• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১৮ /‌ এবার বিশ্ব রোনালদোর! /‌ কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    বিশ্বকাপ এসে পৌঁছল আমাদের এশিয়া মহাদেশে, সঙ্গে বিতর্কও!
    ১৯৯৬ সালে ফিফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০০২ বিশ্বকাপ হবে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ ছিল, দুশ্চিন্তাও। এশিয়ায় প্রথমবার বিশ্বকাপ, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো খরচসাপেক্ষ প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষমতা আছে কি এশিয়ার? এই প্রশ্ন বিশেষভাবে তুলেছিল শ্বেতাঙ্গ দুনিয়া, এশিয়ার দেশগুলির সব কিছু নিয়েই যাঁদের সমস্যা ছিল বা আছে, বরাবরই! হ্যাঁ, অন্য একটি প্রশ্ন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক কোনও কালেই তেমন ভাল ছিল না। বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের ভূমিকা, তারও আগে জাপানের কোরিয়া আক্রমণ এবং উপনিবেশ, দু–দেশের সম্পর্কে শৈত্য, প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। তা ছাড়া, ছিল আরও নানারকমের প্রশ্ন। ফিফা কি যৌথ আয়োজক হিসেবে দুটি দেশকেই দেবে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ? উদ্বোধনী ম্যাচ কোথায় হবে? ফাইনালই বা কোথায়? দক্ষিণ কোরিয়া কি উত্তর কোরিয়াকে লভ্যাংশ দেবে? কীভাবে সামলানো যাবে এই সমস্যাগুলো?
    দুটি দেশই শেষ পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিল আলাদা–আলাদাভাবে, একক কৃতিত্বে বিশ্বকাপের আয়োজক হতে। কিন্তু, দক্ষিণ কোরিয়া যদিও যৌথভাবে আয়োজক হতে রাজি ছিল, জাপান বিরোধিতা করেছিল শুরু থেকেই। শেষে যখন মেনে নেয় জাপান, ১৯৯৬ সালের ১ জুন নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল সংস্থার সভাপতি অ্যালেন রোথেনবার্গকে উদ্ধৃত করে লিখেছিল, ‘যথোপযুক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যদি এটা ঠিকঠাক হয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। বোঝা যাবে, খেলার, বিশেষত ফুটবলের এত বড় প্রতিযোগিতা সাফল্যের সঙ্গে আয়োজন করতে এমন দুটি দেশও যথেষ্ট যাদের মধ্যে আদৌ ভাল সম্পর্ক নেই। ফুটবলের প্রভাব বোঝাতে যা সুদূরপ্রসারী।’ আর, দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপ বিডিং কমিটির কিম গা–ইয়ং বলেছিলেন, ‘আমাদেরই জয় হল, জাপানের পরাজয়। সহ–আয়োজক হতে চায়নি ওরা। কিন্তু শেষে মেনে নিতেই হল। অর্থাৎ, ওদের পরাজয়!’ দুই দেশের সম্পর্কের টেনশন, এই মন্তব্যই প্রত্যক্ষ প্রমাণ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তেমন কিছুই হয়নি। শ্বেতাঙ্গদের আশঙ্কা আশঙ্কাই থেকে গিয়েছিল। হইহই করে শেষ হয়েছিল সপ্তদশ বিশ্বকাপ।

    প্রাথমিক পর্ব

    অঘটনে ভরপুর প্রথম পর্ব, যা শুরুই হয়েছিল গতবারের বিশ্বজয়ীদের হারে!
    সিওলে উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্সের সামনে ছিল বিশ্বকাপে নবাগত সেনেগাল। জিনেদিন জিদান তত দিনে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার। সবচেয়ে বেশি অর্থের বিনিময়ে গিয়েছিলেন জুভেন্তাস থেকে রেয়াল মাদ্রিদে। এবং ২০০২ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে রোবের্তো কার্লোসের পাস থেকে তাঁর ভলিতেই এসেছিল রেয়ালের নবম এবং তাঁর প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ খেতাব। উয়েফা কর্তৃপক্ষ ফাইনালে তাঁর সেই গোলটিকেই চ্যাম্পিয়নস লিগের ৫০ বছরের ইতিহাসে সেরা গোলের সম্মানও দিয়েছিল। কিন্তু, উরুতে চোট পেয়ে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া নিয়েই সমস্যা। শেষ পর্যন্ত জোর করেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আশায় যে, যদি তৃতীয় ম্যাচের আগে কোনও রকমে সুস্থও হয়ে পড়েন, মাঠে নামানো হবে।
    রজার লেমের–এর ফ্রান্স অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়ে শুরুতেই। সেনেগালের কোচও ছিলেন ফরাসি, ব্রুনো মেতসু। ২০০০ সালে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেনেগালের আর ২০০২ নেশনস কাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল সেনেগাল। কী করেছিলেন মেতসু? বেশ কয়েকজন ফুটবলার ছিলেন সেনেগালের, ফ্রান্সে লিগ খেলে জীবন কাটাতেন যাঁরা। কিন্তু, সেনেগালের ফুটবল সংস্থার সঙ্গে তাঁদের বনিবনা ছিল না। সেনেগাল ফুটবল সংস্থা মনে করত তাঁরা দুর্বিনীত। তাই এড়িয়ে চলত তাঁদের। মেতসু তাঁদের ডেকে নিয়েছিলেন দলে। নিশ্চিত করে বোঝাতে পেরেছিলেন, একসঙ্গে একজোট হয়ে খেললে গোটা বিশ্ব তাঁদের বন্দনায় মেতে উঠবে। ‘হোয়াইট সোরসারার’, মেতসুকে ‘শ্বেতাঙ্গ জাদুকর’ নামেই ডাকতে শুরু করেছিল সেনেগাল–জনতা, মালিতে নেশনস কাপের ফাইনালে ক্যামেরুনের কাছে টাইব্রেকারে ২–৩ হারার পরও। দেশে ফেরার সময় মেতসু ও তাঁর ফুটবলারদের জন্য বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘রেড–কার্পেট’। সেই বছরেই বিশ্বকাপও।
    ফ্রান্স তখনই বুড়োদের দল। দেশাই, লিজারাজু, লেবো, থুরঁ, পেতি, এমনকি গোলরক্ষক বার্থেজেরও বয়স তিরিশের বেশি। ভিয়েরা–অঁরি আর্সেনালের মতো মধ্যমণি হতে চেয়েছিলেন ফ্রান্সে, জিদানের অনুপস্থিতিতে। একমাত্র পিরেস ছিলেন না, আর্সেনালের হয়ে দুরন্ত খেলে যিনি শেষ পর্বে ক্লান্ত হয়ে আর টানতে পারেননি। ইংল্যান্ডে চার্লটন–বোল্টন–এভারটন ইত্যাদি ক্লাবের বিরুদ্ধে টন টন গোল — ৪৯ ম্যাচে ৩২ গোল — করায় সে বার অঁরিকে নিয়ে ফরাসি মিডিয়ার চেয়েও বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল ইংরেজরা। তো, সেনেগালের বিরুদ্ধে অঁরি থই পেলেন না। একই অবস্থা ফ্রান্সের বুড়ো রক্ষণেরও। পাপা দিওপ, হাদজি দিউফ, খালিলু ফাদিগা ও সালিফ দিয়াও রাজত্ব করছিলেন মাঠে। গোলটার সময় লেবো–দেশাই–পেতি এবং বার্থেজের ব্যর্থতা চোখে দেখা যায় না! সেনেগালের কাছে হারের দুঃখ ভুলতে অঁরি দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে জঘন্য ফাউল করে লাল কার্ড দেখে বেরিয়ে গেলেন। কোনও দলই গোল করতে পারেনি, গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অবস্থা ছিল: ২ ম্যাচ, ১ পয়েন্ট, ০ গোল! তৃতীয় ম্যাচে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে জিদানকে প্রথম থেকে মাঠে রাখা হয়েছিল জোর করেই। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, খেলার অবস্থায় নেই। তবুও, সেই ম্যাচের সেরার পুরস্কার জুটেছিল জিদানেরই! ডেনমার্ক অস্বস্তি বাড়ায় রোমেডাল ও টোমাসনের গোলে জিতে। কোনও চ্যাম্পিয়ন দেশ পরের বার এত খারাপ পারফরম্যান্স দেখায়নি বিশ্বকাপের ইতিহাসে। প্রথম রাউন্ডেই বিদায় তিন ম্যাচে মাত্র একটি পয়েন্ট নিয়ে এবং একটিও গোল করতে না পেরে!
    ফ্রান্সের মতোই প্রতিযোগিতার অন্যতম ফেবারিট দল ছিল আর্জেন্তিনা। কিন্তু, তাদেরও বিদায় নিতে হয়েছিল প্রথম পর্ব থেকেই! গ্রুপে ছিল ইংল্যান্ড, সুইডেন, নাইজেরিয়া। বিয়েলসার প্রশিক্ষণে সেবার সত্যিই দুর্দান্ত দল আর্জেন্তিনা। ৩–৪–৩ খেলছিল আর্জেন্তিনা, মাঝমাঠের মাঝখানে সিমিওনে আর ভেরনকে রেখে, দু–পাশে জানেত্তি ও সোরিনকে ডানা মেলতে দিয়ে। ওপরে ওর্তেগা, বাতিস্তুতা ও লোপেজ, বেঞ্চে আইমার এবং ক্রেসপো। তারপরও ট্রফির আশা করবে না আর্জেন্তিনীয় সমর্থকরা? কিন্তু, নাইজেরিয়াকে বাতিস্তুতার গোলে হারানোর পরই পতন শুরু আর্জেন্তিনার। আবারও বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি। এবার বেকহ্যাম অধিনায়ক এবং আগের বারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষাকর্তা। পেনাল্টি পেয়েছিল ইংল্যান্ড, পোচেতিনোর ফাউলে, ওয়েনকে। প্রথমার্ধের শেষে সেই পেনাল্টি মারতে এগিয়ে গিয়েছিলেন অধিনায়ক। শটটা জোরালো ছিল, কিন্তু টেনশনের ছাপও ছিল কারণ, গোলরক্ষকের বাঁদিক দিয়ে নিচু শট এবং আর্জেন্তিনার গোলরক্ষক কাভায়েরো ডানদিকে না ঝুঁকে বাঁদিকে একটু ঝুঁকলেই একেবারে হাতের নাগালে পেতেন বল। কিন্তু, বেকহ্যামকে এই ম্যাচে যে চার বছর আগের ভুল শোধরানোর মঞ্চ খুঁজে পেতেই হবে। তাই কাভায়েরো ডানদিকে সামান্য হেলে থাকা অবস্থায় দেখলেন, পায়ের পাশ দিয়েই বল গেল জালে! শেষ ম্যাচে সুইডেনের বিরুদ্ধে ১–১, এবং বিদায় অন্যতম ফেবারিটদের। বাতিস্তুতা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন।’ এ–ও ঠিক, বিশ্বকাপে দশ গোল করেছেন বাতিগোল। ১৯৯৪–তে গ্রিস এবং ১৯৯৮–তে জামাইকার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক। ৯৪–তে রোমানিয়া, ৯৮–তে জাপান আর ইংল্যান্ড এবং ২০০২–তে নাইজেরিয়া। বড় ম্যাচে বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পেনাল্টি ছাড়া গোল কোথায়? সুইডেনের বিরুদ্ধে জিততে হত এই ম্যাচে, প্রথমার্ধে সুইডিশ রক্ষণ অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু, আর্জেন্তিনীয়রা গোল দিতে পারেননি। সুইডেন এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের ৮৮ মিনিটে ওর্তেগার পেনাল্টিও আটকে দিয়েছিলেন সুইডেনের গোলরক্ষক ম্যাগনাস হেডম্যান। কিন্তু ক্রেসপো ‘ফলো’ করেছিলেন, হেডম্যানের আটকে দেওয়া বল ঠেলে দিয়েছিলেন জালে, এক পয়েন্ট পেতে। তার আগে অন্তত বার দুই ফাঁকা গোলে বল ঠেলার নিশ্চিত সুযোগ হেলায় হাতছাড়া করার পর!
    ব্রাজিল মোটেও ভাল খেলেনি বাছাইপর্বে। কোনও রকমে লাতিন আমেরিকার বাছাইপর্ব থেকে চতুর্থ হয়ে পৌঁছেছিল বিশ্বকাপে। লুই ফিলিপ স্কোলারিকে নিয়ে ব্রাজিলেই তখন নানা রসিকতা চালু। ভীষণ ক্ষিপ্ত দেশের ফুটবল–মিডিয়া। রোমারিওকে নেননি স্কোলারি। রোনালদো চোট সারিয়ে ফিরছেন, রিভালদো ছন্দে, রোমারিওকে নেওয়ার যাবতীয় চাপ নিজের ঘাড়ে নিয়ে স্কোলারি এসেছিলেন বিশ্বকাপে। আর রিভালদো জাপানে পৌঁছেই জানিয়ে দিয়েছিলেন দ্ব্যর্থক ভাষায়, ‘যত খারাপ অবস্থাই থাকুক না কেন, ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপে খেলতে যায়, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথাই ভাবে, অন্য কিছু নয়।’ প্রসঙ্গত, প্রশ্নকর্তা রিভালদোর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ব্রাজিলের বিশ্বকাপের লক্ষ্য সেমিফাইনাল কিনা!
    কিন্তু, যা হয়েছিল ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে বা বলা ভাল, যা করেছিলেন রিভালদো, বিশ্বকাপের পাতায় কুৎসিততম নাটকের নিদর্শন হয়ে থেকে গিয়েছে ফুটবল–দর্শকের স্মৃতিতে। খেলা ছিল তুরস্কের বিরুদ্ধে। কর্নার পায় ব্রাজিল। রিভালদো গিয়েছিলেন কর্নার নিতে, পৌঁছে গিয়েছিলেন ফ্ল্যাগের ধারে। বলটা তখনও গোলপোস্ট আর কর্নার ফ্ল্যাগের মাঝে অনাথ পড়ে রয়েছে। ব্রাজিলীয়দের কারও যেন ইচ্ছেই ছিল না বলটা নিয়ে কর্নারের জন্য বসানোয়। হাকান উনসাল দৌড়ে এসে বিরক্তিতেই সজোরে শট করেন, বল সটান গিয়ে লাগে রিভালদোর হাঁটুতে বা হাঁটুর সামান্য ওপরে। রিভালদো, সবাইকে অবাক করে দিয়ে, দু–হাতে মুখ লুকিয়ে (‌এ ছাড়া আর কী–ই বা করা সম্ভব ছিল! ওই আচরণের জন্য মুখ লুকিয়ে ফেলাই একমাত্র উপায়)‌ মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। কোরিয়ার রেফারি কিম ইয়ং–জু বোধহয় তখনও লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের এমন চাতুরির সঙ্গে সড়গড় নন। সটান লাল কার্ড দেখান উনসালকে। রেফারির দোষ দেওয়া কঠিন। এমনিতেই ওভাবে বিপক্ষের দিকে সোজা শট মারার জন্যই লাল কার্ড দেখতে হত উনসালকে। মাঝখান থেকে রিভালদো শুধুশুধুই নিজের বদনাম করলেন এমন চূড়ান্ত অপেশাদার এবং খারাপ নাটকে! তবে, বাকি দুটি ম্যাচে চিন ও কোস্টা রিকাকে হারিয়ে দ্বিতীয় পর্বে যেতে সমস্যা হয়নি। যেমন, ব্রাজিলের মতোই তিনটি ম্যাচই জিতেছিল স্পেনও, যথাক্রমে স্লোভেনিয়া, পারাগুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে। রাউল–মোরিয়েন্তেস, রেয়াল–জুটি তো ছিলেনই, সঙ্গে মেনদিয়েতা, ইয়েরো। ক্লেমেন্তের হাতে একঝাঁক প্রতিভা তখন।
    কিন্তু, প্রথম পর্ব থেকেই আসল চমক দেখাতে শুরু করেছিল দুই আয়োজক দেশই। প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া। এতবার ধরে বিশ্বকাপে খেলেও জয় ছিল অধরা। উল্টে, বিশ্বকাপে কোরিয়ার পারফরম্যান্সের কথা উঠলেই মানুষ মনে করতেন ১৯৬৬–তে উত্তর কোরিয়ার অনবদ্য খেলার কথা। ইতালিকে হারিয়ে, ইউসেবিওর পর্তুগালকে ০–৩ পিছিয়ে রেখেও শেষ পর্যন্ত হার, কোরিয়ার দক্ষিণীদের মনে অশান্তির ঝড় তুলে দিত। এবার তাদের দায়িত্বে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালিস্ট হল্যান্ডের দায়িত্বে–থাকা কোচ গাস হিডিঙ্ক। বিশ্বকাপের আগে পাঁচ মাস তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় সব প্রতিযোগিতার খেলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ওই পাঁচ মাস ফুটবলারদের নিয়ে মগ্ন ছিলেন বিশ্বকাপের জন্য অনুশীলনে। বোধহয় শেষবার দেখা গিয়েছিল এমন যখন বিশ্বকাপকে প্রাধান্য দিতে ক্লাব ফুটবল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল দেশ, বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। এখন যখন বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে ক্রমশ একঘেয়েমি গ্রাস করে আমাদের, বারবারই মনে হয় ফুটবলাররা ক্লান্ত, অবসন্ন, সারা বছর ধরে ফুটবল খেলতে খেলতে, হিডিঙ্কের মতো এমন প্রয়াস হয়ত বিশ্বকাপের মজাটাই আবার ফিরিয়ে আনতে পারে, যা পেরেছিল দক্ষিণ কোরিয়া, নিজেদের দেশে, ২০০২ বিশ্বকাপে।
    প্রথম ম্যাচে পোল্যান্ড। জার্মানির পড়শি ইউরোপে, ফুটবলে সামান্য নাক–উঁচু ভাব তো থাকবেই! বড়–বড় কথা বলেছিলেন পোলিশ ফুটবলাররা। হিডিঙ্কের ফুটবলাররা তাঁদের দিলেন দুটি গোল। ইউরোপীয়রা হেরে গিয়ে যা করতে পারে, পোলিশরা করেছিল তাই–ই। কোরীয়দের ওই অসম্ভব স্ট্যামিনা এবং গতির জন্য দায় চাপিয়েছিল ‘কেমিক্যাল ডোপিং’–এর ওপর। আসলে বলতে চেয়েছিল এশিয়ার ভেষজ ডোপিংয়ের কথা। কিন্তু, বারবার পরীক্ষা করেও দক্ষিণ কোরিয়ার কাউকে ধরা যায়নি সে বার। আর্জেন্তিনার মতো হয়েছিল কিনা বলা যাবে না, কিন্তু, কেউ ধরা পড়েননি, সেটাই আসল। দ্বিতীয় ম্যাচে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ড্র, আন জুঙ হোয়ান এসে গেলেন আলোয়। আর তৃতীয় ম্যাচে তো প্রতিবেশি উত্তর কোরিয়াকেই পেরিয়ে যাওয়া যেন! ফিগোর পর্তুগাল পরাস্ত ১–০, পার্ক জি সুংয়ের গোলে, ভবিষ্যৎ যাঁকে চিনবে ম্যানচেস্টারে অ্যালেক্স ফার্গুসনের সৌজন্যে! ফিগোও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভুলে যেতে চাইবেন সেই বিশ্বকাপ, তাঁর রেয়াল–সতীর্থ জিদানের মতোই। গ্রুপের তিনটি ম্যাচের মধ্যে একমাত্র পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ছাড়া নিজস্ব ছন্দে পাওয়াই যায়নি তাঁকে।
    জাপান বিশ্বকাপের মূলপর্বে প্রথমবার খেলার সুযোগ পেয়েছিল ১৯৯৮ সালে। পরের বারই আয়োজক হওয়ার সুবাদে আবার সরাসরি মূলপর্বে। এবার আর এক ফরাসি কোচ ফিলিপ ত্রোসিয়ের, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় তাঁর সাফল্যের কারণে ডাকনাম ‘হোয়াইট উইচ ডক্টর’। আটানব্বইতে তিনটি ম্যাচই হেরেছিল জাপান। নিজেদের দেশে গ্রুপ লিগ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছয় একটিও না হেরে, দুটি জিতে, একটি ড্র করে! বেলজিয়ামের সঙ্গে ২–২। পরের ম্যাচে রাশিয়া পরাস্ত, তার পরের ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ২–০। গ্রুপের শীর্ষে!

    দ্বিতীয় পর্ব
    জাপানের রূপকথা শেষ তুরস্কের কাছে, দাভালার গোলে। কিন্তু, দক্ষিণ কোরিয়াকে কে রুখবে?
    প্রতিবেশি উত্তরের শেষ গর্বও ধূলিসাৎ করবে বলেই যেন খেলতে নেমেছিল দক্ষিণ। নকআউটে ইতালি। সেই ইতালি যাদের হারিয়ে ১৯৬৬–তে রূপকথার উড়ান শুরু করেছিল উত্তর কোরিয়া, মিডলসবোরোয়। হিডিঙ্কের দক্ষিণ করেছিল দায়েজেওনে, ইকুয়েদরের রেফারি বাইরন মোরেনোর পরিচালনায়। চার মিনিটের মধ্যেই পানুচ্চির ফাউল, পেনাল্টি, সন্দেহের উর্ধ্বে। কিন্তু আন পারেননি বুফোঁকে পরাস্ত করতে। ১৮ মিনিটে ভিয়েরি এগিয়ে দিলেন ইতালিকে, তোত্তির কর্নার থেকে। তারপর ভিয়েরি, তোত্তি, দেল পিয়েরোদের সুযোগ নষ্টের প্রদর্শনী আর ৮৮ মিনিটে পানুচ্চি আবার ব্যর্থ, হোয়াংয়ের পাস থেকে সেওলের গোলে অতিরিক্ত সময়ে গড়াল খেলা। ভিয়েরির গোল অফসাইড বলে নাকচ করলেন রেফারি, তোত্তিকে ফাউল করা হল বক্সে, রেফারি ডাইভিংয়ের অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে বের করে দিলেন তোত্তিকে। ১১৬ মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন আন পেলেন ‘সোনালি গোল’। দুর্ভাগ্য ইতালির, আন খেলতেন সিরি আ–তেই, পেরুজিয়া–য়। অনেকটা যেন নাপোলির মারাদোনার হাতে ‘ভ্যাকসিনেটেড’ হওয়ার মতো ইতালি এবার ‘ভ্যাকসিনেটেড’ হল আনের পায়ে। পেরুজিয়ার সভাপতি লুসিয়ানো গাউচি তো সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন যে, আন যাতে আর পেরুজিয়ার হয়ে কখনও না খেলতে পারে, তিনি দেখে নেবেন! পরে, মতি ফেরে, আনকে খেলতে দেওয়া হয়। তবে, ইতালি দলের সঙ্গে পরিচালকদের যে–দলটি গিয়েছিল, তাদের মাথা রাফায়েল রানুচি রাখঢাক না করেই বলেছিলেন, ইকুয়েদরের রেফারির আচরণ ‘লজ্জাজনক’ এবং তিনি নাকি ম্যাচের আগেই নিশ্চিত ছিলেন এমন কিছুই ঘটবে। হারের পর এমন অভিযোগ বিশ্বকাপে সেবারই প্রথম নয়, এবং এমন অভিযোগগুলো প্রমাণিতও কখনও হয়নি বিশ্বকাপে!
    ২০০২ বিশ্বকাপ আসলে ছিল তথাকথিত ছোট দেশগুলোর, ফুটবলে যাদের সাফল্য দৈত্যাকার দেশগুলোর তুলনায় একেবারেই কম, মাইক্রোস্কোপেও দেখা যায় না বললেই চলে। কিন্তু, দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি মানুষের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন সেনেগালের ফুটবলাররাও। কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে তাদের নায়ক অঁরি কামারা। সুইডেনের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের ৩৮ মিনিটে এবং অতিরিক্ত সময়ের ১০৪ মিনিটে সোনালি গোল তাঁর। হেনরিক লারসেন বিদায় জানিয়েছিলেন তখনকার মতো আন্তর্জাতিক আসরকে। পরে অবশ্য অবসর ভেঙে ফিরেও এসেছিলেন। কিন্তু মেতসু–র সৈন্যরা জিতে নিয়েছিলেন মন তাদের সারল্যে, ফুটবলের উত্তর ইউরোপীয় শৃঙ্খলা ভেঙে লাতিন বল–স্কিল এবং সহজাত স্বাভাবিকতায় আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে, ফুটবল মাঠে। স্পেনকে জিততে হয় আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টাই ভেঙে। ইংল্যান্ড চমৎকার, ডেনমার্ক পর্যুদস্ত ০–৩, নিজেদের গোলরক্ষকের দোষেই। ভাঙা মেটাটারসাল সারিয়ে ফেরা অধিনায়ক বেকহ্যামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মিডিয়া আবার। জার্মানি চূড়ান্ত একঘেয়ে, কিন্তু ৮৮ মিনিটে নুভিলের গোলে পারাগুয়েকে বিশ্বকাপ–ছাড়া করে বাড়ি পাঠায়। উত্তর আমেরিকার ‘এল ক্লাসিকো’–তে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ০–২ হেরে বিদায় মেহিকোর। আর ব্রাজিলের সামনে বেলজিয়ামের মাথানত রিভালদো আর রোনালদোর গোলে!

    কোয়ার্টার ফাইনাল

    সেনেগালের রুদ্ধশ্বাস দৌড় থেমে গিয়েছিল, থামানো যায়নি দক্ষিণ কোরিয়াকে!
    তুরস্ক থামিয়ে দিয়েছিল সেনেগালকে, আবার সোনালি গোল ৯৪ মিনিটে। কিন্তু, দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে এবার হার স্পেনের, চিরন্তন কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট হিসেবেই যাদের পরিচিতি তখনও। গোল করতে পারেনি কোনও দলই, না নির্ধারিত না অতিরিক্ত সময়ে। পরপর দ্বিতীয় ম্যাচে টাইব্রেকার। স্পেন এবার পরাস্ত, চতুর্থ শটে হোয়াকিন গোল করতে না পারায় আর পঞ্চম শটে হোং মিয়াং বু দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫–৩ এগিয়ে দেওয়ায়। কিন্তু, ইতালির মতোই ক্ষিপ্ত ছিল স্পেনও। রেফারি মিশরের গামাল আল–ঘান্দোর–এর ওপর। দুটি গোল বাতিল তো বটেই, হোয়াকিন শট নিতে যাচ্ছিলেন যখন, নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ কোরিয়ার গোলরক্ষক শটের আগেই এগিয়ে এসেছিলেন ‘লাইন’ ছেড়ে, যা দেখেননি রেফারি। কিন্তু, হিডিঙ্কের নাম সেমিফাইনাল–কোচ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায় ১৯৯৮–এর পর ২০০২ বিশ্বকাপেরও সেমিফাইনালে দলকে তোলায়।
    জার্মানি আর কী কী ভাবে সেমিফাইনালে পৌঁছবে, বিশ্ব তখন গবেষণায় ব্যস্ত! এত খারাপও খেলা যায় যে কাইজার বেকেনবাওয়ার — আদ্যন্ত জার্মান এবং জার্মানসুলভ নানা রকমের ছলছুতো খুঁজে বের করতে ওস্তাদ — পর্যন্ত বলে দিয়েছিলেন যে, ‘সেমিফাইনালে এই দলটা পুরোটাই পাল্টানো উচিত, সবাইকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত দলের বাইরে, একমাত্র গোলকিপার কানকে ছাড়া।’ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র দাপটে রাজত্ব করেছিল ম্যাচে, ম্যাচটা আদপে ছিল কান বনাম আমেরিকার, আর জার্মানির কান ধরে তিতিবিরক্ত অলিভার যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ম্যাচের পর ম্যাচ। বালাক আবারও গোল পেয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। ক্লদিও রেইনা–রা ভাল খেলেও যা পাননি। আর, ফুটবলে, গোলই আসল!
    ইংল্যান্ড বেশ আনন্দে ছিল ডেনমার্ককে ৩–০ হারিয়ে। নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, দল আবার প্রথম আটে, বেকহ্যাম নেতৃত্বে, স্বেন গোরান এরিকসনের বান্ধবীকে ভুলে যাওয়া হয়েছে — সবই ঠিকঠাক চলছিল, শুধু ইতিহাস বইতে ঢুকে গেলেন রোনালদিনিও!


    খেলার শুরুতে লুসিও নিজেই পাস দিয়ে দিয়েছিলেন মাইকেল ওয়েনকে, ‘যা গিয়ে গোল করে আয়’ বলে। ওয়েন সেই পড়ে–পাওয়া চোদ্দ আনা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। আর্জেন্তিনার আয়ালার পর এবার লুসিও, লাতিন আমেরিকার তখনকার সেরা দুই স্টপার যেভাবে মাইকেল ওয়েনকে দেখেই গোল খাচ্ছিলেন, আর্জেন্তিনা–ব্রাজিল সব ভুলে চুক্তি করতে পারত, ওয়েনকে আটকাতেই! কিন্তু, ১৬ বছর আগের আরও একটি বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল হয়ত মনে পড়ে গিয়েছিল রোনালদিনিওর, ওই দিন। তাই পল স্কোলসকে এড়িয়ে, অ্যাশলে কোলকে পেরিয়ে তাঁর সাজিয়ে দেওয়া বলে রিভালদোর ১–১। আর ৪৯ মিনিটে আবারও মারাদোনার সেই কথা, ‘ভ্যাকসিনেটেড’! ৪২ গজ দূর থেকে ফ্রি কিক, লাইনের ধার থেকে, ডানদিকে। ইংল্যান্ড ও আর্সেনালের গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যান অনেকটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে। দেখতে পেয়ে রোনালদিনিও ঠিক সেই জায়গায় রাখতে চাইলেন যেখানে রাখলে গোল হতে পারে। সিম্যান পেছতে পেছতে অথৈ সাগরে, বল আশ্রয় নিল জালে! ব্রাজিল সেমিফাইনালে, ইংল্যান্ডের দৌড় শেষ। না কি, শুরু?
    মারাদোনার হাত–গোল ছিল, এবার ইংরেজ মিডিয়া সমস্বরে চেঁচাতে শুরু করল ফ্লুক–গোল, ফ্লুক–গোল! কল্পনার দৈন্যের কারণে যাঁরা বল আকাশে তোলা ছাড়া বিপক্ষের বক্সে পৌঁছনোর আর কোনও উপায় খুঁজে বের করতে পারেননি, জাতিগতভাবেই যাঁদের জীবনের পরম ধর্ম ‘অর্ডার’ পেলেই ‘ক্যারি আউট’ করা, স্বকীয় ভাবনার নামগন্ধ নেই, কী করে তাঁরা বুঝবেন, ওভাবে সিম্যানকে এগিয়ে থাকতে দেখে কারও কারও মাথায় একটু বুদ্ধি থাকলে আর পায়ে স্কিল থাকলে, ওইভাবে মাথার ওপর দিয়ে বল রাখার চেষ্টা করা যায়! ইংরেজরা সেই সব চেষ্টা–ফেষ্টা করেনি কোনও কালে। তাই এখনও রোজ লিখে যায় ছিয়াশির ‘হাত–গোল, পা–গোল’ আর ২০০২–এর ‘ফ্লুক–গোল’ নিয়ে। ‘আমরা আর কী–ই বা করব, ওরা ফ্লুক–গোলে জিতে গেল’ বলে কাব্যি রচিত হয় ইংরেজিতে, আর যে–সব বাঙালি ইংরেজি পড়তে শিখে ‘মানুষ’ হয়েছেন, বিশ্বাস করে ফেলেন সেই ধ্রুবসত্যে। যেমন, গার্ডিয়ান পত্রিকা, ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিও, ফিরে দেখতে চেয়েছিল, রোনালদিনিওর গোলকে ফ্লুক হিসেবেই। তুলে ধরেছিল রাইট ব্যাক ড্যানি মিলসের ভাষণ যেখানে ইংল্যান্ডের রাইট ব্যাক বলেছিলেন —
    ‘From the position Ronaldinho took up and the movement of their forwards in the box, we were all expecting a deep cross. What followed will haunt us for a very long time I looked on in disbelief as the ball looped over poor David but I will never accept that it was intentional. Rio asked Ronaldinho after the game if he meant to shoot and he just gave a shrug and grinned. His sheepishness suggests to me that it was a misguided cross.’
    সমস্যা হল, তিনি ধরে নিয়েই লিখলেন যে, ‘I will never accept that it was intentional.’ তা হলে রোনালদিনিও আর কী–ই বা করবেন ‘শ্রাগ’ ছাড়া! রোনালদিনিওকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কিন্তু বলেই দিয়েছিলেন যে, ‘When we play England, I get asked if I meant that goal in 2002. I knew David Seaman came off his line quite a lot, and I knew if I put the ball where I did that it could cause him problems. So I meant it. It was not luck.’ এবার যে যেমন বুঝতে চান বা যাঁর কথা বিশ্বাস করতে চান, করবেন, তুলে ধরা থাকল দু–পক্ষেরই বক্তব্য!

    সেমিফাইনাল ও ফাইনাল

    জার্মানি ফাইনালে গেল দক্ষিণ কোরিয়াকে ১–০ হারিয়ে। গোলদাতা আবারও বালাক। কিন্তু, এবার বালাক নিজেকে হারিয়ে ফেললেন ফাইনাল থেকে! ৭৫ মিনিটে শেষ করে দিয়েছিলেন আয়োজকদের স্বপ্ন। পরে নিজের স্বপ্নকেই ‘খুন’ করে ফেলেন লি চুন–সু’কে অনাবশ্যক ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখে। বিশ্বকাপ ফাইনালে দলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পথে কোয়ার্টার আর সেমিফাইনালে গোল করেও ফাইনালে খেলতে পারেননি, এ দুঃখ সারা জীবনেও ভুলবেন না বালাক।
    ব্রাজিল–তুরস্ক ম্যাচে আবার অনেক কিছু হিসেব মেলানোর ছিল তুরস্কের, বিশেষত ওই রিভালদোর নাটকজনিত লাল কার্ড দেখার ব্যাপারটা। তা ছাড়া, রোনালদিনিও-ও খেলতে পারেননি সেমিফাইনালে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখে। কিন্তু, রোনালদোর গোল সেই সুযোগ দেয়নি তুরস্ককে। প্রতিযোগিতায় নিজের ষষ্ঠ গোল করে নিশ্চিতভাবেই এগোচ্ছেন তখন সর্বোচ্চ গোলদাতার সোনার বুটের পুরস্কারের দিকে। চার বছর আগের ফাইনাল, খিঁচুনি, ব্রাজিলের রহস্যময় আত্মসমর্পণ সব ভুলে। সামনে জার্মান রোবট–রা, ফুটবল খেলাই ভুলিয়ে দিতে চান যাঁরা, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম লিখে চলেছে।
    ইওকোহামায় ফাইনাল তুলনায় বেশ আকর্ষক, ব্রাজিলের কারণেই। রোনালদিনিও ফিরে এসেছিলেন, রিভালদো–রোনালদো স্বমহিমায়। যে অলিভার ‘কান’ ধরে টেনে ফাইনালে তুলেছিলেন জার্মানিকে, হয়েছিলেন সেই বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার, সোনার বলজয়ী, সেই অলিভারই শেষ পর্যন্ত ভুল করেছিলেন রিভালদোর শট আটকাতে গিয়ে। তাঁর বুক–পাস গেল রোনালদোর দিকে। এবং রোনালদোর কৃতিত্ব এই যে, কানের বুকে লেগে বল ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে, এই ভাবনাটা তাঁর মাথায় উঁকি দিয়েছিল! কানের বুক–পাস থেকে প্রথম গোলের পর ক্লেবারসনের পাস রোনালদোর পায়ে যাওয়ার আগে দু–পায়ের ফাঁক দিয়ে রিভালদোর বল ছেড়ে দেওয়াটাও ভোলার নয়। সেই বল থেকে ডান পায়ের শটে রোনালদোর বিশ্বকাপে অষ্টম গোল সেবারের, ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গোল। পঞ্চমবার বিশ্বসেরা ব্রাজিল এবং শেষবারের মতো (‌আপাতত)‌ বিশ্বকাপ ফাইনাল আবার দর্শকের মনের অ্যালবামে। পরের দু’বারই কুৎসিত হতে হতে মানুষ মনে রাখতেই চাইবে না, এটা তো আর সেই ২০০২–এর ফাইনালের দিন ভেবে নেওয়া সম্ভব ছিল না!
    স্কোলারি বরাবরই উচ্ছ্বাসপ্রবণ। লাতিন আমেরিকানরা যেমন হন আর কী। সাইডলাইনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর স্বভাব নয়। গোল হলে বা না হলে নিজের মেজাজ অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভোলেন না। তা ছাড়াও, ৩-৪-১-২ ছকে খেলিয়েছিলেন, অনেকে যাকে ৩-৫-২ বলেছেন, সহজবোধ্য গণনায়। রক্ষণে লুসিও, রক জুনিয়র আর এদমিলসন। দুপাশে কাফু আর কার্লোসের ডানা মেলে ওপরে ওঠা। মাঝে ক্লেবারসন ও জিলবের্তো সিলভা। ঠিক ওপরে আর রোনালদো ও রিভালদোর নিচে রোনালদিনিও। রোনালদো সেবার বোধহয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েই গিয়েছিলেন জাপানে। আগের বারের ফাইনালে অসুস্থতাজনিত হার মানতে পারেননি কোনওভাবেই। রেয়াল মাদ্রিদে সই করবেন, সতীর্থ হিসেবে পাবেন জিনেদিন জিদানকে, হিসেব মিলিয়ে নিয়েই যেতে চেয়েছিলেন বোধহয় মাথায় চুলের ‘ত্রিভুজ’সহ রোনালদো। তাই, অসুস্থ দলের বিরুদ্ধে ফাইনালে দু–গোল নয়, সুস্থ, সেরা ফর্মে–থাকা কানকে দু–গোল দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলেন জিদানের দিকে, বের্নাবেউতে!
    প্রতিযোগিতা শুরুর আগে রোমারিওকে না–নেওয়া নিয়ে বিরাট হইচই ছিল ব্রাজিলের প্রচারমাধ্যমে। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়েও। চুরানব্বইতে ২৪ বছর পর ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ এনে–দেওয়ার অন্যতম কাণ্ডারি খেলতে চাইছেন, কিন্তু কোচ নিচ্ছেন না, এমন অরাজক অবস্থা ব্রাজিলের ফুটবল দলে ছিল না, প্রায় সবাই একমত হয়েছিলেন তখন। সুভাষ ভৌমিক কিন্তু মানেননি। পরিষ্কার লিখে জানিয়েছিলেন নিজের মত, ‘একটা খাপে দুটো তরবারি রাখতে রাজি হননি স্কোলারি, আর সেই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তেই ব্রাজিলের ঘরে এসেছিল পঞ্চম বিশ্বকাপ।’ চার বছর পরের বিশ্বকাপে রোনালদো আর আদ্রিয়ানোকে পাশাপাশি খেলতে দেখার পর যে সত্য–বিশ্লেষণ অনুধাবন আরও সহজ হবে, বিশ্ব ফুটবলের উপরিতলে থেকে–যাওয়া দর্শককুলের জন্য নয়, গভীরে যেতে–চাওয়া সত্যিকারের দর্শকের পক্ষে!
    (‌আগামিকাল ২০০৬ বিশ্বকাপ)‌

    No comments