• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১৩ / জার্মানির নির্লজ্জ গড়াপেটা, শুমাখারের কুংফু / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    "For me, football should be played with two wingers, a centre forward and a playmaker. That's the way I see the game. I select my players and then I let them play the game, without trying to impose tactical plans on them. You can't tell Maradona, 'Play the way I tell you.' You have to leave him free to express himself. The rest will take care of itself."

    - Enzo Bearzot

    ১৯৮২–তে স্পেনে ফুটবলকে কলঙ্কের পাঁকে ডুবিয়ে দিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া। আফ্রিকার আলজেরিয়াকে বিশ্বকাপ থেকে বাড়ি পাঠানোর ‘ইউরোপীয়’ তাগিদে দশ মিনিটে জার্মানি এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরের ৮০ মিনিট ফুটবল না–খেলে! অস্ট্রিয়ার ধারাভাষ্যকাররা মাঠে ফুটবলারদের নোংরামি দেখে দূরদর্শকদের অনুরোধ করেছিলেন টিভি বন্ধ করে দিতে, শেষ আধঘন্টা ধারাভাষ্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন নিজেরাই। পশ্চিম জার্মানির ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্ট্যানজেক কেঁদে ফেলেছিলেন বলতে বলতে, ‘যা হচ্ছে মাঠে, চূড়ান্ত নোংরামি। ফুটবলের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।’ রুমেনিগেরা অবশ্য কলার তুলেই বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছনোর গর্ব অনুভব করেন আজও। অবশ্য, যাঁদের পূর্বপুরুষ ২৮ বছর আগে প্রথম ম্যাচেই লাথি মেরে ফেরেঙ্ক পুসকাসকে প্রতিযোগিতার বাইরে করে দেওয়ার চেষ্টায় ৯৯ শতাংশ সফল হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, তাদের কাছে এমনটা প্রত্যাশিতও বটে!

    কী হয়েছিল ঠিক? সেই বারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪ করা হয়েছিল, ১৬ থেকে। ফিফার সভাপতি হোয়াও আভেলানজের উদ্যোগে। যে আফ্রো–এশীয় ভোটদাতারা তাঁকে সভাপতি করেছিলেন তাঁদের বিশ্বকাপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে মূলপর্বে আরও আটটি দেশকে যোগ করা হয় সে বার। কোনও কোনও ইউরোপীয় দেশও — যেমন ইংল্যান্ড, যথীরীতি! — এই সুযোগে নিজেদের মূলপর্বে যাওয়া নিশ্চিত করতে সেই সময় ২৪ দেশের পক্ষে ভোট দিতে দ্বিধা করেনি। বাছাইপর্বে ইংল্যান্ড নিজেদের গ্রুপে দ্বিতীয় হয়েছিল। ১৬ দেশের বিশ্বকাপ হলে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’। তাই, ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমে পড়া ইংল্যান্ডের, চিরকালের মতোই!

    দু–নম্বর গ্রুপে ছিল পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও চিলে। কোচ জাপ ডারওয়েল প্রতিযোগিতার আগেই সগর্বে বলেছিলেন, ‘এত শক্তিশালী দল আমাদের যে, বিনা সমস্যায় জিতে ফিরব।’ ভুলে গিয়েছিলেন, ইউরোর ফাইনালের নায়ক বার্নড শুস্টার আহত, দলে নেই। খিওনের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে পশ্চিম জার্মানিকে ফুটবল শেখাল আলজেরিয়া, ২–১ হারিয়ে! দুটো গোল তাঁদের ইতিহাসের সেরা দুই ফুটবলার রাবাহ মাদজের এবং লাখদার বেলৌমির। পরের ম্যাচে চিলেকে ৪–১ হারিয়ে ছন্দে ফিরল পশ্চিম জার্মানি, আর আলজেরিয়া আনন্দে আত্মতুষ্টিতে ভুলল ফুটবল। অস্ট্রিয়ার কাছে হার ০–২। পশ্চিম জার্মানি, সেই ১৯৭৪ বিশ্বকাপের সময় থেকেই, খুব ভাল হিসেব জানে। পূর্ব জার্মানির কাছে সেবার হেরে সহজ গ্রুপে চলে গিয়েছিলেন বেকেনবাওয়াররা। এবার অবশ্য ব্যাপারটা আর নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা গেল না! আর্জেন্তিনা নিজেদের দেশে শেষ ম্যাচে পেরুকে ৬–০ হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছনোর পরও যে ফিফার শিক্ষা হয়নি বোঝা গিয়েছিল ১৯৮২ বিশ্বকাপে গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলি একই সময়ে না–ফেলায়। আলজেরিয়া তৃতীয় ম্যাচে চিলেকে হারাল ২–১। ফলে, গোল দিয়েছে ৫, খেয়েছেও ৫; অর্থাৎ গোল–পার্থক্য শূন্য। শেষ ম্যাচের আগে অস্ট্রিয়ার গোল–পার্থক্য ৩ (‌৩–০)‌, পশ্চিম জার্মানির ২ (‌৫–৩)‌। কিন্তু, পশ্চিম জার্মানি আবার পয়েন্টের দিক দিয়ে ২ নিয়ে অস্ট্রিয়ার পেছনে। হিসেব কষে নিল দুই প্রতিবেশি দেশ। পশ্চিম জার্মানি ১–০ জিতবে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে। দুটো দলই তখন যাবে দ্বিতীয় পর্বে। আলজেরিয়ার কাছে হারের ‘শোধ’ নিতে পারবে পশ্চিম জার্মানি, তাদের বিশ্বকাপ থেকেই বের করে দিয়ে!

    [caption id="attachment_4347" align="alignleft" width="1200"] FILE - In this June 25, 1982 file photo, Algerian soccer supporters show money to photographers, in Gijon, Spain, after the World Cup soccer match between West Germany and Austria. On this day: West Germany beat Austria 1-0, a result that meant both teams progressed to the next round at Algeria's expense. After West Germany took an early lead, the game ran its bland course to conclusion to the ire of the watching Algerians. (AP Photo/File) ORG XMIT: LWC118[/caption]

    অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার দেশকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় দেওয়ার ‘শ্বেত’পত্রে সইয়ের সময় জার্মান–অস্ট্রীয়রা এসব ফালতু ‘সেন্টিমেন্ট’ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি। কোনও দিনও ঘামান না তাঁরা। আলজেরীয় সমর্থকরা প্রচুর কেঁদেছিলেন, গ্যালারি থেকে ‘ডলার’ তুলে দেখিয়েও ছিলেন বিশ্বের ফুটবল সমর্থকদের, বোঝাতে যে, ঠিক কী হয়ে চলেছে মাঠে। কিন্তু, ফিফা কর্ণপাত করেনি। সেই ১৯৮২ সালে এমন অভিযোগ প্রমাণ করার মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থাও হাতে ছিল না ফিফার। তার মানে এমন নয় যে, এখন হলেও তা ধরা হত। তবে, অনেক বেশি প্রচারিত হত সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, নিশ্চিত। তা ছাড়া, আগের দুটি বিশ্বকাপেই আয়োজকদের এমন সুবিধে পাইয়ে দিতে গিয়ে কোনও ব্যবস্থা যখন নেওয়া হয়নি, এবার হঠাৎ ব্যবস্থা নিতে গেলে ফুটবলের বড় শক্তির দেশগুলো যদি বেঁকে বসে? আভেলানজ দিব্যি গুণগান চালিয়ে গেলেন স্পেনের বিশ্বকাপ–ব্যবস্থাপকদের, আর কলঙ্কিত ম্যাচের রেফারি, স্কটল্যান্ডের (‌আরও এক উত্তর ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ!)‌ বব ভ্যালেন্টাইন চোখের সামনে ৯০ মিনিটের নাটক দেখে চুপচাপ সিলমোহর দিলেন ফলের বৈধতায়, শেষ বাঁশি বাজিয়ে। ফুটবলকে কলঙ্কিত করার পশ্চিম জার্মানীয় প্রচেষ্টা অবশ্য জারি থেকেই গেল! জার্মান ভাষাতেই নাম দেওয়া হল, ‘Nichtangriffspakt von Gijón’ যা বোঝায় ‘খিওনের আগ্রাসন–বিরোধী চুক্তি’ (‌Non-aggression pact of Gijon)। ফুটবলের সত্যিকারের মুষ্টিমেয় জার্মান সমর্থক আরও এগোলেন, বললেন, ‘Schande von Gijón’ বা ‘খিওনের লজ্জা’। ইংরেজ কাগজ গার্ডিয়ান–এ সেই দিনের ঘটনা সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে, উৎসাহী পাঠক পড়ে নিতে পারেন এখানে — http://www.theguardian.com/football/2010/jun/13/1982-world-cup-algeria. কিন্তু, রুমেনিগেদের তাতে কী? পরের পর্বে পৌঁছনোর লক্ষ্যে তাঁরা তো সফল!

    এই একই বিশ্বকাপে জার্মানদের দ্বিতীয় লজ্জাজনক ঘটনাটি সেমিফাইনালে। তবে তার আগে প্রতিযোগিতার অন্য পর্বগুলো সম্পর্কেও খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া জরুরি।

    ১)‌ জর্জ বেস্ট সম্পর্কে ইংরেজ প্রচারমাধ্যমের ‘পেলের–চেয়ে–অনেক–বড়’, ‘দেখতে–সুন্দর–না–হলে–পেলেকে–কে–চিনত’ মার্কা একেবারেই ইংরেজসুলভ ধ্যানধারণাগুলোর সঙ্গে কোনওভাবেই মেলানো যায় না নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসার প্রশ্নে বেস্টের ব্যর্থতা। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৭, বেস্ট তাঁর সময়ে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে বাছাইপর্বের বাধা টপকে দিতে পারেননি। খেলেছিলেন ৩৭ ম্যাচ, গোল মাত্র ৯। এমনিতে অবশ্য আমাদের বাংলার বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞদের বিচারে পেলের চেয়ে বেকহ্যামও ‘বড়’ ফুটবলার, কারণ, পেলের হয়ে ফুটবলটা খেলে দিতেন সতীর্থরাই, বেকহ্যামকে সেখানে খেলতে হত নিজেকেই, কান পাতলেই শোনা যায় এমন ‘বৈপ্লবিক’ এবং ‘বাজারি’ বিশ্লেষণ! পেলে শুধু মাঠে থাকার কষ্টটুকু করতেন, এই যা! কিন্তু, পেলের রেকর্ড সত্যিই ভেঙেছিলেন যিনি সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে হাজির হয়ে, তিনি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেরই এবং তাঁর নাম নর্ম্যান হোয়াইটসাইড, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডেই খেলেছেন যিনি! ছিলেন জেরি আর্মস্ট্রং, যিনি ব্রায়ান গ্ল্যানভিলের মতো চূড়ান্ত ইংরেজ মনোভাবাপন্ন সমালোচকের কাছেও ‘সেকেন্ড ডিভিশন রিজার্ভ সেন্টার ফরোয়ার্ড’। স্পেনে বিশ্বকাপের সময় মিডিয়ার সঙ্গে এত কথা থাকত তাঁর, আর্মস্ট্রংয়ের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ডন কুইক কোট’ (‌স্পেনীয় ভাষায় বিখ্যাত Don Quixote, বাংলায় ‘দোন কিহোতে’ অনুসরণে)‌! দলের পাঁচটার মধ্যে তিনটি গোল করে ফেলেছিলেন, আর বেস্ট ওদিকে চিরকালীন ইংরেজ–হাহুতাশ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়েই থেকে গিয়েছিলেন! তিনি খেলা ছাড়ার পরের বিশ্বকাপেই সেমিফাইনালের দোরগোড়া থেকে ফিরেছিল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, মনে রাখলে ভাল হয়ত।

    ২)‌ সিজার মেনোত্তি তাঁকে নিজের দেশের বিশ্বকাপে খেলাননি বলে এখনও অনেক কথা শোনা যায়। মেনোত্তির আপত্তি ছিল, মানসিক দিক দিয়ে বিশ্বকাপের আসরের জন্য পরিণত নন সতের–র দিয়েগো মারাদোনা। চার বছর পর, অর্থাৎ ২১–এও যে সেই পরিণত মানসিকতা দেখাতে পারেননি মারাদোনা, পরিষ্কার স্পেনের বিশ্বকাপে। একটি, মাত্র একটি ম্যাচেই মারাদোনাসুলভ ফুটবল দেখা গিয়েছিল তাঁর পায়ে। হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে! বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ড্র শুরুতেই, জঘন্য খেলে। এল সালভাদোর, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ব্যবধানে ১–১০ হারের রেকর্ড করেছিল সেবারই হাঙ্গেরির কাছে, তাদের বিরুদ্ধেও আর্জেন্তিনাকে জিততে হয়েছিল কালদেরনের ‘ডাইভ’–এ পেনাল্টি পেয়ে! ইতালির বিরুদ্ধে খেলার দিন ক্লদিও জেন্তিলে খেলতে দেননি মারাদোনাকে, আর পাসারেয়ার শেষ মুহূর্তের গোলও এমন সময়ে যখন ফ্রি কিকের জন্য ইতালীয়রা ‘ওয়াল’ সাজাতে ব্যস্ত। বিরাশির ব্রাজিলের ‘ব্রিলিয়ান্স’ ও ৩–১ এগিয়ে–থাকা দাপট দেখে হতাশ মারাদোনা লাথি মেরেছিলেন বাতিস্তাকে, লাল কার্ড এবং মারাদোনার প্রথম বিশ্বকাপের কলঙ্কিত সমাপ্তি। গ্ল্যানভিলের কলমে, ‘A wild, disgraceful foul by Maradona on Batista, the foul of a spoiled, frustrated boy, had Maradona sent off five minutes from the end. Pasarella should have gone earlier for an equally spiteful, painful foul on Zico, whom Batista replaced.’ শুধুই ইংরেজ হওয়ার কারণে আর্জেন্তিনা এবং মারাদোনা–বিরোধী? ভেবে নেওয়া একটু কঠিন যদিও।

    কারণ, মারাদোনার আত্মজীবনীও (‌El Diego)‌ স্বীকার করেছে, ‘It ended badly, I lashed out, kicking Batista in the balls. But it was meant for Falcao. Falcao masterminded a midfield move; they went tac tac tac and left me for dead. As I ran past them, I turned around and hit out at the first guy I saw, I was so pissed off... poor guy, it was Batista. I was sent off... Everyone thought it was going to be my World Cup, and so do I, but it was over. I left the World Cup in a bad way, and Argentina didn't make it to the semi-finals.’

    আর হ্যাঁ, হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে গোল পেয়েছিলেন অবশ্য মারাদোনা, গ্রুপ লিগে।

    ৩)‌ ইতালির গ্রুপ লিগে তিন ম্যাচের ফল যথাক্রমে ০–০ (‌পোল্যান্ড)‌, ১–১ (‌পেরু)‌ এবং ১–১ (‌ক্যামেরুন)‌। এনজো বেয়ারজোতের চাকরি যায়–যায়। ২ গোল, ৩ পয়েন্ট, ৩ ড্র নিয়ে কোনও রকমে পোল্যন্ডের পেছনে দ্বিতীয় হয়ে নকআউটে। বেয়ারজোত দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইতালির, আগের বিশ্বকাপ থেকেই। গোলরক্ষক দিনো জোফ এবং জুভেন্তাসের ফুটবলারদের কেন্দ্র করে গড়ে তুলছিলেন তাঁর দল। ধীরে অথচ নিশিচভাবেই নিজের মতো করে। আর সেই দলের অন্যতম অস্ত্র ছিলেন পাওলো রোসি, যিনি বিশ্বকাপের ঠিক আগে মুক্তি পেয়েছিলেন হাজত থেকে! ঘটনা, পেরুজিয়ায় থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েছিলেন ম্যাচ–গড়াপেটা সংক্রান্ত ‘তোতোনেরো’ কেলেঙ্কারিতে। অভিশপ্ত ২–২ ম্যাচে দুটি গোলই ছিল তাঁর। রোসি যদিও আগাগোড়া নিজেকে নির্দোষ জানাতে ভোলেননি, তিন বছরের জন্য হাজতবাস হয়েছিল ইতালীয় ফরোয়ার্ডের। বেয়ারজোতের ঘনিষ্ঠ ছিলেন রোসি। শোনা গিয়েছে, বিশ্বকাপের কারণেই তদ্বির করে রোসির সেই শাস্তি এক বছর কমিয়ে নেওয়ার পেছনে বেয়ারজোত ছিলেন বিরাট ভূমিকায়, কিন্তু সত্যতা প্রমাণ কঠিন। যা নিয়ে সন্দেহ নেই, রোসি ছাড়া পাওয়ার পরই বেয়ারজোত তাঁকে নিয়ে নেন জাতীয় দলে। বিশ্বকাপের আগে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল রোসির কাছে। গ্রুপ লিগেও প্রথম তিন ম্যাচে কেন তাঁকে দলে রাখা হয়েছে, প্রচুর প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল বেয়ারজোতকে। কোচ একটাই কাজ করেছিলেন, প্রেসকে সম্পূর্ণ বয়কট করেছিল ইতালীয় শিবির। যা কিছু কথা হত শুধু অধিনায়ক দিনো জোফের সঙ্গে। দলের শিবিরেও কাগজ ঢোকা একেবারে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন কোচ। আর, দ্বিতীয় পর্বে যাওয়া নিশ্চিত, আর্জেন্তিনা আর ব্রাজিলের সঙ্গে একই গ্রুপে তাঁদের স্থান হওয়ার পর, ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন একটাই ব্যাপারে, ‘আক্রমণে এগোবে দল, রক্ষণ নিয়ে ভাবনাও থাকবে তাতে, কিন্তু শেকল হয়ে চেপে বসে থাকবে না যা।’

    ৪)‌ ট্যাকটিক্যালি ফরাসি ফুটবল তখনও মাঠের মাঝখানে শ্লথ, গা–এলানো, সহজ–সরল সোজা পাসে ওপরে ওঠা, যাবতীয় শক্তি সংরক্ষিত ওই শেষ ৩০ গজের জন্য। কিন্তু, সেখানে পৌঁছে বিদ্যুৎ খেলে মাথায়, পা’য়। জিদান রাখেন, অঁরি পৌঁছে যান, রোবের্তো কার্লোস কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, দেখবে ২৪ বছর পরের ২০০৬ বিশ্বকাপ! একসঙ্গে এত দিন রেয়ালে খেলেও কার্লোসের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি জিদানের পাস। যেমন কোপা রাখতেন, পৌঁছে যেতেন ফঁতে। আলবের বাতুর শিষ্য মিশেল হিদালগো ফ্রান্সের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাতের দশকের মাঝামাঝি। বিপক্ষে তখন পাঁচ থেকে কমতে কমতে দুই স্ট্রাইকার। হিদালগো বলেছিলেন, দুজন স্ট্রাইকারের জন্য চারজন ডিফেন্ডার খরচ ‘পড়তায় পোষাচ্ছে না’! দুজন যথেষ্ট, বড়জোর আরও এক জনকে রাখা যেতে পারে, ওই দুই ডিফেন্ডারের সামনে। একেবারে সামনে দুজন তো আক্রমণেই যাবেন। মানে, দলে পাঁচজনের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট হল। হাতে রইল পেনসিল নয়, পাঁচজন! ওঁদের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছিলন হিদালগো। গালভরা নাম, ইংরেজিতেই ‘ট্যাকটিকালি লুজ এলিমেন্টস’। আক্রমণে বা রক্ষণে, যখন যেমন তাঁরা তেমন। কখনও ‘ক্রিয়েটর’, কখনও ‘ডেস্ট্রয়ার’। সৃষ্টি করবেন যেমন, ধ্বংসও। মানে, আক্রমণ–রক্ষণ দু’জায়গাতেই অন্তত সাতজনের উপস্থিতি নিশ্চিত এবার। ফুটবল মাঠে যেমন হয়, মস্তিষ্কেও। আর আসল কথা তো নিউমেরিক্যাল সুপিরিয়রিটি বা সংখ্যাধিক্য। আক্রমণে বা রক্ষণে বিপক্ষের চেয়ে নিজেদের ফুটবলার বেশি সংখ্যায় হাজির করা। নিশ্চিত করতে পারলেই কেল্লা ফতে। হিদালগোর জোর এখানে। শেষ নয়, হিদালগো আরও এক যুগান্তকারী ভাবনার জন্ম দিয়েছিলেন। শুনে রে–রে করে তেড়ে উঠবেন অনেকে, কিন্তু, মাঝমাঠে এমন পাঁচজন রেখেও হিদালগো বলেছিলেন মাঝমাঠে দখল না–নেওয়ার কথা! উল্টোদিকের দল রক্ষণাত্মক মানসিকতায় সওয়ার। সেখানে মাঝমাঠের দখল নিতে গেলে বিপক্ষ আরও পিছিয়ে যাবে। নিজেদের অর্ধে ভিড় জমাবে, রক্ষণে লোক বেড়েই থাকবে। সুতরাং, মাঝমাঠে ‘ভিড় পাতলা করো’, দুর্দান্ত সহজ করে বুঝিয়েছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘ফুটবল ঘরানা: বিপ্লব ও বিবর্তন’ বইতে। নিজের খেলার জায়গা বাড়াতে বিপক্ষকেও খেলতে উদ্বুদ্ধ করতে আগ্রহী ছিলেন হিদালগো। প্লাতিনি, তিগানা, জেনঝিনি, জিরেস — স্বপ্নের মাঝমাঠ হিসেবে ফ্রান্স বিরাশির ব্রাজিলের সঙ্গে সমানে পাল্লা তো দেবেই, কেউ কেউ ফ্রান্সকেই এগিয়েও রেখেছিলেন জিকো–সোক্রাতেস–ফালকাওদের তুলনায়। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হারের পর ফ্রান্স যেন সংবিৎ ফিরে পেয়েছিল। রোশেতুর সঙ্গে দিদিয়ের সিক্স ওপরে। প্রথম ম্যাচে হেরে ভালই হয়েছিল। ফ্রান্স গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় হয়ে অস্ট্রিয়া আর উত্তর আয়ারল্যান্ডের গ্রুপে যায়। সেখান থেকে সেমিফাইনাল সহজেই।

    ৫)‌ তেলে সান্তানার ব্রাজিল নিয়ে জোগা বোনিতো অর্থাৎ সুন্দর ফুটবলের সমর্থকদের যেমন আজও মন ভারাক্রান্ত, ব্রাজিলেই বিশেষ করে পরবর্তীতে কার্লোস দুঙ্গা নামের এক ফুটবলারের নেতৃত্বে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের পর, দুঙ্গার মতো একদল ভক্ত আবার নিয়ম করেই সেই ফুটবলের বিপক্ষেই বলেন এখনও। মারাদোনা সেই বিশ্বকাপের সময়ই জানিয়েছিলেন, ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড ছিল না। মাঝমাঠ দুরন্ত কিন্তু ওপরে আর নিচে, মানে রক্ষণেও প্রচুর ফাঁকফোকর। জিকো–সোক্রাতেস–ফালকাও–সেরেজোকে মাঝমাঠে ধরলে গোল করার দায়িত্ব পড়েছিল এদের–সের্জিনিওর (‌Eder, Serginho) কাঁধে, যাঁদের দক্ষতা কারেকা স্তরেরও ছিল না। আর রক্ষণে জুনিয়র, লিয়ান্দ্রো, অস্কারদের আক্রমণে ওঠা নিয়ে যতটা নিশ্চয়তা ছিল, ছিটেফোঁটাও ছিল না রক্ষণের দক্ষতা নিয়ে। দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু, সান্তানা নিশ্চিত করতে পারেননি প্রতি–আক্রমণে দ্রুতগতিতে বিপক্ষ আক্রমণে এলে গোল খাবে না ব্রাজিল রক্ষণ। তাই, বার্সেলোনার সারিয়া স্টেডিয়ামে ৫ জুলাই, ১৯৮২ ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন তখনও পর্যন্ত বিরাশি বিশ্বকাপে একটিও গোল না–পাওয়া পাওলো রোসি, হ্যাটট্রিক করে। ড্র হলেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, সেই জায়গা থেকে ব্রাজিল আরও আক্রমণ করে জিততে গিয়ে প্রতিযোগিতারই বাইরে!

    সেমিফাইনাল

    পশ্চিম জার্মানি, এখানেও, আবার! বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ বলা হয়, কিন্তু, পরিষ্কার ডাকাতি করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল ফ্রান্সের কাছ থেকে এই ম্যাচ। খেলা তখন ১–১। প্লাতিনি মাঝমাঠের ডানদিক থেকে বল রাখলেন বিপক্ষ রক্ষণের ফাঁকা জায়গায়। কেন, কার জন্য, জার্মান রক্ষণ বোঝার আগেই সেই টেলিপ্যাথিক যোগাযোগে বাতিস্তঁ পৌঁছে গেলেন। ওদিকে, বিপদের গন্ধ পেয়ে গোল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন ততক্ষণে টোনি শুমাখার। বাতিস্তঁই পৌঁছলেন আগে। বাঁপায়ে আগুয়ান গোলরক্ষকের পাশ দিয়ে জালে রাখার চেষ্টা করলেন, একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট। কিন্তু, বাতিস্তঁ পায়ে বল লাগিয়ে ফেলেছেন দেখে রাগে অন্ধ শুমাখার লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাতিস্তঁ–র ওপর, যেমনভাবে বাঘ লাফায় শিকারের গায়ে। তিন মিনিট পড়ে ছিলেন মাটিতে বাতিস্তঁ, জ্ঞানহীন। ডাচ রেফারি কর্ভার দেখতেও পাননি, লাইন্সম্যান কোনও পরামর্শ দেননি। ইউটিউবে ফ্রান্স–জার্মানি ১৯৮২ সেমিফাইনাল ম্যাচ দেখলে শিউরে উঠবেন। পরিষ্কার লাল কার্ড, পেনাল্টি। প্লাতিনি দ্বিতীয় পেনাল্টি মারতেন, জার্মানি বাধ্য হত অন্য একজনকে বসিয়ে দ্বিতীয় গোলরক্ষককে নামাতে, পরে আহত রুমেনিগেকে নামানোর সুযোগই পেতেন না জাপ ডারওয়েল। কিন্তু, কিছুই হল না। সংজ্ঞাহীন বাতিস্তঁকে স্ট্রেচারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যখন, প্লাতিনি বুকে ক্রসচিহ্ন এঁকেছিলেন। দুটো দাঁত খুঁজে পাওয়া যায়নি বাতিস্তঁ–র। শুমাখার পরে বলেছিলেন, ‘ও, এই ব্যাপার। তা হলে সেই দাঁত দুটো বাঁধানোর খরচ আমি না হয় দিয়ে দেব!’ হ্যারল্ড ‘টোনি’ না বলে শুমাখারকে তারপর থেকেই বলা শুরু হয় ‘খুনি’! কিন্তু রেফারি ফাউলও দেননি, ঠিক যেমন ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যানুয়েল নয়ার একইভাবে গোনজালো ইগাইনকে আঘাত করার সময়ও ফাউল দেওয়া হয়নি। বিরাশি সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে দুগোল দিয়েও শাটার নামায়নি ফ্রান্স। ইতালির বিরুদ্ধে ড্র রাখলেই সেমিফাইনালে যাবে জেনে ব্রাজিল ২–২ করেও গোল দিতে এগিয়েছিল যেমন, ফ্রান্সও গিয়েছিল আরও গোলের সন্ধানে। রুমেনিগের পা আর ফিশারের ব্যাকভলিতে ৩–৩। কিন্তু, রুমেনিগের গোলের আগে প্লাতিনি এবং জিরেসকে ফাউল করা হয়েছিল, যা আবারও দেখতে চাননি ডাচ রেফারি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথম টাইব্রেকারে ফ্রান্সের হৃদয়বিদারক বিদায়। ফরাসি আর ব্রিটিশদের চিরকালীন বিরোধ মাথায় রেখেও ব্রিটিশ গ্ল্যানভিল যাঁকে বলেছিলেন ‘অযৌক্তিক, ক্ষমাহীন।’ আর, বিশ্বকাপে জঘন্য উপায়ে ফাইনালে ওঠার পশ্চিম জার্মানীয় ধারা প্রচলিত থেকে গিয়েছিল স্পেনেও। হিদালগো বাধ্য হলেন বলতে, ‘We have been eliminated brutally. I would say, scientifically.’



    অন্য সেমিফাইনালে পোল্যান্ড বিশেষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি ইতালির বিরুদ্ধে। রোসি তখন অপ্রতিরোধ্য। ২২ ও ৭৩ মিনিটে গোল রোসির। এমনিতেই কোয়ার্টার ফাইনালে কার্ড দেখে বোনিয়েক ছিলেন না এই ম্যাচে। পোল্যান্ডকে শুরুই করতে হয়েছিল সেরা ফুটবলারকে ছাড়া। তৃতীয় স্থানের ম্যাচে প্লাতিনিরা খেলেননি কেউই, ওভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকাতির পর তৃতীয় হতে লড়তে মন না চাইলে কারও কিছু বলারও থাকে না। ৩–২ জিতে তৃতীয় হয়েছিল পোল্যান্ড।

    ফাইনাল

    ১১ জুলাই সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে ইতালি–পশ্চিম জার্মানি এবং ইতালি কোনও সুযোগ দেয়নি পশ্চিম জার্মানিকে অন্যরকম কিছু করার, প্রথমার্ধে কাব্রিনির পেনাল্টি মিস সত্ত্বেও! ২৪ মিনিটেই কোন্তিকে বক্সে ফেলে দিয়েছিলেন ব্রিজেল। ব্রাজিলের রেফারি কোয়েলো ভুল করেননি পেনাল্টি দিতে। কিন্তু, কাব্রিনির বাঁ পায়ের শট বাইরে। বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি মিসের রেকর্ড থেকে গেল কাব্রিনির নামেই। প্রথমার্ধের শেষ দিকে কোয়েলো যদিও ভুল করেছিলেন স্টিলেকে–কে লাল কার্ড দেখাতে। বক্সের ঠিক বাইরে অনাবশ্যক ফাউল ওরিয়ালিকে, নিশ্চিতভাবেই যা লাল কার্ড দাবি করেছিল। শোনা গিয়েছে, বিরতিতে স্টিলেকে নাকি ফেটে পড়েছিলেন রাগে, আহত রুমেনিগেকে খেলানো নিয়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল পেয়ে যায় ইতালি, সেই রুমেনিগের ফাউল থেকেই, ওরিয়ালিকে। তারদেলির চটপট নেওয়া কিক, জেন্তিলের ক্রস, রোসির হেড, গোল! ইতালির শেষ ছ’টি গোলই তখন রোসির।

    দ্বিতীয় গোলের সময়ও রোসির পা ছিল, তবে গোল তারদেলির। নিজেদের মধ্যে পাস খেলতে খেলতেই তারদেলির দুর্দান্ত শট জালে। তৃতীয় গোলও হল। কোন্তির দুরন্ত দৌড় থেকে আলতোবেলির গোল, দেখেশুনে শুমাখারকে পরাস্ত করে। পশ্চিম জার্মানির সান্ত্বনা–গোল ব্রাইটনারের। কিন্তু, ততক্ষণে বিশ্বকাপে নিজেদের নাম লিখে ফেলেছে ইতালি, তৃতীয়বারের জন্য!

    (আগামিকাল ১৯৮৬ মেহিকো)

    No comments