• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৫ /‌ মারাকানায় সূর্যাস্ত ব্রাজিলের /‌ কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    কতটা অদূরদর্শী হলে বিশ্বকাপ ফুটবলে যাওয়ার আমন্ত্রণও অবহেলায় উপেক্ষা করা যেতে পারে, ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্তা না হলে বোঝা যায় না!

    সেবার বিশ্বকাপে নক আউট ছিল না। আগের দুই বিশ্বকাপে নক আউট নিয়মে খেলা হওয়ায় ইউরোপের দেশে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিকে একটি ম্যাচ খেলে হেরেই ফিরে আসতে হয়েছিল। ব্রাজিল জুড়ে কথা ওঠে। এবং শেষে গোটা প্রতিযোগিতাই লিগ প্রথায় খেলা হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় হাজির থাকলে তাই অন্তত দুটি ম্যাচ খেলতেই পারত ভারত।

    বিশ্বকাপের জন্য ফিফার আমন্ত্রণ পাওয়া দেশ ভারত। ভাবলে গর্ব হতে পারে কিন্তু, ওই পর্যন্তই। ডাক পেয়েও যায়নি ভারত, ১৯৫০ বিশ্বকাপে, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। 

    ব্রাজিলের প্রেক্ষাপট 

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হাড়–হিম করে দিতে যথেষ্ট। ইউরোপ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়া যেভাবে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছিল, দক্ষিণ আমেরিকা অবশ্য ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাই ১৯৪৬ ফিফা কংগ্রেস লুক্সেমবুর্গে সিদ্ধান্ত হয়, বিশ্বকাপ হবে ব্রাজিলে।

    ফিফার সভায় সহ–সভাপতি বিশেষভাবে সংবর্ধিত হবেন, আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু, ইতালীয় ড. ওত্তোরিনো বারাসিকে প্রত্যেক সদস্য কুর্নিশ করেছিল অন্য কারণে— বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নিজের শোওয়ার ঘরের খাটের নিচে এক পুরনো জুতোর বাক্সে বিশ্বকাপ রেখে দিয়েছিলেন, চুরি হয়নি সেই সোনার পরী। ব্রাজিল থেকেই যে কাপের নাম পাল্টে হয়ে যায় জুলে রিমে কাপ, ফিফা–সভাপতির নামে।

    সেই ১৯৪৬ সালেই ফিফায় ফিরে এসেছিল ইংল্যান্ড। প্রাথমিক পর্বে তখনকার হিসেবে ঠিকঠাক বিচারেই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ থেকে দুটি দলকে বিশ্বকাপের জন্য ছাড়পত্র দিয়েছিল ফিফা। স্কটল্যান্ড ঘোষণা করে, চার দলের মধ্যে থেকে তাঁরা শীর্ষস্থানে না–থাকলে বিশ্বকাপে খেলতে যাবে না। ইংল্যান্ড তাঁদের ১–০ হারানোর পর তাঁরা অটল থাকে আগের সিদ্ধান্তে। অনেক অনুরোধ–উপরোধ সত্ত্বেও।

    আসলে ব্রাজিল বিশ্বকাপে এই যাব–কি–যাব–না দ্বিধায় ভুগেছিল বহু দেশ। আর্জেন্তিনার সঙ্গে ব্রাজিলের যুদ্ধ তো বহুদিনের। তাই ১৯৩৮ বিশ্বকাপের পর ঘরের পাশের বিশ্বকাপেও তারা আসেনি। চেকোস্লোভাকিয়ার কারণ ছিল, বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে তখন দেশ নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল। অস্ট্রিয়ারও এক অবস্থা। হাঙ্গেরি, রাশিয়া আসেনি, জার্মানির সদস্য পদ বাতিল করে দিয়েছিল ফিফা। সবচেয়ে সমস্যা হয়েছিল ফ্রান্সকে নিয়ে। প্রথমে যুগোস্লাভিয়ার কাছে হেরে ফ্রান্স মূলপর্বে যাওয়ার যোগ্যতার্জন করেনি। কিন্তু, তুরস্ক আসবে না জানানোর পর ডাকা হয়েছিল। উরুগুয়ে এবং বলিভিয়ার সঙ্গে এক গ্রুপে থাকায় ফ্রান্সকে গ্রুপ লিগের দুটি ম্যাচ খেলতে যেতে হত দু’‌হাজার মাইলের তফাতে থাকা পোর্তো আলেগ্রে থেকে রেসিফে–তে। ফ্রান্স ফুটবল সংস্থা প্রতিবাদে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দিলেও ব্রাজিল ফুটবল সংস্থা মানেনি। ফলে তাঁদের সভাপতির নামে বিশ্বকাপের নাম হল যে বার, ফ্রান্স সেবারই অনুপস্থিত! 

    প্রথম পর্ব 

    ১৩ দল বিভক্ত চার গ্রুপে। উরুগুয়ের গ্রুপে শুধু বলিভিয়া। ৮–০ জিতে বিশ্বকাপে ফিরে–আসা ১৯৩০–এর চ্যাম্পিয়নদের, দ্বিতীয় বিশ্বকাপে। দু’বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালির অবশ্য কিছুই ছিল না। সুপেরগার দুঃসহ বিমান দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল তাদের প্রথম দলের আটজনকে। সুইডেনের কাছে হারের পর খেতাব ধরে রাখার সুযোগ পাওয়া কঠিন। পারাগুয়েকে ২–০ হারালেও সুইডেন ম্যাচের ফলই শেষ পর্যন্ত বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    চার দলের দুই গ্রুপের একটিতে ছিল ব্রাজিল, যুগোস্লাভিয়া, সুইজারল্যান্ড, মেহিকো; অন্যটিতে ইংল্যান্ড, স্পেন, চিলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    চিলেকে ২–০ হারিয়ে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু। এবং, চিরকাল যা হয়ে এসেছে, ইংল্যান্ডের মাতব্বর নির্বাচক আর্থার ড্রিউরি পরের ম্যাচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জয়ী দল বদলানোর বিপক্ষে মত দেওয়ায় স্ট্যানলি ম্যাথুজ দ্বিতীয় ম্যাচেও মাঠের বাইরে। তিনি থাকলেই ইংল্যান্ড জিতত কিনা, তর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু, না–থাকায় ভেদশক্তি কমেছিল অবশ্যই। সে যতই স্যার স্ট্যানলির বয়স ৩৫ হোক না কেন।

    আসলে ওয়াল্টার উইন্টারবটমের ইংল্যান্ড তো প্রথমে বিশ্বকাপের নির্বাচিত দলেই রাখেনি স্ট্যানলিকে। পরে যখন কানাডায় গিয়ে দুর্দান্ত খেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোয় মূল ভূমিকা নেন, ইংরেজ কাগজে মুণ্ডপাত এফএ–র, বাধ্য হয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে টেলিগ্রাম যায় স্ট্যানলির বাড়ি। এবং, নিজের প্রথম বিশ্বকাপে স্ট্যানলি ম্যাথুজকে বিদায় নিতে হয় একটি ড্র ম্যাচ খেলে।

    তখন সত্যিই ভাবা যায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হারিয়ে দিতে পারে ইংল্যান্ডকে। অথবা, ইংরেজ প্রচারমাধ্যমের প্রচারের যা জোর, ভাবতে বাধ্যই করা হয়েছিল যে, ইংল্যান্ড খেলতে গেলেই ড্যাং ড্যাং করে বিশ্বকাপ জিতে বাড়ি চলে আসবে!‌ বার, পোস্ট, গোলরক্ষক এবং ভাগ্য, সে দিন ইংল্যান্ডের হারের কারণ হিসাবে উঠে এসেছে সব ইংরেজ লেখকের কলমে, পরে। নিজেদের হারকে বিরাট করে দেখানোর চিরকালীন ইংরেজ চেষ্টায় সেই হার নাকি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটন, ইংরেজরা বলে চলেছেন, এখনও।

    স্ট্যানলি ম্যাথুজের আত্মজীবনী ‘দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ’–এ বিশ্বকাপ সম্পর্কিত অনুচ্ছেদের শিরোনাম, ‘ওয়ার্ল্ড কাপ লেসনস আনলার্নড’। মুগ্ধতা, মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে প্রথম খেলতে দেখা। এবং উপলব্ধি, ফুটবল মাঠে এমন দেখিনি কখনও!

    সরাসরি তাঁরই ভাষায়, ‘The game was a fascinating spectacle. For me, the interest lay with the Brazillians and how they played the game. Breathtaking skill on the ball coupled with precise passing and explosive shooting. It was evident from watching Brazil and later in the tournament, Uruguay that many of the competing teams had made tremendous progress in footballing terms. Brazil played a game that was fast and accurate with an inordinate amount of skill. Although attacking football was the order of the day in England, the fluidity with which Brazil took the game to opponents had a controlled grace and style about it I had not seen before. In England, teams loved to attack but in comparison to the Brazilians, our style came across predominantly as hell-for-leather running and chasing.’

    কী অদ্ভুত সত্যি আজও! এখনও জেরার্ড–ল্যাম্পার্ডরা সেই বলের লক্ষ্যে ‘দৌড়’ আর বলকে ‘তাড়া’ করার খেলায়ই মেতে রয়েছেন, এখনও বলকে তঁাঁদের বন্ধু করে উঠতে পারেননি! 

    দ্বিতীয় পর্ব 

    ব্রাজিল তখন অপ্রতিরোধ্য। নিজের দেশে বিশ্বকাপ জিততে মরিয়া। ২ লাখ দর্শকাসন বিশিষ্ট মারাকানা স্টেডিয়াম তৈরি করে সেই স্টেডিয়ামে সোনার পরী হাতে নিতে সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবল খেলছে, উড়ে যাচ্ছে বিপক্ষ।

    আগের দুই বিশ্বকাপের নক আউট পর্ব নিয়ে এতই বীতশ্রদ্ধ ছিল ব্রাজিল যে, চার গ্রুপের সেরাদের নিয়ে আবার লিগ প্রথায় খেলার ব্যবস্থা রেখেছিল দ্বিতীয় পর্বেও। সুইডেন এবং স্পেন প্রথম দুই বিপক্ষ স্রেফ মুগ্ধ হয়ে দেখল যথাক্রমে ৭–১ এবং ৬–১ হার। মনে রাখবেন, সুইডেন হারিয়ে এসেছিল ইতালিকে, স্পেনের গ্রুপে ছিল ইংল্যান্ড। এবং তখনও সুইডেন, স্পেন ফুটবলে বড় শক্তি।

    সেই ফরাসি সাংবাদিক ইমানুয়েল গাম্বার্দেয়ার কথা আবার মনে পড়তে বাধ্য। সেই বড় শক্তির দুই দেশকে পরিসংখ্যানে পরিণত করে দেওয়া ব্রাজিল দলে ছিলেন আদেমির–জিজিনিও–জেয়ার ত্রয়ী। বাউয়ার, ফ্রিয়াকা, চিকো, মানেকা। ভবিষ্যতের ফুটবল। অকল্পনীয় ফুটবল। গ্ল্যানভিলের কথায়, ‘ট্যাকটিকালি সাধারণ, টেকনিকালি অসাধারণ’। ফুটবল শিল্পের প্রদর্শনী। স্ট্যানলি ম্যাথুজ যা দেখার জন্য থেকে যেতে চেয়েছিলেন ব্রাজিলেই, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও! 

    ব্রাজিলের ‘হিরোশিমা’! 
    Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.

    - Percy Bysshe Shelley

    আনদ্রাদে–ভারেলার প্রাণপণ লড়াই সেই ব্রাজিলকে আটকাতে। কালো আনদ্রাদের ফাইনাল ট্যাকলে কতবার নিশ্চিত পতন রোধ দলের। আর সিয়াফিনো–ঘিজিয়ার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দুই গোল, ফ্রিয়াকার গোলে পিছিয়ে পড়ার পর। আসলে প্রথমার্ধে আর গোল হয়নি, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব্রাজিল যখন গোল পেয়েছিল, উরুগুয়ে তখন দমে যায়নি। বুঝতে পেরে গিয়েছিল, এতক্ষণ যদি আটকে রাখা যায়, তাহলে বোধহয় জেতাও যায়।

    তাই জীবনের সেরা ম্যাচ খেলে ফেলেন মাস্পোলি, উরুগুয়ের গোলরক্ষক, প্রথমার্ধ থেকেই যিনি একের পরে এক গোল বাঁচিয়ে হতাশার মাত্রা এমনই বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রাজিলীয়দের যে, গোলশোধের সেন্টার হওয়ার সময় থেকেই কেমন যেন ম্রিয়মান মনে হচ্ছিল ব্রাজিলীয়দের।

    খেলা শেষে মারকানায় শ্মশানের নীরবতা। ড্র করলেই ট্রফি যেখানে ব্রাজিলের, উরুগুয়ে ছিনিয়ে নিয়ে গেল সোনার পরী, ব্রাজিল ও লজ্জা লুকোবে কোথায়! তাই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান পর্যন্ত হয়নি, জুলে রিমে নিজ নেমে গিয়ে উরুগুয়ের অধিনায়কের হাতে তুলে দিয়ে এসেছিলেন সেই সোনার পরীকে।

    উরুগুয়ের আলসিদেস ঘিজিয়া যেন মেঘনাদ। তাঁর নিক্ষিপ্ত শক্তিশেলে আজও অচৈতন্য লক্ষ্মণ–ব্রাজিল, ৬৮ বর্ষপূর্তিতেও! ব্রাজিলের ফুটবল রক্তাক্ত ছিল মারাকানাজো–য়, আজও আছে। এমন শোক যা ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলো ওরিজোন্তে–‌র ১–‌৭ সেমিফাইনাল হারও ভোলাতে পারেনি।

    হারতে হয়েছিল এক প্রতিবেশি দেশ উরুগুয়ের কাছে। চূড়ান্ত হতাশ দেশের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতোই ব্রাজিলীয়দের কাছে ওই হাড়–জ্বালানো ‘মারাকানাজো’ নামটাকেও জড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ‘মারাকানাজো’ নামটা কাদের দেওয়া জানেন? কাদের আবার, আর এক প্রতিবেশি এবং চিরশত্রু আর্জেন্তিনার! তাঁরাই বা সনাতন শত্রুদের চিরকালের মতো বিদ্রুপ করার এমন ‘সোনার’ সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন?

    ব্রাজিলীয় লেখক নেলসন রদরিগেজ লিখেছিলেন, ‘প্রতিটি দেশেরই জাতীয় বিপর্যয় বলে চিহ্নিত থাকে কোনও একটি ট্রাজেডি। যেমন হিরোশিমা। ব্রাজিলের ‘হিরোশিমা’ হল উরুগুয়ের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ১৯৫০ সালে।’ খেলা শেষ হওয়ার ১২ মিনিট আগে ঘিজিয়ার গোল, শ্মশান তখন ১ লক্ষ ৭৮ হাজারের মারাকানাসহ গোটা ব্রাজিল। এই মারাকানাকেই সর্ববৃহৎ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশ্বকাপের জন্য। ফাইনালে জয় ‘নিশ্চিত’ জেনেই একটি আসনও খালি পাওয়া যায়নি।

    হুলিও পেরেজ, সেই উরুগুয়ে দলের সদস্য, খেলা শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল যখন, প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছিলেন! ‘লজ্জিত নই সে জন্য’ বলেওছিলেন পরে। কিন্তু, ঘিজিয়ার সেই গোল স্তব্ধ করে দিয়েছিল এমনভাবে, পরে ব্রাজিলীয়রাই সমালোচনা করেছেন, ‘যখন সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল মারাকানাকে, তখনই চুপ করে গিয়েছিল মারাকানা।’ ঘিজিয়ার ঐতিহাসিক উক্তিও স্মরণীয়, ‘মাত্র তিনজনই পেরেছিল মারাকানাকে চুপ করিয়ে দিতে, এক সেকেন্ডে — ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পোপ দ্বিতীয় জন পল আর আমি!’

    ৫০ বছর তাঁর আর পা পরেনি ব্রাজিলে। ২০০০ সালে ডেকে পাঠিয়েছিল ব্রাজিল সরকার, সংবর্ধনা দিতে। রিও বিমানবন্দরে নেমেছেন ঘিজিয়া। পাসপোর্ট এগিয়ে দিলেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। উল্টোদিকে বছর পঁচিশের তরুণী। কথোপকথন এগোল —

    তরুণী: (‌পাসপোর্টে নামটা পড়ে)‌ আপনিই কি সেই ‘দ্য ঘিজিয়া’?

    ঘিজিয়া: (‌অবাক)‌ হ্যাঁ, আমিই। কিন্তু, ১৯৫০ তো অনেক দিন আগের ব্যাপার, তোমার তো জানার কথা নয় গো সুন্দরী!

    তরুণী: (‌নিজের বুকে হাত রেখে)‌ আমরা ব্রাজিলীয়রা আজও সেই ব্যথা অনুভব করি বুকের ভেতর, রোজ!

    ঘিজিয়া: জানো, মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয় আমি বোধহয় ব্রাজিলের প্রেতাত্মা! প্রতিটি ব্রাজিলীয়র স্মৃতিতে অবিনশ্বর!

    কী কী হয়েছে ব্রাজিলের ‘হিরোশিমা’ নিয়ে, বলার চেয়ে সহজ কী কী হয়নি! লেখা, ছবি, ডকুমেন্টারি। আলোচনা আজও চলছে। ভুলতে দেওয়া হয়নি সেই ‘হার’। মারাকানা জাদুঘরে এখনও সেই গোলের রানিং কমেন্ট্র দেন ‘গাইড’রা। ‘‘দ্বিতীয়ার্ধের ৩৩ মিনিট খেলা হয়ে গিয়েছে। ১–১, বিশ্বজয়ী হতে আর ১২ মিনিট মাত্র। ঘিজিয়া এগোলেন, শট নিলেন গোলে, ওই দেখুন বারবোসা পরাস্ত, গোল। দক্ষিণ আমেরিকায় গোল মানেই উৎসব। কমেন্টেটরদের শুনবেন, কখনও গোল বলেন না, চিৎকার করেন ‘গোওওওওওওওওওওওওল’। সেবার আর হল না। উল্টে স্বরে অবিশ্বাস। ‘গোলটা কি সত্যিই হল? ব্রাজিল কি পিছিয়ে পড়ল আবার? হ্যাঁ, হল’, বলে নিজেরাই যেন সান্ত্বনা দিলেন নিজেদের। কিন্তু পারলেন কি? ওই তো বারবোসা জালের ভেতর থেকে কুড়িয়ে আনছেন বল। মারাকানা শোকে পাথর’’, একটানা বলে চলেন গাইড। বলতে বলতে যেন জল চলে আসে তাঁর পেশাদার চোখেও। তিনিও যে শরিক সেই জাতীয় বিপর্যয়ের। তাঁরও ভাঙা–মন জোড়া লাগেনি পরে পাঁচ–পাঁচটা বিশ্বকাপ পাওয়ার আনন্দেও। অপ্রাপ্তির বেদনা ছাড়িয়ে গিয়েছে প্রাপ্তির আনন্দ। আজও তাই সে কাঁদছে, কেঁদেই চলেছে।

    সত্তরের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল চিরকালের জন্য ঘরে এনেছিল সোনার পরী জুলে রিমে ট্রফি। শুধু ব্রাজিলেরই সর্বকালের সেরা নয়, বিশ্বেরও সর্বকালের অন্যতম সেরা সেই দল। তাঁদের সাফল্য নিয়ে যে–বইটি লেখা হয়েছে, ইংল্যান্ডে। বইটা নাকি পাওয়াই যায় না ব্রাজিলে, অনূদিত হয়নি পর্তুগিজে। অথচ, বিরাশির ব্রাজিলকে নিয়ে বেশ কিছু বই প্রকাশিত। আর, অগুনতি বই রয়েছে বাজারে, মারাকানাজো বিষয়ে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি–হওয়া বইগুলোর একটা পাওলো পেরদিগাওয়ের ‘অ্যানাটমি অব এ ডিফিট’।  হোয়াও লুইজ, সাংবাদিক ও ভাষ্যকার দুটি কাজ করেছিলেন। এত অবাস্তব কিছু সত্যিই ঘটেছিল বা ঘটাতে পারেন কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ, মেনে নেওয়া কঠিন!

    এক, ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল–উরুগুয়ে খেলার দিন সকালে রিওতে অবস্থিত উরুগুয়ে এমব্যাসিতে টেলিফোন করেছিলেন, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে। জেনে নিয়েছিলেন উরুগুয়ের অ্যাম্বাসাডর–এর টেলিফোন নম্বর, খেলা শেষ হবে যখন তাঁকে কোথায় পাওয়া যাবে জানতে চেয়ে। মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিলেন কী করবেন। ব্রাজিল ৩–১ জেতার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফন করে তুমুল গালাগালি দিয়েছিলেন সেই অ্যাম্বাসাডরকে। পরে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন। ‘উচিত হয়নি। ওঁকে গালাগাল করে তো আর ইতিহাস বদলাতে পারব না। আমার দুঃখও কমেনি একফোঁটা। শুধু শুধু ওঁকে বিব্রত করেছিলাম।’

    দ্বিতীয় কাণ্ডটি? আরও অভিনব। পাল্টে দিয়েছিলেন ১৯৫০ ম্যাচের ভিডিও, নিজের তৈরি নতুন তথ্যচিত্রে!

    ‘ঘিজিয়া দৌড়ে আসছে, গোলে শট নিচ্ছে, ছিল টেপ–এ। বলটা ঠিক কোথায় যাচ্ছে, পরিষ্কার নয় তখনকার ক্যামেরায়। শট নেওয়ার পর ওই টেপ–টাকেই পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলাম যাতে মনে হয় বলটা পোস্টে লেগে ফিরে আসছে। সঙ্গে, সেই অভিশপ্ত ম্যাচের ধারাভাষ্যকার লুইজ মেন্দেজ–কে দিয়ে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলাম তিনটি শব্দ — ‘শ্যুটস দ্য পোস্ট’!  লুইজ রাজি হয়েছিলেন বলতে, প্রস্তাবটা মেনে নিয়েছিলেন মজা হিসেবেই। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে জিজিনিওর গোলের টেপ–টায় অন্য কারও ছবি ছিল না। ওটাই হয়ে যায় আমার বিশ্বকাপ জয়ের গোল। আর, উরুগুয়ের ফুটবলাররাই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল আমার, খেলা শেষে কান্নায় ভেঙে পড়ে! হেরো দল তো কাঁদবেই, তাই না?’



    কিন্তু, ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার এমন উদ্যোগ কেন?

    আলেক্স বেয়োসকে বলেছিলেন হোয়াও, ‘১৯৫০ বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় আমার বয়স ১১। মারাকানায় যে দিকে বসেছিলাম, উরুগুয়ের দুটো গোলই হয়েছিল আমার চোখের সামনে। কী করে ভুলি সেই দুঃখ, হতাশা, অভিশাপ? তাই ওটা আমাকে পাল্টাতেই হত, যে ভাবেই হোক!’

    দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি অপরাধী ছিলেন গোলরক্ষক বারবোসা। এপ্রিল ২০০০, মানে প্রায় ৫০ বছর পর তাঁকে দেখিয়ে একটি শপিং মলে এক মা তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, ‘একে চিনে রাখো, একা গোটা দেশকে কাঁদিয়েছিল।’ শুনে বারবোসা বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে কোনও অপরাধের জন্য সবচেয়ে বেশি শাস্তি ৩০ বছরের কারাবাস। আমার তো ৫০ পেরিয়েও মুক্তি নেই!’

    সেই বারবোসাও ১৯৬৩ সালে, নিজের বাড়িতে যা করেছিলেন, ইতিহাসে দ্বিতীয় নিদর্শন নেই। বারবিকিউতে ডেকেছিলেন বন্ধুদের। আগুন জ্বালানো হয়েছিল। সাধারণ কাঠ দিয়ে নয়, মারাকানার ‘পোস্ট’ জ্বালিয়ে। তাই ‘সেলিব্রেট’ করতে ডেকেছিলেন সতীর্থদের। আর বলেছিলেন, ‘ওই পোড়াকাঠ ভিনিগারে ভিজিয়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে খেলে মনে হত যেন ঘিজিয়ার সেই পা–টাই খাচ্ছি, গোল দেওয়ার পর যে পা–টা নাচিয়েছিল আমাদের চোখের সামনে।’

    এমনও ঘটে, বাস্তবে? ঘটে বলেই তো ব্রাজিল!

    আসলে, কতটা গভীরে পৌঁছলে একটা ম্যাচের হার নিয়ে এভাবে গোটা জাতি ৬৮ বছর ধরে বিলাপ করে, অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করে, বোধহয় কোনও দিনই ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারা সম্ভব নয়। বুঝলে কি আর সেই ১৯৫০ বিশ্বকাপেই ডাক পেয়েও খেলতে যায়নি ভারত?

    আর, ১৯৫০–এ, মারাকানা থেকে বহু দূরের এক বাড়ির ছাদে উঠেছিল কান্নার রোল। একটা বাড়িতে বলা ভুল, গোটা দেশ জুড়ে, সব বাড়িতেই। শুধু, সেই বিশেষ বাড়ির দশ বছরের ছেলেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না, বাবা–কাকারা কেন এমন অঝোরে কাঁদছিল, কেনই বা পাশের এবং তার পাশের বাড়িতে, গোটা পাড়ায় উঠেছিল কান্নার রোল, কী বা কে হারিয়েছিল তাঁদের। শুধু, আপনজনদের কাঁদতে দেখে সে–ও কাঁদছিল। বাবা তাকে বলেছিল, এ কান্না সোনার পরী হারানোর কান্না, এ কান্না বিশ্বের দরবারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের শেষ লড়াইতে হারার কান্না, আত্মীয় বিয়োগের চেয়েও যা নাকি বহুগুণ বড়।

    খুব বেশি কিছু বোঝেনি সেদিন সেই ‘দশ বছর’। শুধু, আশ্বস্ত করেছিল বাবাকে কাঁদতে কাঁদতেই, ‘সোনার পরীর জন্য কেঁদো না, বড় হয়ে আমি এনে দেব সোনার পরী, তোমাদের সবার জন্য।’

    আট বছর পর সুইডেনে বিশ্ব তাঁকে একডাকে চিনেছিল, আর ২০ বছর পর সত্যি সত্যিই এনে দিয়েছিলেন সোনার পরী, চিরতরে, ব্রাজিলে — পেলে!

    No comments