• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১৭ /রোনালদো–রহস্য, ট্রফি জিদানের /কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    বিশ্বকাপ ফিরেছিল ফ্রান্সে, ১৯৩৮–এর ৬০ বছর পর। এবং, প্রথমবার ৩২ দল বিশ্বকাপের মূলপর্বে। আভেলানজ যাওয়ার আগে আরও বাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা। আরও দুটি‘প্রথম’ দেখেছিল বিশ্ব। বিরতি এবং খেলা শেষের আগে চতুর্থ রেফারি তুলে ধরছেন একটি ইলেকট্রনিক বোর্ড, যেখানে জ্বলজ্বল করছে একটি সংখ্যা এবং যা দেখা যাচ্ছে গোটা মাঠজুড়ে। ওই সংখ্যা বোঝাচ্ছে, ‘ইনজুরি টাইম’ কত মিনিটের। আর শেষের পরিবর্তনটি, পেছন থেকে ফাউলে লাল কার্ড। রেফারিদের মধ্যে এখনও যা নিয়ে মতের অমিল। কিন্তু এটাও সত্যি, লাল কার্ড দেখার ভয় সামান্য হলেও অবচেতনে থাকায় পেছন থেকে ফাউলের সংখ্যা কমতির দিকে পরবর্তীকালে।

    গ্রুপ পর্ব

    আহত থাকায় রোমারিও আসেননি। ‘লাকি’ মারিও জাগাও আবার দায়িত্বে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে দলে থাকলেও একটিও ম্যাচে খেলেননি রোনালদো। এবার ২১ বছরে, ছন্দে। পাশে রিভালদো, চুরানব্বইয়ের দলে এমন কোনও সৃষ্টিশীল ফুটবলার ছিলেন না। বেবেতো তখনও ছিলেন। দুঙ্গার সঙ্গে ‘ডার্টি জব’ সম্পন্ন করতে জুনিয়র বাইয়ানো, সিজার সাম্পাইও। আর কাফু যদি ডান দিক থেকে ডানা মেলতে চান,বাঁদিক থেকে একই কাজ করতে এসে গিয়েছিলেন রোবের্তো কার্লোস। তাফারেল তো ছিলেনই। সুতরাং ব্রাজিল আবারও ফেবারিট, ট্রফি ধরে রাখতে। কিন্তু, গ্রুপের তৃতীয় ম্যাচেই হেরে বসল নরওয়ের কাছে!

    তোরে আন্দ্রে ফ্লো, বিশ্বকাপ এমন কিছু নামের জন্ম দিত তখনও। ইংরেজদের ক্লাব ফুটবল যেহেতু তখনও এই ২০১৮ সালের মতো ছেয়ে ফেলেনি বাঙালি জনমানসকে, চেলসির তোরে আন্দ্রের সঙ্গে তেমন পরিচিতি ছিল না বাঙালি দর্শকের। আজ মানে এই ২০১৮–য় এমন সম্ভাবনা নেই–ই প্রায়। এই ২০১৮ বিশ্বকাপেই যদি ইডেন হ্যাজার্ড নায়ক হয়ে ওঠেন, বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই তাঁকে এখন থেকেই চেনে, সেই চেলসিতে খেলার কারণেই। কিন্তু তখন তোরে আন্দ্রে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল করার পরই নায়ক। নরওয়ের কোচ এগিল ওলসেন বলেছিলেন, ‘জাগাও–র চেয়ে অনেক ভাল কোচ হতে পারতাম ব্রাজিলের। ব্রাজিলের থেকে আমাদের শেখার কিছু নেই কারণ এত বিশৃঙ্খল রক্ষণ আর দেখিনি। আবর্জনার স্তুপে যেমন শৃঙ্খলা থাকে, ব্রাজিলের রক্ষণও তেমন।’ ০–১ পিছিয়েই ছিল নরওয়ে, ৮১ মিনিট পর্যন্ত, কিন্তু শেষ ৯ মিনিটে যেহেতু দু’গোল, এগিল যা বলবেন শুনতে বাধ্য ছিলেন তিনবারের বিশ্বজয়ী জাগাও! যদিও তোরে–কে ফাউলের জন্য পেনাল্টি দেওয়া নিয়েও প্রচুর প্রশ্ন আছে, কিন্তু রেকডাল ভুল করেননি। আর, ওই ম্যাচটা মনে রাখতে হবে আরও একটি কারণে — তোরে আন্দ্রে আর জোস্তেইন, দুই ফ্লো–ভাইয়ের সঙ্গে তাদের তুতো ভাই হাভার্ডও খেলেছিলেন। বিশ্বকাপের মূলপর্বে তিন ভাইয়ের খেলার একমাত্র নিদর্শন ওই ম্যাচ। ওই জঘন্য রক্ষণ নিয়েও ব্রাজিল দ্বিতীয় পর্বে গিয়েছিল শীর্ষে থেকেই। নরওয়ে দ্বিতীয়, অঁরি মিশেলের প্রশিক্ষণে মরক্কো সাড়া জাগিয়ে শুরু করলেও (‌নরওয়ের বিরুদ্ধে ২–২, স্কটল্যান্ডকে হারানো ৩–০)‌ নকআউটে যেতে পারেনি, ব্রাজিল শেষ ম্যাচটা ড্র–ও করতে না–পারায়।

    গ্রুপ বি–তে ছিল ইতালি, সিজার মালদিনি, পাওলোর বাবার প্রশিক্ষণে। বাজ্জিওকে নিয়ে অদ্ভুত এক নেতিবাচক ভাবনা ছিল সিজারের। চুরানব্বইয়ের স্বর্গীয় ‘পনিটেল’ ততদিনে অদৃশ্য হলেও গোল করার ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানা ছেড়ে যায়নি তখনও। সিজার মানলে তো! শুরুতে সালাস–জামোরানো জুটির চিলের বিরুদ্ধে খেলা এবং ভিয়েরি প্রথমে গোল করলেও সালাসের জোড়া গোলে পিছিয়েই ছিল ইতালি। একেবারে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পায়, বাজ্জিও–র শট ফুয়েন্তেসের হাতে লাগায়। গত বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ পেনাল্টি নিতে গিয়েছিলেন বাজ্জিও, এবার দলের পাওয়া প্রথম পেনাল্টি নিতে আবারও তিনিই এগিয়েছিলেন, এবং ৮৫ মিনিটের সেই গোল ইতালিকে দিয়েছিল একটি পয়েন্ট। ২১ বছর ৩২৭ দিন, সবচেয়ে কমবয়সে বিশ্বকাপের মূলপর্বে অধিনায়ক নওয়ানকো কানুর নাইজেরিয়া অবশ্য আত্মসমর্পণ করেছিল ইতালির কাছে। অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গ্রুপ সি–তে ফ্রান্স–দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে। আয়োজকদের বিরুদ্ধে নেমেছিল বিশ্বকাপের মূলপর্বে প্রথম খেলতে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা এবং এমন একটি রেকর্ডের সঙ্গে তাঁদের পিয়ের ইসা–র নাম জড়িয়ে যায়, যা ভুলে যেতেই চাইবেন ইসা! বিশ্বকাপে তিনিই একমাত্র যিনি দু’টি আত্মঘাতী গোল করেছিলেন এক ম্যাচে! এবং এখানেই শেষ নয়, ইসা কাজটি করেছিলেন নিজের ক্লাবের ঘরের মাঠ মার্সেই–তে!

    আয়োজকদের দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ৪–০ জিতলেও ৬৯ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন জিনেদিন জিদান। অধিনায়ক ফুয়াদ আমিন মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন জিদানের সঙ্গে সংঘর্ষে। মাটিতে পড়ে–থাকা আমিনের শরীরে ডান পা মাড়িয়ে দিয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন জিদান। প্রথম ম্যাচেই দেখেছিলেন হলুদ কার্ডও। বোরাসিয়া ডর্টমুন্ড এবং রেয়াল মাদ্রিদের কাছে পরপর দু–বার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও হেরেছিলেন জিদান, বিশ্বকাপের আগেই। ফলে, বড় ম্যাচে এবং বড় আসরে ব্যর্থতার তকমা লেগে গিয়েছিল, বিশেষ করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অনাবশ্যকভাবে সরাসরি লাল কার্ড দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর। তবে, ফ্রান্সের তাতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি এই ম্যাচ জিততে। তখনই ২–০ এগিয়ে, শেষে ৪–০। কিন্তু, সরাসরি লাল কার্ড দেখায় দুটি ম্যাচ খেলতে পারবেন না জিদান। অর্থাৎ গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয় পর্বের নকআউট ম্যাচে, যা চিন্তার কারণ ছিল কোচ আইমে জাকের। দিওরকায়েফের পেনাল্টি এবং পেতি–র গোলে অবশ্য ডেনমার্ককে হারিয়ে স্বস্তিতেই দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছেছিল ফ্রান্স।

    বুলগারিয়াকে ৬–১ হারিয়েও প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল স্পেনকে, নাইজেরিয়ার কাছে প্রথম ম্যাচে অবিশ্বাস্য ২–৩ হারে। নাদাল, ইয়েরো, এনরিকে, রাউলরা তখন হাভিয়ের ক্লেমেন্তের দলে। ২–১ এগিয়ে থাকা অবস্থায় নাইজেরিয়ার গারবা লাওয়ালের নিচু ক্রস ধরতে গিয়ে নিজের গোলে পাঠিয়ে দেন স্পেনের গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতা, দেশের হয়ে নিজের ১২৪–তম ম্যাচে, নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপে। স্পেন অদ্ভুতভাবে গুটিয়ে যায় তারপর। তখনও বিশ্বকাপে এমনই হত, বরাবরই নকআউটে হঠাৎ করে সব ঘেঁটে যেত স্পেনের, এবার তা–ই হয়েছিল প্রাথমিক পর্বে। চিরন্তন ‘আন্ডার অ্যাচিভার’ তখনও স্পেনের নাম, যা সার্থক করতে পরের পারাগুয়ে ম্যাচেও গোল দিতে পারেননি রাউলরা। বুলগারিয়াকে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন ঠিক, কিন্তু, তত দিনে বোরা মিলুটিনোভিচের নাইজেরিয়া আর সেজার কার্পেজিয়ানির পারাগুয়ে নিজেদের জায়গা করে ফেলেছে দ্বিতীয় পর্বে। ছিয়াশিতে মেহিকোকে নিয়ে শুরু–করা সার্বীয় বোরার সে বার চতুর্থ বিশ্বকাপ। প্রথমেই পৌঁছেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রতিবারই নতুন নতুন দেশ নিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া এবং কিছু অঘটন ঘটানো তত দিনে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছিলেন। ১৯৯০–তে কোস্টা রিকা (‌দ্বিতীয় পর্ব)‌, ১৯৯৪–তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (‌দ্বিতীয় পর্ব)‌ এবং ১৯৯৮–তে নাইজেরিয়াকেও নিয়ে গেলেন নকআউটে, কোচ হিসেবে যা অনন্য রেকর্ড। এবং সেই রেকর্ড আরও ভাল হয়েছিল, পরের বার, ২০০২ বিশ্বকাপে চিনকে মূলপর্বে নিয়ে যাওয়ায়। হ্যাঁ, নকআউটে নিয়ে যেতে পারেননি চিনকে, কিন্তু, পাঁচটি দেশকে বিশ্বকাপের মূলপর্বে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব মিলুটিনোভিচ ছাড়া আর কারও নেই।

    গাস হিডিঙ্কও এসে গিয়েছিলেন হল্যান্ডের দায়িত্বে। ১৯৯৬ ইউরোতেই হিডিঙ্ক প্রথম আসেন খবরের শীর্ষে যখন তারকা এডগার ডাভিডসকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে তর্কের কারণে। ডাভিডসের সেই মন্তব্য এখনও ভোলেনি বিশ্ব। বাংলা–অনুবাদে ধরা যাবে না, তাই সরাসরি ইংরেজিতেই, ‘the coach should not put his head in the ass of some players.’ দু–বছর পর ফ্রান্স বিশ্বকাপে তাঁর দাপট দলে প্রতিষ্ঠিত। ডাচ দল মানেই অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত বলে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, হিডিঙ্ক চেষ্টা করেছিলেন তাকে সমূলে উৎপাটিত করতে। বিশ্বাসী ছিলেন ৪–৪–২ ছকে, যদিও বার্গক্যাম্পকে খেলাতেন ক্লুইভার্টের একটু পেছনে অর্থাৎ হিসেবমতো যা দাঁড়াত ৪–৪–১–১। আর উইংব্যাকদের ওপরে উঠে আসতে, এমনকি গোল করতেও উৎসাহ দিতেন, যা তাঁর প্রশিক্ষণে থাকা সব দলেরই বৈশিষ্ট্য থেকে গিয়েছে। ডাভিডসকে ফিরিয়ে এনেছিলেন বিশ্বকাপে, আগের মনোমালিন্য মাথায় না রেখে। দক্ষিণ কোরিয়াকে উড়িয়ে আর বেলজিয়াম ও মেহিকোর বিরুদ্ধে ড্র করে নকআউটে। ইউরো–চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকেও নকআউটে পৌঁছতে বিশেষ ঘাম ঝরাতে হয়নি।

    আর্জেন্তিনার কোচের দায়িত্বে দানিয়েল পাসারেয়া, ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। এবং, মেনোত্তির ভাবশিষ্য প্রায় মিলিটারি নিয়ম চালাতে চেয়েছিলেন আর্জেন্তিনা শিবিরে। আলবিসেলেস্তে (‌আর্জেন্তিনার জাতীয় ফুটবল দলের ডাকনাম)‌ শিবির যা নিয়ে একেবারেই খুশি ছিল না। বিশেষ করে গাব্রিয়েল বাতিস্তুতার সঙ্গে বড় চুল নিয়ে ঝামেলা (‌মনে পড়তে পারে আমাদের কলকাতার সৈয়দ নঈমউদ্দিনের কথা,তিনিও ফুটবলারের ফুটবল–দক্ষতার চেয়ে বেশি নজর রাখতেন কার চুল বড় হল সেই দিকেই!)‌, দীর্ঘদিন তাঁকে দলেই নেননি পাসারেয়া। কিন্তু ফিওরেন্তিনার হয়ে গোলের পর গোল করে চলেছিলেন‘বাতিগোল’, সিরি আ–তে। নিঃসন্দেহে তখনকার বিশ্বে সেরা লিগে নিয়মিত গোল করে–যাওয়া বাতিস্তুতাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের দলে রাখতে বাধ্যই হয়েছিলেন পাসারেয়া। বাছাইপর্বে তিন ম্যাচে চার গোলে সেই আস্থার মর্যাদাও দিয়েছিলেন বাতিগোল।

    দ্বিতীয় পর্ব

    মিরোস্লাভ ব্লাজেভিচের প্রশিক্ষণে ক্রোয়েশিয়া তত দিনে জবরদস্ত ‘হিট’ টেলিদর্শকের কাছে। ইংরেজ প্রচারমাধ্যম ক্রোয়েশীয়দের লাল–সাদা জার্সির নাম দিয়েছিল ‘পিকনিকের টেবলক্লথ’! অ্যালেন বকসিচের আঘাত বাধ্য করেছিল তাদের, স্ট্যানিচকে ওপরে তুলে নিতে। আর ছিলেন দাভর সুকের। রেয়াল মাদ্রিদে দেল বস্কের প্রশিক্ষণে সেই বছর বেশি সুযোগ পাননি। ৩৭ ম্যাচে ১৫ গোল করলেও, সেই ৩৭ ম্যাচের অধিকাংশ সময়ই খেলেছিলেন পরিবর্ত হিসেবে। তবুও, ছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী রেয়াল দলে। আর, বিশ্বকাপে এসেই দলের দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা পেয়ে প্রথম বড় প্রতিযোগিতা ছিল ইউরো ১৯৯৬ যেখানে চ্যাম্পিয়ন জার্মানির কাছে হারতে হয়েছিল দ্বিতীয় পর্বে। বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বে জামাইকা আর জাপানকে সহজেই হারিয়ে এবং আর্জেন্তিনার কাছে হেরে দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছেছিল ক্রোয়েশিয়া। রোমানিয়াকে হারায় সুকেরের পেনাল্টি গোলে, যদিও পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ছিল। রেফারি আর্জেন্তিনার হাভিয়ের কাসত্রিই–র সিদ্ধান্তে দু’বার পেনাল্টি মারতে হয়েছিল সুকেরকে, বোবান বক্সে ঢুকে যাওয়ায়। তবে, দু’বারই সুকের গোল করেছিলেন এবং গোলরক্ষকের একই দিকে, বাঁ–পায়ের শটে। আর পেনাল্টি নিতে যাওয়ার আগে গালে হাত দিয়ে সুকেরের সেই বিখ্যাত ছবি, যদিও ক্লাব ফুটবলেও কাউকে আর সেভাবে পেনাল্টি নেওয়ার আগে গালে হাত দিয়ে ভাবতে দেখা যায়নি সচরাচর!

    সবচেয়ে বেশি হইচই — অকারণে নয়, অবশ্যই — দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্তিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে। বিরাশির ষোল বছর পর আর্জেন্তিনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন মারাদোনা আর। কিন্তু, বিশ্বকাপে যতবার আর্জেন্তিনার সামনে পড়বে ইংল্যান্ড ভবিষ্যতেও, কী করে ছিয়াশির মেহিকো বিশ্বকাপ ভুলে যাবেন ফুটবল–দর্শক? সঁ এতিয়েঁ–তে নাটক অবশ্য শুরু থেকেই। প্রথম দশ মিনিটে দুটি গোল, দুটি–ই পেনাল্টি থেকে, যথাক্রমে বাতিস্তুতা এবং শিয়ারারের। প্রথমে সিমিওনেকে ফাউল সিম্যানের, পরে ওয়েনকে আয়ালার। দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন ছিল কিন্তু যা নিয়ে প্রশ্ন একেবারেই ছিল না, ১৫ মিনিটে ১৮ বছর বয়সী মাইকেল ওয়েনের দুর্দান্ত গোল। বেকহ্যামের পাস থেকে বল পেয়েছিলেন সেন্টার সার্কেল–এর ভেতরই, তবে আর্জেন্তিনার অর্ধে। দুরন্ত গতিতে দুই ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে রোয়া–কে পরাস্ত করে যান ওয়েন। বিরতির ঠিক আগে ফ্রি কিক থেকে ভেরন পাস দিয়েছিলেন জানেত্তিকে, বাঁ পা ঝলসে উঠেছিল, বিরতিতে ২–২ নিয়ে দু’দল সাজঘরে। কিন্তু, বিরতির পরই ম্যাচ ঢলে পড়েছিল আর্জেন্তিনার দিকে যখন বেকহ্যামকে ফাউল করেছিলেন সিমিওনে। মাটিতে শুয়ে–থাকা অবস্থায় বেকহ্যাম ডান পা মুড়ে পেছন থেকে সামনে এনে অনাবশ্যক লাথি চালান সিমিওনের পায়ে। ডেনমার্কের রেফারি কিম মিলটন নিয়েলসেন ছিলেন কাছেই। সঙ্গে সঙ্গে হলুদ কার্ড দেখান সিমিওনেকে এবং বেকহ্যামকে লাল কার্ড। সিমিওনের পড়ে–যাওয়ায় অতিনাটকীয়তা ছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু, অমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাঘাত মানেই লাল কার্ড, এ–ও নিশ্চিত! বেকহ্যাম নিজেই দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন অন্ধকারের দিকে।

    পরে, আত্মজীবনীতে লিখবেন বেকহ্যাম, ‘কে জানত বিরতির পর আমার ভাগ্যে অমন কিছু অপেক্ষা করে আছে? বিশ্বকাপের আগেই হডল বলেছিলেন, চাপের মুখে আমার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ছিল ওঁর মনে। সেই কারণেই প্রথম ম্যাচে নামাননি। দিয়েগো সিমিওনে বেশ ভাল ফুটবলার। কিন্তু সে দিন যেভাবে বারবার পায়ের ওপর এসে পড়ছিল, বাড়ছিল রাগ। বিরতির ঠিক পরেই আবার এসে পড়ল পায়ের ওপর। এবার পেছন থেকে। পা ছুঁড়লাম বিরক্তিতে আমিও। এবং ছুঁড়েই বুঝলাম, ভুল করে ফেলেছি!

    ‘সোজা ফিরে গিয়েছিলাম সাজঘরে। স্নান সেরে বসেছিলাম, ফিফার এক প্রতিনিধি এসে জানিয়েছিলেন, ডোপ টেস্টের জন্য যেতে হবে। গেলাম। পরে যখন দেখি যে ডেভিড ব্যাটি মিস করেছে পেনাল্টি এবং আমরা হেরে বিদায় নিয়েছি বিশ্বকাপ থেকে, বুঝে যাই, দোষ আসবে আমার ঘাড়েই। এরপর সারা জীবন আমাকে ওই একটিই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে, কেন লাথি মেরেছিলাম সিমিওনেকে?

    ‘বিশ্বকাপে আসার আগেই ভিক্টোরিয়া খবর দিয়েছিল, সন্তানসম্ভবা। আমার কাছে তখন যা সবচেয়ে খুশির খবর ছিল। কিন্তু, সেই সময় সেভাবে আনন্দ করার সুযোগও পাইনি। ভাবলাম, দল যখন হেরেই গিয়েছে, আমেরিকায় চলে যাই, ভিক্টোরিয়ার পাশে থাকি এই সময়টায়। ভেবেছিলাম, মন ভাল থাকবে। জানতাম না, বিমানবন্দর থেকেই সাংবাদিকরা পিছু নিয়েছিল।

    ‘সেই সময়টা সত্যিই বিভীষিকার মতো। বাকি জীবন ধরেই জানিয়ে যেতে হবে, সেই লাথি মারার কারণ। সাধারণ মানুষের কাছে, ইংল্যান্ডের জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল ভিক্টোরিয়া। যে–ভাষায় তার উত্তর এসেছিল, বলতেও খারাপ লাগে। এমন অপরাধ করে ফেলেছি নাকি, যে–কারণে আমার দেশে ফেরার পথই বন্ধ, এমনও শুনতে পাচ্ছিলাম। ইংল্যান্ডে অবশ্য সবই সম্ভব। বিপক্ষের ফুটবলারকে এক লাথি মেরে নিজের দেশে দেশদ্রোহী হওয়া যেমন!’

    হ্যাঁ, পরের মরসুমেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ত্রিমুকুট জিতবেন বেকহ্যাম, ঠিক। কিন্তু, বার্সেলোনায় সেই দিনটা আসার আগে পর্যন্তও বেকহ্যাম ছিলেন ইংরেজ মিডিয়ার সবচেয়ে বড় ‘ভিলেন’, সন্দেহ ছিল না এ–নিয়েও। সবই পেছনে চলে গিয়েছিল। হডল যেমন ব্যাটিকে নামিয়েছিলেন মাঠে, ৯৭ মিনিটে, পেনাল্টি–বিশেষজ্ঞ হিসেবে। বেকহ্যাম ৪৭ মিনিটে লাল কার্ড দেখার পরের ৭৩ মিনিট ইংল্যান্ড দাঁতে দাঁত চেপেই লড়েছিল। টাইব্রেকারে ক্রেসপো এবং ইন্সের শট বাঁচানো হয়, শেষে ব্যাটির শটও, যে–ব্যাটিকে পেনাল্টি নেওয়ার জন্যই নামিয়েছিলেন হডল। কিন্তু, ততক্ষণে তো নিশ্চিত হয়েই গিয়েছে খলনায়কের নাম, ইংরেজ মিডিয়ায়!

    সেই দ্বিতীয় রাউন্ডেই আরও একটি ‘প্রথম’ দেখেছিল বিশ্বকাপ। ‘সোনালি গোল’। টাইব্রেকারের মন–ভেঙে দেওয়া সমাপ্তির চেয়ে, ফিফার মনে হয়েছিল, এমন একটা পথ খোলা থাকুক যাতে ম্যাচের ফয়সালা হয়ে যেতে পারে টাইব্রেকারে পৌঁছনোর আগে। তাই, নিয়ম হয়েছিল, অতিরিক্ত সময়ের খেলা হবে যেমন হয়। কিন্তু, যে কোনও দল গোল পাওয়ামাত্রই খেলা শেষ! এবং যে–দিন এই নিয়ম প্রচলিত হয়েছিল, বলা হয়েছিল, খেলার প্রাথমিক নিয়ম অর্থাৎ পিছিয়ে পড়লেও সেই গোল শোধ দেওয়ার জন্য সুযোগ পাওয়াটা জরুরি বিপক্ষের কাছে। তখন যুক্তির পাল্টা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল সেই সব ম্যাচের কথা যেখানে ৯০ বা ১২০ মিনিটে গোল দিয়ে জিতেছে কোনও দল, বিপক্ষকে সেই গোল শোধ দেওয়ার সময় না দিয়ে। তারও পাল্টা বলা হয়েছিল যে, নির্ধারিত সময়, মানে খেলাটা ৯০ বা ১২০ মিনিট হবে, এটা তো পক্ষ–বিপক্ষ সবাই–ই জানে। সোনালি গোলের নিয়মে সবচেয়ে বেশি অসঙ্গতি তো সেখানেই যে, নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যাচ্ছে না। তখন ফিফা মানেনি। তাই চালু ছিল সোনালি গোলের নিয়ম। আর সেই নিয়মে প্রথম গোল পারাগুয়ের বিরুদ্ধে আয়োজকদের পক্ষে লরা ব্লাঁয়ের, ১১৩ মিনিটে, ত্রেজেগুয়ের হেড থেকে ভলিতে। চিলাভার্টের শেষ ম্যাচ। গোল হওয়ার পর বিহ্বল, বুঝতেও সময় নিয়েছিলেন যে খেলা শেষ, বাকি ৬ মিনিট আর পাবে না পারাগুয়ে! আর, প্রতি ম্যাচে বার্থেজের টাকে চুমু–দেওয়া ব্লাঁ–র আলাদা পরিচিতি তখন, জিদানহীন ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে–যাওয়া নায়ক হিসেবেও।

    কোয়ার্টার ফাইনাল

    কোয়ার্টার ফাইনালে জিদান ফিরলেও বিশেষ লাভ হল না ফ্রান্সের। সামনে ছিল ইতালি। আর, প্রতিযোগিতার সেরা রক্ষণের লড়াই দুই দলে। একদিকে আয়োজকদের পক্ষে ক্রমশ মহীরুহ হয়ে উঠছেন মার্সেল দেশাই, সঙ্গে ব্লাঁ–লিজারাজু–থুরঁ। উল্টোদিকে কোস্তাকুর্তা–বার্গোমি–কানাভারোর সঙ্গে পাওলো মালদিনি, তখনও রক্ষণের বাঁদিকে শ্রেষ্ঠ। ফলে দেল পিয়েরো–ভিয়েরি–পেসোতো বা পরিবর্ত বাজ্জিওর যা অবস্থা, জিদান–দিওরকায়েফ–গুইভার্চেরও। কোনও দলই গোল না–পেলে যা অবশ্যম্ভাবী, ম্যাচ গেল টাইব্রেকারে। ১৯৯০, ১৯৯৪–এর পর টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ থেকে ইতালি বিদায় নিল টাইব্রেকারে হেরে। এবার মিস করলেন আলবের্তিনি ও দি বিয়াজিও; বিশ্বকাপ অধরাই থেকে গেল সর্বকালের সেরা লেফট ব্যাক মালদিনির!

    ব্রাজিল–ডেনমার্ক মানে সেরা গোলগেটার রোনালদোর বিরুদ্ধে অন্যতম সেরা গোলরক্ষক পিটার স্মাইশেলের লড়াই। স্মাইশেল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলার কারণে ইংরেজ সাংবাদিককুলের বেশ পরিচিত, বলেছিলেন রোনালদো সম্পর্কে যে, ‘রোনালদো তো আস্ত বিপর্যয়! যতবার বল পায়ে পায়, প্রতিবারই হারিয়ে ফেলে!’ সেই ম্যাচে বার দুয়েক রোনালদোর শট ধরে ফেলেছিলেন ঠিকই। কিন্তু,ব্রাজিলের তিন গোলের প্রথম দুটিই রোনালদোর তৈরি করে দেওয়া, যাকে বলে ‘অ্যাসিস্ট’। প্রথমে বেবেতোকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন ড্যানিশ রক্ষণের মাঝখান দিয়ে, পরের বার রিভালদোর জন্য একই রকমের ডিফেন্সচেরা থ্রু, তবে এবার বাঁদিকে। এবং স্মাইশেলকে শুয়ে পড়ার সময়টুকু দিয়ে রিভালদোর বাঁ–পায়ের ‘ডিলাইটফুল চিপ’। ডেনমার্ক লড়ছিল সমানে–সমানে, দুই লাউড্রাপ ভাইয়ের সৌজন্যে। ২ মিনিটে জোরগেনসেনের গোলের পেছনে দুই ভাইয়ের অবদান। দ্বিতীয় গোল রোবের্তো কার্লোসের সৌজন্যে, এমন ভুল তিনি আবার করবেন ২০০৬ কোয়ার্টার ফাইনালে। কিন্তু সেবারের ভুলের মাসুল দিতে হয়নি ব্রাজিল জিতে যাওয়ায়। গোল করে ব্রায়ান তো নান্তেসের মাঠে শুয়ে পড়েছিলেন, মাথার তলায় বাঁ–হাত রেখে, আড়াআড়ি, যে ভঙ্গিমায় অনেক সময় নিজের শোওয়ার ঘরে আমরা শুয়ে খবরের কাগজ পড়ি, বিছানা–চা সহযোগে! কিন্তু, রিভালদোর ২৫ গজের শটে স্মাইশেল আবারও পরাস্ত। সুতরাং, ব্রাজিল আবারও সেমিফাইনালে।

    হল্যান্ড–আর্জেন্তিনা ম্যাচ ডেনিস বার্গক্যাম্পের। দুর্দান্ত ম্যাচ, কিন্তু স্মৃতিতে বার্গক্যাম্প ছাড়া আর কেউ সেভাবে থাকেননি, বিশেষত দ্বিতীয় গোলের জন্য। প্রথম গোলটা রোনাল্ড ডি বোয়েরের বাঁকানো শটে পড়ে–যেতে–যেতে হেড দিয়ে ক্লুইভার্টের জন্য সাজিয়ে দিয়েছিলেন বার্গক্যাম্প। দ্বিতীয় গোলটার সময় ফ্র্যাঙ্ক ডি বোয়েরের লং বল, আর্জেন্তিনা বক্সে ডান পায়ের অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণে পোষ মানালেন বলকে,একটা ছোট্ট টোকায় আয়ালা নেই, সামনে গোলরক্ষক রোয়া, ডান পায়ে দূরের পোস্টে উঁচু করে রেখে গেলেন। ছবির মতো গোল, মনে রেখে দেওয়ার কারণ ওই অসম্ভব ফার্স্ট টাচ–টা। যদিও গোলের বর্ণনা দেওয়ার সময় ইউটিউব–এ আর একবার দেখে নিতেই হল, তবু, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, সব কিছুই ভুলে যাওয়ার জন্য নয় দেখে! আর্জেন্তিনার হয়ে লোপেজ শোধ দিয়েছিলেন একটি গোল, ভেরনের পাস থেকে। কিন্তু, বাতিস্তুতার এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তেমন মনে–রাখার মতো পারফরম্যান্স কই?

    শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে বিরাট চমক। বিশ্বকাপে নবাগত ক্রোয়েশিয়া পরিষ্কার তিন গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দিল প্রতিযোগিতার অন্যতম ফেবারিট জার্মানিকে! ম্যাথাউস, কোহলার, বিয়েরহফ,ক্লিন্সম্যানরা তখনও আছেন। কিন্তু, বয়স থাবা বসিয়েছে অনেকেরই দক্ষতায়। আর ক্রোয়েশিয়া টগবগে, চনমনে। জার্নি, ভ্লাওভিচ আর সুকেরের গোল ব্লাজেভিচের দল সেমিফাইনালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে। ১৯৩০, ১৯৩৪ — দুটি বিশ্বকাপেই অধিকাংশ দলের ছিল প্রথম বিশ্বকাপ। ফলে, প্রথমবার খেলতে এসেই সেমিফাইনাল, ফাইনাল বা জয়ী হওয়ার মতো কৃতিত্বের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ৬৮ বছর পর এসেই সেমিফাইনাল মানে কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে বিরাট সুকের–প্রসিনেচি–বোবানদের।

    সেমিফাইনাল

    প্রথম সেমিফাইনালে ব্রাজিল–হল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে এখনও ডাচ সমর্থকদের আক্ষেপ, বার্গক্যাম্প একেবারেই ছন্দে ছিলেন না আর ক্লুইভার্ট একের পর এক মিস করে গিয়েছিলেন ইচ্ছেমতো। উচ্ছ্বাস সরিয়ে দেখলে, ক্লুইভার্ট অন্তত দুবার ফাঁকায় হেড করার সুযোগ পেয়েও তিনকাঠিতে রাখতে পারেননি যেমন, রোনালদো এবং রিভালদো অন্তত তিনবার ব্রাজিলকে আরও এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েও বল রাখতে পারেননি জালে। প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল গোলশূন্য। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রিভালদোর পাস খুঁজে নিয়েছিলেন রোনালদো, বাঁ–পায়ে, বাঁ–পায়েই পরাস্ত করেছিলেন ভ্যান ডার সারকে। তারপর কীভাবে অন্তত দুটি গোল মিস করেছিলেন, রোনালদোই জানেন! ক্লুইভার্ট শেষ পর্যন্ত সফল হন ৮৬ মিনিটে, রোনাল্ড ডি বোয়েরের ক্রসে লাফিয়ে উঠে হেড দিয়ে। টাইব্রেকারে হল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ আবার। নিজের ১০০–তম ম্যাচে তাফারেল বাঁচিয়ে দেন কোকু এবং রোনাল্ড ডি বোয়েরের শট। ব্রাজিল পরপর দুবার ফাইনালে।

    ফ্রান্স কিন্তু ক্রোয়েশিয়াকে একেবারেই খেলতে দেয়নি নিজেদের খেলা। আইমে জাক নির্ভরশীল ছিলেন রক্ষণের ফুটবলারদের দক্ষতায়। দেশাই, দেশঁ, ব্লাঁ, লিজারাজু, থুরঁ, পেতি, কারেমবিউ — এই ছ’জনের খেলায় আগের ফ্রান্সের অঁরি মিশেল ‘ট্যাকটিক্যালি লুজ এলিমেন্টস’ নামে যে–ভাবনার আমদানি করেছিলেন, জাকের অধীনে এঁরাও একই ঘরানায়। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে তো ফ্রান্স কোনও উইঙ্গার রাখেইনি দলে। অবশ্য লিজারাজু আর থুরঁ থাকলে দরকারই বা কী! বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এক উইংব্যাকের দু’গোল, আগে বা পরে কখনও হয়েছে কি? হয়ত অবিশ্বাস্য, কিন্তু, সত্যি যে, ফ্রান্সের হয়ে মোট ১৪২ ম্যাচ খেলে থুরঁ–র গোলসংখ্যা ওই দুটিই! ক্রোয়েশিয়া সুকেরের গোলে এগিয়ে গেলেও পরাস্ত হয় থুরঁ–র কাছে। আর একটি কাজ করেছিলেন ক্রোয়েশীয় ডিফেন্ডাররা, জিদানকে টুঁ শব্দও করতে দেননি সেমিফাইনালে। আবারও তাই প্রচারমাধ্যমে বিরাট হয়ে উঠে এসেছিল জিদানের বড় ম্যাচে ব্যর্থতার কিসসা। তৃতীয় স্থানের ম্যাচে হল্যান্ডকে ২–১ হারিয়ে আর নিজের ষষ্ঠ গোল পেয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার নিয়ে যান দাভর সুকের।



    ফাইনাল, রহস্য–রোমাঞ্চ!

    কী হয়েছিল ফাইনালের আগে রোনালদোর?

    প্রথমে বলা হয়েছিল গোড়ালিতে চোট। তারপর, পেট–খারাপ। ম্যাচ শুরুর ৭২ মিনিট আগে যখন মিডিয়ার হাতে পৌঁছেছিল টিম–লিস্ট, রোনালদোর নাম ছিল না সেখানে। সাংবদিকরা হইচই শুরু করে দিয়েছিলেন। খেলা শুরুর আধঘন্টা আগে আবার টিম লিস্ট আসে, সেখানে নাম ছিল রোনালদোর। কিন্তু, ব্রাজিল দলের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, ম্যাচের আগে সরকারিভাবে গা ঘামাতেও আসেনি।

    ব্রায়ান গ্ল্যানভিলের বই জানাচ্ছে — ‘পরের বছর সাও পাওলোর ম্যাগাজিন প্লাকার খানিকটা জানাতে পেরেছিল ঠিক কী হয়েছিল সেই দিন। লেখা হয়েছিল, সেই ফাইনালের দিন দুপুর দুটো নাগাদ রোনালদোর খিঁচুনি হয়, হোটেলের ঘরে। রুমমেট ছিলেন রোবের্তো কার্লোস যিনি ভয়ে, শঙ্কায় হতভম্ব হয়ে দৌড়ে গিয়ে ডেকে এনেছিলেন এদমুন্দো, সেজার সাম্পাইওদের। মৃগি রোগীদের ক্ষেত্রে যেমন হয়,ঠিক তেমন। সাম্পাইও জোর করে রোনালদোর মুখ খুলে রেখেছিলেন যাতে জিভটা ভেতরে না চলে যায় বা অচেতন রোনালদো দাঁত দিয়ে কেটে না ফেলেন। প্রায় পৌনে দু–মিনিট ওই অবস্থায় থাকার পর রোনালদো স্বাভাবিক হন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ড. লিদিও তোলেদোকে সঙ্গে সঙ্গেই খবর দেওয়া হয়। তিনি অর্থোপেডিক, তাই ডেকে আনেন ড. জোয়াকিম মাতা–কে। জিকো তখন সহকারী ম্যানেজার, খবর দেওয়া হয় তাঁকেও। জাগাও তখনও জানতেন না কী ঘটেছে, তোলেদো চাননি তাঁকে জানাতে। এরই মধ্যে রোনালদোর চেতনা ফিরে আসে। পাঁচটা নাগাদ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লিলাস ক্লিনিকে। সেখানে প্রায় ঘন্টা দেড়েক চলে চিকিৎসা এবং নানা পরীক্ষা। তবে, খারাপ কিছু ধরা পড়েনি।

    ‘স্তাদ দে ফ্রান্সে রোনালদো পৌঁছন ৮টা ১০ মিনিটে। রোনালদো নিজেই বলেছিলেন নাকি, দিব্যি আছেন, খেলতে পারবেন। কোচ জাগাও, যিনি সেই খিঁচুনির পর আর দেখেননি রোনালদোকে তার আগে,রোনালদো তাঁকেই বারবার অনুরোধ করেন তাঁকে খেলাতে। দুই ডাক্তার সমর্থন করেন তাঁকে। তোলেদো পরে বলেছিলেন, ‘আমার অবস্থা ভাবুন। রোনালদো বলছে খেলতে পারবে, দুই ডাক্তার ওকে সমর্থন করছে। এ দিকে, খেলার শেষে আমরা হারছি!’ তাই জাগাওকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যাবে না, রোনালদোকে খেলানো নিয়ে। যে–কারণে দোষী করা যায়, একেবারেই খেলতে পারছেন না দেখেও রোনালদোকে মাঠে রেখে দেওয়া নিয়ে। খেলার আগে কি কোনও নীল রঙের ট্যাবলেট খেতে দেওয়া হয়েছিল? ভ্যালিয়াম? এখনও তা প্রমাণিত নয়। কিন্তু, যদি সত্যিই হয়ে থাকে তেমন, বিশেষজ্ঞরা পরে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, আরও অসুস্থ হয়ে তো পড়তেই পারতেন, প্রাণ সংশয়ও হতে পারত রোনালদোর।’

    বিবিসি–র রিপোর্টে রোনালদোর পরিষ্কার মন্তব্য, ‘বিশ্বকাপটা হারিয়েছিলাম ঠিকই। তবে আমি জিতেছিলাম একটা কাপ — আমার জীবন! জানি না ঠিক কী হয়েছিল। আমার কিছুই মনে নেই। ডাক্তাররা যেমন বলেছেন, ৩০–৪০ সেকেন্ডের জন্য অচেতন ছিলাম।’ আর রোবের্তো কার্লোসের মতে, ‘রোনালদো বেশ চিন্তায় ছিল, কী হবে নিয়ে। চাপটা নিতে পারেনি তখন, কাঁদছিলও। অবস্থা আরও খারাপ হয় চারটে নাগাদ। সেই সময়ই দলের ডাক্তারদের একজনকে ডেকে জানাই সব।’

    সমস্যা হল, সাও পাওলোর ম্যাগাজিন এবং বিবিসি–র রিপোর্টেই দু’ঘন্টার পরিষ্কার ফারাক দেখা যাচ্ছে। একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে দুপুর দুটোয়, একটিতে আবার রোবের্তো কার্লোস বলেছেন বিকেল চারটের কথা। তবে, কিছু একটা হয়েছিল যে, সন্দেহ নেই। এবং, এই ঘটনায় ব্রাজিল শিবির মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল এতটাই যে, খেলার মতো মানসিক অবস্থাতেই ছিল না। তাই খেলায় জিদান দু–দু’বার কর্নার থেকে হেডে গোল দিলেন, ব্রাজিলের রক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। কার্লোস তো মনে–মনে বোধহয় তখনও সেই ঘরেই আটকে ছিলেন যেখানে খিঁচুনি ধরেছিল রোনালদোর! দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুটি গোলের ক্ষেত্রেই। দেশাই লাল কার্ড দেখেছিলেন কাফুকে ফাউল করে, আর সেমিফাইনালে অপ্রয়োজনীয় লাল কার্ড দেখে ব্লাঁ সমস্যায় ফেলেছিলেন দেশকে। কিন্তু ফাইনালের আগে দলের তুক অনুযায়ী ব্লাঁ চুমু খেয়েছিলেন বার্থেজের টাকে। আর রোনালদোর অসুস্থতার কারণে ব্লাঁ–র অভাব বুঝতে পারেনি ফ্রান্স। ফরোয়ার্ডরা একটিও গোল করেননি শেষ ৫ ম্যাচে, কিন্তু বিশ্বকাপ ফ্রান্সের। প্রধানত দুর্দান্ত রক্ষণ এবং মাঝমাঠে অধিনায়ক দেশঁর দুর্দান্ত নেতৃত্বে। বেকেনবাওয়ারের মতোই ইউরো ও বিশ্বজয়ী দেশঁ এখন ফ্রান্সের কোচ আবার।

    কিন্তু, তখনও ফ্রান্সের বিশ্বজয়ে খুশি হননি এক ফরাসি। এরিক কঁতোনা, অধিনায়ক দেশঁকে যিনি বলেছিলেন জলবাহক!



    (আগামিকাল ২০০২ বিশ্বকাপ)

    No comments