• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১২ / রাজনীতির গ্রাসে ফুটবল / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    In South America the relationship between politicians and football has often been much stronger... Military Governments in particular have employed a well-tried mixture of repression, bread and circuses in order to control their peoples, and football has played a leading role in the circus.

    - Tony Mason: Passion of the People? Football in South America (Page - 61)

     

    ফিফা ১৯৭৫ সালেই জানিয়ে দিয়েছিল, পরের বিশ্বকাপ হবে আর্জেন্তিনায়। কিন্তু, ফিফার ঘোষণার সময় থেকেই আর্জেন্তিনাতে সমস্যা প্রচুর। গৃহযুদ্ধ চলছিল। হুয়ান পেরন মারা গিয়েছিলেন, দেশের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর বিধবা ইসাবেল। ‘ডার্টি ওয়ার’ আর্জেন্তিনায় চলেছে সেই পাঁচের দশক থেকেই। ইসাবেল ওই ১৯৭৫ সালেই মিলিটারি এবং পুলিসকে ক্ষমতা দিয়েছিলেন বামপন্থী শক্তিকে নিকেশ করার, নানা চুক্তির মাধ্যমে, লিখেছে উইকিপিডিয়া (‌http://en.wikipedia.org/wiki/Dirty_War)। কিন্তু, ইসাবেলও থাকতে পারেননি ক্ষমতায়। ১৯৭৬ সালেই মিলিটারি ‘জুনতা’ (‌Junta) সরিয়ে দেয় ইসাবেলকেও। ‘জুনতা’ স্পেনীয় ভাষার একটি শব্দ যা ব্যবহৃত হয় ‘রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া কিছু মানুষের সঙ্ঘ’ অর্থে। ব্রিটানিকা থেকে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব — ‘committee or administrative council, particularly one that rules a country after a coup d'etat and before a legal government has been established. The word was widely used in the 16th century to refer to numerous government consultative committees. The Spanish resistance to Napoleon's invasion (1808) was organized by the juntas provinciales; the national committee was the junta suprema central. In subsequent civil wars or revolutionary disturbances in Spain, Greece, or Latin America, similar bodies, elected or self-appointed, have usually been called juntas.’

    ১৯৭৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগেই আর্জেন্তিনায় এই মিলিটারি জুনতা–র হাতে ১৬ হাজারেরও বেশি আর্জেন্তিনীয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন নানাভাবে। অধিকাংশকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি, মারা গিয়েছিলেন বহু মানুষ, আহতও অনেকে। স্পেনীয় ভাষায় যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দেসাপারেসিদোস’, ইংরেজিতে যা ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড উইদাউট এক্সপ্ল্যানেশন’ আর আমাদের বাংলায় বোঝায় ‘ব্যাখ্যাতীতভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া’। আর্জেন্তিনার নেভি অফিসার আদোলফো শিলিনগো জনতার মাঝেই স্বীকার করেছিলেন ওই ‘নোংরা যুদ্ধ’–এ জড়িত থাকার কথা, বলেছিলেন, ‘নাৎসিদের থেকেও খারাপ কাজ করেছিলাম আমরা।’ এই অবস্থা চলেছিল ১৯৮৩ পর্যন্ত, যতদিন না রাউল আলফোসিনের নেতৃত্বে গণতন্ত্র ফিরেছিল আর্জেন্তিনায়। র্জেন্তিনার তৎকালীন এই অরাজকতা সম্পর্কে আরও পড়তে চাইলে, প্লিজ এই লিঙ্ক-এ ক্লিক করে নিন - http://www.espn.com/espn/feature/story/_/id/11036214/while-world-watched-world-cup-brings-back-memories-argentina-dirty-war

    ফুটবল বিশ্বকাপের কথা বলতে গিয়ে আর্জেন্তিনার সামাজিক অবস্থানের কথা ছোট করে বলে নেওয়া এই কারণেই জরুরি যে, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আর্জেন্তিনায় বিশ্বকাপ হয়েছিল, সহজে বোঝা সম্ভব তখন। ১৯৭৬–এর মার্চে হোরগে ভিদেলার নেতৃত্বে জুনতা ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, আর্জেন্তিনা তখন ফুটবলের বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের আয়োজক হওয়ার উপযুক্ত নয়। কিন্তু, জুনতা মানেনি। চার মাসের মধ্যেই, জুলাইতে, জুনতা ঘোষণা করেছিল, বিশ্বকাপ হবে জাতীয় স্বার্থে। একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল EAM 78 (Ente Autarquico Mundial 78) নামে। কিন্তু, শুরুতেই তার সভাপতি জেনারেল আকতিসকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। নবনির্মিত প্রেস সেন্টার থেকে বোমা সরাতে গিয়ে মারা যান আরও এক পুলিস অফিসার। কিন্তু ‘পিপলস ফেস্টিভ্যাল’–কে সাফল্যমণ্ডিত করার জুনতা–লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি সেই সময়ের শাসকরা।

    আর্জেন্তিনার এই বিশ্বকাপে খেলতে যাননি ডাচ কিংবদন্তী জোহান ক্রুয়েফ। ১৯৭৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পরও তাঁর সামনে সুযোগ ছিল আরও একটি বিশ্বকাপে খেলার। এবং হল্যান্ড সেবার আর্জেন্তিনাতেও পৌঁছেছিল ফাইনালে। কিন্তু, ক্রুয়েফ যাননি মূলপর্বে খেলতে। দেশকে বাছাইপর্ব থেকে বিশ্বকাপের আসরে পৌঁছে দিয়েও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। কেন? তখন আন্দাজ করা হয়েছিল, ডাচ ফুটবল সংস্থার সঙ্গে স্পনসরশিপ নিয়ে ঝামেলায় জড়িত ক্রুয়েফ যেতে চাননি। উঠেছিল আর্জেন্তিনায় এই মিলিটারি শক্তির অভ্যুত্থানের কথাও, ক্রুয়েফ বরাবরই যে স্বৈরাচারকে ঘৃণা করেছেন, জানাতে ভোলেননি। কিন্তু, আসল কারণ জানা গিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে, ২০০৮ সালে, যখন ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান কাগজকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ক্রুয়েফ, তাঁর বিশ্বকাপ বয়কটের কারণ। উৎসাহী পাঠক এই ‘লিঙ্ক’ নিজেদের ওয়েব–ব্রাউজারে লিখে ক্লিক করে পড়ে নিতে পারেন —   http://www.theguardian.com/football/2008/apr/17/newsstory.sport

    যা বলেছিলেন ক্রুয়েফ বার্সিলোনার কাতালুনিয়া রেডিও–তে, বাংলায় তার তর্জমা, ‘আপনাদের জানা উচিত, ফুটবলার জীবনের শেষলগ্নে এখানে কী কী সমস্যায় পড়েছিলাম। হয়ত জানেনই না যে, বার্সেলোনাতে আমাদের ফ্ল্যাটে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আমার স্ত্রী–কেও, আমাদের বাচ্চাদের সামনেই। মাথায় তাক করে রাখা ছিল রাইফেল। কোনওমতে পালিয়েছিলাম। তারপর বাচ্চারা স্কুলে যেত পুলিস–পাহারায়। আমাদের ফ্ল্যাটে আমাদের সঙ্গেই থাকতেন কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী। প্রায় চার মাস ছিলেন তাঁরা। এই ঘটনাগুলো জীবন সম্পর্কেও ধারণা বদলে দেয়, পাল্টে দেয় দৃষ্টিভঙ্গি। অগ্রাধিকার তালিকায়ও বদল আসে। আমাদের মনে হয়েছিল, এই ঘটনাগুলো স্বাভাবিক নয়, আমাদের রোজকার জীবনে এই ঘটনাগুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়া অর্থহীন। একটু স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চেয়েছিলাম, স্ত্রী ড্যানি কোস্টার আর আমাদের তিন সন্তানকে নিয়ে। এই ঘটনার পর ফুটবল খেলারই ইচ্ছে ছিল না আর, বিশ্বকাপেও।’ প্রসঙ্গত, ক্রুয়েফকে কিডন্যাপ করতে চাওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে। অনেকেই দায়ী করেছিলেন তখন ক্রুয়েফের স্ত্রী–কে, বিশ্বকাপে না-যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে। এমনকি বার্সেলোনায় যাঁকে বলা হয় লাওনেল মেসির আবিষ্কর্তা সেই কার্লোস রেক্সাচও তাঁর বইতে এই কারণেই সমালোচনা করেছিলেন ক্রুয়েফের। ডাচরা তো আজও ভাবেন, যদি ক্রুয়েফ থাকতেন সেবার, দ্বিতীয়বার ফাইনাল থেকে ফিরতে হত না খালি হাতে। কিন্তু, ক্রুয়েফ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, নিজেই নিয়েছিলেন সেই সিদ্ধান্ত।

    প্রথম পর্ব

    ১৬–দেশের বিশ্বকাপ শেষবার। পরের বার স্পেন থেকে বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলবে ২৪ দেশ। আর্জেন্তিনাতেও ১৬ দেশকে ভাগ করা হয়েছিল ৪ গ্রুপে।

    গ্রুপ ওয়ান — আর্জেন্তিনা, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, ইতালি

    গ্রুপ টু — মেহিকো, পোল্যান্ড, তিউনিশিয়া, পশ্চিম জার্মানি

    গ্রুপ থ্রি — অস্ট্রিয়া, ব্রাজিল, স্পেন, সুইডেন

    গ্রুপ ফোর — হল্যান্ড, ইরান, পেরু, স্কটল্যান্ড

    আর্জেন্তিনা বেশ শক্ত গ্রুপে। কোচ লুই সিজার মেনোত্তি দল তৈরি করেছিলেন আর্জেন্তিনার ফুটবলারদের দেশ ছাড়তে না–দিয়ে। ইউরোপ থেকে নিয়ে এসেছিলেন শুধু ভালেন্সিয়ার মারিও কেম্পেসকে। যদিও উলফকে চেয়েছিলেন, কিন্তু রেয়াল মাদ্রিদ এপ্রিলের শুরুতে তাঁকে ছেড়ে দিতে চায়নি বলে এল ফ্লাকো নেননি। প্রধানত দেশের তারকাদের নিয়ে বুয়েনোস আইরেসে বেশ কিছু প্রীতি ম্যাচ খেলতে খেলতেই বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হয়েছিল মেনোত্তির আর্জেন্তিনা।

    কিন্তু, প্রথম ম্যাচ থেকেই আর্জেন্তিনার জয় নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। আর্জেন্তিনা শুরু করেছিল বুয়েনোস আইরেসে মনুমেন্তালে, হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে। হাঙ্গেরির কোচ লাইওস বারোতি পরিষ্কার আশঙ্কা করেছিলেন, রেফারিরা গোটা দুয়েক পেনাল্টি না দিয়ে দেয় আয়োজকদের! ‘সবই তখন আর্জেন্তিনীয়দের দিকে, এমনকি বাতাসও! আর বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা।’ ৭০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল মিলিটারি জুনতা, বিশ্বের কাছে আর্জেন্তিনার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরার একমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে। সুতরাং, হাঙ্গেরির কোচের শঙ্কিত হওয়ার কারণও ছিল যথেষ্ট।

    বিশ্ব–ফুটবল সেবারই প্রথম দেখল কাগজের টুকরোর সৌন্দর্য! মাঠে কুচি কুচি কাগজ উড়ছে নানা রঙের। এখন বিশ্বকাপে যা মাঝেমাঝেই দেখা যায়, শুরু হয়েছিল আর্জেন্তিনা থেকে। কিন্তু, আর্জেন্তিনীয়রা শুরুর নার্ভাসনেস কাটানোর আগেই ৯ মিনিটে সাপো এগিয়ে দিয়েছিলেন হাঙ্গেরিকে। জোম্বোরির শট ঠিকঠাক ধরতে পারেননি ফিলোল, তাঁর হাত থেকে ছিটকে আসা বলে সাপোর গোল। তবে, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাঙ্গেরির গোলরক্ষক গুইদার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কেম্পেসের ফ্রি কিক, লুকের পায়ে! মেনোত্তি বারবার বলেছিলেন, ওই সব টোটাল ফুটবল বিটলসের মতো, ফ্যাশন, আসে–যায়। জ্বলন্ত চুরুট মুখে নিয়ে দীর্ঘদেহী মেনোত্তি জানিয়েছিলেন, আসল ফুটবল হল বল–পায়ে তীব্র গতিতে আক্রমণ, আর বলের দখল না থাকলে তা কেড়ে নেওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, যে–ফুটবল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতোই চিরন্তন। তাঁর সেই পরিকল্পনায় কেম্পেস–লুকে–আউসমান–আর্দিলেসরা ক্রমাগত ছুটছিলেন সামনের দিকে, সোজা এবং অসম্ভব দ্রুতগতিতে।

    তবু, বলের দখল ফেরত পেতে আর্জেন্তিনীয়দের ফাউলে কমতি ছিল না, অধিনায়ক দানিয়েল পাসারেয়ার নেতৃত্বেই। হাঙ্গেরির সেরা ফুটবলার সেই ম্যাচে ছিলেন তোরোসিক। এতবার ফাউল করা হচ্ছিল এবং রেফারির সিদ্ধান্ত এতবার বিপক্ষে যাচ্ছিল যে, প্রথমার্ধেই বিরক্ত হয়ে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে হলুদ কার্ড দেখেছিলেন। ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছেন ‘সেই–অপরাধ’ সম্পর্কে, ‘যা হচ্ছিল ততক্ষণ ম্যাচে, এবং যা হতে চলেছিল পরে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ওই হলুদ কার্ড দেখানো যেন কোনও কুখ্যাত মাফিয়াকে আয়কর না–দেওয়ার জন্য জেলে পোরা!’ পরে গায়েজো আবার ফাউল করলে তোরোসিক সরাসরি লাথি মেরে গায়েজোকে মাটিতে ফেলে নিজে বেরিয়ে যান মাঠ থেকে। তারও পরে নিলাসিকেও লাল কার্ড দেখান পর্তুগিজ রেফারি গারিদো। নিলাসিও মাঠ ছাড়েন মাথা উঁচু করেই! আর্জেন্তিনা অবশ্য জয়ের গোল পেয়ে গিয়েছিল আগেই, বের্তিনো গোলে ঠেলেছিলেন বল যখন, হাঙ্গেরির গোলরক্ষক গুইদারকে ফাউল করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ‘আকাশ–বাতাস এবং রেফারিরাও’ আর্জেন্তিনার দিকেই থাকবে, আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল হাঙ্গেরি–কোচের।

    ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচেও একই অবস্থা। ফরাসি ফুটবলের রাজপুত্র মিশেল প্লাতিনি এসে গিয়েছেন বিশ্বকাপে, সেই প্রথম। মিশেল হিদালগোর ফ্রান্স তখনও পুরোপুরি তৈরি নয় পরের বারের মতো, কিন্তু ঝলক পাওয়া যাচ্ছে রোসেতু–সিক্স ও প্লাতিনির পায়ে। আর্জেন্তিনাকে অবশ্য প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল পেনাল্টি। কানাডার লাইন্সম্যান ওয়ার্নার ওয়াইন্সমান মনে করেছিলেন, ত্রেসোর পড়ে যাওয়ার সময় হাতে লাগিয়ে ফেলেছেন বল। সুইস রেফারি জঁ দুবাচ মেনে নিয়েছিলেন সেই পরামর্শ। অথচ, বলের ওপর পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখতে রেফারি যতটা দূরে ছিলেন, লাইন্সম্যান ছিলেন তার চেয়েও বেশি দূরত্বে। ফ্রান্স অবশ্য ফিরেছিল খেলায়, তাড়াতাড়িই। বাতিস্তঁ–র পাঠানো বল থেকে লাকোম্বের শট বারে লেগে ফেরার পর সহজেই গোল প্লাতিনির। লুকের গোলে আর্জেন্তিনা এগিয়ে যাওয়ার পর রেফারির সেরা সিদ্ধান্ত ম্যাচের — সিক্স–কে ফাঁকায় বল দিয়েছিলেন প্লাতিনি, গোল করতে উদ্যত সিক্সকে প্রায় ধরে–বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছিল পেনাল্টি বক্সে, রেফারি তাকিয়েছিলেন অন্য দিকে!

    দ্বিতীয় গ্রুপে তিউনিশিয়া প্রথম ম্যাচে মেহিকোকে ৩–১ ব্যবধানে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল সবাইকে। আফ্রিকার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের মূলপর্বে সেই প্রথম জয়। পশ্চিম জার্মানি অনেকটাই কমজোরি কাইজার বেকেনবাওয়ার ও জার্ড মুলারকে হারিয়ে। বনহফ, কাল্টজ, কেউই ছিলেন না সেরা ছন্দে। তবু, মেহিকোকে ৬–০ হারানো এবং নতুন তারকা রুমেনিগের আগমন। যেমন, ব্রাজিলের জার্সিতে প্রথমবার দেখা গিয়েছিল জিকোকেও। তোনিনিও সেরেজো, রেইনালদো ও ‘বুড়ো’ রিভেলিনোকে নিয়ে ব্রাজিল কুতিনিওর ম্যানেজারিতে একেবারেই চেনা ছন্দে নেই। প্রথম দুটি ম্যাচ ড্র করে এবং কোনও রকমে অস্ট্রিয়াকে ১–০ হারিয়ে পৌঁছেছিল দ্বিতীয় পর্বে।

    হল্যান্ডকে নিয়ে বিশ্বকাপের আসরে নানা বিতর্কের সূত্রপাত সেবারই। ম্যানেজার হিসেবে সেবার ডাচ শিবিরে ছিলেন অস্ট্রিয়ার আর্নস্ট হ্যাপল। জান জোয়ার্টকুইসও ছিলেন, এয়ার ফোর্সের প্রাক্তন অফিসার এবং হ্যাপলের অনেক আগে থেকেই যিনি যুক্ত ডাচ শিবিরে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে জোয়ার্টকুইস প্রথম বোমা ফাটান বলে যে, হ্যাপল ফুটবলারদের ফুটবলার হিসেবেই দেখছেন, মানুষ হিসেবে নয়! অভিজ্ঞ গোলরক্ষক জঙব্লোয়েডকে ম্যানেজার হ্যাপল এমনভাবে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর বলেছিলেন ‘তুমি আর পরের ম্যাচে খেলবে না’, অপমানিত বোধ করেছিলেন জঙব্লোয়েড। হ্যাপল চেষ্টা করেছিলেন মাঝমাঠে পাঁচজনকে নিয়ে ‘X’ ফর্মেশন তৈরি করে খেলাতে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে তা আর হয়ে ওঠেনি। উইম ফন হানেজেমকে বিশ্বকাপের দলে হ্যাপল রাখতে পারার নিশ্চয়তা না দিতে পারায় উইম ফন নিজে থেকেই সরে গিয়েছিলেন বলে।

    দ্বিতীয় পর্ব

    ১৯৭৪ বিশ্বকাপের মতোই এবারও দুটি গ্রুপ করা হয়েছিল দ্বিতীয় পর্বে। সেরা দুটি দল ফাইনালে খেলবে আর রানার্স হলে তৃতীয় স্থানের জন্য খেলায়। ফলে, প্রথম পর্ব শেষে দ্বিতীয় পর্বের গ্রুপ বিন্যাস হল এমন —

    প্রথম গ্রুপ: ইতালি, হল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া

    দ্বিতীয় গ্রুপ: আর্জেন্তিনা, পেরু, পোল্যান্ড, ব্রাজিল

    প্রথম গ্রুপ থেকে হল্যান্ড ফাইনালে যায় অস্ট্রিয়াকে ৫–১, পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ২–২ ও ইতালিকে শেষ ম্যাচে ২–১ হারিয়ে। হল্যান্ড–পশ্চিম জার্মানি, আগেরবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা দুটি দেশে আবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল এবং হল্যান্ড পারেনি জিততে এবারও। উল্টে, ৭০ মিনিটে ডিয়েটার মুলারের গোলে ২–১ এগিয়েছিল জার্মানিই। কেরখফ শোধ দেন ৮২ মিনিটে। হল্যান্ডের ডির্ক নানিঙ্গা ৮৯ মিনিটে লাল কার্ড দেখেন, বিশ্বকাপের মূলপর্বে কোনও পরিবর্ত ফুটবলারের সেই প্রথম লাল কার্ড।

    সমস্যা হয় দ্বিতীয় গ্রুপে এবং এমন সমস্যা যা আজও মেটেনি!

    ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে পেরুকে হারায় ৩–০, পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২–০ জেতে আর্জেন্তিনা। নিজেদের দেশের মাটিতে আর্জেন্তিনা চিরশত্রুদের বিরুদ্ধে ০–০ রাখে। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে ১৭টা ফাউল! দু–দেশই ফাউল করায় এত ব্যস্ত ছিল যে, গোল করার দিকে তেমন মন দিতে পারেনি। কিন্তু, ম্যাচ শেষে দু–দলই সন্তুষ্ট, হারতে হয়নি বলে। তবে, সমস্যা ছিল। শেষ ম্যাচে ব্রাজিল খেলবে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর আর্জেন্তিনাকে খেলতে হবে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুর বিরুদ্ধে। ব্রাজিল জানায় যে, তাদের ম্যাচ যেহেতু বিকেলে এবং তাদের খেলা শেষ হওয়ার পরই আর্জেন্তিনা খেলবে পেরুর বিরুদ্ধে, জেনে যেতে পারবে কত গোলে জিতলে তাদের ফাইনালে যাওয়া সম্ভব। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়, দুটো ম্যাচ এক সময়ে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ফিফা শোনেনি, কারণ, আর্জেন্তিনাতেই বিশ্বকাপ এবং আর্জেন্তিনা যে কোনও মূল্যে সেই বিশ্বকাপ জিততে আগ্রহী। ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলার এমন সোনার সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন আয়োজকরা? তাই ব্রাজিল ৩–১ ব্যবধানে পোল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্তিনা জেনে গেল, অন্তত ৪–০ জিতলেই তারা ফাইনালে পৌঁছবে। সেই ম্যাচের ফল হল তারপর, ৬–০! পেরু সেই বিশ্বকাপে তার আগে পাঁচ ম্যাচে মোট গোল খেয়েছিল ছয়। সেই ২১ জুন, কলঙ্কিত এক ম্যাচেই এবার হাফ ডজন!



    মূল্যবোধ। বড্ড কঠিন শব্দ! ধরে রাখা তো আরও কঠিন। তার চেয়ে, মূল্য ধরে দিলে ল্যাঠা চুকে যায় না? মূল্য তাই ধরেই দিয়েছিল আর্জেন্তিনা! তখন জানা যায়নি, এখন বলা হচ্ছে, পেরুকে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড আর ১৩ বন্দিকে রাজনৈতিক বন্দির সম্মান দেওয়া হবে, এই শর্তে। ব্রাজিল সেই রাতেই অভিযোগ জানিয়েছিল, ঘুষ দেওয়ার। আর্জেন্তিনার মিলিটারি সরকার উড়িয়ে দিয়েছিল যথারীতি। কানাঘুষোয় প্রচুর কথা শোনা গেলেও, প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু, ২০১২–র ফেব্রুয়ারি মাসে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন পেরুর সেই সময়ের সেনেটর জেনারো লেদেসমা ইজকুয়েতা। বুয়েনোস আইরেসের বিচারপতি নোবের্তো ওইআরবিদের এজলাসে জানিয়েছিলেন আশি বছরের প্রাক্তন সেনেটর, গড়াপেটা হয়েছিল সেই ম্যাচ, দুই দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের মদতে।

    পেরুতে তখন বিরোধী দলের নেতা ছিলেন লেদেসমা। পেরু থেকে ১৩ জনকে বিশেষ নির্দেশে পাঠানো হয়েছিল আর্জেন্তিনায়, ‘কন্ডর প্ল্যান’ সফল করতে। কিন্তু, ধরে ফেলে আর্জেন্তিনীয় সরকার। অকথ্য অত্যাচার চলছিল। যা–খুশি লিখিয়ে নেওয়া হত সেই সময়, এই বন্দিদের দিয়ে। রাজনৈতিক বন্দির সম্মান দেওয়া হত না, ফলে থাকত না আন্তর্জাতিক স্তরে কোনও সাহায্য পাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনাও। বুয়েনোস আইরেসের আদালতে লেদেসমা পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, ‘ওই ১৩ জনকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে স্বীকার করতে রাজি হয়েছিল ভিদেলা একটাই শর্তে — পেরুকে যথেষ্ট গোলে হারতে হবে আর্জেন্তিনার কাছে, যাতে প্রতিযোগিতার ফাইনালে যেতে পারে আর্জেন্তিনা। ভিদেলা চেয়েছিল যে কোনও উপায়ে বিশ্বকাপ জিতে বিশ্বের কাছে আর্জেন্তিনার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। পেরুর কাছেও আর কোনও উপায় ছিল না ভিদেলার প্রস্তাবে সায় দেওয়া ছাড়া।’ আয়োজকরা ছ’গোলে জেতার পরই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পেরুর গোলরক্ষক কুইরোগা, যাঁর জন্ম হয়েছিল আর্জেন্তিনার রোজারিওতে, যা মেসিরও জন্মস্থান। ম্যাচের আগেই পেরুর অধিনায়ক একতর চুম্পিতাজ কিন্তু বলেছিলেন, প্রতিযোগিতার স্বার্থ ধরে রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁদেরই হাতে। কিন্তু, যেভাবে পেরু বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেছিল দ্বিতীয়ার্ধে, অভিযোগ ওঠাও স্বাভাবিকই ছিল। পেরুর বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছিল আর্জেন্তিনা, ফুটবল–বিশ্বে এ–অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও বহু বছর ধরেই প্রচলিত। এখন, পেরুর প্রাক্তন সেনেটরের স্বীকারোক্তির পর নিশ্চিত যে, বিরতিতে পেরুর সাজঘরে ভিদেলার দীর্ঘক্ষণের উপস্থিতির এক এবং একমাত্র কারণই ছিল, আর্জেন্তিনার ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করা! খবরের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে — http://www.dailymail.co.uk/sport/football/article-2098970/Argentina-cheated-World-Cup-1978-says-Peru-senator.html

    কিন্তু, এখন এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলেই কি আর ৯৭৮–এর বিশ্বজয়ী খেতাব কেড়ে নেওয়া সম্ভব? খনই না। লাতিন আমেরিকার কাগজে যদিও খবর ছিল তেমনই। বুয়েনোস আইরেস হেরাল্ডসহ দক্ষিণ আমেরিকার আরও বেশ কিছু কাগজে পরিষ্কার লেখা হয়েছে, ফিফা তদন্তে নেমেছে। ফুটবলে যে কোনও ম্যাচ–গড়াপেটা বা ম্যাচের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে ফিফা খুবই কড়া সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, হয়ত আর্জেন্তিনার খেতাব কেড়ে নেওয়া হতে পারে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে। হল্যান্ড হেরেছিল ফাইনালে, তাই হল্যান্ডের কাগজ ‘ডে ভলসক্রান্ট’–এর আশা ছিল, আর্জেন্তিনার ফাইনালে ওঠাই কলঙ্কিত প্রমাণিত হলে খেতাব জুটবে হল্যান্ডের, আজ পর্যন্ত যে–দেশ তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে একবারও জিততে পারেনি। বুয়েনোস আইরেস হেরাল্ড–এও বলা হয়েছিল, পরের বার স্পেন বিশ্বকাপে চারটি দল বেশি থাকা সত্ত্বেও আর্জেন্তিনা বিশ্বকাপে খরচ বেশি দেখানো হয়েছিল, ফিফা তদন্ত করছে সেই ব্যাপারেও। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তেমন কিছুই হয়নি। ব্রাজিলকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল ইতালিকে ২–১ হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিয়েই।



    ফাইনাল

    শুরু থেকেই নাটক আবার! আর্জেন্তিনীয় ফুটবলাররা মাঠে এসেছিলেন নির্ধারিত সময়ের পাক্কা ৫ মিনিট পর এবং এসেই রেফারির কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন হল্যান্ডের কেরখফের হাতের ব্যান্ডেজ নিয়ে। নিসকেনস তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আগের বেশ কয়েকটি ম্যাচে কেরখফ ওই ব্যান্ডেজ নিয়েই খেলেছিলেন, তখন কেন রেফারিরা খেলতে দিয়েছিলেন, প্রশ্ন তুলে। কিন্তু, ফাইনালের রেফারি ইতালির সের্গিও গোনেলা কর্ণপাত করেননি। কেরখফকে বাইরে যেতে হয়, ফিরেও আসেন ওই ব্যান্ডেজের ওপর আরও একটি ব্যান্ডেজ জড়িয়ে। ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছেন আর্জেন্তিনীয় অধিনায়ক দানিয়েল পাসারেয়ার কথা। ‘এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ার প্রশ্নই ছিল না। লুকের মনে হয়েছিল, ব্যান্ডেজ থেকে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অধিনায়ক হিসেবে আমাকে প্রতিবাদ জানাতেই হত, জানিয়েও ছিলাম।’ কেরখফ মেনে নেন সেই যুক্তি, পাল্টা প্রশ্নও তোলেন, ‘আগের ম্যাচগুলোতে কেন খেলতে দেওয়া হয়েছিল তবে?’ উত্তর, যথারীতি, পাওয়া যায়নি!

    ম্যাচে গোটা পঞ্চাশেক ফাউল আর ইতালীয় রেফারির জঘন্য রেফারিং বুঝিয়ে দিয়েছিল, কী হতে যাচ্ছে। গোনেলা ধরেই নিয়েছিলেন, যে কোনও দিকে বা যে–ই ফাউল করুক না কেন, বাঁশি বাজবে হল্যান্ডের বিরুদ্ধেই। আর্জেন্তিনা ঘরের মাঠে সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিল। যদিও ১৯৭৪ ফাইনালের মতোই রেপ আবারও চার বছর পরের ফাইনালেও প্রথম সুযোগ হারান। হানের ফ্রি কিকে হেড করতে উঠে বাইরে পাঠান বল। পরের বার ফিলোলের দুর্দান্ত সেভ। আর্জেন্তিনাকে তারপর এগিয়ে দিয়েছিলেন সেই কেম্পেস, দুই ডাচ ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে ঠিক সময় বলে পা লাগিয়ে। দ্বিতীয়ার্ধে হল্যান্ড চেপে বসেছিল, কিন্তু, আর্জেন্তিনার পরের পর হ্যান্ডবল ইতালীয় রেফারি দেখেও না দেখায় হতাশার মাত্রা বাড়ছিল। রেপের জায়গায় নানিঙ্গা এসে গোল শোধ করেন ৮২ মিনিটে। ইনজুরি টাইমে নিশ্চিত হয়ে যায়, হল্যান্ড এবারও সম্ভবত জিততে পারছে না। রেনসেনব্রিঙ্ক এগিয়ে গিয়েছিলেন ক্রলের ফ্রি কিক ধরে, বক্সের বাঁদিক থেকে ফিলোলকে এড়িয়ে পাঠিয়েও দিয়েছিলেন বল, গোলের দিকে। কিন্তু পোস্টে লেগে ফিরে আসে বল।

    অতিরিক্ত সময়ে কেম্পেস আর বের্তোনির গোলে শেষ পর্যন্ত ট্রফি আর্জেন্তিনার। ঠিক যা চেয়েছিলেন মিলিটারি শাসকরা। ভিদেলার হাত থেকে পাসারেয়া নেন বিশ্বকাপ, তুলে ধরেন আকাশের দিকে। আর ওই ছবির মাধ্যমেই আর্জেন্তিনা বিশ্বের কাছে তুলে ধরে নিজেদের গৌরবের ছবি, যে ট্রফি আসলে ছিল রক্তস্নাত। প্লাজা দে মেয়োতে তখনও মায়েরা রোজ নিঃশব্দে জড়ো হচ্ছিলেন, হারিয়ে–যাওয়া ছেলেদের খোঁজে। আর্জেন্তিনার বিশ্বকাপ জেতার আনন্দে সামিল হতে পারেননি মন খুলে। রিকার্দো হালাক, নাট্যকার, অবশ্য লিখেছিলেন, ‘The Military men wanted to use the Mundial but they also wanted us to come out champions. Many Argentines who celebrated did not like the military, but we also wanted to be champions. What could we do? Not dance? Boycott the Mundial? Do dictatorships pass away, do Cups remain? We went, we won and we danced.’

    মেনোত্তির পরিশ্রম সার্থক। প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হারার পর আর্জেন্তিনা তখনও পর্যন্ত আর কখনও ফাইনালে পৌঁছতে পারেনি। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল আর্জেন্তিনীয়দের, বিশ্বকাপ জেতার। অথচ, তাদের দেখতে হয়েছিল চিরশত্রু ব্রাজিল চিরতরে নিয়ে গিয়েছে সোনার পরী জুলে রিমে কাপ। বিশ্ব ফুটবলকে সর্বদাই দুর্দান্ত প্রতিভাবান ফুটবলার উপহার দিয়েও বিশ্বকাপ জিততে না পারার ক্ষতে প্রলেপ পড়েছিল। আম–আর্জেন্তিনীয় তাই উৎসবে মেতেছিল বিশ্বসেরা হওয়ার আনন্দে। দেশের দশের সমস্যা নিয়ে ভাবনা ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছিল কিছুদিনের জন্য।

    কিন্তু, সেই সময় সন্তানহারা মায়েদের সঙ্গেই আর একজন ছিলেন, বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হলেও ম্যানেজার এল ফ্লাকোকে যিনি কখনও ক্ষমা করতে পারেননি। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭। দেশের প্রচারমাধ্যম চাপ দেওয়া সত্ত্বেও, মেনোত্তির মনে হয়েছিল, দেশের মাঠে বিশ্বকাপের চাপ নেওয়ার জন্য মানসিক দিক দিয়ে তৈরি নয় সেই কিশোর। তাই নেননি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে। পরে ৪০ বছর বয়সে সেই তারকা  আত্মজীবনীতে লিখবেন, ‘আটাত্তরের বিশ্বকাপে খেলতেই পারতাম। পুরোপুরি তৈরি ছিলাম। যখন জানতে পারি, চূড়ান্ত দলে নেওয়া হয়নি, কেঁদেছিলাম খুব। একই রকম কেঁদেছিলাম ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে। দুটো আলাদা ব্যাপার, কিন্তু আমাকে কাঁদিয়েছিল একই ভাবে কারণ দুটোই চূড়ান্ত অবিচার। মেনোত্তিকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না, করবও না। একই সঙ্গে বলব, ওকে ঘৃণা করি না। ক্ষমা করতে না–পারা আর ঘৃণা করা, এই দুটোও আবার এক নয়। কীভাবে আমাকে গাইড করেছিলেন এল ফ্লাকো পরের বছরগুলোয়, কী করে ভুলি?’

    হ্যাঁ, মেনোত্তি আটাত্তর বিশ্বকাপে নেননি ১৭ বছরের দিয়েগো মারাদোনাকে। খুব কি ভুল করেছিলেন? যে মানসিক পরিণতির অভাবের কথা বলেছিলেন মেনোত্তি, চার বছর পর সেই কথার সত্যতা কি প্রমাণিত হয়নি স্পেনে, যখন লাল কার্ড দেখে মাথা গরম করে বিশ্বকাপের আসর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল ২১ বছরের মারাদোনাকে?

    No comments