• Breaking News

    বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ১০/কাতানেচিও–র হার, সোনার পরী ব্রাজিলের/কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    ফুটবল বাঁচল হাঁফ ছেড়ে!

    ১৯৬৬–র বিশ্বকাপে দম আটকে গিয়েছিল। উত্তর ইউরোপীয় শরীর–নির্ভর ফুটবল যদি ফুটবলের ভবিতব্য হয়, সমূহ বিপদ। নেতিবাচকতার সাগরে নিমজ্জিত ফুটবলকে পুরনো জায়গা ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজন ছিল ইংল্যান্ডের সঙ্গে সঙ্গে ইতালির রক্ষণাত্মক খেলে জয়ের ধারাও থামিয়ে দেওয়া। তৃতীয়বার জুলে রিমে কাপ জিতে চিরতরে নিজের দেশে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও ফুটবলের প্রতি আকর্ষণ বাঁচিয়ে রাখার দায়ও ছিল ব্রাজিলের। পেলে–তোস্তাও–রিভেলিনোরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ দেখেছিলেন আরও বেশি। ফুটবলে ফিরেছিল দখিন হাওয়া।

    ব্রাজিল এবং ইংল্যান্ড, প্রতিযোগিতার আগের দুই ফেবারিটের সমস্যা ছিল দুরকম। ইংল্যান্ড মাঝের চার বছরে ৩৫ ম্যাচের মধ্যে হেরেছিল মাত্র চার ম্যাচ। কোনওবারই এক গোলের বেশি ব্যবধানে নয়। গোটা দশেক ম্যাচ ড্র করলেও ইংল্যান্ডকে হারানো কঠিন ছিল তখনও। ববি মুর তো বলেই ফেলেছিলেন, ১৯৬৬–র তুলনায়ও শক্তিশালী দল। খেতাব ধরে রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা।

    ব্রাজিলে সমস্যা ছিল অন্য। ১৯৬৬–র ব্যর্থতা তাঁদের এত মুহ্যমান রেখেছিল যে, ভাল করে কিছু ভাবারও সময় ছিল না যেন। হোয়াও সালদানিয়া ছিলেন সাংবাদিক, ফুটবল–লিখিয়ে। ব্রাজিলের এত সমালোচনা করেছিলেন যে, ব্রাজিলের ফুটবল সংস্থার কর্তারা বাধ্য হয়ে তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন জাতীয় কোচের দায়িত্ব। সালদানিয়া নতুন করে গড়েছিলেন দল, প্রধানত সানতোসের ফুটবলারদের দলে রেখে। কিন্তু, সালদানিয়ার সমস্যা ছিল বদ মেজাজ। পেলেও লিখেছেন আত্মজীবনীতে, ‘যখনই দেখতাম মাঠের কোনও কোণে কাউকে ঘিরে জটলা, নিশ্চিত হয়ে যেতাম, আবার কাউকে বকছে সালদানিয়া!’

    বিশ্বকাপের আগে যখন পেলেকেই বাদ দিয়ে দিলেন সালদানিয়া, আর বিশ্বাস ধরে রাখা যায়নি। তার আগে এক সমালোচকের বাড়িতে রিভলভার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, এমনও শোনা গেছে। পেলেকে বাদ দেওয়ার পর আর ঝুঁকির রাস্তায় হাঁটতে চাননি কেউ। মারিও জাগাও ছিলেন ১৯৫৮ এবং ১৯৬২–র বিশ্বজয়ী দলে। শান্ত জাগাওকে পাঠানো হয় সোনার পরী চিরতরে দেশে নিয়ে আসার দায়িত্ব দিয়ে।

    সালদানিয়ার যে সমস্যা ছিল, ‘লাকি’ জাগাওর আমলে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি প্রধানত তোস্তাও–এর জন্য। ৬৬ বিশ্বকাপে ঝলক দেখিয়ে যখন তোস্তাও তাঁর সেরা ছন্দে, দুর্ঘটনায় চোখ ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমেরিকায় অস্ত্রোপচার করে কোনও রকমে দৃষ্টিশক্তি ফেরানো হয়। তোস্তাও মাঠে ফিরতে সময় নিয়েছিলেন বেশ কিছু দিন। জাগাও আসার পর পেলেও অনেক খোলা মনে খেলতে পারছিলেন। আর উঠে এসেছিলেন একঝাঁক ফুটবলার, জেরসন আর জেয়ারজিনিও যাঁদের অন্যতম।

    ইংল্যান্ডের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্যর অ্যালফ র‌্যামসে! বিশ্বকাপের ঠিক এক বছর আগে মেহিকোয় খেলতে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। আজতেকায় ১৯৬৯–এর মে মাসে মেহিকোর বিরুদ্ধে গোলশূন্য ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে মেহিকো সম্পর্কে তাঁর মনোভাব জানাতে গিয়ে বিরক্তি আর হতাশায় র‌্যামসে যা যা বলেছিলেন —

    ‘There was a band playing outside our hotel till five o'clock this morning. We were promised a motor cycle escort to the stadium. It never arrived. When our players went out to inspect the pitch, they were jeered and abused by the crowd. I would have thought the Mexican public would have been delighted to welcome England. Then when the game began, they could cheer their own team as much as they liked. But, we are delighted to be in Mexico and the Mexican people are a wonderful people.’

    ইংল্যান্ড, বরাবরের ছিঁচকাঁদুনে ট্যুরিস্ট, তা যে কোনও খেলায়ই হোক না কেন, এরপরও আশা করেছিল, বিশ্বকাপে তাঁদের জন্য মেহিকোর দর্শকরা ফুল–মালা নিয়ে অপেক্ষা করবে! মেহিকোর কাগজে বেরিয়েছিল সেরা মন্তব্য, ‘A team of thieves and drunks.’ ‘থিভস’, কারণ, ববি মুর নাকি কলম্বিয়ার বোগোতায় জহরত চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন!

    আর, ইংল্যান্ড এবার প্রাথমিক পর্বেই ব্রাজিলের সঙ্গে, সমস্যা আরও বেশি তাই। নিজেদের দেশে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলিকে মেরে এবং রেফারি দিয়ে বের করে দেওয়ার খেলা এবার চলবে না জেনে আগে থেকেই আতঙ্কিত। এমনকি গ্ল্যানভিলও ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলার আগের রাতে ইংল্যান্ডের হোটেলের বাইরে গভীর রাত পর্যন্ত মেহিকোর সমর্থকদের ‘ব্রাজিল–ব্রাজিল’ চিৎকারের কথা এত ফলাও করে লিখেছেন, ভাবতে খারাপ লাগে, গ্ল্যানভিলও!

    ফাইনালের আগেই ফাইনাল বলা হয়, কিন্তু, সমানে সমানে নয়, ম্যাচ হয়েছিল ব্রাজিলের বিপক্ষে গর্ডন ব্যাঙ্কসের। পেলের হেড মিনিট দশেকের মাথায় কী করে বাঁচিয়েছিলেন ব্যাঙ্কস, আজও রহস্য। উল্টোদিকে বসে গিয়েও শেষ মুহূর্তে পেলের হেড বুঝে দিক পরিবর্তন করে ঝাঁপিয়ে বারের ওপর দিয়ে তুলে দিয়েছিলেন। গোল বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন পেলেও। অবিশ্বাস্য সেভ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা, নিঃসন্দেহে।

    আত্মজীবনী থেকে পেলের কথায় — ‘জানতাম ম্যাচটা কঠিন হবে। জেরসনের চোট ছিল, ইংরেজ রক্ষণ প্রায় দুর্ভেদ্য। জাগাও অবশ্য বারবারই বলে দিয়েছিল, অধৈর্য না হতে। সাম্বা–ফুটবল হবে না হয়ত, কিন্তু জিতব। অন্য অনেকবারের মতোই, ওর পর্যবেক্ষণ এবারও ঠিক। কেন, বোঝা গিয়েছিল মাত্র দশ মিনিটেই। ১৯৭০–এর অন্যতম সেরা মুহূর্ত। আমার হেড থেকে গোল বাঁচানো ব্যাঙ্কসের। ইংরেজ ফুলব্যাক টেরি কুপারকে কাটিয়ে নিয়ে জেয়ারজিনিও নিখুঁত ক্রস রেখেছিল আমার জন্য, বক্সে। লাফিয়ে উঠে হেড করে রেখেছিলাম গোলের মধ্যে। মনে হয়েছিল টেক্সট–বুক হেডার। বল জালের দিকে যাচ্ছে, ধরে নিয়েছিলাম গোল। কিন্তু তখনই, কোত্থেকে কে জানে — আসলে উল্টোদিকের পোস্ট থেকেই, সত্যি সত্যি — ব্যাঙ্কস উঠে এসেছিল। কী অসম্ভব দক্ষতায় তারপর তুলে দিয়েছিল বলটা, বারের ওপর দিয়ে। ফেনোমেনাল সেভ! ওই প্রতিযোগিতার তো বটেই, বোধহয় সব প্রতিযোগিতার সেরা সেভ। তার কিছুক্ষণ পরেই আরও একটা গোল বাঁচিয়েছিল। না, এবার আর হেড থেকে নয়, ফ্রি কিক থেকে। ওর জন্যই ম্যাচে অনেকক্ষণ বেঁচে ছিল ইংল্যান্ডের আশা।’

    কিন্তু, ইংল্যান্ডকে হারানো কঠিল হলেও অসম্ভব ছিল না, যেমন ব্রাজিলকে গোল করতে না–দেওয়া ছিল অসম্ভব। তাই, ব্রাজিল গোল পেয়েছিল শেষ পর্যন্ত, জেয়ারজিনিও নিরাশ করেননি, বিশ্বকাপের প্রত্যেক ম্যাচে গোল করার পথে এগিয়ে ছিলেন আরও।

    মেহিকোয় সমস্যা উচ্চতা। কেন আর্জেন্তিনাকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া হবে না, টোকিওয় ফিফার ১৯৬৪ কংগ্রেস তা নিয়ে উত্তাল হলেও লাভ হয়নি। বলা হয়, মেহিকো বিশ্বকাপ পেয়েছিল চুরি করে। কোনও কোনও কর্তার ফিফা কংগ্রেসে যাতায়াতের ভাড়া, থাকা–খাওয়া, হাত খরচের দায়িত্বও নাকি নিয়ে ছিলেন মেহিকোর কর্তারা। ৭ হাজার ফুট উচ্চতা, অসম্ভব গরম, সঙ্গে ইউরোপের দর্শকদের টেলিভিশনে খেলা দেখানোর জন্য দুপুরের প্রচণ্ড গরমে বারোটায় খেলা, ফুটবলারদের প্রাণ অতিষ্ঠ হলেও কিছু করার ছিল না। হোয়াও আভেলানজের ফিফা তখন অর্থবলে বাড়ছে রোজ!

    আবহাওয়ার প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে কোনও কোনও দল স্বপ্নের ফুটবল খেললেও ইউরোপীয় দলগুলির সমস্যা ছিল বেশি। কোয়ার্টার ফাইনালে ১৯৬৬ ফাইনালের পুনরাবৃত্তি। পশ্চিম জার্মানির সামনে ইংল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড ওই ম্যাচে হেরে গিয়েছিল সেই দিনই, ব্যাঙ্কস যেদিন বিয়ার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন!

    বদলা নেওয়ার সুযোগ এত তাড়াতাড়ি আসবে, জার্মানরাও ভাবেননি। কিন্তু, ১৯০১ সাল থেকে এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের অদ্ভুত প্রাধান্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৫০ মিনিট পর্যন্ত ইংরেজরাই এগিয়ে ছিল ২–০। ব্যাঙ্কসের পরিবর্ত পিটার বনেট্টি তার পর ফস্কাতে শুরু করলেন। ৯০ মিনিটে ২–২, অতিরিক্ত সময় শেষে জার্মানরা ৩–২ জয়ী, র‌্যামসে খেলা শেষে বললেন, জানতেন এমনই হবে, ব্যাঙ্কস ছিলেন না যে! জার্মানদের পিছিয়ে পড়ে ফিরে আসার সিলসিলা সেই শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ ফাইনাল থেকে, বেকেনবাওয়ারের আমলে হঠাৎ তা পাল্টাতে যাবে কেন?

    ইউরোপের অন্য বড় শক্তি ইতালি তখন কাতানেচিও–য় বুঁদ। রিভা–রিভেরার দুর্দান্ত কম্বিনেশন শেষ আটে আয়োজকদের শুইয়ে দিল ৪–১। উরুগুয়ে আবার সেমিফাইনালে রাশিয়াকে ১–০ হারিয়ে। আর কুবিয়াসের পেরু সাড়া জাগিয়ে শুরু করলেও সামনে পড়ে গিয়েছিল ব্রাজিলের। পেলে–তোস্তাও–রিভেলিনো–জেয়ারজিনিওরা জুলে রিমে কাপ নিজেদের দেশে নিয়ে যাবেন বলেই এসেছিলেন।

    সেমিফাইনালে তাই দুই ঘরানার দুই বড় শক্তির লড়াই। প্রথম সেমিফাইনাল ব্রাজিল–উরুগুয়ে, দ্বিতীয় খেলায় ইতালি–পশ্চিম জার্মানি।

    উরুগুয়ে যথারীতি এগিয়ে গিয়েছিল। ক্লোদোয়ালদোর ‘দেবতা’ সানতোস থেকেই, পেলে। ব্রাজিলকে সমতায় এনে দেন তোস্তাও–এর দুর্দান্ত পাস থেকে। দ্বিতীয়ার্ধে সাম্বা ম্যাজিক। উরুগুয়ে সব ছেড়ে তখন শরীরী ফুটবলে। আটকানো যায়নি। জেয়ারজিনিও আর রিভেলিনোর গোলে ৩–১, ফাইনাল।

    ইতালি–পশ্চিম জার্মানি ম্যাচ যত হাড্ডাহাড্ডি হওয়া সম্ভব, হয়েছিল। ৯০ মিনিট শেষে যে ম্যাচ ১–১, অতিরিক্ত সময়ের পর ৪–৩, অর্থাৎ শেষ ৩০ মিনিটে ৫ গোল! হাত ভেঙে গিয়েছিল বেকেনবাওয়ারের, কাঁধের সঙ্গে বেঁধে অতুলনীয় লড়াই বিশ্ব কী করে ভুলবে? মুলার–সিলার জুটি এক দিকে, অন্যদিকে রিভা–রিভেরা। বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচের তালিকায় নিশ্চিন্তে থেকে যাবে এমন শ্বাসরোধকারী সেমিফাইনাল। জার্মানরা অবশ্য আবারও পরাজিত, বেকেনবাওয়ারের বিদায় বিশ্বকাপ থেকে এবারও শূন্য হাতে।



    ফাইনালের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল কারণ, দু’দেশেরই সংগ্রহে দুবার করে জুলে রিমে কাপ। শুরুতে ফিফা ঠিক করেছিল, যাঁরা তিনবার জিতে ফেলবে, জুলে রিমে চিরতরে চলে যাবে তাঁদের দেশে। আজতেকায় যাঁরাই জিতুক, সোনার পরী নিয়েই দেশে ফিরবে। পেলে না ফাচেত্তি? আক্রমণাত্মক সুন্দর ফুটবল না কাতানেচিও? এখন যত প্রশ্নই তুলুন, তখন ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনও দল জিততে পারে বলে খুব কম ইতালীয়ও বিশ্বাস করেছিলেন।

    গত একশো বছরের সেরা দল বাছতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা ব্রাজিলের সত্তরের দলকেই বেছে নিয়েছেন পরে। তখন বিপক্ষ দলগুলোও যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল অমন স্বপ্নের ফুটবলের সামনে। তোস্তাও, রিভেলিনো, জেয়ারজিনিও, জেরসন, পেলে — কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? পুসকাসের হাঙ্গেরি বা ক্রুয়েফের হল্যান্ড চূড়ান্ত ফেবারিট হয়েও ট্রফি জেতেনি, ব্রাজিল কিন্তু জিতেছিল।

    ‘ব্রাজিলকে আক্রমণ করে যেতে হবে। যদি ওদের নিজেদের সীমানায় উঠে আসতে দাও, বিপর্যয়,’ বলেছিলেন ফ্রান্সিস লি। ইতালীয়রা সেই ভুলই করল, ব্রাজিলকে উঠে আসতে দিল তাঁদের অর্ধে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের শেষে বিপক্ষের মারে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত বীতশ্রদ্ধ পেলে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর কখনও বিশ্বকাপে খেলবেন না। পরে মত পাল্টান এবং ১৯৫৮ ফাইনালের পর নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে নিজেকে নিয়ে যান এমন উচ্চতায়, ফুটবল বিশ্ব তার পর থেকে আর কাউকে সেখানে জায়গা দিতে চায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে পেলের নিজের গোল একটি, আরও দুটি গোল তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তোর জন্য চতুর্থ গোলের বল সাজিয়ে দেওয়া নিয়ে, বিশ্বকাপ নিয়ে কলকাতায় এসে ২০১৩–র ডিসেম্বরে কার্লোস বলে গিয়েছিলেন, ‘ওটা পেলের পক্ষেই সম্ভব! আমাদের টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ ছিল। যখন ডান পায়ে ডান দিকে বলটা ঠেলছিল পেলে, আমি তখন ক্যামেরায় নেই! দৌড়ে আসছি পেছন থেকে। পেলে জানত ঠিক কখন এসে পৌঁছব। ঠিক সময় বাড়িয়ে দেয়, আর আমিও ডান পায়ের জোরালো শটে বল রাখি নেটে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দলগত গোল, নিঃসন্দেহে।’ কাতানেচিও–র অসারতা দেখিয়ে দিয়েছিলেন পেলেরা, পায়ে বল নিয়ে। নেতিবাচক ফুটবল সেই ছন্দের তালে নেচেছিল, রক্ষণ–সংগঠনের প্রচারকরা পালিয়ে বেঁচেছিলেন, ফুটবল পেয়েছিল জীবন। গুমরে গুমরে মরা যে জীবনের ধর্ম নয়!

    ৪–১, অ্যাথলেটিক, ওয়ার্ক রেট ফুটবলের ওপর শৈল্পিক ফুটবলের সর্বোচ্চ জয়গাথা, সর্বোচ্চ মঞ্চে। চার বছর আগে কেউ কেউ যখন শ্রমিকদের শিল্পীর ওপরে স্থান দিতে মহার্ঘ্য কাব্য লিখেছিলেন, এখনও লিখে চলেছেন অনেকে, কী আর করা যাবে, লড়াইয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতার আনন্দ খুঁজে পান যখন! হার বাঁচাতে যে লড়ে সারা জীবন, জেতার কথা ভাবার আগে তাঁকে ভাবতে হয় অনেক কিছু। যে শুধুই জেতার কথা ভাবে, হার তাকে কখনও হারিয়ে দিতে পারে না। কারও জীবন না–হারার স্বপ্নে কাটে, কারও জেতার স্বপ্নে।

    ব্রাজিল সেই জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল বলেই গোটা বিশ্ব তাঁদের সঙ্গে, একই বিশ্বস্ততা নিয়ে, আজও!

    (আগামিকাল ১৯৭৪ বিশ্বকাপ)

    No comments