• Breaking News

    ফুটবল–সাম্যের খোঁজে, মস্কোয়! | কাশীনাথ ভট্টাচার্য


    সামনে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। সুন্দরী রুশ রমণী সামনের বিছানায়, ড্যাবড্যাব তাকিয়ে!
    দুপুরে তো এমন ছিল না। পৌঁছনোর পর কোনও সমস্যাই হয়নি উদ্দীষ্ট লেনিন হোস্টেল খুঁজে পেতে। দিব্যি ঘরে গিয়ে লটবহর রেখে বেরিয়ে পড়েছিলাম লুঝনিকি খুঁজতে। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফিরে যদি ‘আবিষ্কার’ করা যায় পাশের খাটে এক যুবতীকে, মনের অবস্থা যে কেমন হয়!
    আসলে, উয়েফার ‘কনফার্মেশন’ এসেছিল এত দেরিতে, মস্কোর সব হোটেল তখন ‘বুকড’। যেগুলো বাকি, আকাশছোঁয়া দাম। সকাল থেকেই তাই ‘গুগল সার্চ’ ভরসা। বাঘের দুধ ছাড়া এখন সবই ইন্টারনেটে পাওয়া যায় যেহেতু! জোরদার খোঁজ, রোজ। পাওয়া গিয়েছিল বেশ কিছু হোস্টেল। অন্যান্য সময় যেমন দাম রাত–প্রতি থাকার, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের আশেপাশে বেশি হবে, জানাই ছিল। কিন্তু, হোটেল যেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে, হোস্টেল তেমন নয়। তার ওপর মস্কোয় গিয়ে লেনিন নামের হোস্টেলে থাকার লোভও কি সংবরণ করা যায়?
    তাই ‘বুক’ করে গিয়েছিলাম কলকাতা থেকেই। কিন্তু, সেখানে এমন অবস্থায় পড়ব, বুঝব কী করে?
    আট–বিছানার ডর্মিটরিতে ছিলাম। দোতলা খাট, চারটে। ভাল করে তাকিয়ে দেখি, বাকি তিন বিছানাতেই তিন তন্বী। পুরুষরা সব দোতলায়। আমিই একা জায়গা পেয়েছি একতলার খাটে।
    মনে পড়ল, ‘বুকিং’–এর সময় পড়েছিলাম বটে, ‘মিক্সড ডর্মিটরি’। মানে বুঝিনি তখন। পরিষ্কার হল সেই রাতে যখন এক হাত দূরত্বে শুয়ে এক অচেনা যুবতী!
    কী করেই বা বুঝতাম? ভারতে ভাবা যায় নাকি এমন? যুবতীর একা একা ঘুরতে বেরনোই যেখানে অভাবনীয়, একঘর অচেনা পুরুষের মাঝে সে দিব্যি রাতে শুয়ে আছে নিজের বিছানায়, কেলেঙ্কারির একশেষ তো সেখানেই!
    কিন্তু, এ তো আর আমাদের ভারত নয়। মাত্র ৪৮৭০ কিলোমিটার দূরের সাম্যবাদের পিতৃভূমি। যেখানে শ্রেণীসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একদা, গোটা বিশ্বকে দেখিয়েছিল নতুন পথ। লিঙ্গভেদ সেখানে থাকবেই বা কেন? পুরুষ যা পারে, মহিলা পারে না নাকি? তাঁদের কি অধিকার নেই একা একাই পথে বেরনোর? আমার ভারতীয় মনন মেনে নিতে শঙ্কিত হলেই বা, তাঁকে কে দিব্যি দিয়েছে, এমন হতে পারে না?
    পরের সকালে জানা গেল কামচাটকার মেয়েকে। ঘুরতে ভালবাসেন, নিজের ইচ্ছেয় ঘুরে বেড়ান, কাজও করেন কামচাটকার এক ট্রাভেল এজেন্সি–তে। সঙ্গে নিজের দেশ চেনানোর বেশ কিছু সিডি/ডিভিডি। ল্যাপটপ দেখে নিজেই আগ্রহী হয়ে দেখালেন সব। সঙ্গে মিষ্টি আমন্ত্রণ, ‘আসুন না একবার, ভাল লাগবে দেখবেন।’ আমাদের সঙ্গেই ছিলেন ইজরায়েলের জোসেফ। এখনও বিয়ে হয়নি, দেশঘুরে স্বপনসঙ্গিনী খুঁজছেন, এমন নয়। কিন্তু, উপেক্ষা করতে পারলেন না সেই ডাক। ‘বলছেন তা হলে, আপনার দেশে গেলে পেলেও পেয়ে যেতে পারি জীবনসঙ্গিনীর খোঁজ?’ আশ্বাস দিলেন নতুন বান্ধবী। ‘সুন্দর দেশের মহিলারাও সুন্দরী। আমাকে দেখে বিচার করবেন না’ বলার সময় লাজুকলতা তো চিরকালের নারী।
    আর, কে বলেছে, নিজের দেশকে ‘সকল দেশের রানি’ বলার লোক শুধু ডিএল রায়ই ছিলেন!

    রাজ ঠাকরে? ভুল!

    দিল্লি থেকে বিমানে ওঠার আগে ফুলস্লিভ শার্টও গুটিয়ে নিতে পারলে বোধহয় ভাল, বিমান যখন শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দর ছুঁয়ে ফেলেছে, আকাশ–বাণী পাওয়া গেল, ‘বাইরে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস’। জানলা দিয়ে বাইরে দেখি, বৃষ্টি অঝোর।
    ‘ই কম–এর ব্রজবুলি’ জপে যাওয়ায় জানা ছিল, তাপমাত্রা ঘোরাঘুরি করবে ১০–১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ‘সামার’ রাশিয়ায়। বৃষ্টি পড়লে তাপমাত্রা একটু কমে, ৭–৮ হয়। বিবিসি–র আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী নিশ্চয় আলিপুরের মতো হবে না। সেখানে তো বলাই ছিল, যে দিন পৌঁছব বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তা হলে?
    কিছু করার নেই। বিভুঁই–তে পা–দেওয়া মাত্র কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া কাঁপিয়ে দিল হাড়। খানিক দূরে অপেক্ষমান বাস। কিন্তু সেখানে পৌঁছতেও তো অন্তত ৩০–৩৫ মিটার। দৌড় শুরু মাটিতে পা দেওয়া মাত্রই। আগামী পাঁচ দিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আভাস, দিনের শুরুতেই। ইমিগ্রেশন না–পাওয়া পর্যন্ত সোয়েটার হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কোনও রকমে বাসে উঠে বিমান বন্দরের ভেতরে ঢুকতে পেরে শান্তি।
    ইমিগ্রশনে পেছনে দাঁড়িয়ে দিল্লির তবলিয়া জানিয়ে দিলেন, প্রথম এসেছি যখন, কিছু প্রশ্ন করতেই পারেন কাউন্টারে থাকা ভদ্রমহিলা। ‘তবে, চিন্তার কিছু নেই। রুশ ভাষায় জিজ্ঞেস করবে। ইংরেজি বলতে চায় না কেউই। আপনি ইংরেজি বললে বিশেষ আগ্রহ দেখাবে না আর।’
    তাঁকে জানাই, ব্রহ্মাস্ত্র হাতে আছে। উয়েফা (‌ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা, ফিফার ছোট ভাই)‌ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল দেখতে বা ‘কভার’ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য কিছু নমনীয়তা দেখাতেই হবে রাশিয়াকে। কলকাতা থেকে ভিসা পাওয়ার সময়ও দেখেছিলাম, কাজ হয়েছিল উয়েফার সেই চিঠিতেই। ইমিগ্রেশনেও হল। একটু ভুরু কুঁচকে ছিল হয়ত, মনে পড়ছিল আজকাল–এর গ্লোব–ট্রটার ক্রিকেট–লিখিয়ে দেবাশিস দত্ত–র সাবধানবাণী যাওয়ার আগে, ‘দাড়িটা কেটে যাবি নাকি?’ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই অভিজ্ঞ দেবাশিসদার উত্তর ছিল, ‘বিদেশে দাড়িওয়ালা মানেই কিন্তু সন্দেহের চোখে দেখা শুরু।’ মনে পড়তেই, দেরি না–করে উয়েফার ই মেল–এর ‘প্রিন্ট আউট’ দেখানোয় চওড়া হল ঠোঁট। দিল্লির সেই ভদ্রলোক প্রায় জটায়ুর ঢঙে পরে বললেন, ‘আপনি তো জিনিয়াস! কী এমন দেখালেন যে রুশ মহিলার মুখে হাসি এল? এত বছর ধরে আসছি রাশিয়ায়, কখনও দেখিনি।’ আপনাকে তো কালচার করতে হচ্ছে মশাই, বলেননি ভাগ্যিস!
    তাঁর পরামর্শে এবং সাহায্যে তেমন দরদাম না–করেই ট্যাক্সি পাওয়া গেল গন্তব্যে পৌঁছনোর। বিদেশেও দেশের আন্তরিকতার ছোঁয়া। উত্তর ভারত সম্পর্কে ধারণা সবসময়ই রাজ ঠাকরের মতোই হতে হবে, মস্কো পৌঁছে অন্তত বোঝার উপায় ছিল না।




    খাঁটি বাংলায়!

    মস্কোর রাস্তার সঙ্গে পরিচয় সেই বৃষ্টিস্নাত সকালে। ঝকঝকে রাস্তা, চওড়া। চালক সাহেব কাজের ইংরেজি জানেন, বোঝেন। আট লেনের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতেই জানালেন, ‘এত ফাঁকা রাস্তা, সপ্তাহে কাজের দিন পাবেন না। জট পাকিয়ে এমন হবে, হাতে সময় নিয়ে বেরোবেন যেখানেই যান।’
    চোখ তখন গিলতে চাইছে আশপাশ। বিরাট বিরাট কারখানা, বিদেশি গাড়ির কোম্পানির। শহরের বাইরে, তাই জায়গা নিযে সমস্যা নেই। ম্যাকডোনাল্ডস হাজির, আছে বিরাট বিরাট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। আর রাস্তায় খুঁজে চলেছি, বিমান বন্দরে ঢোকার মুখেই যা স্বাগত জানিয়েছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেই সব পোস্টার। চোখে পড়ল বেশ কয়েক জায়গায়। তার পাশে পাশেই গাস হিডিঙ্কের ছবিও। আশ্বস্ত করছেন গোটা রাশিয়াকেই যেন! নিয়ে গিয়েছেন ইউরোর মূলপর্বে। ইংল্যান্ড ধরাশায়ী তাঁর দলের হাতে। রুনিদের ইউরো–স্বপ্নকে রূঢ় বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনেছেন, যোগ্যতা মান পেরোতে ব্যর্থ ইংল্যান্ড, হিডিঙ্কের হাসিতে ভরসা তো থাকবেই।
    আবার, যে–মাঠে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রশস্ত হয়েছিল রাশিয়ার ইউরো যাওয়ার পথ, সেই মাঠেই খেলবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর চেলসি, দুই ইংরেজ ক্লাব, ক্লাব–ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফির জন্য, এর চেয়ে বড় বৈপরীত্যই বা কোথায়?
    তো, সেই স্টেডিয়াম দেখার তরও তো সইছে না। তাই, কোনও রকমে লটবহর রেখেই বেরিয়ে পড়া মেট্রোর ম্যাপ–হাতে। কীভাবে যেতে হবে, নির্দেশ পেয়ে গিয়েছিলাম আগে। কিন্তু, তখনও জানতাম না রাস্তায় আরও বড় বিপদ অপেক্ষায়।
    অন্তর্জাল যে–কাগজ হাতে ধরিয়েছিল, মেট্রো স্টেশনের নাম ছিল ইংরেজিতে। স্টেশনের খোঁজ পেতেই তো গলদঘর্ম প্রায়। সামনে দিয়ে ঘুরলাম বেশ কয়েকবার। তার পর মনে হল, নিচে নেমেই দেখি। পাওয়া গেল প্রথম স্টেশন। তার পর? কোন দিকে? যতজনের কাছেই জানতে চাই, কী ছাইপাঁশ বলছেন, সব হিব্রু। হাতের কাগজ দেখেও কেউ কিচ্ছু বুঝছেন না, বা বুঝতে চাইছেন না। ইংরেজি বৃথা জেনে তখন পুলিশকে খাঁটি বাংলাতেই জানতে চাইছি, কোন দিকের মেট্রোতে উঠব। সে–ও হাত নেড়ে কী বোঝাচ্ছে, সে–ই জানে! অনেক কষ্টে দুরুদুরু বুকে উঠে পড়লাম, পরের স্টেশনের নাম ঘোষণা হতেই বুঝলাম, ভুল করেছি। স্টেশনের নাম কী করে বুঝলাম? হ্যাঁ, ঘোষণা যথারীতি রুশ ভাষাতেই, কিন্তু, প্রপার নাউনে তো আর ভুল হবে না। অগত্যা, নেমে উল্টো দিকের লাইনে!
    সেই রাতেই কিনে–ফেলা মস্কোর মেট্রোর বড় ম্যাপ যেখানে ইংরেজির পাশে রুশ ভাষাতেও লেখা আছে সব নাম। রুশ ভাষার সেই চিহ্ন দেখে দেখে মিলিয়ে মিলিয়ে পথ–চলা তার পর। আর অসুবিধে হয়নি তেমন। কিন্তু, ঠিক করে নিয়েছিলাম, আর ইংরেজি বলার চেষ্টাই করব না। খাঁটি বঙ্গসন্তান বিদেশির কাছে শিক্ষা পেয়ে তার পর আর মস্কোর রাস্তায় বিদেশি ভাষার সাহায্য নেয়নি।
    সুরজিৎ সেনগুপ্ত শুনে বললেন, ‘‘তোর উচিত ছিল যাওয়ার আগে পিন্টুদার (‌সমরেশ চৌধুরি)‌ কথা জেনে যাওয়া। পিন্টুদা তোর অনেক আগে ওই একই পদ্ধতিতে ‘ভাত লইয়া আয়’ বলেছিল এবং ভাত এসেও যেত ঠিক, যতবার পিন্টুদা চাইত, তত বারই!’’

    হায় আইটি!

    আইটি–তে ভারত নাকি এত উন্নত যে ভাবাই যায় না! কিন্তু, ল্যাপটপ নিয়ে এমন ঝামেলা, ওই ঠাণ্ডায়ও মাথা ঠাণ্ডা রাখা কঠিন তখন।
    কে জানত ইউরোপ এমন এগিয়ে গিয়েছে যে ভারতের ল্যাপটপ–এর পাওয়ার প্লাগ সেখানে কাজেই আসবে না?
    ইউরোপ নাকি প্লাগের ক্ষেত্রে বছর ছয়েক আগেই থ্রি–পিন থেকে টু–পিন হয়ে গিয়েছে। আমার ল্যাপটপের পাওয়ার প্লাগে তিন দাঁড়, মস্কোর হোস্টেলে যত প্লাগ–পয়েন্ট, সবেতেই ফুটোর সংখ্যা দুই। ব্যাটারি অনন্ত কাল চলে না, তাকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ‘জ্যান্ত’ রাখতে হয়। কিন্তু, উপায়ই নেই। তা হলে হবে কী?
    সমস্যা হাফ–সেন্টিমিটারের! সঙ্গে একটা এক্সটেনশন কর্ড ছিল। ভারতের বিভিন্ন মাঠে দেখা গিয়েছে, ল্যাপটপ–এর পাওয়ার প্লাগ লাগানোর পয়েন্ট এত দূর যে, এক্সটেনশন কর্ড না–থাকলে ওই পয়েন্ট পর্যন্ত পৌঁছনো যায় না। তাই সঙ্গে রাখতেই হয়। ভাবা গেল, ওই কর্ড কাজে লাগবে এবার। কাজে লাগাতে গিয়ে দেখা গেল, ওই ৫ মিলিমিটার ছোট! এবার, আর কিছু করার নেই।
    অবস্থা এমন, হোস্টেলে নতুন বোর্ডার এলেই আগে দেখছি সঙ্গে ল্যাপটপ আছে কিনা! অবতার হয়ে দেখা দিলেন স্ট্রোল, ডেনমার্কের সাংবাদিক। তিনিও এসেছিলেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল ‘কভার’ করতে। তাঁর ল্যাপটপ–এর পাওয়ার প্লাগ আমার ল্যাপটপে লেগে যেতেই প্রায় জড়িয়ে ধরি আর কী। রাত সাড়ে এগারোটার মধ্যে কপি পাঠানো শেষ হয়ে যেত স্ট্রোলের। বসে থাকতাম পাশে। কর্ড নিয়ে ব্যাটারি ‘জীবন্ত’ করে রেখে দেওয়া পরদিনের জন্য। আর রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই খুঁজতে বেরনো, কোথায় পাওয়া যায় এমন কর্ড বা অন্য কিছু, যা দিয়ে আমার সমস্যা মেটে।
    ভাষার সমস্যা মেটাতে সবগুলো তার হাতে করেই নিয়ে যেতাম। কত দোকান, কত পথ হেঁটেও পাওয়া যায় না কাঙ্ক্ষিত তার। শেষে, ফাইনালের দিন সকালে পাওয়া গেল মেট্রো স্টেশনের এক ছোট্ট দোকানে। কিন্তু, একটা মাল্টিপ্লাগের জন্য তত দিনে বোধহয় কিলোমিটার কুড়ি হেঁটে ফেলেছি মস্কোর রাস্তায়!
    বোঝা কঠিন, কেন সারা বিশ্বে যন্ত্রের আনুষঙ্গিক জিনিসের মাপ কেন এক হয় না? উন্নত হলেও কেন ভারত এখনও এমন উন্নত নয় যে, ভারতে যে ল্যাপটপ যে–তারে চলে ইউরোপে সেই তার বেকার?

    জলের চেয়ে বিয়ার সস্তা!

    শীতপ্রধান দেশে যা হয়, জলের চেয়ে বিয়ার সস্তা!
    হাফ–লিটার জলের দাম ৩০ রুবল, সেই পয়সায় দু–বোতল বিয়ার হেসেখেলে। জল সে জন্য কম পান করে সে–দেশের যুবসমাজ। স্বাভাবিকও। কিন্তু, তাই বলে পাঁউরুটি ৩০–৩৫ রুবল, চিকেন রোল খেলে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২০০ টাকা, তা–ও আবার রাস্তার ধারের দোকানে?
    বড্ড দাম বললেও কম। চকোলেট সস্তা সেই তুলনায় ২০ রুবলে ভারতের ফাইভস্টার গোছের চকো–বার। কিন্তু, ফাইনালের লুঝনিকিতে বাঙালির বাজারে জামাইষষ্ঠীর আগুন! এক লিটার জলের বোতল ১০০ রুবল, চকো–বারগুলো ৫০, চিকেন স্যান্ডউইচ সেই ১০০, হাত দেওয়া যায় না কিছুতেই। কিছু করারও নেই। ইংরেজ সমর্থকরা এসেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল যে–শহরে হয়, উয়েফার সমীক্ষা দেখিয়েছে সেই শহরের ব্যবসা সেই সপ্তাহে বাড়ে নাকি প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ। মস্কো এখন বিশ্বের সবচেয়ে খরচবহুল শহরগুলির প্রথম দশে থাকলেই বা, এমন খেলা ঘিরে নতুন করে জেগে উঠবে না?
    পানীয় আর সিগারেট ছেড়ে দিলে মস্কোয় যা সত্যিই সস্তা — মেট্রো। একবার চড়তে চাইলে ১৯ রুবল। তাতে, মেট্রো স্টেশনের বাইরে না–গিয়ে সারা দিন আপনি বিভিন্ন স্টেশনে নেমে বিভিন্ন লাইনে গিয়ে যত দূর খুশি ঘুরে আসতে পারেন। বাইরে বেরিয়ে গেলে ‘রাইড’ শেষ, পরের বারের জন্য আবার টিকিট কাটতে হবে।
    এমনিতে মস্কোর বিখ্যাত মেট্রো সত্যিই চোখ–ধাঁধানো। দেড় মিনিটের বেশি কোনও স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়নি কখনও ওই সাত দিনে। দশ রকমের লাইন আছে। প্রতিটি লাইনের নাম রং অনুসারে। লাল, সবুজ, নীল, আকাশি, খয়েরি, কমলা, বেগুনি, হলুদ, ছাই এবং হালকা সবুজ। তুঁতে রঙের ছোট্ট এগারো নম্বর লাইনে মাত্র তিন স্টেশন। বিভিন্ন জংশন, একই জায়গায় তিনটিও স্টেশন আছে, তিন ভিন্ন রঙের, মানে তিন ভিন্ন দিকের। এক–একটি স্টেশনে ঢোকার সময় প্রায় ৭০০ সিঁড়ি, কোথাও বা তার চেয়েও বেশি। এসকেলেটর ছাড়া উপায় নেই। এবং লোডশেডিং হলে কী ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে সমস্যা, ভেবে দেখতে পারেন। কিন্তু, তেমন কিছু শেষ কবে হয়েছিল, মনে করতে পারলেন না স্থানীয় মানুষও। আসলে, লোডশেডিং কী মস্কো ভুলেই গিয়েছে!
    পরিষ্কার ঝকঝকে স্টেশন চত্বর। স্টেশনে ঢোকার মুখে সিগারেট–বিয়ার খেয়ে ফেলে দিয়ে ঢুকুন। সেখানেও ডাস্টবিন হাতের নাগালে। এত পরিষ্কার দেখে বাঙালি হলেও রাস্তায় আবর্জনা ফেলতে ইচ্ছে হবে না। অফিসযাত্রীর ভিড় সেখানেও সকাল–বিকেল। কিন্তু, যা দেখতে খুব ভাল লাগে, মেট্রোর এসকেলেটরের সিঁড়িতেই হোক বা মেট্রোর ভেতরে, সত্তর শতাংশের হাতে বই, পত্রিকা বা কাগজ। পড়ছেন, পড়েই চলেছেন কিছু–না–কিছু। যাতায়াতে বেশ সময় যায়। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা যেতে হয়ত বেশ কয়েক বার মেট্রোর লাইন পাল্টাতে হবে। সময় কাটাতে বই–ই ভরসা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও পড়ে চলেছেন তাঁরা।
    বাস আছে। কলকাতার ট্রামের মতো, মাথার ওপর বিদ্যুতের তার। তবে দেখা পাওয়া যায় কম। মস্কোর সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়ও নয় তেমন। প্রধানত যানজটের কারণে। মেট্রোতে যে দূরত্ব দু’বার লাইন পাল্টেও আধঘন্টায় পেরনো সম্ভব, বাসে ঘন্টা দুয়েক লেগে যেতে পারে। খুব কাছে কোথাও যেতে হলে ঠিক আছে। না হলে কে আর সাধ করে যানজটের কবলে পড়তে চান?
    কলকাতার মেট্রো? ভারতের গর্ব, এই পর্যন্ত কোনও অসুবিধে নেই। মস্কোর সঙ্গে তুলনা করতে গেলে স্পেনের লা লিগা আর ভারতের আই লিগের পার্থক্য মনে পড়ে যেতে পারে!

    ‘জিমি, আ জা...’

    বিশ্ব বিস্মিত করে, এই বিস্ময়ের শেষ নেই, রোজ নানাভাবে প্রমাণিত হয়, হলও।
    মেট্রো স্টেশনে ছোট্ট দোকান। নানা রকমের ঘড়ি পাওয়া যায়। দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। দোকানের মালিক ভাঙা ইংরেজিতে জানতে চাইলেন, ট্যুরিস্ট কিনা। যে–ই শুনলেন ‘ইন্ডিয়া’ উৎসাহের আতিশয্যে যে ভঙ্গিতে রুশ ভাষায় কিছু বললেন, মনে হল, ‘দাঁড়ান মশাই, একটা জিনিস দেখাই।’ কী দেখাতে চান, দাঁড়াতেই হল। দেখি মোবাইলের বোতাম টিপছেন। ভাবলাম, হয়ত গিয়েছিলেন ভারতে, তাজমহলের ছবি তুলে রেখেছেন। যা দেখালেন, থুড়ি শোনালেন, সুদূর কল্পনাতেও ভাবিনি।
    আলিশা চেনয় গেয়ে উঠলেন, ‘মেরা দিল গায়ে যা জু জু জুবি জুবি জুপ্পি!’ রাশিয়ার এক মেট্রো স্টেশনে, এক রুশের মোবাইলে। হতবাক, ভাবছি কারণ। নিজেই জানালেন বছর চল্লিশের দোকানি, ‘ছোটবেলায় দেখেছিলাম সিনেমাটা, ভাল লেগেছিল। আরও ভাল লেগেছিল এই গানটা। সংগ্রহে রেখে দিয়েছি। আর ভাল লেগেছিল নায়ককে।’ তাঁকে বলতে বাধ্য হলাম, সেই নায়ক (‌মিঠুন চক্রবর্তী)‌ আর সুরকারের (‌বাপি লাহিড়ি)‌ জন্ম ভারতের যে প্রদেশে, সেই বাংলা এই ট্যুরিস্টেরও ঘর। চকোলেট খাওয়ালেন, কিছুতেই শুনবেন না। এমনও হয়!
    চমক অবশ্য আরও বাকি ছিল। হোস্টেলে গভীর রাতে বেশ আড্ডা জমত। কত যে ভিনদেশের লোক একসঙ্গে সেখানে। ফরাসি, স্পেনীয়, দক্ষিণ আফ্রিকার এক সাদা আর এক জন কালো, ডেনমার্কের সেই সাংবাদিক, জার্মান দুই মহিলা, ইংরেজ গোটা পাঁচেক, তার মধ্যেও দুজন সুন্দরী, সুইস এক ভদ্রলোক যিনি ফুটবলের নাম শুনলেই রেগে যান, রুশ রিসেপসনিস্ট এবং হোস্টেল মালিক ড্যান আর এক বাঙালি। সেই অদ্ভুত জগাখিচুড়িতে হোস্টেলের মালিক ড্যান এক রাতে হঠাৎ জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের সিনেমায় এত অতিনাটকীয়তা কেন থাকে বলো তো?’
    জানতে চাই, যেমন?
    ‘আরে বাবা, সেই জিমি জিমি বলে মেয়েটার করুণ ডাক, জিমি গাও গাও বলে–যাওয়া, এক বুড়ো লোক একটা গিটার ছুঁড়ে দিল, সেই গিটার নিয়ে নায়কের লাফিয়ে পড়া স্টেজে আর গান। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, এত গানই বা কেন থাকে সিনেমাতে? হঠাৎ–হঠাৎ বিনা কারণে তোমরা কি গান গাও নাকি?’
    ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, মিঠুন, আপনাকে রুশরা এখনও এভাবেই মনে রেখেছে, ভাবতে ভাল লাগছে না? অনেক আলোচনা হল। এমনকি, ‘মেরা নাম জোকার’–ও এল আলোচনায়। রাজ কাপুর প্রয়াত তো কী, ড্যান তো তাঁকে বললেন, ‘দ্যাট বাডি, ট্রাইং টু বি ইন্ডিয়ান ভার্সান অব চ্যাপলিন!’‌
    কিন্তু, ‘বিগ বি’ অমিতাভ বচ্চন বা ‘কিং’ শাহরুখ খান? দুঃখিত, তাঁদের পাওয়া গেল না এভাবে। কারণও জানা গেল। সাবেক সোবিয়েতে ভারতীয় সিনেমার, মানে বলিউডি ছবির বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। এখনও নাকি অনেক ভিডিও ক্যাসেট অনেকের সংগ্রহে আছে। সেখানে মিঠুন আর রাজ কাপুরের জনপ্রিয়তা বিরাট। এখন, নতুন রাশিয়ায় শুধু হলিউড আসে, বলিউড–এর ‘নো এন্ট্রি’। তাই, ভারতীয় বা বলিউডি সিনেমাও যে লগান–চাক দে ইন্ডিয়া–ব্ল্যাক পেরিয়ে ‘তারে জমিন পর’–এ পৌঁছেছে, কথায় বলা গেলেও বোঝানো গেল না বোধহয়। রুশ জনতার কাছে আজও তাই ভারতীয় সিনেমা মানেই ‘জিমি’ এবং তাঁর নাচ!

    সাম্যের অদ্ভুত ছবি!

    মস্কোয় গিয়ে রেড স্কোয়্যারে যাবেন না, তা–ও আবার হয় নাকি?
    সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল তো আছেই, পাশে ঐতিহাসিক স্টেট মিউডিয়াম, তারও পাশে চিরশয়ানে সমাজতন্ত্রী রাশিয়ার জনক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, দেখবেন না? তা ছাড়া, সেখানেই তো উয়েফা করছে চ্যাম্পিয়ন্স ফেস্টিভাল, কাজের খাতিরেও তো যেতেই হবে।
    ফাইনালের সকালে পাওয়া গেল ফুরসত। লাল লাইন ধরে ওখাটনি রোড স্টেশনে নেমে নীল লাইনের টেট্রালনায়া স্টেশনের গেট দিয়ে বেরোলেই মস্কোর রাইটার্স বিল্ডিংস–এর সামনে আপনি!
    কিন্তু, কোথায় ইতিহাস, কোথায় অন্য দ্রষ্টব্যগুলোর জন্য মানুষের আকর্ষণ? সবই কেড়ে নিয়েছিল ফুটবল, অন্তত সেই ২১ মে–র সকালে।
    ফুটবল–মেলা বললেই ঠিক। কুড়ি–কুড়ি চল্লিশ হাজার ব্রিটিশ সমর্থক তখন রাশিয়ার রাস্তায় নিজেদের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। রেড স্কোয়্যারে তখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ইংরেজি সংলাপ। ম্যানচেস্টার এবং চেলসি সমর্থকরা নিজেদের নিজেদের ক্লাব এবং নায়কদের নামে জয়ধ্বনি করে জানিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের উপস্থিতি। স্কাই টিভি–র কর্মরত টেলিভিশন সাংবাদিকরাও ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন ইংল্যান্ডে ‘লাইভ ফিড’ পাঠাতে। সমর্থকদের ধরা হচ্ছে ক্যামেরায়, যে যার মতো করে রাশিয়া থেকে সন্দেশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেশে অপেক্ষারত অগণিত ভক্তকে। মাঝখানে ছোট মাঠ। ভবিষ্যতের তারকারা খেলছেন। ফাইভ–এ–সাইড। বাঁদিকে অস্থায়ী গ্যালারি করে দেওয়া হয়েছে। প্রচুর সমর্থক সেখানেই বসে দেখছেন ছোটদের কারসাজি। এক বালক, বছর বারো হবে, ফ্রি–কিক নিচ্ছে আর গোল করছে, রোবের্তো কার্লোস বা জুনিনিও পেরনামবুকানোরা দেখলে কী খুশিই যে হতেন!
    চার পাশে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্পনসরদের স্টল ছড়ানো–ছেটানো। বিভিন্ন স্টলে বিভিন্ন ভাবে ফুটবল বিপণণ। কোথাও কেউ পায়ে বল নাচিয়ে চলেছেন। নাচাতে নাচাতে বল পড়ে গেল, চলে গেল গোল হযে ঘিরে থাকা দর্শকের কারও পায়ে। তিনিও বার কয়েক নাচিয়ে বোঝালেন কম যান না। বল ফেরত পাঠালেন নাচাতে নাচাতেই। তার পাশে আরও এক জটলা। সেখানে দুই বছর পনেরর গায়ে ম্যানচেস্টার এবং চেলসির জার্সি। হঠাৎ হঠাৎ নানা ভঙ্গিতে এমন দাঁড়ানো, যেন মাঠের খেলার কোনও মুহূর্ত। দুপাশে ম্যানচেস্টার এবং চেলসির আলাদা আলাদা স্টল। সেখান থেকে দেদার বিকোচ্ছে দুই দলের জার্সি, স্কার্ফ, টুপি, স্মারক। ‘মস্কো, ফাইনাল ২০০৮’ লেখা টি–শার্ট চাইলে কিনতে পারেন উয়েফার স্টল থেকে। দাম যা–ই হোক, প্রিয় ক্লাবের সমর্থনে এত দূর থেকে এসে একটা জার্সি বা টুপি কিনবেন না, তা–ও তো হয় না। বারোটা নাগাদ বৃষ্টি শুরু। ঝিরঝিরে। কারও হেলদোল নেই তাতে। ফুটবলের জন্য একটু ভিজতে ক্ষতি কী?
    উয়েফা দেখাচ্ছিল বিশেষ তথ্যচিত্র। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা ইউরোপীয় কাপের ইতিবৃত্ত। ৪৫ মিনিটের ছবি, ৫ মিনিটের ব্রেক দুই শো–এর মাঝে। তখন লাইনে দাঁড়িয়ে–থাকা। ভেতরে ঢুকে অবাক হতেই হবে। টানা পাঁচ বড় পর্দার এক দিক থেকে দিস্তেফানো দৌড় শুরু করে শেষ করছেন শেষের পর্দায়, ততক্ষণে পুসকাস ছুটতে শুরু করে দিয়েছেন আবার প্রথম পর্দা থেকে!
    সবাই হাজির সেখানে। জিদানের সেই হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গিতে বাঁ–পায়ের অবিস্মরণীয় গোল যা রেয়ালকে দিয়েছিল তাদের নবম খেতাব, পেয়েছে সেরা গোলের সম্মান। জোহান ক্রুয়েফের সেই ‘টার্ন’, বড় পর্দায়, রিপ্লেতেও। আছেন ইউসেবিও আর তাঁর বেনফিকা। কাইজার বেকেনবাওয়ার, মিশেল প্লাতিনিরা দূরে থাকেন কী করে? ফিরে–আসার রূপকথায় ১৯৯৯–এর ম্যানচেস্টার আর ২০০৫–এর স্টিভি জেরার্ড। ভাবতে শুরু করেছেন, ব্রাজিলীয়রা গেলেন কোথায়, পর্দায় ভেসে উঠল ‘ব্রাজিল’। আলাদা অধ্যায় রাখবেন না ব্রাজিলকে নিয়ে, হয় নাকি? রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও, কাকাদের ভুলে যাবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ?
    বাইরে বেরিয়ে অনেক ক্ষণ থেকে যায় রেশ। আর চোখ টেনে নেয় সর্পিল লাইন যার শেষ সীমা বিস্তৃত প্রায় রেড স্কোয়্যারের মুখের রেজারেকশন গেট পর্যন্ত। কীসের জন্য এত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে? জানা গেল, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফির পাশে দাঁড়িযে ছবি তোলার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তার আগের দিন নাকি আট ঘন্টাও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মানুষ, ওই এক ছবির জন্য! কোনও ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি নেই। নিজেদের মধ্যে গল্প, উচ্চস্বরে, আছে। কিন্তু বিশৃঙ্খল বলা যায় না কিছুতেই।
    প্রথমে সেই লাইন দেখে বাইরের লোক হিসেবে ভাবতে বাধ্য হবেন, লেনিনের সমাধি দেখতেই বোধহয় এত ভিড়। আর, একা লেনিন তো নন, আছেন প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন, সাবেক সোবিয়েতের সমাজতন্ত্রী আরও প্রচুর নেতা। কিন্তু, সেই লাইনের মাথা তো শেষ হচ্ছে সেই ছোট্ট ঘরটায় যেখানে রাখা রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি!
    প্রতীকী দৃশ্য, অবশ্যই। রাশিয়ায় সাম্যবাদের জনকের কৃত্রিমভাবে রক্ষিত অবিনশ্বর শরীরের পাশে নতুন সাম্যবাদ নয়, চিরকালীন সাম্যবাদ যা প্রচার করে এসেছে এক চামড়ার গোলক, গোটা বিশ্বজুড়ে — ফুটবল। রুশ অর্বুদপতি চেলসি–মালিক রোমান আব্রোমোভিচ আর বাগুইআটির রিকশাওয়ালাকে জন টেরির পিছলে–যাওয়া যেখানে সমান বুক ভার করে, কাঁদায় সমান ভাবে।
    শ্রেণীসাম্যের এর চেয়ে বড় উদাহরণ কে কোথায় আর দেখাতে পেরেছে, ফুটবল ছাড়া!
    (লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল আজকাল কাগজে, ২০০৮ সালের জুন মাসে)    



    No comments