• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৭ /জুনে সোনা ফলতে শুরু ব্রাজিলে! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    [avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]

    হোয়াও কার্ভালেসের নাম বিশ্ব ফুটবল ইতিহাস কি কখনও ভুলবে?

    সুইডেনে বিশ্বকাপ খেলতে ব্রাজিল এসেছিল কোচ ভিসেন্তে ফিওলার সঙ্গে এক মনোবিজ্ঞানীকে নিয়ে। হ্যাঁ, তখনই। এবং তাঁর কাজের ধরণও ছিল অদ্ভুত। ফুটবলারদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে তাঁদের কথা শোনেননি, আলাদা আলাদা করে কারও সঙ্গে কথা বলাও তাঁর মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মধ্যে পড়েনি। শুধু ফুটবলারদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে ডেকে প্রত্যেককে একটি করে ছবি আঁকতে বলেছিলেন, মানুষের ছবি। কে কেমন মানুষ আঁকছে দেখে সেই ফুটবলারের মানসিক অবস্থার ছবি এঁকেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, ফরোয়ার্ডের ছবিতে থাকবে আগ্রাসী মনোভাব, রক্ষণের ফুটবলারদের ‘স্ট্রোকে’ থাকবে সতর্কতার প্রতিফলন।

    সেই কার্ভালেসের কাছে ফিওলা দলের সব ফুটবলারের মানসিক অবস্থার কথা জানতে চাওয়ায় দুজন ফুটবলার সম্পর্কে কার্ভালেসের মূল্যায়ণ ছিল এমন — প্রথম জন ‘বড্ড ছোট, শিশুসুলভ’, দ্বিতীয় জনকে ‘দলে নিলে বিপর্যয় হবে’।

    মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ সেদিন ভাগ্যিস ফুটবল–কোচ শোনেননি। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সেই দুজনের নাম, যথাক্রমে, পেলে এবং গারিনচা!

    শুধু, মনোবিজ্ঞানী দলের সঙ্গে আনাই নয়, ব্রাজিল সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছিল ফুটবলেরও সেবার, সিস্টেম বদলে। ১৯৫৪–তে হাঙ্গেরি ‘থার্ড ব্যাক’ থেকে এগিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা দেখিয়ে ছিল, ব্রাজিলের দক্ষ ফুটবলারদের পায়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল ৪–২–৪।

    জাকারিয়াসকে দিয়ে হাঙ্গেরি ঠিক সেই কাজই করিয়েছিল আগের বিশ্বকাপে। লেফট হাফকে সেন্টার হাফের পাশে রেখে রাইট হাফকে রাইট ব্যাক করে দেওয়া যাতে রক্ষণের কাজে সুবিধে হয়। দুপ্রান্তে আগুয়ান দুই উইঙ্গারকে আটকাতে দুই সাইড ব্যাক, স্ট্রাইকারদের জন্য মাঝেও দুই ডিফেন্ডার, ব্রাজিল ডিফেন্সে কে কাকে ধরবে, চিরন্তন সেই সমস্যার আদর্শ সমাধান। মাঝমাঠে দুজন বল কাড়বে, পাস বাড়াবে, ওপরে দুই উইঙ্গার মাঠের দুপ্রান্ত বরাবর উঠবে, সেন্টার করবে বা কাট করে ভেতরে ঢুকে আসবে প্রচণ্ড গতিতে, বক্সে তো দুই স্ট্রাইকার থাকছেই।

    এবং, হাঙ্গেরির মতোই এই ব্রাজিলীয় দলে এমন সব প্রতিভাবান, যাঁদের জন্য সিস্টেম পেতে পারে প্রয়োজনীয় রূপ, সিস্টেমের জন্য নিবেদিত–প্রাণ যে ফুটবলার–প্রজাতি উত্তর ইউরোপ দাপিয়ে বেড়ায় এখনও, তেমন নয়। নিলতন সানতোস, দিদি, ভাভা, জাগালো, জিতো, গারিনচা এবং অবশ্যই পেলে, সিস্টেম প্রাণ পায় যাঁদের পায়ে।

    প্রথম পর্ব

    ইংল্যান্ডের সমস্যা বাড়িয়েছিল মিউনিখের সেই দুর্ভাগ্যজনক বিমান–দুর্ঘটনা। এলিজাবেথান, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের বিমান সেই ফেব্রুয়ারির কুয়াশাঘেরা সকালে প্রয়োজনীয় উচ্চতায় ওঠার আগেই ধাক্কা খেয়েছিল রানওয়ের শেষ প্রান্তে থাকা এক বাড়ির দেওয়ালে। আয়ারল্যান্ড হারিয়েছিল জ্যাকি ব্যাঞ্চফ্লাওয়ার, তাঁদের অধিনায়ক ড্যানির ভাইকে। আর ইংল্যাড তিনজনকে — লেফট ব্যাক রজার বাইর্ন, সেন্টার ফরোয়ার্ড টমি টেলর এবং ২১–বছর বয়সী ডানকান এডোয়ার্ডস, বেঁচে থাকলে বেস্ট বা পেলের কাছাকাছি যেতেন বলে এখনও আক্ষেপ করেন ইংরেজরা।

    তবু, ব্রাজিলকে আটকে দিয়েছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপে সেই প্রথম ০–০, তিন কাঠির তলায় দুর্ভেদ্য গর্ডন ব্যাঙ্কস। পেলের অভিষেক তখনও হয়নি। আহত ছিলেন। ক্রিস ফ্রেডির মতে ইংল্যান্ড নেতিবাচক ফুটবল খেলেছিল এবং কৌশল হিসেবে ঠিক কারণ ব্রাজিলের ফুটবলাররা প্রতিভায় এত এগিয়ে যে ধ্বংসাত্মক না–খেললে আটকে রাখার কোনও উপায় আর ছিল না উইন্টারবটমের।

    ১৭ বছরের পেলে আর একুশের গারিনচা যাঁকে খেলানোর জন্য নিলতন সানতোসের নেতৃত্বে ফুটবলারদের এক ডেপুটেশন গিয়েছিল কোচের কাছে। ফিওলা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ অনুযায়ী গারিনচাকে খেলাতে প্রথমে সামান্য দ্বিধায় ছিলেন। ফুটবলারদের এমন অনুরোধ এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আটকে যাওয়ার পর আর অন্য কিছু ভাবতে পারেননি। ফলে সোভিয়েত রাশিয়া, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এবং প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলের বিরুদ্ধে আর কোনও ঝুঁকির রাস্তায় হাঁটতে চাননি ফিওলা। তাই কিংবদন্তী লেভ ইয়াসিনের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে অভিষেক ব্রাজিলের জোড়া ফলার — পেলে, গারিনচা ১৫ জুন, ১৯৫৮, গোটেনবার্গে।

    এবং, কী অভিষেক! প্রথম মিনিটে গারিনচার শট বারে, দ্বিতীয় মিনিটে পেলের! তৃতীয় মিনিটে ভাভার গোল, দিদির ফ্লিক থেকে বল পেয়ে। পরে ৭৭ মিনিটে আবার ভাভার গোল। ব্রাজিল শেষ আটে।

    চমকে দিচ্ছিল ফ্রান্স। আলবের বাতুর প্রশিক্ষণে, রেয়াল মাদ্রিদ থেকে প্রায় জোর করে রেমঁদ কোপাকে ছাড়িয়ে এনে, জুস্ত ফঁতেকে কোপার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে। পারাগুয়েকে ৭–৩ হারিয়ে শুরু, ফঁতের হ্যাটট্রিক। পরের ম্যাচে যুগোশ্লাভিয়ার কাছে ২–৩ হার, আবার ফঁতের দুগোল, স্কটল্যান্ডকে কোপা আর ফঁতের গোলে ২–১ হারিয়ে শেষ আটে। পুসকাস–ককসিসকে হারিয়ে হাঙ্গেরি আর আগের হাঙ্গেরি ছিল না। আর্জেন্তিনা বহু বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এলেও চেকোস্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে ড্র হলেই প্লে–অফ খেলতে পারবে এমন অবস্থায় খেলতে নেমে হারে ১–৬। ‘সেসে উলকো’ অর্থাৎ রাস্তার ফুটবলের ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ ট্যাকটিক্সে ছোট পাসের খেলায় অসম্ভব গতি সঞ্চার করে আর্জেন্তিনার তখনকার ধীর গতির ফুটবলকে মাঠের এপ্রান্ত–ওপ্রান্ত ছুটিয়ে বেদম করে দিয়ে ছিল চেকরা।

    কোয়ার্টার ফাইনাল

    আয়োজক সুইডিশরাও এগিয়েছিল, তবে প্রত্যাশা বিরাট ছিল না। সুইডিশ ফুটবল সংস্থা ভাল করেছিল নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ বলে পেশাদার ফুটবলারদের দলে ফিরিয়ে এনে। এসি মিলান থেকে এসেছিলেন গুনার গ্রেন, গুনার নোর্ডাল এবং নিলস লিয়েডহোম। শেষ আটে সোভিয়েত রাশিয়াকে ২–০ হারিয়ে সেমিফাইনালে গেল যখন সুইডেন, নড়েচড়ে বসেছিল ফুটবল–বিশ্ব।

    ফঁতেকে আটকে রাখা যাচ্ছিল না কোনওভাবেই। উত্তর আয়ারল্যান্ডকে ঘিরে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আশার সমাধি ফ্রান্সের কাছে, ৪–০! ফঁতের দুগোল আবার, সঙ্গে উইসনিয়েসকি এবং পিয়ানতোনি। ফ্রিটজ ওয়াল্টার সেবারও পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক। উয়ে সিলার এসে গিয়েছেন, রান আছেন, তাঁরা যুগোস্লাভিয়াকে রানের গোলে হারিয়ে শেষ চারে পৌঁছনোয় খুব অবাক হননি কেউই।

    ব্রাজিলকে বরঞ্চ চমকে দিয়েছিন ওয়েলসের গোলরক্ষক কেলসি। ইংরেজ লেখকরাই লিখেছেন, ম্যাচে একবারই সুযোগ পেয়েছিল ওয়েলস, ওয়েবস্টার সেই সুযোগ হারানোর পর মাঠে লড়াই ব্রাজিল বনাম কেলসি। মরণপণ কেলসিকে যখন আর কিছুতেই হারানো যাচ্ছে না, বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার হতে–চলা ১৭ বছরের পা থেকে বেরল তেমন কিছু যার জন্য আজও তাঁকে যাঁরা দেখেছেন, অন্য কারও দিকে তাকানোর কথা ভাবতেই চান না।

    ম্যাচের ৭৩ মিনিট, দিদির হেড থেকে বল পেলেন পেলে নিজের বুকে, ছোট্ট ফ্লিকে ডিফেন্ডার কেটে গেল, আট গজ থেকে জোরালো শট যা উইলিয়মসের পায়ে লেগে গেলেও অত কাছে থেকে নেওয়া শট আটকাতে যথেষ্ট নয়। বিশ্বকাপে প্রথম গোল পেলের, নিজের দ্বিতীয় ম্যাচে এবং সেই গোলই ব্রাজিলকে নিয়ে গিয়েছিল শেষ চারে। পেলে তাই আজও স্বীকার করেন, জীবনের অন্যতম সেরা তো বটেই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওয়েলসের বিরুদ্ধে সেই গোল।

    সেমিফাইনাল

    [caption id="attachment_4273" align="alignleft" width="1536"] জুস্ত ফঁতে। এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের রেকর্ড তাঁর, যা সম্ভবত থেকে যাবে আজীবন[/caption]

    ব্রাজিল–ফ্রান্স মানে স্কিলের শেষ কথা। স্টকহোমের দর্শকরা অন্য সেমিফাইনালে দেশের খেলা থাকা সত্ত্বেও খুব মন খারাপ করেননি। কোপা–ফঁতে–পিয়ানতোনির বিরুদ্ধে পেলে–দিদি–ভাভা–গারিনচা, জিভে জল–আনা খেলা। ক’গোল হতে পারে, ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারলে পুরস্কার দেওয়াই যেত!

    প্রত্যাশামতোই শুরু। গারিনচা–পেলে হয়ে দিদির ক্রসে ভাভার গোল দু’মিনিটে। সাত মিনিট পর কোপার থ্রু ধরে ফঁতের গোল শোধ। ভাভার সঙ্গে সংঘর্ষে জঁকে ৩৫ মিনিটে চোট পেয়ে ম্যাচের বাকি সময়ের জন্য দর্শক হয়ে যাওয়ায় গোটা ফ্রান্সের ছন্দপতন, ৩৯ মিনিটে দিদির গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে শুধু পেলে। ৫২, ৬৪ এবং ৭৫ মিনিটে হ্যাটট্রিক, বিশ্বকাপে সবচেয়ে কমবয়সী হিসেবে যে রেকর্ড আজও অক্ষত। ব্রায়ান গ্ল্যানভিলের লেখায় সতেরর পেলে সম্পর্কে কয়েক লাইন — Five feet eight inches tall, weighing some ten and a half stone, superbly muscled, he was at this stage a goal-scorer par excellence, gymnastically agile and resilient, a tantalising juggler of the ball, a fine right-footed shot with the ability to climb and head like a Lawton. Above all his temperament was extraordinary, his coolness in the thick of the battle, the most tense and dramatic situations, uncanny.

    অন্য সেমিফাইনালে সুইডিশরা যেন জার্মানদের থেকেও বেশি দেশপ্রেমী। খেলা শুরুর আগে নিজেদের দর্শকদের নিয়ে মাঠের মাঝে গান–বাজনা, গ্যালারি জুড়ে জাতীয় সঙ্গীত, জার্মান ফুটবল সংস্থার সভাপতি তো তাঁর কয়েক সঙ্গীর বসার ব্যবস্থা ঠিকমতো না হলে ম্যাচ বয়কটের হুমকি পর্যন্ত দিয়ে রেখেছিলেন! গতবারের চ্যাম্পিয়নরা শেষ পর্যন্ত আর তাল মেলাতে পারেনি, হারে ১–৩। আয়োজকরা আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে, ১৯৩৮–এ ফ্রান্স এবং ১৯৫৪–র সুইটজারল্যান্ড ছাড়া যে ধারা বিশ্বকাপে চলছিল তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতি রেখেই।

    ফাইনাল

    পশ্চিম জার্মানিকে তৃতীয় স্থানের খেলায় ফঁতে একা শেষ করে দেন ৪ গোল করে। ৬–৩, ফ্রান্সও এত দূর ভাবেনি। ১৩ গোল প্রতিযোগিতায় ফঁতের, আজও রেকর্ড এবং অন্য অনেক রেকর্ড ভাঙলেও ভবিষ্যতে এই রেকর্ড ভাঙা কঠিন। এখন এক বিশ্বকাপে একার গোলসংখ্যা দু’অঙ্কে পৌঁছনোই কঠিন, ১৪ গোল অভাবনীয়।

    ফাইনালে ব্রাজিল আর কোনওভাবে সুযোগ দিতে চায়নি। ফিওলার প্রথম একাদশে প্রথম বারের জন্য জায়গা হল জালমা সানতোসের। বিরাট চেহারার জালমার কাজ ছিল ভাই নিলতন এবং জিতোর সঙ্গে সুইডেনের সব আক্রমণ প্রতিহত করা। দক্ষতার সঙ্গে ধ্বংস করেছিলেন তাঁরা। সৃষ্টি নিয়ে ভাবার কাজ তো ছিল পেলের!

    ফাইনালে দু’গোল। প্রথমে নিলতনের ক্রস বুক থেকে উরুতে নিয়ে গুস্তাভসনের মাথার ওপর দিয়ে তুলে পড়তি বলে ভলি। শেষে, জাগাওকে ব্যাকহিল করে দুই ডিফেন্ডারের মাঝে পৌঁছে হেড। শুরুতে ভাভার দু’গোল আর পেলের দুই গোলের মাঝে জাগাও–‌র — ফাইনালে ৫–২ ফলও আর কখনও হবে কি?

    দশ বছর আগের রাত তখন মনের ভেতর, সেই প্রত্যেক ছাদ থেকে ভেসে আসা কান্নার শব্দ, বাবাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, আধুনিক ফুটবলের আগমন–বার্তা ঘোষণা করে ব্রাজিলকে প্রথম বারের জন্য সোনার পরী এনে দিয়ে মাঠে তাই শিশুর মতো কাঁদছিল সেই সতেরো বছর। সেই চোখের জলের ছোঁয়া পেয়ে আরও পবিত্র হয়েছিল ফুটবল।

    আর অন্য কোনও বারের মতো শ্রেষ্ঠ দলের হাতেই বিশ্বসেরার খেতাব  উঠেছে কিনা নিয়ে এবার অন্তত কোনও সন্দেহ ছিল না কারও!

    (আগামিকাল ১৯৬২ চিলে)

    No comments