার কথা, লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন যখন গারিনচা, দর্শকাসন থেকে ছোঁড়া ‘মিসাইল’–এ মাথা ফেটে যাওয়ার কথাও। কাস্ত্রো অবশ্য আরও অনেক সরাসরি, চিলের সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণে। ‘ওঁরা তো সামান্য একটা ফাউলকেই ক্রিমিনাল অফেন্স বানিয়ে ছেড়েছিল! সাংবাদিকতার লাইসেন্সের নামে ফেঁদেছিল গল্প, সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল গারিনচা নাকি বদমেজাজি, রগচটা, নোংরা যার প্রতিটিই মিথ্যে। সবচেয়ে বেশি ফাউল করা হত তাঁকে, কিন্তু কখনও উঠে দাঁড়িয়ে আক্রমণ ফিরিয়ে দেননি, বল নিয়ে পরের বার সেই ডিফেন্ডারকে কাটিয়েই যেতেন, হাসতে হাসতেই।’

    দ্বিতীয় সেমিফাইনালে চার গোলই দ্বিতীয়ার্ধে। চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে যুগোস্লাভিয়ার হার, ৩–১। কারেল কোলস্কির প্রশিক্ষণে যুগোস্লাভিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল উইং–এ। চেকদের রক্ষণ ভাঙা যায়নি প্রথমার্ধে। বিরতির পরই চেকরা এগিয়ে যায় কাদ্রাবার গোলে। যুগোস্লাভিয়া ফিরে এসেছিল জারকোভিচ সমতা ফেরানোয়। কিন্তু, স্কেরারের গোল এবং মার্কোভিচ হাতে বল লাগিয়ে পেনাল্টি দেওয়ায় স্কেরারের দ্বিতীয় গোলের পর আর কোনও উপায়ও ছিল না। ফাইনালে এবার ব্রাজিল–চেকোস্লোভাকিয়া।



    ফাইনাল

    ব্রাজিল চিন্তায়! পেলে তো নেই–ই, এবার কি গারিনচাও থাকবে না ফাইনালে?

    সেমিফাইনাল ম্যাচের পরের দিন, বৃহস্পতিবার, সিদ্ধান্ত নেবে সাত–সদস্যের ফিফা–কমিটি। ফাইনাল রবিবার। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে রেফারির রিপোর্টের ভিত্তিতে। ফাইনালে ওঠার উৎসব ছেড়ে ব্রাজিল লেগে পড়েছিল গারিনচাকে ‘মুক্ত’ করতে। এক ব্রাজিলীয় সাংবাদিক, কানর সিমোয়েস কোয়েলো টেলিফোন করেছিলেন ব্রাসিলিয়ায়, বন্ধু এবং ব্রাজিলের প্রধানমন্ত্রী তানক্রেদো নেভেসকে, যাতে প্রধানমন্ত্রী ফিফার ওই শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে, ‘ইন দ্য নেম অফ দ্য ব্রাজিলিয়ান পিপল’ ক্ষমা প্রার্থনা করে নেন। পেরুর রাষ্ট্রপতি মানুয়েল প্রাদো চিলেতে থাকা পেরুর রাষ্ট্রদূতকে পরিষ্কার নির্দেশ দিয়ে দিয়েছিলেন রেফারিকে বলে দেওয়ার ব্যাপারে যে, গারিনচা প্রসঙ্গে ‘ধীরে চলো’ নীতি নেন যেন রেফারি। আর ফিফার ব্রাজিল–কর্তা মোজার্ত দি জিওর্জিও কোনও ঝুঁকির রাস্তাতেই হাঁটেননি! সোজা যোগাযোগ করেছিলেন সেই লাইন্সম্যানের সঙ্গে, হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন মন্তেভিদিওতে তাঁর বাড়ি ফেরার টিকিট, ভায়া পারি। শুনানির সময় তাঁকে পাওয়া যায়নি আর!

    ফিফা এমনিতেই ব্রাজিলের কাছে কৃতজ্ঞ ছিল, বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন করে ফিফার কোষাগারে লাভের অঙ্ক তুলে দেওয়ায়। ইয়ামাজাকিও কমিটির সামনে লিখিত রিপোর্ট দিয়েছিলেন — অবশ্যই পেরুর রাষ্ট্রদূতের সরাসরি পরামর্শ মেনে — গারিনচার সেই ফাউল তিনি দেখেননি! তাঁর লাইন্সম্যানকে ‘চলে যেতে হয়েছে অনিবার্য কারণে,’ কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি নাকি গারিনচার ফাউল সম্পর্কে লিখে রেখে গিয়েছেন, ‘টিপিক্যাল রেসপন্স’। সেই সভায় গারিনচার আইনজীবী মাদুরো গলা ফুলিয়ে রেফারির বক্তব্য আর লাইন্সম্যানের নোট নিয়ে সওয়াল করে ছাড়িয়ে এনেছিলেন মক্কেল–কে, বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কমিটিকে, ঘটনাটা অন্য কোনও স্বার্থে অন্যরকম আলোয় দেখানো হয়েছে চিলের প্রচারমাধ্যমে। ফাইনালে গারিনচাকে খেলানোর পক্ষে ভোট পড়েছিল ৫–২,সামান্য তিরস্কারও জুটেছিল। কিন্তু, রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বকাপের সরাসরি যোগাযোগ লাতিন আমেরিকায়, দেখা দিয়েছিল সে বার, গারিনচাকে ফাইনালে খেলানো নিয়ে, ১৬ বছর পর আর্জেন্তিনায় যা চূড়ান্ত কলঙ্কের রূপ ধারণ করবে সেই পেরুকেই ৬–০ হারানো নিয়ে!

    ফুটবল ইতিহাসে এমন ঘটনা আর নেই। লাল কার্ড দেখার পরের ম্যাচে কোনও ফুটবলার খেলেছিলেন সেই প্রথম। আসলে, পেলে চোট পেয়ে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাওয়ার পর গারিনচাই ছিলেন বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার। বিশ্বকাপের ফাইনালে থাকবেন না সেরা ফুটবলার, তখন এমন ভাবা যায়নি। সুতরাং, গারিনচা খেলেছিলেন ফাইনালে, যদিও আশ্চর্যজনকভাবে ফাইনালে একেবারেই ছন্দে ছিলেন না।

    চেকদের শুরু দুর্দান্ত। ডান দিক থেকে স্কেরারের কোণাকুণি পাস ধরে ম্যাসোপুস্তের ১৬ মিনিটের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল চেকরা। আটান্নর ফাইনালে সুইডেনের মতোই। ব্রাজিলের জেগে ওঠার জন্য বোধহয় এই ধাক্কার প্রয়োজন ছিল, দুবারই ফাইনালে। এবার নায়ক আমারিলদো। দুরূহ কোণ থেকে দূরের পোস্টে বল রেখে স্ক্রোইফকে বোকা বানান। দ্বিতীয় গোলেও আমারিলদোর অবদান। বাঁদিক থেকে ডান দিকে চকিত টার্ন, গোলমুখ খুলে ফেলে জিতোর জন্য বল সাজিয়ে দেওয়া, জিতো ভুল করেননি। শেষদিকে জালমা সানতোসের উঁচু সেন্টার প্রখর সূর্যালোকে দেখতে পাননি স্ক্রোইফ। এক হাতে চোখ আড়াল করে বল মাটিতে পড়তে দিয়েছিলেন। সেই বল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাভার শট, চেক গোলরক্ষকের কিছু আর করার ছিল না।

    পরপর দুবার বিশ্বশ্রেষ্ঠ ব্রাজিল। পেলে নেই তো কী, আমারিলদো সেখানে থাকেন, উঠে আসেন সুযোগ পেয়েই। গারিনচা তো ছিলেনই, জাগাও, জিতো, ভাভা, দুই সানতোস — সোনার পরী কি টানা তিন বার যাবে ব্রাজিলে?

    তখনকার নিয়ম অনুযায়ী তিন বার জিতলে চিরতরে জুলে রিমে ট্রফি নিয়ে যাবে সেই দেশ। ইতালি, উরুগুয়ে দুবার করে জিতলেও সেই সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ব্রাজিলেরই।

    কিন্তু, পরের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডে। এবং, উত্তর ইউরোপীয় মারামারির যে ফুটবল বিশ্বে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিল অত্যন্ত দ্রুত, ব্রাজিল কি পারবে সেই ইউরোপ থেকে আবার জিতে হ্যাটট্রিক করতে?

    (আগামিকাল ১৯৬৬ ইংল্যান্ড)

    No comments