• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১৪ / বিলার্দোর ভাবনা, মারাদোনার হাত ও পা / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    বাঙালি সবথেকে বেশি আলোচনা করে ছিয়াশির বিশ্বকাপ নিয়েই, কারণ, সেই প্রথম আমাদের দেশে বিশ্বকাপের প্রায় সব ম্যাচ দেখা গিয়েছিল টেলিভিশনে এবং ‘লাইভ’। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল, ১৯৮২ বিশ্বকাপের বেশ কিছু ম্যাচ, তার অধিকাংশই আবার বাংলাদেশ টিভি–র সৌজন্যে, দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদের এই বাংলায় সবার। আশ মেটেনি। দরজাটা যেন খানিকটা খুলেছে,পর্দা উড়ছে বলে মাঝেমাঝে দেখা যাচ্ছে ভেতরে কী চলছে, কিন্তু, হাট করে দরজাটা খুলে যায় ওই ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সময়। রাতজাগা, বন্ধুদের সঙ্গে কোনও এক বাড়িতে সারারাত ফুটবল দেখার স্মৃতি,অনেক বয়সে–বড় মানুষেরও, এবং দিয়েগো মারাদোনা তাই তারপর থেকে বাঙালির বুকের ভেতর!

    ‘প্রথম সব কিছু’–রই একটা আলাদা মাত্রা থাকে। কবীর সুমন যেমন বলেছিলেন গানে, ‘প্রথম দেখা দিনদুপুরে পুলিশ ঘুষ খায়/প্রথম জানা পয়সা দিয়ে সবই কেনা যায়’, তবুও, ‘এই শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু/পালাতে চাই যত সে আসে আমার পিছু–পিছু’। ছিয়াশির মেহিকো বিশ্বকাপ অধিকাংশ বাঙালির কাছে ঠিক তাই–ই। আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবল তখনও আমাদের ড্রইং রুমে বাসা বাঁধেনি। টিভি–ই তো ছিল না সত্তর শতাংশ ঘরে, চ্যানেল বলতে শুধুই দূরদর্শন। হাপিত্যেশ বসে–থাকা সপ্তাহের বিশেষ বিশেষ রাতে, অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে বাংলাদেশ টিভি–র দিকে, যদি টুকরোটাকরা ছিটকে আসে এসি মিলান বা রেয়াল মাদ্রিদ খেলার অংশবিশেষ। ঘরের ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগান তখনও বাঙালির ‘বড়’ ম্যাচ হিসেবেই পরিচিত, ইংরেজ ‘ডার্বি’ হয়ে উঠল তো খুব বেশি হলে এই শেষ বছর পাঁচেকে! কিছু ক্লাবের নাম জানা আছে অনেকেরই, সমর্থক বা ‘প্লাস্টিক’–সমর্থক (‌সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল প্রচলিত শব্দ যার মানে ‘সদ্য–গজিয়ে–ওঠা’)‌ কিছুই নেই সে ভাবে। বাঙালি তখন চার বছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকত বিশ্বকাপের। বেশ একটা পুজো–পুজো ভাব আসত, উৎসবের মাস হিসেবে জুন–জুলাই মিলিয়ে ৩০–৩২ দিন। বিশ্বকাপের বছরগুলোয় টিভি–কোম্পানিগুলো বিশেষ ছাড় দিত ওই মার্চ–এপ্রিল মাসে, কত বাড়িতে যে ‘কালার’ টিভি এসেছিল বিশ্বকাপের কারণেই! ‘ইনস্টলমেন্ট’ ব্যাপারটা আসলে কী, বুঝে–নেওয়ার সময়ও ওই বিশ্বকাপের কোনও এক বছরেই প্রথম এসেছিল অনেক বাঙালি ঘরে, বিশ্বকাপ ফুটবল দেখবে বলে কিস্তিতে টিভি কিনতে গিয়েই! মারাদোনা–প্রেমের সঙ্গে এই ফ্যাক্টরগুলোও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আম–বাঙালির।

    ১৯৭০ সালেই হয়েছিল, ১৬ বছরের মধ্যে আবার মেহিকোয় কেন বিশ্বকাপ? ব্রাজিলীয় ফিফা–সভাপতি হোয়াও আভেলানজের সৌজন্যে! কলম্বিয়ার দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, প্রথমবার ২৪ দলের বিশ্বকাপ আর কলম্বিয়ায় ড্রাগ–মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যের কথা ভেবে সরিয়ে নেওয়া হয়। ব্রাজিল দায়িত্ব নিতে অসমর্থ তখন। বিরাশিতে স্পেনে বিশ্বকাপ হয়েছে, চার বছর পর আবার ইউরোপে? ফিফা সভাপতির সায় ছিল না। মেহিকো শুধু রাজিই হয়নি, তলে–তলে আরও অনেক কিছুই করেছিল। আভেলানজ যদিও বলেছিলেন, ‘বিবেকের কাছে পরিষ্কার। যে যা খুশি বলতে বা লিখতেই পারে, তার ব্যাপার।’ হ্যাঁ, তেলেভিসা মেহিকানার মালিক এমিলিও আজকারাগা–র সঙ্গে স্পেন থেকেই মেহিকো উড়ে গিয়েছিলেন আভেলানজ বিশ্বকাপ শেষেই, আজকারাগা–র ব্যক্তিগত বিমানে, সে অবশ্যই অন্য প্রসঙ্গ! ক্ষুব্ধ ছিল ইউরোপ, বিশেষ করে উত্তর। একে তাপমাত্রা, তায় উচ্চতাজনিত অক্সিজেনের অভাবের সমস্যা। মানিয়ে নেওয়া কঠিন। কিন্তু, আভেলানজের যা প্রতাপ তখন ফিফায়, কেউ ট্যাঁ–ফোঁ করেননি।

    পাসারেয়ার ফিরে–যাওয়া

    পরপর দুটো বিশ্বকাপে মেনোত্তি ছিলেন। বিরাশিতে আর্জেন্তিনা প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় সরে যেতে হয়েছিল। মেহিকোতে আর্জেন্তিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো। আর তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখার পর, ‘অধিনায়ক’ মারাদোনার মনে হয়েছিল, ‘লোকটার মাথা–ফাথা খারাপ, বদ্ধ পাগল একেবারে!’ কারণ? দেখা হওয়ার পর মারাদোনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দৌড়চ্ছিলেন পাশাপাশি, তা–ও ‘আপার’–টা মারাদোনার কাছ থেকেই ধার করে!

    পরে অবশ্য আত্মজীবনীতেই জানিয়েছেন মারাদোনা, ‘সব কোচেরই আলাদা অধিনায়ক থাকে বোধহয়। মেনোত্তির যেমন ছিল পাসারেয়া। এল ফ্লাকোর আমলে কারও সাধ্য ছিল না পাসারেয়াকে ছোঁয়।ছোটখাটো কথা উঠলেও মেনোত্তি এমন প্রতিক্রিয়া দিতেন, সবাই বুঝে যেতেন তাঁর এক নম্বর কে। বিরাশির বিশ্বকাপের পর মেনোত্তি দায়িত্ব ছাড়েন, আসেন বিলার্দো। এসেই যখন বিলার্দো আমাকে অধিনায়ক হিসেবে চেয়েছিলেন, মনে হয়েছিল, আমাকেও বিলার্দোর এক নম্বর হতে হবে।’

    তাই নিয়েই বিতর্ক শুরু। বিলার্দো বলতেন, দলে একজনের জায়গাই নিশ্চিত, তাঁর অধিনায়কের। এদিকে, দলে তখনও পাসারেয়া। বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র আর্জেন্তিনীয় অধিনায়ক। তাঁর ‘ইগো’ আহত হবেই।খুচখাচ ঝামেলা শুরু, যা চরম আকার নিয়েছিল মেহিকোতে আর্জেন্তিনা দল পৌঁছনোর পর। পাসারেয়ার কোনও আত্মজীবনীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাই বিশ্বকাপ ছেড়ে কেন চলে এসেছিলেন পাসারেয়া,গল্পটা জানতে হাত পাততে হবে মারাদোনার আত্মজীবনীর কাছেই।

    ‘শেষ দিন পর্যন্ত পাসারেয়া চেষ্টা করে গিয়েছিল নেতৃত্ব ফেরত পেতে। অবস্থা চরমে ওঠে মেহিকোয় পৌঁছে। দুটো প্রস্তুতি ম্যাচের একটিতে হারি, একটিতে ০–০। সমস্যা! মিটিং ডাকা হল। নির্ধারিত সময়ের মিনিট ১৫ পর পৌঁছই। সঙ্গে পাসকুই, বাতিস্তা, ইসলাস। পাসারেয়া বলতে শুরু করে, ‘এই যে এলেন অধিনায়ক–মশায় ও তার অনুচররা! বুঝি না, অধিনায়ক হয়ে কেউ কী করে টিম মিটিংয়ে দেরিতে আসে। দলের সামনে কী দৃষ্টান্ত রাখছে অধিনায়ক? এই কি বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলের শৃঙ্খলার নমুনা?’ এমন আরও অনেক কিছু। ড্রাগাসক্ত, অন্যদেরও ড্রাগ নিতে শেখাচ্ছি, ভবিষ্যৎ নষ্ট করছি অন্যদের ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনছিলাম শুধু। থামার পর বলতে শুরু করি আমিও, রাখঢাক না–করেই। ড্রাগ নিই অস্বীকার করার কোনও কারণ ছিল না, কিন্তু পরিষ্কার বলে দিই যে, মেহিকোতে আসার পর আর নিইনি। দলবিরোধী কাজের অভিযোগ করি পাসারেয়ার বিরুদ্ধেই। ফিওরেন্তিনায় খেলত তখন। ইতালিতে সবাই জানত যে পাসারেয়া মাঝেমাঝেই যায় মোনাকোতে। আসলে এক বিখ্যাত ফুটবলারের স্ত্রী–র সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিল, সেই কারণেই। পাসারেয়া নিজেই এমন গর্বিত হয়ে এই কথাগুলো বলত নিজের পছন্দের মহলে যে, মনে হত যেন বিরাট কাজ করছে। সেই কথাগুলোও বলে দিই এবার। ওর গ্রুপে তখনও ছিল ভালদানো। সে দিন আমার কথা শোনার পর ভালদানো উঠে যায়, যাওয়ার আগে পাসারেয়াকে বলে গিয়েছিল, ‘তুমি... জঘন্য মানুষ।’ আর সেই মিটিংয়ের পরই পাসারেয়ার বিখ্যাত ডায়েরিয়া এবং একটিও ম্যাচ না খেলে ফিরে আসা মেহিকো থেকে।’

    সমস্যা ছিল মারাদোনারও। বিশ্বকাপের সময় ক্রিশ্চিনা সিনাগ্রা, মারাদোনার বান্ধবী, আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সিনাগ্রার সঙ্গে পরিচয় বোন মারিয়ার মাধ্যমে। ছোটবেলার বান্ধবী ক্লদিয়া থাকা সত্ত্বেও সিনাগ্রার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেরি হয়নি মারাদোনার। মেহিকোর কাগজে ফলাও করেই বেরিয়েছিল এই প্রেমকাহিনী। সঙ্গে সিনাগ্রার হুমকিও, পিতৃত্ব অস্বীকার করলে দিয়েগোকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে আদালতে। অন্য দিকে, মেহিকো যাওয়ার আগে মারাদোনাকে পাঠানো হয়েছিল রোমে, ড. দালমন্তের কাছে। ফিফা তখনই জানিয়ে দিয়েছিল, বিশ্বকাপের আসরে তারকাদের ডোপ–পরীক্ষা করা হবে অহরহ,ধরা পড়লেই নির্বাসন। আটাত্তরে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপের সময়ও ডোপ–পরীক্ষা হয়েছিল, কিন্তু, মারিও কেম্পেসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী–র মূত্রের নমুনা পাঠানো হয়েছিল পরীক্ষার জন্য! চিকিৎসকরা পুরুষ ফুটবলারের মূত্রের নমুনায় অন্তঃসত্ত্বার চিহ্ন বহনকারী লক্ষণ পেয়েও চেপে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন আর্জেন্তিনার জুনতা সরকারের কথা ভেবে। কেম্পেস এবং তারাতোকি নাকি একটি বিশেষ ম্যাচের পর এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে, ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও দু’ঘন্টা খেলতে দিতে হয়েছিল তাঁদের, উত্তেজনা কমাতে। কিন্তু, মেহিকোয় তো আর সেই সব চেপে রাখা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া, মারাদোনাকে বিশ্বাসও নেই! তাই, ইতালির অলিম্পিক সংস্থার চিকিৎসক দালমন্তের কাছে পাঠাতেই হয়েছিল মারাদোনাকে, তাঁর রক্তে কোনও রকম পারফরম্যান্স–বর্ধক ড্রাগের চিহ্নও যাতে না থাকে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে। মারাদোনার জীবনীকার জিমি বার্নস লিখেছেন, ‘ফিফার এক উচ্চপদস্থ কর্তা বলেছিলেন, তিন–তিনবার তাঁরা পরীক্ষা করেছিলেন মারাদোনাকে, মেহিকো বিশ্বকাপ চলাকালীন। কোনওবারই নেতিবাচক কিছু পাননি। বারবার মারাদোনাকে পরীক্ষার পেছনে কারণও ছিল। তখন আর্জেন্তিনা দলের সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসক মাদেরো, যাঁর নামে দেহসৌষ্ঠব প্রতিযোগীদের নিষিদ্ধ ড্রাগ দিয়ে পেশিশক্তি বাড়ানোর পুরনো অভিযোগ ছিল। মেহিকোর আগে মাদেরো টানা কাজ করেছিলেন মারাদোনার সঙ্গেও। তারই ফলে মেহিকো বিশ্বকাপে খেলতে পেরেছিলেন মারাদোনা, তা–ও আবার দু–পায়ে দু–মাপের বুট পরে!’

    প্রাথমিক পর্ব

    ইতালির সঙ্গে ১–১ আর বুলগারিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয় পর্বে যেতে কোনও সমস্যাই হয়নি আর্জেন্তিনার। বি গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়ে দ্বিতীয় পর্বে উঠেছিল বেলজিয়াম, পরে যারা সেমিফাইনালে হেরেছিল আর্জেন্তিনার কাছে। সি গ্রুপে রাশিয়া–হাঙ্গেরি ম্যাচ উল্লেখযোগ্য, ৬–০ ব্যবধানের কারণে। ফ্রান্স সামান্য বয়স্ক। অঁরি মিশেল দায়িত্বে, প্লাতিনি–জিরেস–তিগানা থাকলেও চার বছর আগের তুলনায় খানিকটা পড়তি। ব্রাজিল তিন ম্যাচই জিতে দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছলেও জিকো–সোক্রাতেসের বয়স হয়েছে, কারেকা–মুলার জুটি গোল করেন কম, সুযোগ হেলায় হারান অনেক বেশি! পশ্চিম জার্মানির দায়িত্বে এসেছেন নতুন ম্যানেজার বেকেনবাওয়ার, তৈরি করতে শুরু করেছেন লোথার ম্যাথাউসকে, দলের প্রাণভোমরা।

    কিন্তু, প্রাথমিক পর্বে চমক বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে, ডেনমার্কের হাতে উরুগুয়ের ৬–১ হার! জার্মান সেপ পিওনটেক–এর হাতে ডেনমার্ক পেয়েছিল তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাদের। মর্টেন ও জেসপার ওলসেন, সোরেন লারবি, মাইকেল লাউড্রাপ, প্রেবেন এলকিয়ায়ের। স্কট অ্যালেক্স ফার্গুসন তখনও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পা রাখেননি। স্কটল্যান্ডের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বিশ্বকাপে। প্রথম ম্যাচে তাঁর দলকেই ১–০ হারিয়ে অভিযান শুরু করেছিল ডেনমার্ক। পরের ম্যাচের শেষে তাঁরা হয়ে গিয়েছিলেন, ‘উই আর রেড, উই আর হোয়াইট, উই আর ড্যানিশ ডাইনামাইট’! ১৯ মিনিটে বোসিও লাল কার্ড দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর লাল–সাদা বিস্ফোরণে উড়ে–যাওয়া উরুগুয়ের। এলকিয়ায়েরের হ্যাটট্রিক, লারবি, লাউড্রাপ ও জেসপারের বাকি তিন গোল। কেন মাইকেল লাউড্রাপ তখন বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজক তরুণ ফুটবলার, বুঝতে হলে এখন ইউটিউবের শরণাপন্ন হতে পারেন যে কোনও পাঠক। এনজো ফ্রান্সেসকোলি — এই নশ্বর বিশ্বে যিনি জিনেদিন জিদান নামক এক ফুটবলারের আরাধ্য আদর্শ — দলে থাকা সত্ত্বেও উরুগুয়ে এত মারকুটে বোধহয় জুলে রিমে কাপের পর কোনও বিশ্বকাপে ছিল না। ডেনমার্ক গ্রুপের শেষ ম্যাচেও পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ধরে রেখেছিল নিজেদের অঘটনের ধারা। ইংল্যান্ডের হয়ে লিনেকার নিজেকে ফিরে পেলেন গ্রুপের শেষ পোল্যান্ড ম্যাচে, হ্যাটট্রিকে দ্বিতীয় পর্বে নিয়ে গিয়েছিলেন দেশকে।

    দ্বিতীয় পর্বে দুটি ম্যাচ ফলের দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য। এক, বেলজিয়াম–রাশিয়া ৪–৩। রাশিয়ার ফুটবলারদের ফিটনেস লেভেল এতটাই ছিল যে, মেহিকোর উচ্চতাতেও কোনও সমস্যা হয়নি। তিনকাঠির তলায় দুর্ভেদ্য দাসায়েভ তো ছিলেনই। বেলানভ, সে–বছরের ইউরোপীয় বর্ষসেরা ফুটবলারের সম্মান পাবেন। ওই ম্যাচে হ্যাটট্রিক তাঁর। বেলজিয়াম তেমন কিছুই করেনি গোটা বিশ্বকাপে তখনও পর্যন্ত।কিন্তু রাশিয়াকে ব্যতিব্যস্ত করতে চেয়েছিল উঁচু সেন্টারে। শিফো গোল পেলেন, সেউলেম্যানসও, যদিও সেউলেম্যানস অফসাইডে ছিলেন। ৪–২ পিছিয়ে বেলানভ পেনাল্টি থেকে ৩–৪ করলেও শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয় রাশিয়াকে। দুবছর পর হল্যান্ডের কাছে ইউরোপের ফাইনালেও হেরে বিদায় নেবেন দাসায়েভরা, তখন যদিও তা জানা যায়নি। কিন্তু, রাশিয়ার বিদায় কষ্ট দিয়েছিল ফুটবলপ্রেমীদের।

    কে জানত তখন, আরও কষ্ট অপেক্ষা করেছিল! ডেনমার্ক, এবার! উরুগুয়েকে ৬–১ হারানোর পর নিজেদের হার ১–৫, স্পেনের কাছে, বুত্রাগুয়েনোর কাছে, নিজেদের ভুলের কাছে। এক গোলে এগিয়ে ছিল ড্যানিশ ডাইনামাইট–রা, প্রথমার্ধের শেষে জেসপার ওলসেনের একটি ভুল, ডেনমার্কের ফুটবলের ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছিল হয়ত। ডানদিকে অনেকটা নিচে নেমে গিয়েছিলেন, গোলরক্ষক হোঘের কাছ থেকে বল নেন, স্কোয়ারে ঠেলে দেন, কোনও দিকে না–তাকিয়েই। ‘এল বুইত্রে’ (‌শকুন)‌ দৌড়ে আসছিলেন, পেয়ে যান পায়ে, বিন্দুমাত্র না–থেমে গোলশোধ করে যান। পরে দু’বার তাঁকে বক্সে টেনে ফেলে দেওয়া হয়, দু’টি পেনাল্টি এবং এলয়ের ক্রসে হেড করে, মোট চারটি গোল বুত্রাগুয়েনোর একারই। জেসপারকে দোষ দেওয়া হয় ঠিকই। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ডেনমার্কের এভাবে আত্মসমর্পণের কারণ শুধুই একটা ভুল পাস হতে পারে না! পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্নেসেনকে লাল কার্ড দেখতে বাধ্য করেছিলেন ম্যাথাউস। তাঁর কোচ বেকেনবাওয়ার তো পরিষ্কারই বলেছিলেন, ‘ডেনমার্কের খেলার ধরন প্রাগৈতিহাসিক।’ কিন্তু, ছিয়াশি বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বে মুষ্টিমেয় যে দলগুলি সাধারণ মানুষকে যথেষ্ট আনন্দ দিয়েছিল, ডেনমার্ক তাদের অন্যতম।

    কোয়ার্টার ফাইনাল

    এক ম্যাচে তিনজনের পেনাল্টি মিস। সেই তিনজনের নাম যথাক্রমে জিকো, প্লাতিনি এবং সোক্রাতেস!

    প্রতিযোগিতার সেরা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও ফ্রান্স। সেমিফাইনালে পৌঁছনোর লক্ষ্যে নিজেদের খেলায় আরও উন্নতি এনেছিল তেলে সান্তানার ব্রাজিল। যদিও বিরাশির সেই ছন্দ অনুপস্থিত।ফালকাও ছিলেন না মাঝমাঠে, শুরুতে সোক্রাতেসের পায়ে রিমোট, খেলাচ্ছিলেন মুলার–কারেকা–জুনিয়রকে। গোলও পেয়ে যান কারেকা যখন মুলার–জুনিয়র নিজেদের মধ্যে পাস খেলে ফ্রান্সের রক্ষণের ফুটবলারদের টেনে নিয়ে কারেকার পায়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন বল ফাঁকায়। আগুয়ান বাতস–কে গোল আটকানোর কোনও সুযোগই দেননি কারেকা। পরে, কারেকা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সুযোগ মুলারকে।কিন্তু, সে দিন গোটা ম্যাচে মুলার অবিশ্বাস্য সব মিস করে গিয়েছিলেন, পরপর। একবার পোস্টে মেরে, শেষে তো একবার ফাঁকা গোলের সামনে বল পেয়েও বারের ওপর দিয়ে তুলে দিয়েছিলেন। উল্টোদিকে,স্তোপাইরা, রোশেতু–রাও পিছিয়ে ছিলেন না কেউই। কিন্তু, নিজের জন্মদিনে ফ্রান্সকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন সেই প্লাতিনিই, দেশের জার্সিতে নিজের ৪১–তম গোল করে, ফ্রান্সের হয়ে যে–রেকর্ড বহুদিন ছিল তাঁর নামেই, থিয়েরি অঁরির আগে পর্যন্ত।

    ব্রাজিলের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত আসে ম্যাচের ৭৩ মিনিটে। জিকো সদ্য মাঠে নেমেছিলেন, মুলারের জায়গায়। ব্রাঙ্কোকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বল, ফাঁকায় বক্সে। বাতস এসে ফেলে দেন, পেনাল্টি। তখন এই ধরনের ফাউলে গোলরক্ষককে লাল কার্ড দেখানো হত না। সোক্রাতেস, কারেকা বা ব্রাঙ্কো মারতেই পারতেন, জিকো এগিয়ে যান। অত্যন্ত দুর্বল পেনাল্টি নেন একসময়ের ডেড–বল মাস্টার জিকো। বাতসের বাঁদিকে, ঠিক যে–উচ্চতায় এবং যে–গতিতে শট নিলে গোলরক্ষকদের বাঁচাতে সবচেয়ে সুবিধে হয়, তেমন। তখনও ফুটবল এভাবে মোরিনিও–দূষিত হয়নি যে বিপক্ষের সহকারী কোচের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতে হবে, নিজের দল অপরাধ করলেও! ইউটিউবে আরও একবার দেখে নিন, জিকোর পেনাল্টি মিস। দেখবেন, পেনাল্টি থেকে গোল মিসের পর ফিরতি বল যখন ফরাসি ডিফেন্ডার কর্নারের মাধ্যমে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, জিকো বিধ্বস্ত, প্লাতিনি এসে হাত বুলিয়ে দিয়ে গেলেন জিকোর মাথায়। সর্বোচ্চ স্তরের দুই ফুটবলার, প্লাতিনি ঠিক জানতেন মানসিক দিক দিয়ে কী অবস্থায় থাকতে পারেন জিকো তখন। ফুটবল, একটু হলেও, অন্যরকম ছিল তখনও।

    নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষের আগে প্লাতিনির থ্রু একইভাবে বেলোনকে সাজিয়ে দিয়েছিল ফাঁকায়। ব্রাজিলের গোলরক্ষক কার্লোসও কিন্তু ফেলে দিয়েছিলেন বেলোনকে, ডি–র ভেতরে। মনে পড়তে বাধ্য আগের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জার্মান ‘খুনি’ শুমাখারের ফাউল। এখানে ফাউলটা তেমন বিপজ্জনক নয়, শারীরিক দিক দিয়ে। কিন্তু, পেনাল্টি তো? রোমানিয়ার রেফারি ইওয়ান ইগনা পাত্তাই দেননি ফ্রান্সের কারও আবেদনে। উল্টে, ব্রাজিল এগিয়ে যেতে পারত ওই বল থেকেই ফিরতি আক্রমণে যখন কারেকা একেবারে ফাঁকায় সাজিয়ে দিয়েছিলেন সোক্রাতেসকে, কিন্তু চরম ক্লান্ত ড. সোক্রাতেস বলে পা লাগানোর আগেই পড়ে যান মাটিতে।

    প্লাতিনি কি জানতেন, একই অবস্থায় পড়বেন তিনিও, টাইব্রেকারে? অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটেও দু–দলই জিততে চেয়েছিল সরাসরি, দু–দলই জিততেও পারত সরাসরি, যদি স্ট্রাইকাররা পারতেন গোলে বল রাখতে। পারেননি, ফলে টাইব্রেকার এবং হৃদয়–ভাঙা শুরু ড. সোক্রেতাসের প্রথম পেনাল্টি মিস দিয়েই! দু–পা হেঁটে টাইব্রেকারে প্রথম শট মারতে গিয়ে বাতসের ডানদিকে রেখেছিলেন, বাতস সহজেই বাঁচান। ফ্রান্সের হয়ে চতুর্থ শট মারতে গিয়েছিলেন প্লাতিনি। কার্লোসের ডানদিকের জালে ওপরে রাখতে গিয়ে বাইরেই মেরে ফেলেন ফরাসি–অধিনায়ক! ঠিক তার পরের শটটাই ব্রাজিলের সিজার পোস্টে মারায় ফেরনান্দেজ পরের শটে ফ্রান্সকে নিয়ে চলে যান সেমিফাইনালে। তেলে সান্তানার ব্রাজিলের আরও একবার বিদায়, কৌশলগত সমস্যাতেই। মাঠে আসার দু–মিনিটের মধ্যে কেন পেনাল্টি মারতে যাবেন তেত্রিশের জিকো?

    দ্বিতীয় আর চতুর্থ কোয়ার্টার ফাইনাল প্রায় একই রকম। পশ্চিম জার্মানি আর মেহিকো ম্যাচে কোনও গোল হয়নি ১২০ মিনিটে, ফয়সালা টাইব্রেকারে। আর চতুর্থ ম্যাচে বেলজিয়াম–স্পেন ১–১, পরে টাইব্রেকারে পাফের একমাত্র সেভ, স্পেনের বিদায়, বেলজিয়াম সেমিফাইনালে। গ্রুপে তৃতীয় হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে এবং এনজো শিফো থাকা সত্ত্বেও বেলজিয়ামের মোটেও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছনোরযোগ্যতা ছিল না।



    তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে এত বলা, লেখা এবং শোনা হয়েছে যে, বিশদে বলার মতো কিছু বেঁচে নেই আর! আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, ফকনার যুদ্ধ, মারাদোনার দেশের সংবাদমাধ্যমে ফিরে আসা জুনতা–প্রজন্ম যেন, দেশাত্মবোধের আবেগ, ইংরেজ প্রচারমাধ্যমেও যুদ্ধের আবহ। তিউনিসিয়ার আলি বেন নাসের ছিলেন বাঁশিমুখে। পোল্যান্ড আর পারাগুয়েকে হারিয়ে ববি রবসনের ইংল্যান্ড পৌঁছেছিল শেষ আটে। প্রথমার্ধ গোলশূন্য। তারপরই সেই ১৯৬৬ বিশ্বকাপের বল গোললাইনের ভেতরে না বাইরে বিতর্কের পর এত বড় বিতর্ক বিশ্বকাপে আবার। ৫১ মিনিট, হডল নিজেদের পেনাল্টি বক্সের দিকে তুলে দিয়েছিলেন বল। মারাদোনা এবং শিলটন দুজনেই লাফালেন, দেখা গেল বল জালে, মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে নিজেদের দর্শকদের দিকে গিয়ে মারাদোনা নাচছেন, আর শিলটন–হডল রেফারির কাছে নালিশ জানাচ্ছেন! এত দ্রুত ঘটেছিল যে, শিলটন সবচেয়ে কাছে আর হডল ঠিক পেছনে ছিলেন বলে বুঝতে পেরেছিলেন। রেফারির তাৎক্ষণিক ভাবনায় আসেনি এই প্রশ্নটা যে, ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির মারাদোনা কী করে লাফিয়ে ৬ ফুটের শিলটনকেও পরাস্ত করে বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেন? তা–ও যেখানে শিলটনের হাত ব্যবহারের অনুমতি আছে আর মারাদোনার নেই? যাই হোক, সেই মুহূর্তে মারাদোনার হাত–গোল ঢুকে গেল বিশ্বকাপের ইতিহাসে। মারাদোনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লিখেছেন আত্মজীবনীতে, ‘যা ব্যাটারা, গির্জায় গিয়ে কেঁদে আয় খানিক!’



    আর তার চার মিনিট পরের পা–গোলও তো ইতিহাসই! নিজেদের অর্ধে বল ধরে, ইংল্যান্ডের চার ডিফেন্ডারকে (‌বিয়ার্ডসলে, রিড, বুচার, ফেনউইক)‌ পেরিয়ে শিলটনকেও কাটিয়ে জালে বল। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা আগের গোল–চুরির আঘাত থেকে নিজেদের তখনও ফিরিয়ে আনতে পারেননি বাস্তবে, গ্ল্যানভিল লিখলেও নেহাত ছেঁদো যুক্তি। হ্যাঁ, ০–০ থেকে প্রথমে এই গোলটা হলে, পরে হাত–গোল হলে হয়ত ‘মরাল পুলিশ’ আর একটু কম চটত, কিন্তু, এই গোলটা আসলে ওই প্রথম গোলের পর মারাদোনার নিজের নিজেকে পুরস্কার।

    মারাদোনার আত্মজীবনী থেকে একটা ছোট্ট অংশ তুলে দেওয়ার লোভ সামলানো যাচ্ছে না, আজকের যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে চেয়ে। এখনকার বাজারে ‘অ্যাসিস্ট’ সম্পর্কিত উচ্ছ্বাস অনেক বেশি।‘অ্যাসিস্ট’ মানে গোলের পাস বাড়ানো, যা থেকে গোল ছাড়া অন্য কিছু করা মুশকিল। তা, মারাদোনার এই দ্বিতীয় গোলের ‘অ্যাসিস্ট’ কার, জানেন? প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যাচ্ছেন তো? নিজেদের অর্ধে বল পাস দিলে তাকে ‘অ্যাসিস্ট’ বলা যায় কিনা, ভাবছেন? শুনুন মারাদোনার কথা তা হলে!

    ‘কী ভয়ানক বিচ্ছু নেগ্রো এনরিকে, ভাবতেও পারবেন না। গিয়েছিল স্নান করতে। ফিরে এসে শুনল ভালদানোর সঙ্গে কথা বলছি, বাকিরাও গোলটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে অম্লানবদনে বলে ফেলল, সবাই গোল নিয়ে এত হইচই করছ, কই আমাকে কেউ অভিনন্দন জানালে না তো? যে–পাসটা বাড়িয়েছিলাম, দিয়েগোর গোল না–করে উপায় ছিল?

    ‘মার–মার করে তেড়ে গিয়েছিলাম সবাই, নেতৃত্বে এখানেও আমিই। নিজেদের অর্ধে পাস দিয়ে বলে কিনা, ওই পাসটা থেকে গোল না করে উপায় ছিল না! কিন্তু, ওই একটা মন্তব্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমাদের সাজঘরের অবস্থা তখন। পাসারেয়া–বিদায়ের পর সবাই এককাট্টা, এতটাই নির্মল ছিল, এতটাই খুনসুটি ছিল, এতটাই বিশ্বাসও ছিল পরস্পরের প্রতি তখন। তা ছাড়া, সেমিফাইনালে উঠেছি, এসব হবে না?’

    শেষ ৪ ম্যাচ

    আর্জেন্তিনার সামনে সেমিফাইনালে বেলজিয়াম, পশ্চিম জার্মানির সামনে ফ্রান্স মানে বিরাশির পুনরাবৃত্তি। মারাদোনা আরও একবার জোড়া গোল করলেন। দল হিসেবে বেলজিয়াম, শিফোকে ধরেও বলা সহজ যে, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের অনুপযুক্ত। তবে, বিশ্বকাপে হয় এমন মাঝেমাঝে। সারাক্ষণ রক্ষণে ব্যস্ত। এরিক গেরেটসরা ছিলেন। জেন্তিলের পর এত মারকুটে ডিফেন্ডার কি দেখা গিয়েছিল আর?কলকাতায় এসেছিলেন পিএসভি আইন্দোভেনের হয়ে খেলতে। প্রয়াত কৃশানু দে ছিলেন মাঠে। একবার সাইডলাইনের ধারে রুমাল–পরিমাণ জায়গায় দুজন ডিফেন্ডারকে হতচকিত টার্ন–এ পরাস্ত করে বেরিয়ে পড়েছিলেন। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ভিআইপি গ্যালারিতে বসে দেখছিলাম, চোখের সামনেই। ওটা দেখেই গেরেটস ছুটে এলেন। একমুখ দাড়িগোঁফ নিয়ে জোরালো ট্যাকল, কৃশানু দে মাটিতে।কৃশানুর চোখের সামনে ডান হাতটা মুঠো করে পেশিটা ফুলিয়ে এমনভাবে বেরিয়ে গেলেন, কৃশানুর বোধহয় মনে পড়ে গিয়েছিল কিছু দিন আগে টিভিতে মারাদোনাকে কীভাবে মেরেছেন গেরেটস। তাই আর যাননি কাছাকাছি! যাক গে, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফেরা যাক। একে তো ওই বেলজিয়াম, তারপর মারাদোনা তখন আত্মবিশ্বাসের চূড়ায়, হাত ও পা–গোলের পর! সুতরাং, আরও দুটো গোল এবং ফাইনালে। কাদের বিরুদ্ধে? সেই বিরাশিতেও যারা ফাইনালে খেলেছিল, পশ্চিম জার্মানি। আরও একটি এমন দল, যাদেরকে ডেনমার্ক হাসতে হাসতে হারিয়েছিল প্রথম পর্বেই। পৌঁছে গিয়েছিল সেমিফাইনালে তত দিনে, আর ডেনমার্ক, ওই বিশ্বকাপের সবচেয়ে উত্তেজক ফুটবল খেলে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই ফিরে গিয়েছিল দেশে! ফ্রান্স ক্লান্ত ছিল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে অমন ম্যাচ খেলে। প্লাতিনির সমস্যা পেশির টান,রোশেতু খেলতে পারেননি, আর বাতস শুরুতেই এমন একটা বাজে গোল খেয়ে বসেছিলেন যে, ফ্রান্স আরও দমে গিয়েছিল মানসিক দিক দিয়ে। বিরাশির সেমিফাইনালের ধারেকাছে যায়নি তাই সেই ম্যাচ।তৃতীয় স্থানের খেলায় ফ্রান্সের দ্বিতীয় দলও বেলজিয়ামের প্রথম দলকে ৪–২ হারায় হেসেখেলে। আরও একবার বুঝিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের শেষদিকের পর্বে কতটা বেমানান ছিল বেলজিয়াম।

    ফাইনাল? পশ্চিম জার্মানি, আগেই বলা হয়েছে, সেই বিশ্বকাপেও হেরেছে, বিরক্তিকর ফুটবল খেলেছে, কোনও রকমে জিতেছে, দাপটের কাছাকাছি না–থেকেও। কিন্তু বিরাশিতে যেভাবে জালিয়াতি করে বা শুমাখারের খুনে মেজাজের ডাকাতি সত্ত্বেও জিতেছিল, ছিয়াশিতে তেমন নয়। বেকেনবাওয়ার এসেছেন দায়িত্বে, লোথার ম্যাথাউস তৈরি হচ্ছেন পরবর্তী যুগের জন্য, এ–পর্যন্তই। কাইজার নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তাঁর দল একেবারেই গোছানো ছিল না। কিন্তু, ববি রবসন যে–ভুল করেছিলেন, ফাইনালে বেকেনবাওয়ার করেননি। ম্যাথাউসকে লাগিয়ে রেখেছিলেন মারাদোনার পেছনে। এবং, ম্যাথাউস তখনই কিছু করতে দেননি মারাদোনাকে। বাধ্য হয়েই নিজেদের অর্ধে নেমে আসতে হয়েছিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার এবং সেমিফাইনালের সেরা ফুটবলারকে। আর্জেন্তিনার প্রথম গোল শুমাখারের বদান্যতায়।বুরুচাগার ফ্রি কিক ধরতে হঠাৎই গোল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, ব্রাউন হেডে গোল করে যান সানন্দে! বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম গোল আর কারও মাথা থেকে আসা সম্ভব ছিল না বোধহয়। পাসারেয়ার অভাব বুঝতে দেননি যিনি গোটা প্রতিযোগিতায়, কিন্তু এখনও যাঁর নাম করাই হয় না কোনও ফুটবল আলোচনায়, সেই ব্রাউন। দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রেও শুমাখার, তবে এবার গোললাইন ছেড়ে না–বেরোনর কারণে। শুমাখার নাকি আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, সতীর্থরা তাঁকে এত বার করে গোললাইন ছেড়ে বেরতে নিষেধ করছিল যে, ভালদানোর গোলের সময় তিনি আর বেরিয়ে আসেননি,লিখেছেন ক্রিস ফ্রেডি, তাঁর বইতে।

    কিন্তু, যত বাজে ফুটবলই খেলুক না কেন, জার্মানদের সবচেয়ে বড় গুণ হাল না ছাড়া। ৫৬ মিনিটে ভালদানোর গোলের পর বেকেনবাওয়ারের মনে হয়েছিল, আর মারাদোনাকে মার্ক করার দরকার নেই,ম্যাথাউসকে এবার স্বাধীনতা দেওয়া দরকার। ম্যাথাউস শুরু করেছিলেন নিজের খেলা, পরে ৭৪ আর ৮২ মিনিটে দুটো গোল শোধ দিয়ে দিলেন রুমেনিগে আর ফোলার! দুটোই ডানদিক থেকে ব্রেহমের কর্নারে। প্রথমবার ফোলার সাজিয়ে দিয়েছিলেন রুমেনিগের জন্য, দ্বিতীয়বার বার্টহোল্ডের হেড থেকে ফোলারের হেড, পুম্পিদোর বাড়ানো হাতের সামনে থেকে। লিখেছেন মারাদোনা, ‘সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তবু, ওদের অবসন্ন পা–গুলো দেখে ভরসা পেয়ে সেন্টার স্পটে বল বসিয়ে সবাইকে চিৎকার করে বলেছিলাম, জিতব আমরাই। জিততেই হবে, ওরা আর পারছে না, শেষ চেষ্টা আর একবার,অতিরিক্ত সময়ের আগেই শেষ করব। নিজেদের অর্ধেই ছিলাম। মাথা তুলে দেখতে পাই বুরুচাগার সামনে সেই রাস্তা যেখান দিয়ে চলতে চলতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব! নিরাশ করেনি বুরু। ৬ মিনিট বাকি তখনও। বিলার্দো চেঁচাচ্ছে, দিয়েগো, ভালদানো, নেমে এসো, মার্ক করো। কোথায় কী! নামছিলাম ঠিকই, কিন্তু জানতাম, আর হবে না। রোমুয়ালদো আরপি ফিলোর বাঁশি, আজতেকায় আর্জেন্তিনীয়দের উল্লাস আর আমার কেঁদে ফেলা — সব একসঙ্গে!’

    পোস্ট স্ক্রিপ্ট

    ‘একার পায়ে বিশ্বকাপ জেতানো’-র প্রবল জনপ্রিয় কথাটার মধ্যে সত্যি কতটা, কতটাই বা ‘মিথ’?

    মারাদোনা নিজের দল সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘দল হিসেবে আমাদের টেকনিক ছিল, টেনাসিটিও। এক আর্জেন্তিনীয় সাংবাদিক ঠিকঠাক লিখেছিল, লাতিন আমেরিকার স্কিলের সঙ্গে ইউরোপের ছন্দ। লিবেরো ব্রাউন, দুই স্টপার রুজেরি ও কুকিউফো, সঙ্গে ওলারতিকোয়চিয়া, মাঝমাঠে গিউস্তি, পাসকুলি, বাতিস্তা, বুরুচাগারা ওপরে আমি আর ভালদানো। বুরুচাগা–এনরিকে ধরে রাখত ভারসাম্য। ট্যাকটিকালি পরিষ্কার, রক্ষণে বেশ ভাল, এই ছিল আমাদের দল।’

    ‘কী দল নিয়ে মারাদোনা বিশ্বকাপ জিতেছিলেন’, একই রকম জনপ্রিয় কথা। তবে ভিত্তি কতটা, জানা নেই এখানেও। মারাদোনার ওই কথাগুলোর সঙ্গে যোগ করতে হবে, নেরি পুম্পিদো গোলে। রুজেরি এবং ব্রাউনের দক্ষতার অর্ধেক নিয়েও যদি কোনও জুটি থাকত আর্জেন্তিনার ডিফেনসে পরবর্তীকালে, আরও বারদুয়েক বিশ্বকাপ হেসেখেলেই জিততে পারত আর্জেন্তিনা। বুরুচাগা খেলতেন ফ্রান্সের নানতেস–এ তখন, ভালদানো তো রেয়াল–কিংবদন্তীদের একজন। মারাদোনা ‘যে-রাস্তাটা’ দেখিয়ে দিয়েছিলেন বুরুচাগাকে, ফাইনালের ‘ফাইনাল’ গোলের সময়, বলটা পায়ে পেয়ে বুরুচাগাকে অন্তত ৩৫ গজ দৌড়তে হয়েছিল, ঘাড়ে হ্যান্স পিটার ব্রিজেলকে নিয়ে এবং একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতিতে সেই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক শুমাখারকে পরাস্ত করতেও হয়েছিল। কোনওভাবেই সেই গোলের পাসটি ‘পায়ে–পেয়ে–গোল–ছাড়া–আর–কিছু–করা–যাবে–না’ এই ক্যাটেগরির ‘অ্যাসিস্ট’-এ পড়ে না! কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে বেলজিয়াম ছিল প্রতিপক্ষ। গোটা বিশ্বকাপে তেমন শক্তির দলের বিরুদ্ধে খেলা বলতে গ্রুপ লিগে আগের বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি, যাদের শক্তিও কমে এসেছিল। সেই সময়ের সেরা দুটি দল প্লাতিনির ফ্রান্স বা জিকো–সোক্রাতেসের ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতেই হয়নি, এমনকি ‘ড্যানিশ ডাইনামাইটস’–ও নয়। এটা প্লাতিনি–জিকো–লাউড্রাপদের ব্যর্থতা, ঠিক। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল, তাই ইংরেজরাই লিখে লিখে শ্রেষ্ঠ বানিয়ে ফেলল! বিশ্বকাপের ইতিহাসেই পরে রোবের্তো বাজ্জিও (‌বনাম চেকোস্লোভাকিয়া ১৯৯০)‌ প্রায় একই রকম ও সৈদ আল ওয়াইরানের পায়ে (‌বনাম বেলজিয়াম ১৯৯৪)‌ ওই গোলের চেয়েও ভাল গোল দেখা গিয়েছে। কিন্তু কোনওটাই যেহেতু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে করা হয়নি, দুটি গোল সম্পর্কেই কোনও কথা শোনা যায় না কখনও!

    আর হ্যাঁ, ফাইনালেও ফেবারিট হিসেবেই শুরু করেছিল আর্জেন্তিনা। আমাদের বাঙালি ফুটবল–সমাজ এই ব্যাপারগুলোয় চিরকালই নীরব থেকেছে। সুভাষ ভৌমিক ছাড়া আর কোনও বাঙালি বিশেষজ্ঞকে এই প্রশ্নটাও করতে শুনিনি যে, ব্রাউন–রুজেরি–ভালদানো–বুরুচাগারা কোনও ফুটবলারই নয় যারা বলে তাদের কথা শোনার দরকারটাই বা কী?

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ওই বিশ্বকাপে বিলার্দো ৩-৫-২ ছক দিয়েছিলেন আর্জেন্তিনাকে, যা আলোচিতই হয় না বললে ঠিক হয়। মাঝমাঠে পাঁচজনকে তুলে দিয়ে রক্ষণে তিনজন, যে-কারণে তাঁর দলকে উইং ধরে আক্রমণ করলে সমস্যায় ফেলা যেত এবং ইংল্যান্ডের কোচ ববি রবসন করেওছিলেন তেমন। বেলজিয়ামের মতো মানসিক দিক দিয়ে গুটিয়ে থাকা দলের পক্ষে যা সম্ভব ছিল না। জার্মানিও ম্যাথাউসকে মার্কার করে ওই একই রাস্তায় হেঁটেছিল। পরে বন্ধনহীন ম্যাথাউস এবং দুটি গোল। বিলার্দো পইপই করে রুজেরিকে বুঝিয়েছিলেন, কর্নারের সময় কাকে মার্ক করতে হবে। এমনকি, ফাইনালের আগের রাতে তিনটের সময় নাকি ঘুম থেকে তুলেও জানতে চেয়েছিলেন। রুজেরির মুখে রুমেনিগে শুনে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যান তারপর। কিন্তু মাঠে রুজেরি তা আর করে দেখাতে পারেননি। তবে, বিলার্দোর ৩-৫-২ সেই সময়ের হিসাবে অবশ্যই এগিয়ে-থাকা ভাবনা, যার উপযোগিতা আজকে, এই ৩২ বছর পরও কমেনি। এমন ভাবনা এনে দিয়েছিলেন যিনি তাঁকে ভুলে যাওয়াও কি যায়!

    No comments