• Breaking News

    বিশ্বকাপের ইতিহাস ১ | ফুটবলে ফরাসি বিপ্লব /কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    সে বেশ মজার গল্প। আসুন ইউরোপের তিন বিখ্যাত জাতিকে চিনে নিই এই ছোট্ট হাসির গল্পে।

    হাতি নিয়ে গবেষণা। আবেদন পড়ল প্রচুর। বেছে নেওয়া হল যথাক্রমে এক ইংরেজএক জার্মান ও এক ফরাসিকে। বছরখানেক সময় দেওয়া হল। সঙ্গে হাজার দুই করে পাউন্ড। বাড়িতে রাশভারি সিনিয়র ইংরেজের পরামর্শে জুনিয়র ইংরেজ চলে গেল আফ্রিকার জঙ্গলে। গাছের মাথায় বাঁধল বাসা। দিনরাত চলল নিবিড় হাতিপর্যবেক্ষণ। এক বছর বাদ বেশ গায়েগতরে বই বেরল, ‘হাতির রোজনামচা — যেমন দেখেছি আফ্রিকার জঙ্গলে

    জার্মান চলে গেল লাইব্রেরি। আট মাস ধরে পড়ে ফেলল হাতি সম্পর্কে ততদিন পর্যন্ত বেরন সব বই। এক জায়গায় নিয়ে এল সব। বাকি চার মাস নিরলস লিখলতিন ভল্যুমে বেরল হাতি সম্পর্কে যা যা জানতে চান

    ওদিকেহাতে দুহাজার পাউন্ড পাওয়া ফরাসিকে দেখে কে! সোজা ছুটল শুঁড়িখানায়। আকণ্ঠ গিলল সুরামধু। চলল তেমন বেশ কিছু মাস। শেষদিকে ভাঁড়ারে টান পড়ায় দামি ছেড়ে দেশিগিলে পড়ে থাকল সমুদ্রতীরে। কেউ বোধহয় মনে করিয়ে দিল গবেষণার কথা। বাজারে এল চটি বই, ‘যেমন দেখেছি হাতিনেশার ঘোরে’ (‌এলিফ্যান্টস অ্যাজ আই স ইন হ্যালুসিনেশন)‌। বেস্টসেলার!‌

    বহুল প্রচলিত চুটকি। অনেকেই জানেন। ঝালিয়ে নেওয়া আরও একবার ইউরোপের উত্তরদক্ষিণ ভাগের বৈশিষ্ট্য বুঝতে। উত্তরমানে ইংরেজজার্মানকাজপাগল,কোনও আদেশ (‌অর্ডার)‌ পেলেই হলপালন (‌ক্যারি আউট)‌ করবেন পরম নিষ্ঠায়ফাঁকির প্রশ্নই নেই। সুশৃঙ্খল জাত।

    দেখনি ফরাসি আনমনাএলোমেলো। আড্ডাবাজ। পানপাত্তর হাতে পেলে কীসের হাতি! সওয়ার তখন ভাবনাহাতির পিঠে চেপে। বুকের ভেতর কবীর সুমনের সুর যেন, ‘দূরে তেপান্তরআকাশ খোঁজে ঘর...’ কোথাকার ভাবনা কোথায় গিয়ে জিরোয়কেউ জানে না। কাজ করবেন তিনিওথাকবে স্বকীয়তাসৃষ্টিশীলতা। আর হ্যাঁ,যে পথে অন্যে আগে হেঁটেছেফরাসির সে পথে হাঁটতে মানা।

    তোএই যদি এক মহাদেশের দুভাগের জনমানসিকতার প্রতিফলন হয়ফরাসিরা কোনও নতুন ভাবনার আমদানি করবেবিস্ময়ের কিছু থাকবে না তাতে নিশ্চিত যেমনব্রিটিশরা বাগড়া দেবেতাও তো সুনিশ্চিত!

    তাইফরাসিরা ফিফা গড়তে গেছেব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ সরে দাঁড়িয়েছেফরাসিরা বিশ্বকাপের কথা ভেবেছেনিজেদের লিগ আর এফএ কাপ নিয়ে মত্ত থেকেছে গ্রেট ব্রিটেন। বোঝেনিবোঝা সম্ভবও ছিল না তখনসব বিশ্বকাপে খেলাও পরবর্তীতে এমন উজ্জ্বল এক রেকর্ড হয়ে দাঁড়াবেমাত্র ৮৮বছরেই!

    ২১ মে১৯০৪প্যারিসে ফিফার প্রতিষ্ঠা দিবস। দুদিন পর২৩ মেফ্রান্সের রোবের্ত গেরিঁ প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন ফিফার। সাত সদস্যদেশের সমর্থনে। ফ্রান্স,বেলজিয়ামডেনমার্কনেদারল্যান্ডসস্পেনসুইডেন ও সুইটজারল্যান্ড। ইংরেজরাআসেননি। তাঁদের তো ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (‌এফএ)‌ ছিল আরও বেশ কিছু বছর আগে থেকেই। তাঁরা তাই দেখতে চেয়েছিলেননতুন এই ভুইফোঁড় সংস্থা কত দিন চলে। আর ইংল্যান্ডের বাইরে ফুটবল?‌ সে আবার কী এমন বস্তু যে মাথা ঘামাতে হবে? 

    বিশ্বকাপের প্রয়োজনীয়তা


    ১৯২০ ফিফা কংগ্রেসঅ্যান্টওয়ার্পে। বিশ্বকাপের প্রয়োজনীয়তার কথাঅন্তত মৌখিকভাবেমেনে নেওয়া হয়েছিল প্রথম বার।

    চার বছর পর আলোচনা শুধু প্রস্তাবনায় সীমাবদ্ধ থাকল না আর। ততদিনে অলিম্পিকের আসরে এসে পড়েছে উরুগুয়ে। এবংফিফার হাতে এসে পড়েছে অলিম্পিকের ফুটবল আয়োজনের দায়িত্বশর্তাধীন। যদি অলিম্পিকের আসরেও ফুটবল হয় ফিফার নিয়মানুযায়ী তবেই তাকে বিশ্ব ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে ধরা যেতে পারে’,বলেছিল ফিফা। ১৯২৪ অলিম্পিকে ফুটবল জোয়ার আনল জনজীবনে। উরুগুয়েসুইটজারল্যান্ড ফাইনাল দেখতে ৬০ হাজার লোক এলেন মাঠে। ৩০ জিতল উরুগুয়ে। মন্তেভিদিওর সঙ্গে মেনে নিল সারা দুনিয়াউরুগুয়েই বিশ্বসেরা।

    [caption id="attachment_4192" align="alignnone" width="800"] জুলে রিমে[/caption]

    আজ আন্তর্জাতিক ফুটবল এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেঅলিম্পিকের আসর আর তার বিকাশের পক্ষে আদর্শ নয়। বহু দেশে যেখানে পেশাদারিত্ব স্বীকৃত এবং সর্বজনগ্রাহ্য সেই সব দেশের পেশাদারদের জন্য অলিম্পিকের আসরে জায়গা নেই অথচ সেই সব দেশের সেরা ফুটবলাররা বিশ্বের কাছে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ খুঁজছেন। সেরা ফুটবলারদের জন্য কোনও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে না কেন’, জোরালো সওয়াল করলেন ১৯২৬ ফিফা কংগ্রেসে সচিব অঁরি দেলাউঁ। বিশ্বকাপ প্রসঙ্গকে আর দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না অন্যদের কাছেও।

    আমস্টারডম অলিম্পিকে (‌১৯২৮)‌ আবার চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। এবার লাতিন আমেরিকায় তাঁদের পড়শি আর্জেন্তিনাকে হারিয়ে। ফিফা ভেবে নেয়অলিম্পিকের ছাতার তলা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসে গিয়েছেনিজেদের বিশ্বপ্রতিযোগিতা আয়োজনের সময় তখন। সভাপতি (‌হ্যাঁফরাসি!)‌ জুলে রিমের নির্দেশে ফরাসি সচিব দেলাউঁ প্রস্তাব দিলেন ১৯২৮ ফিফা কংগ্রেসে। আপত্তি এল পাঁচ দেশের কাছ থেকে — স্ক্যান্ডিনেভিয়ার চার দেশ (‌সুইডেনডেনমার্কনরওয়েফিনল্যান্ড)‌ এবং এস্তোনিয়া। কিন্তু২৫৫ ভোটে জিতে সিদ্ধান্ত হয়ে গেলবিশ্বকাপ হবে।

    তারিখ? — ২৮ মে১৯২৮। বিশ্বকাপের জন্মদিন! 

    কোথায় হবে? 

    ইউরোপ জুড়ে এক অদ্ভুত আর্থিক সঙ্কট। কারা নেবে দায়িত্বপ্রথম বিশ্বকাপআয়োজনের দিক দিয়ে কোনও ত্রুটি মেনে নেবে না কেউ। ফিফা জানতে চাইল কোন্‌ কোন্‌ দেশ আগ্রহী। এবংবিশ্বকাপের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথম আয়োজক হতে আগ্রহী হয়ে পড়ল সুইডেন!

    ইতালিনেদারল্যান্ডস এবং স্পেনও ছিল দাবিদারের তালিকায়। শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পেল উরুগুয়ে। তাঁদের দাবি অগ্রাধিকার পেল প্রধানত দুটি কারণে। একশেষ দুই অলিম্পিকে তাঁরা চ্যাম্পিয়ন। দুইখুব গুরুত্বপূর্ণঅংশগ্রহণকারী সব দেশের আসাযাওয়া এবং থাকাখাওয়ার দায়িত্ব নিতে রাজি। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি যে কাজে খুব বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়নি। অথচআর্থিক সচ্ছলতার প্রশ্নে উরুগুয়ে যে খুব এগিয়ে ছিলতাও নয়। বরঞ্চওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারে ধস বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল তাঁদের অর্থনীতিকে। কিন্তুদক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশের সামনে ছিল বড় স্বপ্ন। ১৯৩০ তাঁদের স্বাধীনতার শতবার্ষিকী। বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন তাড়া করল তাঁদের। ফিফাকে এমন প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হলসম্পূর্ণ নতুন এক স্টেডিয়াম তৈরি করে দেবেন তাঁরামন্তেভিদিওতে,  হাতে যত কম সময়ই থাকুক না কেন। বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে সেই ঝকঝকে নতুন স্টেডিয়ামেই। ফিফার আপত্তির কোনও কারণই থাকতে পারত না আর। থাকেওনি।

    সুতরাংপ্রথম বিশ্বকাপের আয়োজকওমহাদেশের হিসাবেদক্ষিণ আমেরিকাই!‌

    (‌আগামিকাল ১৯৩০ উরুগুয়ে)‌‌

    *‌ বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে /‌ কাশীনাথ ভট্টাচার্য /‌ রূপালি /‌ ২০১৪

    No comments